grand river view

।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

সরকার ঘোষিত লকডাউনে ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন জেলায় পোশাক কারখানাসহ ছোট-বড় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খোলা রয়েছে। তবে সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করায় কারখানার শ্রমিক-কর্মী এবং অফিসগামী যাত্রীদের মঙ্গলবার (২২ জুন) সকালে সড়কে ভোগান্তিতে পোহাতে হয়েছে। গণপরিবহন না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে অপেক্ষার পাশাপাশি বিকল্প উপায়ে অফিস ও কারখানায় যেতে কর্মীদের গুনতে হয়েছে বাড়তি টাকা।

গাজীপুর

স্বাভাবিক দিনগুলোতে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা ও ময়মনসিংহের শেষ সীমান্ত এলাকা জৈনাবাজারে দেখা যেতো গণপরিবহনের জটলা। বাসে যাত্রী তুলতে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকতো অসংখ্য বাস। এসময় এ সড়কে কিছুটা যানজটের সৃষ্টিও হতো। তবে মঙ্গলবার সকালে ওই স্থানের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে সকালে সড়কটিতে দেখা যায় অফিসগামী যাত্রীরা দাঁড়িয়ে আছেন, নেই গণপরিবহন। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ওই স্থানে নেই কোনও যানজট। তবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দেখা গেছে।

গণপরিবহন না থাকায় বাধ্য হয়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় চলাচল করতে হচ্ছে অফিসগামী পোশাক কারাখানার শ্রমিক ও সাধারণ যাত্রীদের। এতে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে তাদের। মহাসড়কের জৈনা বাজার, এমসি, নয়নপুর, মাওনা চেরৈাস্তা, মাস্টারবাড়ি, বাঘের বাজার, ভবানীপুরসহ সড়কের প্রতি বাস স্টপেজে দেখা গেছে যাত্রীদের জটলা। গণপিরবহন না পেয়ে আবার অনেকে পায়ে হেঁটেও পৌঁছেছেন কর্মস্থলে।

মহাসড়কের এমসি বাজার বাস স্টপেজে যানবাহনের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় ছিলেন মাস্টারবাড়ি এলাকার পোশাক কারখানার শ্রমিক রেজাউল করিম। সকাল ৭টার দিকে জৈনা বাজারের বাসা থেকে বের হয়ে অটো দিয়ে বাস স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু সড়কে নেই বাস। পরে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় দ্বিগুন ভাড়ায় অফিসের উদ্দেশে রওনা হন।

বাঘের বাজার এলাকার গোল্ডেন পোশাক করাখানার নারী শ্রমিক জহুরা বেগম, আয়েশা আক্তার, ফুলমতি বেগম ও রেহেনা আক্তারসহ তাদের সহকর্মীরা বলেন, করোনা সংক্রমণ কমানোর জন্য লকডাউন দিয়েছে, অন্যদিকে অফিসও খোলা রাখছে। তাই দুর্ভোগ মাথায় নিয়েই আমাদের অফিসে যেতে হচ্ছে। কাজ না করলে তো অফিস বেতন দেবে না। তাই বাধ্য হয়েই বেশি ভাড়া দিয়েই অফিসে যাচ্ছি।

তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের যাতায়াতের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করেছে। আবার অনেকেই এ বিষয়ে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। যে কারণে কর্মীদের কর্মস্থলে পৌঁছাতে অতিরিক্ত ভাড়া গোনার পাশাপাশি পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি।

এদিকে, মহাসড়কে দূর পাল্লার যানবাহন ছাড়া সব ধরনের যানবাহন চলতে দেখা গেছে। সেখানে দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, প্রাইভেটকার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, পিকআপভ্যানসহ রিকশাও চলতে দেখা গেছে।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালক আল-আমিন জানান, লকডাউনে আমরা ভাড়া বাড়াইনি। আমাদের ইনকাম কম। এ লকডাউনে আমাদেরও তো খাইয়া পইরা বাঁচতে হবে।

মাওনা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন বলেন, লকডাউনের প্রথম দিনে সড়কে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ রেখেছি। তবে জরুরি সেবায় বা ব্যক্তিগত কিছু গাড়ি চলছে। এছাড়া সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও কাছাকাছি দূরত্বের জন্য সড়কে রিকশাও চলছে।

নারায়ণগঞ্জ

করোনা সংক্রমণরোধে নারায়ণগঞ্জে চলছে লকডাউন। মঙ্গলবার সকাল থেকে বৃষ্টির মধ্যেই জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে পুলিশ কাজ শরু করেছে। ঢাকা চট্টগ্রাম ও ঢাকা সিলেট মহাসড়ক দিয়ে যাতে কোনও গণপরিবহন নারায়ণগঞ্জ অংশ দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য পুলিশের বেশ কয়েকটি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ শহরে লকডাউন ও বৃষ্টির কারণে সড়কে সাধারণ মানুষ ও যানবাহন স্বাভাবিক দিনের চেয়ে কম ছিলনারায়ণগঞ্জ শহরে লকডাউন ও বৃষ্টির কারণে সড়কে সাধারণ মানুষ ও যানবাহন স্বাভাবিক দিনের চেয়ে কম ছিল

