রাজশাহী নগরীর কুমারপাড়ার বাসিন্দা সাংস্কৃতিক কর্মী আহসান কবীর লিটন। গত ১২ জুন তিনি করোনা পজিটিভ হন। পজিটিভ হওয়ার আগেই তিনি ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কোভিশিল্ডের দুটি ডোজ নিয়েছিলেন। গত ২০ জুন অ্যান্টিজেন টেস্টে তার রিপোর্ট নেগেটিভ আসে।

আহসান কবীর লিটন জানান, করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হলেও খুব বেশি উপর্সগ ছিল না। শরীরে হালকা জ্বর ও কিছুটা শারীরিক দুর্বলতা অনুভব করেছেন তিনি।

তিনি জানান, তার শরীরে আগে থেকে ফ্যাটি লিভার ও ফুসফুসে কিছুটা সমস্যা ছিল। যেহেতু এই সময় ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের প্রকোপ বেশি, সে কারণে করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর মনে কিছুটা ভয় ও সংশয় তৈরি হয়, কী জানি কী হয়ে যায়! বিশেষ করে লিভার ও ফুসফসজনিত সমস্যা বৃদ্ধির আশংকা ছিল শুরু থেকেই। কিন্তু সেসব আশঙ্কা বাস্তবে সত্যি হয় নি।

তিনি মনে করেন, ভ্যাকসিন নেয়ার কারণে করোনা সংক্রমিত হওয়ার পরও কোনো ধরনের মারাত্মক অবস্থার মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়নি। একই সঙ্গে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতেও হয়নি।  

একই এলাকার যুবলীগ কর্মী আরকান বাপ্পী ও তার স্ত্রী করোনা আক্রান্ত হন। তারাও সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত দুই ডোজ টিকা নিয়েছিলেন। তিনি মনে করছেন, ভ্যাকসিন নেওয়ার কারণেই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে সংক্রমিত হয়েও তাদের মারাত্মক পর্যায়ে যেতে হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক জানান, দু্ই ডোজ ভ্যাকসিন নেয়ার পর তার দুই স্বজন করোনা আক্রান্ত হন। এরমধ্যে একজন বয়স্ক নারী ছিলেন। যিনি গত রমজান মাসে শেষ ডোজ গ্রহণ করেন। ১৪ দিনের মাথায় তারা করোনা নেগেটিভ প্রমানিত হয়েছেন। বড় ধরনের কোনো সমস্যাতেও পড়তে হয়নি

ওই চিকিৎসক অন্তত আরও ৫ জনকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকা নেয়ার পরও আক্রান্ত হতে দেখেছেন। তবে তাদের কাউকেই করোনার ভয়ংকর অবস্থা বা মারাত্মক পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সালমা বানু ও তার পরিবারের সদস্যরা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। তারা আগে থেকেই টিকা নিয়েছিলেন। এরমধ্যে মঙ্গলবার ওই শিক্ষিকার নেগেটিভ আসলেও পরিবারের এক সদস্য পজিটিভ রয়েছেন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সম্প্রতি ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন, টিকার দুই ডোজ গ্রহণের পর এ মাসের শুরুতে তার পিতা-মাতা করোনায় আক্রান্ত হন। এই দুই প্রবীণ নাগরিকই ২১ জুন করোনা নেগেটিভ হন।

রাজশাহীতে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার দুই ডোজ টিকা নেয়ার পর করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাবার একটিমাত্র তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি হলেন গোদাগাড়ীর বাসিন্দা ৬৭ বছর বয়সী গোলাম মোস্তফা। তার স্ত্রী মমতাজ বেগম জানিয়েছেন, গোলাম মোস্তফা কোভিড আক্রান্ত হওয়ার পর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। সেখানে ৯ দিন রাখার পর শারিরীক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে আবারো ৩০ নম্বর করোনা ওয়ার্ডে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

কোভিড টিকা নেয়ার পর করোনা আক্রান্তরা বলছেন, অন্যদের তুলনায় তাদের উপসর্গ কম ছিলো। শ্বাসকষ্ট, লিভার, ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার বিষয়টিও খুবই কম মাত্রায় হয়েছে।

দুই ডোজ ভ্যাকসিন নিয়ে রাজশাহীতে প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হয় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশার। প্রবীণ এই রাজনৈতিক নেতাকে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। তবে বড় কোনো জটিলতা ছাড়াই তিনি করোনা নেগেটিভ হন।

রাজশাহী সিভিল সার্জন অফিসের হিসেবে, গত ১৯ মে করোনা টিকা কার্যক্রম বন্ধের আগ পর্যন্ত রাজশাহীতে প্রথম দফায় টিকা গ্রহীতার সংখ্যা ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৪ জন। নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় টিকা গ্রহণ করেছেন ৮১ হাজার ৬৪০ জন। মজুদ শেষ হওয়ায় টিকা নিতে পারেননি ৫২ হাজার ১৩৪ জন।

