মহিশালবাড়ী করবস্থানে সারি সারি নতুন কবর

।। মওদুদ রানা, রাজশাহী ।।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে রোববারের (২০ জুন) করোনা প্রতিবেদন বলছে, ২৪ ঘণ্টায় সেখানে করোনা সংক্রমিত হয়ে ও উপসর্গ নিয়ে মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে একজন কোভিড পজিটিভ। বাকি ৯ জন সন্দেহভাজন। অর্থ্যাৎ নমুনা পরীক্ষার ফল আসার আগেই উপসর্গে তাদের মৃত্যু হয়েছে। গেলো কয়েকদিন ধরে এই হাসপাতালে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে।

উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি গ্রামাঞ্চলে আরও বেশি। গোদাগাড়ী উপজেলার মহিশালবাড়ী কবরস্থানে এ বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে মরদেহ সমাহিত করা হয় ১২ জনের মরদেহ। ফেব্রুয়ারি মাসে ৯ জন। মার্চ মাসে ৮ জন। এপ্রিল মাসে ৭ জন। অর্থাৎ চার মাসে ৩৬ জন, গড়ে প্রতি মাসে ৯ জন।

কিন্তু মে মাসে ঈদের পরপর এই চিত্র পাল্টে যায়। করোনার প্রকোপ বাড়তে থাকে একদিকে, অন্যদিকে গোরস্থানে অস্বাভাবিক সংখ্যক মরদেহ সমাহিত করার কাজও শুরু হয়, যা এখনো চলছে। গত মে মাসে মারা গেছে ২৩ জন। আর চলতি মাসে ১৯দিনে ২১ জন মারা গেছে। এরমধ্যে ২৪ জনের করোনা ও উপর্সগ ছিলো। বাকিদের বার্ধ্যক্য, সড়ক দুর্ঘটনা ও স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।

নিজের হাতে লেখা রেজিস্ট্রার খাতা দেখে এই পরিসংখ্যান যিনি বর্ণনা করছিলেন তিনি নওশাদ আলী। গোদাগাড়ী উপজেলার মহিশালবাড়ী কবরস্থান এর সভাপতি। কবরস্থানে দাফন করা প্রতিটি মানুষের মৃত্যুর কারণ ও হিসেব লিখে রাখেন তিনি।

নওশাদ আলী বলেন, “কোভিডের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হওয়া বেশিরভাগ মানুষের কোনো পরীক্ষা হয়নি। ওষুধপত্র বা চিকিৎসাও তারা পাননি। মূলত জ্বর, সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় মারা গেছেন। যারা মারা গেছেন, হয়তো তারাও জানতেন না এগুলো করোনার উপসর্গ।”

শনিবার মহিশালবাড়ী কবরস্থানে গিয়ে দেখা যায় তিন জন ব্যক্তি নতুন কবর খুড়ছেন। একজন নারী রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন। তাকে সমাহিত করতেই কবর খোঁড়া হচ্ছে। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মহিশালবাড়ী ১ নম্বর ওয়ার্ডের বায়তুল জামে মসজিদের ইমাম নাজির আহমদ বলছিলেন, “এ এলাকার বেশিরভাগ মানুষই খেটে খাওয়া, শ্রমিক শ্রেণির।শহরে গিয়ে করোনা পরীক্ষা করার ব্যাপারে উৎসাহী নয় এমন মানুষ বেশি। দিন কয়েক আগে স্থানীয় প্রশাসন করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করলেও অধিকাংশ আগ্রহী হয়নি। ফলে যারা মারা যাচ্ছেন নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না, কী কারণে এত মৃত্যু। তবে বেশীরভাগের করোনার লক্ষণ ছিলো।” চিকিৎসা বা করোনা পরীক্ষা না হওয়ায় বেশিরভাগই থেকে গেছেন কোভিড পরিসংখ্যানের বাইরে, জানান তিনি।

এই কবরস্থানে অর্ধশতাধিক নতুন কবরের সারি। মে মাস থেকে জুন মাসে নতুন এসব কবরে মৃতদের সমাহিত করা হয়েছে। কবরস্থনের তত্বাবধায়ক মমতাজ উদ্দিন জানান, তিনি তার জীবদ্দশায় এখানে এই হারে মৃত্যু দেখেননি।

