কাপড়ে ঢাকা নিথর দেহ। পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীর মরদেহ যখন হাসপাতালের বাইরে নেয়া হচ্ছিল, তখনও বিলাপ করছিলেন স্বজনরা। বলছিলেন, ওয়ার্ডের বাইরে থেকেই নিতে হলো চিকিৎসা। নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সুবিধা বা আইসিইউ সুবিধা মিললে, শরীরে প্রাণটা হয়তো থাকতো!

হাসপাতালে রোগীদের এমন করুণ আর্তি জরুরি বিভাগ বা করোনা ওয়ার্ডে এখন খুবই পরিচিত। হরহামেশা ঘটে। চিত্র সাংবাদিক মাহফুজুর রহমান রুবেল বলছিলেন, জরুরি বিভাগের একঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলে দেখবেন, অক্সিজেনের জন্য আক্রান্তরা পাগলপ্রায়। তিনি যখন কথা বলছিলেন, তখন জরুরি বিভাগের গেটে ভর্তির জন্য অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামানো হচ্ছিল দুর্গাপুরের সুনীল বসুকে। লোকটা ছটফট করছিলেন। অক্সিজেনের নল সর্বশক্তি দিয়ে মুখের সাথে চেপে ধরছিলেন যাতে তিনি ক্ষণিক সময়ের জন্য হলেও প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারেন।

রুবেল তাকে দেখিয়ে বলছিলেন, অক্সিজেনের জন্য আকুলি বিকুলি কতটা বেদনাদায়ক, সেটি আপনি চোখে দেখতে পাচ্ছেন। সেকারণে হয়তো মন থেকে ব্যাথাটা অনুভব করছেন। কিন্তু লিখে বা বলে, এই কষ্ট আপনি কোনোভাবেই কাউকে বোঝাতে পারবেন না।

আশেপাশের মানুষকেও খুব একটা চঞ্চল হতে দেখা গেল না, এমন যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতিতে। কারণ, রোগীর ঢেউয়ে টালমাটাল হাসপাতালে একটা ঘটনার থেকে আরেকটা বেশি মর্মান্তিক।  

চারিধারে সংকট

বর্তমানে সংকটের প্রধান ও প্রথম বিষয় অক্সিজেন। দ্বিতীয়টি লকডাউনের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসেও নগরে কমছে না আক্রান্তের হার। তৃতীয়টি গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। শেষ সংকট হাসপাতাল ভরে গেলেও ব্যবস্থা করা যায়নি বিকল্প চিকিৎসা কেন্দ্র। সংকটময় পরিস্থিতিকে এভাবেই বর্ণনা করছিলেন উন্নয়নকর্মী সুব্রত কুমার পাল।

তার অভিমত, নগরে সংক্রমণের হার এখনও ঊর্ধ্বমুখী। গ্রামে হু হু করে বাড়ছে সংক্রমিত ব্যক্তি। করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা, হাসপাতালে বেড, আইসিইউ সবখানেই সংকটের চিত্র মোটামুটি এক।  

সোমবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রায় একই কথা বললেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী। তিনি বললেন, পরিস্থিতি ভয়াবহ। তবে এখনও সময় শেষ হয়ে যায়নি। সম্মিলতিভাবে চেষ্টা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়া সম্ভব।

অক্সিজেন, অক্সিজেন

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানিয়েছেন, হাসপাতালে এখন যেসব রোগী আসছেন সকলেরই অক্সিজেন প্রয়োজন। এদের সিলিন্ডার দিয়ে অক্সিজেন সরবরাহ করা খুবই কঠিন। কারণ একটা সিলিন্ডার চলে মাত্র দেড় ঘণ্টা। সে হিসেবে ২৪ ঘণ্টার জন্য প্রয়োজন হয় ১৬টি সিলিন্ডার। হিসেব খুব স্পষ্ট সিলিন্ডার দিয়ে করোনা আক্রান্তদের নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সহায়তা দেয়া দূরহ ব্যাপার।

তিনি জানালেন, হাসপাতালের (সোমবার দুপুর পর্যন্ত) ৯৩ জন যে বাড়তি রোগী রয়েছে তাদের কেন্দ্রীয় অক্সিজেন লাইনের সাথে অক্সিজেন কনসেনট্রেটর যুক্ত করে ম্যানেজ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সাথে হাসপাতালে থাকা ৭৫২টি সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে। তারপরও কিছুটা বিচ্যুতি তো থাকছেই। তবে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হবে একই হারে রোগী ভর্তি হতে থাকলে।

নগরে সংক্রমণের হার এখনও কমেনি, ছড়িয়েছে গ্রামে

অল্প কথায় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বললেন, নগরীতে ঘরে ঘরে রোগী। সবচেয়ে বেশি রোগী বোয়ালিয়া থানা এলাকায়। আক্রান্তের হার এখনও উদ্বেগজনক।

গেল (২০ জুন) ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬২ জন করোনা রোগী। একদিনের ভর্তিতে যেটি রেকর্ড। এরমধ্যে ৩৬ জন গ্রামের। শতকরা হিসেবে ভর্তি রোগীর ৬০ ভাগ। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদিন করোনা আক্রান্ত হয়ে যেসব রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, তারমধ্যে গ্রামের বাসিন্দা ৬০ শতাংশ।

তিনি আরো বলেন, এখানকার নমুনা সংগ্রহ করে জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে। সেটির ফলাফল বলছে, ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে। এটা সামনের দিনে বড় ধরনের সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি করবে।