সিভিল সার্জন অফিস জানিয়েছে, সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনার টিকা প্রথম দফায় ১লাখ ৮০ হাজার ডোজ আসে রাজশাহীতে। দ্বিতীয় দফায় ৮৪ হাজার ডোজ টিকা আসার পর বিতরণের কার্যক্রম শুরু হয়।

সিভিল সার্জন অফিস জানিয়েছে, দুই ডোজ টিকা নেয়ার পর কতজন আক্রান্ত হয়েছেন তার সংখ্যা নিরুপনে উপজেলা ও হাসপাতাল থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এটি এখন পর্যন্ত চলমান। এখন পর্যন্ত তারা যে তথ্য পেয়েছেন তা থেকে তারা বলছেন, দুই ডোজ নেয়ার পর যারা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের সংখ্যা এখন পর্যন্ত একশ জনের বেশি নয়।

এবিষয়ে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করছেন আইইডিসিআর একজন কর্মী। তিনি সরাসরি কেন্দ্রে তথ্য প্রেরণ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, “আমরা তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে স্বাস্থ্য বিভাগকে জানাবো। যেহেতু বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন সেহেতু ঠিকঠাক তথ্যের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।”

তিনি জানান, এখন পর্যন্ত যে তথ্য রয়েছে তাতে দুই ডোজ টিকা নিয়েছেন এবং আক্রান্ত হয়েছেন রাজশাহীতে জেলাতে এমন ব্যক্তির সংখ্যা একশ জনের কাছাকাছি। আর বিভাগজুড়ে এ সংখ্যা আড়াইশ হবে। এক ডোজ নেয়ার পর সংক্রমিত হওয়ার সংখ্যাও আক্রান্তের অনুপাতে কম বলে দাবি করেছেন তিনি।

তিনি তথ্য সংগ্রহের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, যারা দুই ডোজ নিয়েছেন তাদের সংক্রমিত হওয়ার হার খুব কম। মৃত্যুহার নেই বললেই চলে। আর যারা এক ডোজ নিয়েছেন তারাও খুব অস্বাভাবিক মাত্রায় সংক্রমিত হচ্ছেন না। তাদের সংখ্যাও কম।

নানা পেশার অভিজ্ঞতা

নগরীতে একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত এক ব্যক্তি নাম পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা সমবয়সী ৫ ব্যাংকার এক সঙ্গে ভ্যাকসিন নেয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। শুরুতেই তারা তিনজন নিবন্ধন করতে সক্ষম হন। বাকি দুজন বারবার চেষ্টার পরেও নিবন্ধন করতে পারেননি। ফলে ওই দুজনকে ছাড়া বাকি তিনজনই ভ্যাকসিনের দুই ডোজ নেন।

নগরীতে সংক্রমণের হার বাড়তে থাকার মুখেও তাদের সবাইকেই পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। ভ্যাকসিন নেয়া তিনজন এখনও আক্রান্ত হননি। কিন্তু এ মাসের শুরুর দিকেই ভ্যাকসিন না নেয়া সেই ‍দুজন আক্রান্ত হয়েছেন। ওই ব্যাংকার মনে করেন, ভ্যাকসিন নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানলে সংক্রমণের ঝুঁকি কম থাকে।

সংক্রমণের ভয়াবহতার মুখেও নগরীতে সংবাদকর্মীরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন। পেশাগত কারণেই হাসপাতালেও তাদের যেতে হচ্ছে নিয়মিত। তাদের মধ্যে অন্তত ৯ জনের শরীরে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউই নানা কারণে ভ্যাকসিন নিতে পারেননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক তরুণ ব্যবসায়ী বলছিলেন, তিনি সপরিবার শুরুর দিকেই দুই ডোজ ভ্যাকসিন নিয়ে নেন। তার ব্যবসায়িক পার্টনার ও আরেক বন্ধু ব্যবসায়ী ভ্যাকসিন নেয়া না নেয়া নিয়ে দ্বিধাদন্দ্বে ছিলেন।

ওই তরুণ ব্যবসায়ী বলেন, “আমার পার্টনার একবার বলতেন, নিয়ে নেবো। পরের দিন এসেই আবার বলতেন, এই টিকার সাইড ইফেক্ট আছে নাকি! এরপরেই তিনি আবার বলতেন, থাক, পরে নেবো।”