গোদাগাড়ী কেন্দ্রীয় গোরস্থানেও কবর দেয়ার সংখ্যা অস্বাভাবিক মাত্রায় বেশি। গত দেড় মাসে ৩৯টি নতুন কবর হয়েছে। ২৪ জনই কোভিডের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছেন। একই দিনে চারটি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কবরস্থান সংশ্লিষ্ট একজন জানান, মৃতদের অধিকাংশ চিকিৎসাও নিতে যাননি। বেশিরভাগ পরিবারই বিষয়টি সামনে আনতে চান না। চাপাচাপিতে স্বীকার করে তারা। তিনি বলেন, “এই যে অনেক মানুষ করোনার পরীক্ষা বা চিকিৎসা না করেই মারা যাচ্ছে এটা গ্রামের মানুষের যেমন অজ্ঞতা বা কুশিক্ষার ফল, তেমনই প্রশাসনেরও দায়ভার থেকে যায়।”

ওই ব্যক্তি কবরস্থানও ঘুরে দেখান। পাশাপাশি নতুন কবরগুলো অপেক্ষাকৃত নিচু স্থানে। সেখানে নাম ফলক বা বিশেষ কোন চিহ্ন না থাকলেও সদ্য সমাহিত করা কবরগুলো আলাদা করা যায়। চারিদিকে একের পর এক সারিবদ্ধ নতুন কবর।

গোদাগাড়ী কেন্দ্রীয় কবরস্থান এর সাধারণ সম্পাদক আকবার আলী বলছিলেন, এতোসব মৃত্যু বা মরদেহের পেছনে আলাদা আলাদা গল্প লুকিয়ে আছে। বিশেষ করে অন্ধ বিশ্বাস, কুশিক্ষা, দারিদ্রতা আর ভয়ংকর অতিমারী সর্ম্পকে সঠিক তথ্য না পাওয়ার গল্প।

তিনি বলেন, “গত দেড় মাসে এই গোরস্থানে ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে ২৪ জনই কোভিডের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছেন।এদের অধিকাংশ চিকিৎসা নিতে যাননি। করাননি টেস্ট। এদের মধ্যে বড় জোর দু’এক জনের নাম সরকারি হিসাবে থাকলেও থাকতে পারে, বেশিরভাগের নেই।”

গোদাগাড়ীর দুটি কবরস্থানে করোনা লক্ষণ নিয়ে মারা যাওয়া ৪৮ ব্যক্তির সমাহিত করার তথ্য উঠে এলেও সিভিল সার্জন অফিসের হিসেবে গোদাগাড়ীতে করোনায় এ পর্যন্ত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

উপজেলা পর্যায়ে শুধুমাত্র র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টের মাধ্যমে কোভিড পরীক্ষা করা হয়। গত ১১ জুন থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত ৯ দিনে রাজশাহীর উপজেলাগুলোতে র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৩১টি। করোনা প্রমানিত ৫’শ ১৮ জন। জন। আক্রান্তের হার ২৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। অবশ্য গত ১২ ও ১৯ জুন কোন টেস্টই হয়নি উপজেলা পর্যায়ে।

স্বাস্থ্যবিদরা বলেছেন, একদিকে অপ্রতুল করোনা পরীক্ষা ব্যবস্থা। অন্যদিকে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে গ্রামের মানুষের উদাসীনতা। ফলে দ্রুত বাড়ছে করোনা আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা।

এদিকে শনিবার রামেক হাসপাতালে অনুষ্ঠিত প্রেস ব্রিফিং’এ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গ্রামাঞ্চল থেকে করোনা সংক্রমিত রোগী ভর্তির হার বেড়েছে হাসপাতালে। একই সাথে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে মৃত্যুহার।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী হাসপাতালে রোগী ভর্তির অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, “এর আগে গ্রাম থেকে এতো সংখ্যক করোনা রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়নি। বিশেষ করে রাজশাহীর ও নওগাঁ জেলার গ্রামাঞ্চলে করোনা সংক্রমণ বেড়েছে। উপজেলা উল্লেখ করলে, গোদাগাড়ী ও পবায় আক্রান্তের হার বেশি।”

এই চিকিৎসকের আশঙ্কা, উপজেলা পর্যায়ে কঠোর লকডাউন দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নমুনা পরীক্ষার হার না বাড়ালে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে। “এবং সেটি করতে না পারলে এর খেসারত হবে ভয়ংকর”, বলেন রামেক হাসপাতাল পরিচালক।