লকডাউনের মধ্যেই নারায়ণগঞ্জের গার্মেন্টস কারখানাগুলো খোলা রয়েছে। শ্রমিকরা বৃষ্টিতে ভিজেই কাজে যোগ দিয়েছেন। তবে গার্মেন্টেসে কর্মরত অফিসের কর্মকর্তারা নগরীতে প্রবেশ করার সময় পুলিশের চেকপোস্টে এসে অনেকেই আটকে গেছেন। অবশ্য পুলিশের কর্মকর্তারা গার্মেন্টস কর্মী বা কর্মকর্তাদের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে পরে ছেড়ে দিয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান নিজেদের কর্মীদের আনা-নেওয়ার জন্য পরিবহনের ব্যবস্থা করেছেন। তবে বেশিরভাগেরই সেই ব্যবস্থা নেই। এতে ওইসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে সকালে অফিসগামী যাত্রী নিয়ে ঢাকায় বাস প্রবেশ করতে দেখা গেছে। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরাও তেমন একটা বাধা দিচ্ছেন না। তবে দূরপাল্লার কোনও বাস ছেড়ে যাওয়া বা ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। সকালে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড ও শনিরআখড়া এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সাইনবোর্ড-গুলিস্তান সড়কের সাইনবোর্ড অংশে পুলিশের একটি চেকপোস্ট রয়েছে। সেখানে ‘রাস্তা বন্ধ’ লেখা পুলিশের একটি স্টিকার যুক্ত ব্যারিকেড রয়েছে। সেখান থেকে কিছু দূরে কয়েকজন পুলিশ সদস্য দাঁড়িয়ে রয়েছেন। যাত্রী পরিববহনের দায়ে কয়েকটি বাস ও লেগুনাকে আটকে রাখতে দেখা গেছে। তবে বাকি সবগুলো বাস ভরপুর যাত্রী নিয়ে ঢাকার দিকে ছেড়ে গেলেও বাধা দেওয়া হচ্ছে না।

তবে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম জানান, লকডাউন কঠোরভাবে পালন করতে দুটি মহাসড়কসহ ৩০টি পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে কাজ চলছে। এই চেকপোস্ট দিয়ে কেউ জেলা থেকে বের হতে পারবে না, বাইরের জেলা থেকে ভেতরে আসতে পারবে না। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাড়ি থেকে বের না হতে বলা হয়েছে। তবে পোশাক কারখানা ও জরুরি সেবা চালু রয়েছে। গার্মেন্টস সেক্টরে কর্মরতদের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তাদের কর্মস্থলে যেতে সহায়তা করা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ্ জানান, জরুরি প্রয়োজনে লোকজন যাতায়াত করতে পারবেন। এছাড়া সব ধরনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

মানিকগঞ্জে গণপরিবহন না থাকায় পায়ে হেঁটে অনেককেই গন্তব্যে পৌঁছাতে দেখা যায় মানিকগঞ্জে গণপরিবহন না থাকায় পায়ে হেঁটে অনেককেই গন্তব্যে পৌঁছাতে দেখা যায়

মানিকগঞ্জ

জেলায় সকাল থেকে শুরু হওয়া লকডাউন বাস্তবায়নে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। আজ অন্যদিনের মতো সড়কে লোকজনের চলাচল ছিল না। স্বাভাবিক সময়ের মতো হ্যালোবাইক, রিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা সড়কে দেখা যায়নি। এ অবস্থায় সকালে কর্মস্থলে রওনা হয়ে বিপাকে পড়েন শ্রমিক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা।

শহরের সেওতা এলাকায় বাসা ভাড়া থাকেন তৈরি পোশাক শ্রমিক আম্বিয়া খাতুন (২৫)। প্রতিদিন তার কর্মস্থলে যাতায়াত ছিল গণপরিবহনে। অন্যান্য দিনের মতো কর্মস্থলে যেতে সকাল ৮টায় হাজির হন তিনি মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে। কিন্তু লকডাউনের কারণে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় তিনি পড়েন মহা বিপাকে। বাসস্ট্যান্ড থেকে কর্মস্থল সাত কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে পৌঁছাতে অফিসের সময় পেরিয়ে যাবে। অগত্যা আরেক নারী সহকর্মীর সঙ্গে ১০০ টাকা ভাড়ায় রওয়ানা দেন কারখানায়।

কথা হয় আরেক গার্মেন্টকর্মী আওলাদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি যাবেন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের তরা ক্রস ব্রিজের পাশে অবস্থিত মুন্নু অটোওয়্যারে। লকডাউনে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় তিনিও অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে কর্মস্থলে রওনা হন।

তবে জেলার বিভিন্নস্থানে অবস্থিত তৈরি পোশাক কারখানার অনেকগুলোই নিজস্ব পরিবহন দিয়ে কর্মীদের যাতায়াত নিশ্চিত করেছে বলে জানা গেছে।

লকডাউনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে জেলার অভ্যন্তরের কোনও গণপরিবহন চলাচল করতে দেখা যায়নি। শুধুমাত্র দক্ষিণাঞ্চলের দূরপাল্লার নৈশকোচগুলো পাটুরিয়া থেকে ঢাকার গাবতলী অভিমুখে চলাচল করতে দেখা গেছে।

ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টর (টিআই) প্রশাসন আবুল হোসেন গাজী জানান, সরকারে নির্দেশনার আওতামুক্ত যানবাহন ব্যতিরেকে কোনও গণপরিবহন চলাচল করতে দিচ্ছেন না তারা। পাটুরিয়া–দৌলতদিয়া ও আরিচা–কাজিরহাট রুটে পণ্যবাহী ট্রাক, অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া ফেরিযোগে কোনও যানবাহন পারাপার হচ্ছে না। পাশাপাশি সকাল থেকে উল্লেখিত দুটি রুটে কোনও লঞ্চ ও স্পিডবোটও চলাচল করছে না।

ট্রাফিক পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ দায়িত্ব পালন করে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে।

প্রসঙ্গত, করোনার ভয়াবহ প্রকোপ থেকে রাজধানী ঢাকাকে সুরক্ষিত রাখতে আশপাশের সাত জেলায় কঠোর লকডাউন ঘোষণা করা হয়। আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত এই লকডাউন চলবে। সোমবার (২১ জুন) বিকালে জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম লকডাউনের কথা জানান।