grand river view

।। রাসেল মুস্তাফিজ, রাজশাহী ।।

একটা ছবিসহ পুরনো খবর রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড ডেভেলপারস অ্যাসোসিয়েশন, রাজশাহীর (রেডা) ওয়েবসাইটে। গেলো বছরের আগস্টের খবরটি রেডার তৎকালীন নবনির্বাচিত কমিটি রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) চেয়ারম্যানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের। খবরে বলা হচ্ছে, “সাক্ষাতকালে আরডিএ’র চেয়ারম্যান বলেন, ‘আগামীতে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) ও রিয়েল এস্টেট এন্ড ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশনের (রেডা) সদস্য না হলে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে পারবে না ডেভেলপাররা।”

আরডিএ’র এই ভবিষ্যত পরিকল্পনার পর ছোটবেলার একটা বিয়োগ অঙ্ক কষে ফেলা যাক। নগরীতে এখন পর্যন্ত মোট ১৭টি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দিয়েছে আরডিএ। আর রেডার সদস্য সংখ্যাই ১৮। এবার ১৮ থেকে ১৭ বিয়োগ করলে থাকে ১। অর্থ্যাৎ ছোটবেলার এই বিয়োগ অঙ্ক কষে সহজভাষায় বলে দেয়া যায়, রেডার সদস্যদের মধ্যে কমপক্ষে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেটি আরডিএর অনুমোদিত নয়। অঙ্কের বাইরের বাস্তবতায় সেই সংখ্যা আরো বেশি।

আরডিএ ও রেডা উভয়পক্ষের দেয়া তথ্য থেকে উঠে এসেছে, রেডার অন্তত ৫ সদস্য আরডিএর অনুমোদনই পায়নি। এর বাইরে আরও যে কত অনুমোদনহীন ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান নগরীতে ঊর্ধ্বমুখী ইমারতের মিছিলে যোগ দিয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসেব খোদ আরডিএর কাছেও নেই।

রেডাকে দিয়ে এই প্রতিবেদন শুরুর কারণ হলো, আবাসন ব্যবসায় শৃঙ্খলার স্বার্থে যে সমিতিকে খোদ আরডিএ চেয়ারম্যান আস্থায় নিয়েছেন বলে তাদের ওয়েবসাইটে খবর প্রকাশ করা হয়েছে, সেই রেডাই আরডিএর অনুমোদন না পাওয়া প্রতিষ্ঠানকেও সদস্য বানিয়েছে।   

রেডা সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান কাজী স্বীকার করেন যে, তাদের সদস্যভুক্ত বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আরডিএর অনুমোদন পায়নি এখনও। সোমবার (২১ জুন) বিকেলে উত্তরকালের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমাদের যেসব সদস্য এরকম অনুমোদন পায়নি এখনও, তারা কিন্তু সবাই অনুমোদনের জন্য আরডিএর কাছে আবেদন করে রেখেছে। ফলে তাদেরকে অনুমোদনহীন না বলে অনুমোদনের জন্য আবেদনকৃত বলা যেতে পারে। আইনগতভাবে অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানের বৈধতা থাকা না থাকার ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, “সবাই তো অনুমোদন নেবে। নিতেই তো চায়।”

আইন কী বলে?        

রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ধারা ৫-এর উপধারা (১) অনুযায়ী “কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় রিয়েল এস্টেট ব্যবসা পরিচালনার উদ্দেশ্যে প্রত্যেক রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে।” ২০১০ সালের ৫ অক্টোবর এই আইনটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।

এই আইনের সারকথা হলো, এর আওতায় দেশের সব ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। নিবন্ধন ছাড়া কোনো ডেভেলপার নিজ বা সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে কিংবা বিদেশি অর্থায়নে প্লট, অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট, শিল্প বা বাণিজ্যিক প্লট বা ফ্ল্যাট, প্রাতিষ্ঠানিক বা মিশ্র ফ্লোর স্পেস-জাতীয় স্থাবর ভূ-সম্পত্তির উন্নয়ন, কেনাবেচা, নিয়ন্ত্রণ, বরাদ্দ, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করতে পারবে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলতে এখানে গৃহায়ণ ও পূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ), রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) এবং জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ ও গণপূর্ত অধিদফতরকে বোঝানো হয়েছে। সোজা কথা হলো, আইন বলছে, রাজশাহীতে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা করতে হলে আরডিএর অনুমোদন নেয়া বাধ্যতামূলক।

কেতাবের গরু গোয়ালে কতটা?