ব্যবস্থা করা যায়নি বিকল্প চিকিৎসা কেন্দ্র

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোভিড ওয়ার্ডের সংখ্যা ১১টি। শয্যা সংখ্যা ৩০৯টি। ভর্তি ৪ শতাধিক। কেবিন ১৫টি। তাতে ভর্তি ১৭ জন। আইসিইউ ২০টির সবকটিতে রোগী রয়েছে। এমন অবস্থায় আরো একটি ওয়ার্ড বাড়াচ্ছে কর্তৃপক্ষ। সেটি হলে শয্যা সংখ্যা হবে ৩৫৭টি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এভাবে আর বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। কারণ অন্যান্য ওয়ার্ডে সাধারণ রোগের গুরুতর রোগীর চিকিৎসা হচ্ছে। একইসাথে করোনা ও সাধারণ রোগের চিকিৎসার ফলে হাসপাতালও করোনা ঝুঁকিতে পড়ছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, বিকল্প হিসেবে চিন্তা করা হয়েছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেন্টাল ইউনিট। যেটি সদর হাসপাতাল নামে পরিচিত। সেটি সংস্কারে সকলে একমত হলেও কাজের কাজ শুরু হয়নি। সেটি করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল উপযোগী করতে হলে অনেক সময়ের প্রয়োজন।

উদ্যোগী নগর কর্তৃপক্ষ

আগে থেকেই সচেতনতা ও স্যানিটাইজেশনের কাজ চালাচ্ছে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন। নগরের ১৩টি স্পটে করছে নাগরিকদের র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন্ট টেস্ট। বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনাও সংগ্রহ করছেন কর্মীরা। তবে অভিযোগ রয়েছে, উপসর্গ থাকলেও সঠিক সময়ে পরীক্ষা করাতে পারছেন না অনেকে। কিংবা নমুনা দেয়ার পরেও রিপোর্ট পেতে দেরি হচ্ছে।

কল করলেই অক্সিজেন

নগরীতে কোভিড আক্রান্তদের বিনামূল্যে অক্সিজেন সেবা কার্যক্রম চালু করেছে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে অক্সিজেন স্বল্পতায় ভুগছেন এমন ব্যক্তি ও তাঁর স্বজনেরা হটলাইন ০১৭৫৮-৯০১৯০৩ নম্বরে কল করলে তাৎক্ষণিক তার বাড়িতে পৌছে যাচ্ছে অক্সিজেন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী। অক্সিজেনের পাশাপাশি প্রয়োজনে দেয়া হচ্ছে ওষুধ ও খাবার সহায়তা।

সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছেন, আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি। অনেক মানুষ কল করছেন সহায়তা পেতে। তারা সাধ্যমত চেষ্টা করছেন, রোগীদের অক্সিজেন সেবা পৌঁছে দিতে।

নগর পুলিশের অক্সিজেন ব্যাংক

বিনামূল্যে প্রয়োজনানুসারে নগরীর কোভিড আক্রান্তদের অক্সিজেন সহায়তা দেয়ার লক্ষ্যে রাজশাহী নগর পুলিশ গঠন করেছে ‘পুলিশ কোভিড অক্সিজেন ব্যাংক’। বিনামূল্যে রোগীকে অক্সিজেন ও সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদান করছেন। কোভিড আক্রান্ত হয়ে শ্বাসকষ্টে ভুগছেন এমন ব্যক্তি বা তার স্বজনরা কন্ট্রোল রুমের ০১৩২০-০৬৩৯৯৮ নম্বরে কল করলে অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ পুলিশ সদস্য আক্রান্তের ঠিকানায় উপস্থিত হচ্ছে। বিনামূল্যে রোগীকে অক্সিজেন ও সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদান কার্যক্রম চলছে।

নগর পুলিশের মুখপাত্র গোলাম রুহুল কুদ্দুস জানান, প্রতিনিয়ত তারা সিলিন্ডার এর সংখ্যা বাড়াচ্ছেন। একাধিবার রিফিল করে দিচ্ছেন। আক্রান্ত মানুষের চাহিদা অনুযায়ী সবর্োচ্চ চেষ্টা করছেন। তিনি মনে করেন, আরো বেশি অক্সিজেন এর প্রয়োজন পড়বে নগরীতে।

সংগঠন যেন আপনজন

শুধু প্রশাসনিক সংস্থা নয়, অনেক সংগঠন এই মহামারিতে আপনজনের ভূমিকা পালন করছে। ওয়ার্কার্স পার্টির নেতৃত্বাধীন স্বেচ্ছাসেবী দল শহিদ জামিল ব্রিগেড কাজ করছে নগর জুড়ে। এর সঙ্গে আরও কিছু উদ্যোগ তাদের রয়েছে। এই সংগঠনটির হটলাইন নম্বর ০১৭১২২৭৭৮৭১ ও ০১৭২৩৯০৪৯০১ নম্বরে ফোন করলেই করোনায় আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতালে আনা-নেওয়ার জন্য হাজির হয়ে যাচ্ছে বিনা মূল্যের অ্যাম্বুলেন্স। করোনাকালে শহরের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে মানবিক এই উদ্যোগ। তবে এ জন্য একটা টাকাও খরচ হচ্ছে না আক্রান্তদের।

প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত লকডাউন

জনস্বাস্থ্যবিদ চিন্ময় কান্তি দাস জানান, যেভাবে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে তাতে একসময় চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। খুব দ্রুত বিকল্প করোনা চিকিৎসা কেন্দ্রের ব্যবস্থা করতে হবে। একইসাথে জেলা জুড়ে বিজ্ঞানসম্মত লকডাউন দিতে হবে। সবমিলিয়ে বলা যায়, পরিস্থিতি উত্তোরণে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। করোনা চিকিৎসায় খুব বেশি ফল পাওয়া যাবে না, এর থেকে উত্তম হবে প্রতিরোধে।