grand river view

।। রাসেল মুস্তাফিজ, রাজশাহী ।।

পারিজাত আবাসিক এলাকার দুই নম্বর সড়কের ৩৩ নম্বর প্লটে সাততলা ভবনের নাম ঘাসফুল। ভবনটি নির্মাণ শেষ হলেও এর ফ্ল্যাট মালিকরা বিক্রি করতে চাইলে রেজিস্ট্রি করে দেয়া যাচ্ছে না। কারণ হলো, এই ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) অনুমোদিত নকশা মানা হয়নি।

শুধু এই একটি ভবন নয়, রাজশাহী মহানগরীতে এমন জটিলতা অনেক বহুতল ভবনকে ঘিরেই রয়েছে। ঊর্ধ্বমুখী ইমারত নির্মাণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিয়মনীতি জলাঞ্জলি দেয়ার অভিযোগ আছে। মাত্র একযুগের মধ্যে এই নগরীতে যেভাবে বহুতল ভবন উঠতে শুরু করেছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নজরদারি বাড়েনি। আর সেই সুযোগে বাড়ছে অনুমোদনহীন ভবনের সংখ্যা। এমনকি নগরীতে এমন ভবনের সঠিক সংখ্যাও নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।  

আরডিএর অথরাইজড অফিসার আবুল কালাম আজাদ দাবি করেন, বহুতল ভবন নির্মাণে আইন প্রয়োগ ও যথাযথ নজরদারির প্রচেষ্টা তারা চালাচ্ছেন। তবে আইনি জটিলতা ও জনবল সংকটের তারা যাথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।

রোববার (২০ জুন) নগরীর কয়েরদাঁড়া খ্রিস্টানপাড়ায় নির্মাণাধীন একটি চারতলা ভবন ধসে পড়লে এই আলোচনা বরাবরের মতো আবার উঠেছে। ভবনটির অনুমোদন আছে কি না তা ঘটনার দিন কেউই জানাতে পারেননি।

খাবার দাঁত বনাম দেখানোর দাঁত!

জানেন তো, হাতির অতিকায় যে দাঁতজোড়া আমরা বাইরে থেকে দেখতে পাই, তা কিন্তু খাবার কাজে ব্যবহৃত হয় না! আর তাই বাংলা প্রবচনে এই খাবার দাঁত আর দেখানোর দাঁত আলাদা হওয়ার বিষয়টি স্থান করে নিয়েছে। রাজশাহী মহানগরীর বহুতল ভবন নির্মাণে নকশা অনুমোদনের বিষয়টির সঙ্গে এর দারুণ সাদৃশ্য রয়েছে।

পারিজাত আবাসিক এলাকার ৩৩ নম্বর প্লটের ওই সাততলা ভবনটির কথাই ধরা যাক। ভবন নির্মাতা নিজে একজন প্রকৌশলী। ভবনের যে নকশা তিনি আরডিএ থেকে অনুমোদন পেয়েছেন, নির্মাণকাজের সময় সেই নকশা মানেননি। অর্থাৎ দেখিয়েছেন এক, আর বাস্তবে নির্মাণ করেছেন আরেক নকশায়!

বিস্ময়কর হলো, মাসুদ রানা নামের সেই প্রকৌশলী পাশের পদ্মা আবাসিক এলাকায় আরও একটি সাততলা ভবন নির্মাণে একই কাণ্ড ঘটিয়েছেন। তার দাবি,ভবনের মালিকদের চাহিদা অনুযায়ী তাকে আরডিএর অনুমোদিত নকশা ‘কিছুটা’ বদলাতে হয়েছে।

আরডিএ অথরাইজড অফিসারের দাবি, একটা নকশা অনুমোদন করে আরেক নকশায় কাজ সম্পন্ন করার ঘটনা তাদের গোচরে এলেই তারা সেই ভবন ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। তবে সাম্প্রতিক অতীতে সেই নির্দেশ প্রতিপালনের নজির খুব একটা নেই বলেও তিনি স্বীকার করেন।  

আরডিএর সংশ্লিষ্ট বিভাগের তথ্য অনুসারে, ভবন নির্মাণকালে অথরাইজড অফিসার ও ইমারত পরিদর্শকরা নির্মাণকাজ তদারকি করে থাকেন। ওই সময় তারা শুধু স্থাপত্য দিকটি দেখভাল করেন। যদিও উপেক্ষিত থাকে কারিগরি দিকটি। এতে নির্মাণাধীন ভবনগুলো বিএনবিসি (গুণগতমান) ঠিক রেখে নির্মাণ করা হয় কিনা, তা নজরে আসে না।

একাধিক সূত্র বলছে, বর্তমানে ভবন নির্মাণের জন্য মালিকরা দুটি নকশা তৈরি করেন। একটি হচ্ছে অনুমোদনের জন্য নকশা অপরটি ওয়ার্কিং প্লান বা বাস্তবায়নের জন্য নকশা। যদিও অনুমোদিত নকশার সাথে ওয়ার্কিং প্লান বা বাস্তবায়ন নকশার ফারাক থাকে অনেক।

অভিযোগ রয়েছে, ভবন নির্মাতারা নকশার অনুমোদন পাওয়ার পরই সংশ্লিষ্ট স্থপতি ও প্রকৌশলীকে বাদ দিয়ে মনমতো প্রকৌশলী অথবা অভিজ্ঞ মিস্ত্রিদের দিয়ে ভবন নির্মাণ করেন। এতে ভবনের গুণগত মান ও অনুমোদিত নকশার হেরফের করা যায় অনায়াসে। আবার ইচ্ছে করে অনেকেই নকশা পাল্টে ফেলে বাড়াচ্ছেন ভবনের সংখ্যা।

ইমারত নির্মাণ আইন ১৯৫২ সালের ৩ ধারা অনুযায়ী, বাড়ির পেছনে ৩ ফুট ৪ ইঞ্চি ও বাড়ির উভয় পাশে ৩ ফুট ৪ ইঞ্চি করে জায়গা ছাড়তে হবে। অর্থাৎ দুইটি বাড়ির মাঝে দূরত্ব থাকবে ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি। এবং ভবনের সম্মুখভাগে ৪ ফুট ১১ ইঞ্চি জায়গা ছাড়া থাকতে হবে। কিন্তু বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে এগুলোর কোনোটাই ঠিকভাবে মানা হচ্ছে না। নগরীর অধিকাংশ আবাসিক এলাকার দৃশ্য প্রায় একই।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে আরডিএ চেয়ারম্যান আনওয়ার হোসেন বলেন, “আগের তুলনায় এখন রাজশাহীতে যেসব বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে তা মানসম্মত। কিন্তু কিছু ডেভেলপার আরডিএ থেকে বহুতল ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন নিয়ে পুরোটাই নিয়মবহির্ভুতভাবে করছেন। এতে ঝুঁকি থেকে যায়। সে কারণে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে আরডিএ।”

পরের পর্বে: অনুমোদিত ডেভেলপার ১৭, সমিতির সদস্য ১৮!