আর তার বন্ধুটি শুরু থেকেই বলে আসছিলেন যে, তিনি আরও দেখবেন, তারপর ভ্যাকসিন নেবেন। শেষমেশ যখন ওই ব্যবসায়ীর পার্টনার সিদ্ধান্ত নিলেন যে, ভ্যাকসিন নেবেন, ততদিনে রাজশাহীতে ভ্যাকসিন দেয়া শেষ। এ মাসের শুরুর দিকেই তাদের দুজনই সংক্রমিত হন। একজন সপরিবার, অন্যজন একা হলেও শ্বাসকষ্টের কারণে তাকে হাসপাতালে নিতে হয়।    

হাসপাতালের অভিজ্ঞতা

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা ইউনিটে দ্বায়িত্ব পালন করছেন ২৫২ জন চিকিৎসক, ৫৮০ জন নার্স ও ১৫২ জন চিকিৎসাকর্মী। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত করোনা ইউনিটের ১২৩ জন চিকিৎসক করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। এরমধ্যে ১২০ জনই আক্রান্ত হয়েছেন প্রথম ওয়েভ বা করোনা সংক্রমনের শুরুর দিকে। অর্থাৎ টিকা গ্রহণের আগে। এবার ভ্যাকসিন গ্রহণের পর চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন মাত্র ৩ জন।

প্রথম ওয়েভে করোনা চিকিৎসায় জড়িত ২৬৭ জন নার্স আক্রান্ত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় ধাপে আক্রান্ত ৫৭ জন। এরমধ্যে যারা বিভিন্ন কারণে টিকা গ্রহণ করতে পারেননি তারাই বেশী আক্রান্ত হয়েছেন।দুই ডোজ টিকা গ্রহনের পর ওয়ার্ড বয় বা চিকিৎসাকর্মী করোনা আক্রান্ত হয়েছেন মাত্র ৬ জন। অথচ টিকা গ্রহণের আগে গেল ওয়েভে করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন ১০১ জন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, “টিকা গ্রহণের ফলে করোনা চিকিৎসার সাথে সম্পৃক্ত চিকিৎসকরা ও অন্যরা কতটা ঝুঁকিমুক্ত হয়েছে তা দুই ধাপের মধ্যে তুলনা করলেই স্পষ্ট হয়। বলতে গেলে কার্যকারিতা শতভাগের কাছাকাছি।”

তিনি আরো জানান, প্রথম ওয়েভে করোনা চিকিৎসার সাথে সম্পৃক্তরা নিজেরা যেমন সংক্রমিত হয়েছিল, তেমনি তাদের পরিবারের সদস্যরাও সংক্রমিত হয়েছে। এবার টিকা গ্রহণের পর সেই চিত্র আর নেই।

তিনি উল্লেখ করেন, প্রথম ধাপে করোনা চিকিৎসায় সম্পৃক্তদের আলাদা রাখতে আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কারণ তারা বেশিসংখ্যক আক্রান্ত হয়েছিল। এবার যেহেতু সবাইকে করোনার টিকার আওতায় আনা হয়েছে এবং সংক্রমণ নেই বললেই চলে, সেকারণে আইসোলেশন সুবিধা দেয়ার প্রয়োজন পড়ছে না।

তবে ভ্যাকসিন গ্রহণ করলেও অন্যদের সংক্রমিত করা এড়াতে পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মানার ওপর জোর দেন তিনি।

গবেষণা কী বলে?

স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, টিকার কার্যকারিতা নিয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে সেভাবে গবেষণার ফলাফল পাওয়া যায়নি। তবে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করছে আইইডিসিআর।

স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক কর্মী নাম প্রকাশে অপারগতা জানিয়ে বলেছেন, রোগীদের ইতিহাস পর্যালোচনা ও আশেপাশের তথ্য যা বলছে, তাতে সেরাম ইন্সিটিটিউটের টিকার কার্যকারিতা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ভালো। 

তবে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন নিয়ে ব্রিটেনে একটি গবেষণা পূর্ণাঙ্গ হয়েছে। পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ড এপ্রিল থেকে জুনে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত ১৪ হাজার রোগীর ওপর চালানো গবেষণার ফলাফল গত ১৪ জুন অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। সেখানে ফাইজার ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার দুটি ডোজ ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর সেটা তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, ভ্যাকসিনগুলো মৃতের সংখ্যা কমাতে পারে সেই সঙ্গে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যাও কমাতে পারে।

ফলাফলে উল্লেখ করেছে, যারা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনের দুটি ডোজ নিয়েছেন, তাদের ভেতরে ৯২ শতাংশ কোনো ধরনের মারাত্মক কোভিডে আক্রান্ত হননি। আক্রান্ত হয়েও ভর্তি হতে হয়নি হাসপাতালে। যারা এই ভ্যাকসিনটির একটি ডোজ নিয়েছেন, তাদের মধ্যকার ৭১ শতাংশ ব্যক্তির হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন পড়েনি।