আইন কী বলে তা জানার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে, রাজশাহীতে বাস্তব চিত্র কী? রেডার সদস্যদের মধ্যেই যখন এখনও আরডিএর অনুমোদন না পাওয়া প্রতিষ্ঠানের হদিস মিলছে, তখন সংগঠনের বাইরের চিত্র তো সহজেই অনুমেয়। চলুন, রেডার বাইরের পরিস্থিতিটা জানার চেষ্টা করার আগে আরডিএর দৃষ্টিভঙ্গিটা জেনে আসা যাক।

আরডিএর অর্থরাইজড অফিসার আবুল কালাম আজাদ উত্তরকালের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে অনুমোদিত ১৭টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা দেন। সেগুলো হলো- রহমান ডেভেলপার্স অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস, আদদ্বীন প্রপার্টিজ, শামস কন্সট্রাকশন, সরকার ডেভেলপারস, নর্থ প্রোপার্টিজ, মিজান রিয়েল এস্টেট, ফিরোজ ইঞ্জিনিয়ারিং, শ্যামলছায়া, ড্রিমস্মিথ, আল আকসা, মেসার্স কবির হোসেন, ফরিদ এন্টারপ্রাইজ, রাঙাপরী, এনএনবি, ফোর এন, অ্যারিস্টোক্র্যাটস ও সুকন্যা। হিসাব সহজ, এর বাইরে বাকি যে প্রতিষ্ঠানগুলো নগরীতে কাজ করছে, তাদের আরডিএ অনুমোদন দেয়নি এখনও।

অথচ, তালিকার এই ১৭টির বাইরে প্রায় অর্ধশত প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব মিলেছে, যারা বহাল তবিয়তে নগরীতে রিয়েলএস্টেট ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ৫ প্রতিষ্ঠান রেডার সদস্য। বাকিগুলো সেই আনুষ্ঠানিকতার ধারও ধারেনি। নগরীর প্রধান প্রধান এলাকায় একটু তাকালেই চোখে পড়ে বাহারি সব ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের নাম, যারা এভাবে অনুমোদন না নিয়েই ব্যবসা করে আসছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন আরেক প্রবণতা। কদিন আগেই একাধিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিককালে নগরীর ভদ্রা আবাসিক এলাকা, উপশহর, বিনোদপুর ও ডাবতলা এলাকায় বিভিন্ন পেশার মানুষ একত্রিত হয়ে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ করছেন। ডাবতলা এলাকার একটি ১১তলা ভবনের নাম ‘কৃষিবিদ টাওয়ার’। চিকিৎসকরা গড়ে তুলছেন ‘ডিউড্রপ টাওয়ার’। বেশিরভাগ শিক্ষক মিলে গড়ে তুলেছেন ‘ফ্রেন্ডশিপ টাওয়ার’। এসব ভবনে কেউ কেউ একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক। একাধিক ফ্ল্যাটের কারণে কেউ কেউ বিক্রিও করছেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রেজিস্ট্রি হচ্ছে না। হচ্ছে শুধু মালিকানা বদলের চুক্তি। সেই খবরে খোদ রেডার সাধারণ সম্পাদক অসন্তোষ জানিয়েছিলেন। তুলেছিলেন, সরকারের রাজস্ববঞ্চিত হবার অভিযোগ।

আরডিএ অথরাইজড অফিসারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তার সোজাসাপ্টা জবাব, আরডিএর অনুমোদন নেই এমন কোনো ডেভেলপার বা প্রতিষ্ঠান কোনোপ্রকার বহুতল ভবন নির্মাণ করতে পারে না। আর যদি কেউ করে থাকে তাহলে তা বৈধ নয়।

সে না হয় বোঝা গেলো। উনি দিব্যি আইনের কথাই বললেন। কিন্তু যদি সেই জনপ্রিয় বাংলাপ্রবাদের দিকে যাই, ‘কাজীর গরু কেতাবে আছে গোয়ালে নাই’- তাহলে? আরডিএ কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ নিজেও মনে করেন, বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান অনুমোদন না নিয়েই কাজ করছে। কিন্তু কীভাবে?

তিনি বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভূমির মালিক এবং কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে আরডিএকে না জানিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করে থাকে। এতে অনেক ক্ষেত্রে মালিক পক্ষ প্রতারিত হয়। যেখানে আরডিএর কিছু করার থাকে না। তবে আরডিএর অনুমোদিত কোনো প্রতিষ্ঠান যদি চুক্তির কোনো ব্যত্যয় ঘটায় তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেবার বিধান রয়েছে।”

কিন্তু সেই আইনগত ব্যবস্থা কালেভদ্রেও প্রয়োগের নজির রাজশাহীতে আছে কি না তা জানাননি তিনি।

এ কেমন ভুল!      

শুরু হয়েছিলো রেডার ওয়েবসাইট দিয়ে। শেষে আবার সেখানে ফেরা যাক। সংগঠনটির ওয়েবসাইটে বোর্ড অব ডিরেক্টরস বলে একটি ট্যাব রয়েছে। সেখানে চাপ দিয়ে নির্দিষ্ট পাতায় গেলেই বিস্মিত হতে হয়। সেখানে বোর্ড অব ডিরেক্টরস হিসেবে ছবিসহ একটিমাত্র নাম দিয়ে রাখা হয়েছে। বিস্ময়করভাবে সেই নামটি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র (রাসিক) এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের।

রেডার ওয়েবসাইটে বোর্ড অব ডিরেক্টর্সের ঘরে রাসিক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের নাম। সোমবার রাত ৮টায় ওয়েবসাইট থেকে স্ক্রিনসটটি নেয়া

এ মাসের গোড়ার দিকে এই ধারাবাহিক প্রতিবেদন তৈরির কাজ শুরুর সময় বিষয়টি নিয়ে কথা হয় রেডার সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান কাজীর সঙ্গে। সেই সময় তিনি বলেন, “যেহেতু রাজশাহীতে মেয়র মহোদয়ের (এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন) নেতৃত্বে সরকারের আবাসনের স্বপ্ন পূরণে আমরা কাজ করছি, সে কারণে তিনি আমাদের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের একজন।”

বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে বিস্ময় প্রকাশ করেন খোদ মেয়র লিটন। উত্তরকালের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “রেডার বোর্ড ডিরেক্টর্সে আমার নাম থাকার কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়ে আমাকে কেউ কখনও কিছু বলেনি। আমি কাউকে আমার নাম ব্যবহারের অনুমতিও দিইনি। কেউ যদি এভাবে নাম ব্যবহার করে থাকে, তাহলে অন্যায় করেছে।”

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে মেয়র লিটন বলেন, “মেয়র হিসেবে নগরীর বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সহযোগিতা ও সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক আছে আমার। কিন্তু এর মানে এই না যে আমার নাম ব্যবহার করবে। অনেকদিন আগে রেডার নেতৃবৃন্দ আমার কাছে এসে আমাকে উপদেষ্টা হবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেদিনও আমি সে ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো কথাই বলিনি।”

মেয়র লিটনের এই বক্তব্য নিয়ে যোগাযোগ করা হয় মিজানুর রহমান কাজীর সঙ্গে। এদিন তিনি বলেন, “আসলে ব্যাপারটা একটু ভুল হয়েছে। উনি (মেয়র লিটন) আসলে আমাদের উপদেষ্টা। ভুলক্রমে বোর্ড অব ডিরেক্টর হিসেবে তার নাম ওয়েবসাইটে চলে গেছে।” মেয়র লিটন উপদেষ্টা হবার আনুষ্ঠানিক সম্মতি দিয়েছিলেন কি না জানতে চাইলে মিজান বলেন, “আমরা তো উনাকে অনুরোধ করেছিলাম উপদেষ্টা হতে। যতদূর মনে পড়ে উনি তো মানা করেননি।”

উপদেষ্টা হবার অনুরোধ জানিয়ে দিয়েই দিনের পর দিন কীভাবে নিজেদের ওয়েবসাইটে মেয়র লিটনের নাম বোর্ড অব ডিরেক্টর্সের তালিকায় রাখলেন তারা? “ভুল তো ভাই ভুলই। আমরা সংশোধন করছি”, মিজানুর রহমান কাজীর জবাব যেন তৈরিই ছিলো, যিনি রেডার নেতৃত্বের পাশাপাশি আল-আকসা ডেভেলপার্স প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও।

পরের পর্ব