সাহিত্যের ছাত্র-শিক্ষক হলেও ইতিহাস এবং দর্শন আমার বিশেষ আগ্রহের বিষয়। একদা মহাঋষি চার্বাকের এই মন্ত্র ‘যাবৎ জীবেৎ সুখং জিবেৎ, ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পীবেৎ’ না বুঝেই মনে মনে আওড়াতাম। ভাসা ভাসা ধারণায় যা বুঝতাম তা হলো, ইউরোপীয় সুখবাদী দর্শনের এ ছিল প্রাচীন ও প্রাচ্যদেশীয় রূপ। কিছুদিন রাসেল পড়েছি; বার্টান্ড রাসেল, এবং গড়েছি সুখের ভুবন! সত্যিকারের দর্শনের পাঠ বলতে যা বোঝায়, তা কিছুটা গ্রহণের সুযোগ হয় আরও পড়ে, তাও খুব একটা গভীরে অবগাহনের সুযোগ হয়নি। প্রয়োজনে যতটুকু গলাধঃকরণ সম্ভব, তা করে পিএইচডির বৈতরণী পার হয়েছি। হ্যাঁ, পিএইচডি-র অভিসন্দর্ভ রচনার সময় আমাকে বুঝে, না-বুঝে পড়তে হয়েছে হেগেল, মার্কস, সার্ত্র, কাম্যু, হাইডেগার প্রমুখের দর্শনের কিছু বিষয়; আরও খোলাসা করে যদি বলি তাহলে বলবো, মার্কসীয় দর্শনের বিচ্ছিন্নতা (Alienation) ত্রিশোত্তর কালের প্রধান পাঁচ কবি জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে এবং অমিয় চক্রবর্তীর কবিতায় কীভাবে রূপায়িত হয়েছে, তার সুলুক-সন্ধান করতে গিয়ে আমাকে দর্শনের পাঠ গ্রহণ করতে হয়েছিল। বছর ছয়েক হলো মালীর ঘাড়ে পড়ার মতো আমার ঘাড়ে পড়েছে স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের দর্শনের একটি কোর্স পড়ানোর দায়ভার। সে-সূত্রে অল্প-স্বল্প দর্শনের জ্ঞান নিয়ে পড়াই প্রাচ্য-পাশ্চাত্তের দর্শনের প্রাথমিক সব তত্ত্ব-মতবাদ। সেই প্রয়োজনে টেবিলে রাখি সরদার ফজলুল করিমের ‘দর্শনকোষ’। এরপর রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের সময় ও আগে-পরের দেশ-কাল-সমাজ-রাজনীতি সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গিয়ে পড়ি তাঁর ‘চল্লিশের দশকের ঢাকা’, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ: অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের আলাপচারিতা’, ‘নানাকথা’, ‘নানা কথার পরের কথা’ প্রভৃতি গ্রন্থ। বিচ্ছিন্নভাবে তাঁর কয়েকটি সাক্ষাৎকারেও চোখ বুলানোর সুযোগ ঘটেছে। 

২.

সরদার ফজলুল করিমের সহজিয়া নয়, সহজ জীবন; আদর্শের বুলি আওড়ানো নয়, আদর্শবাদী জীবন-যাপন; বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা নয়, পরিচ্ছন্ন চিন্তা এবং দৃঢ় মনোবল; দেশ, দেশের সাধারণ মানুষ ও দলের প্রতি গভীর প্রেম-ভালোবাস, আনুগত্য এবং জীবন উৎসর্গ করার প্রত্যয়; সর্বোপরি তাঁর গভীর পঠন-পাঠন এবং সাধনা আমাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর সম্মান প্রদর্শন এবং তাঁদের মুক্তির জন্য সরদার ফজলুল করিমের যে আকুতি, তাও আমাকে টানে; কিন্তু টানে না তাঁর বামপন্থা; মানে, আমি বামপন্থায় বিশ্বাসী নই। অত তত্ত্বের তত্ত্বের বেড়াজালে জীবনকে বাঁধতে চাই না। এমনকী বিশ্বাসী নই ডানপন্থাতেও। অর্থাৎ ডান-বাম সবই আমার কাছে চরমপন্থা মনে হয়, তাই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি সহজপন্থায়, যাকে বলা যায় মধ্যপন্থা। যাই হোক, সরদার ফজলুল করিমের বই-পুস্তক এবং আত্মজীবনীমূলক লেখাগুলো পড়ে তাঁর প্রতি যে ভক্তিবাদ আমার মনে জন্ম নেয়, তা আরও দৃঢ় হয় আনিসুজ্জামান চর্চা করতে গিয়ে। বছর খানে আগে ভূইয়া ইকবাল সম্পাদিত ‘আনিসুজ্জামান সংবর্ধনা-স্মারক’ গ্রন্থটি কিনে ঢাকা থেকে ফিরতি পথে গাড়ির মধ্যেই সরদার ফজলুল করিমের ‘পরম স্নেহের আনিস’ লেখাটি পড়েছিলাম। ঐ লেখার এক জায়গায় তিনি বলেছেন: ‘আমি নিজে রসিকতা করে বলি, আহা আগে আসার যদি ভাগ্য হতো তাহলে আনিসের ছাত্র হয়ে ওর সামনের বেঞ্চিতে বসতাম। এমন সুন্দর নরম ভদ্রভাবে ও কথা বলতে পারে। এই বোধ ওর জীবনের আদর্শ। মন্দকে মন্দ বলে লাভ নেই। আমার মধ্যে কিছু ভদ্রতা ও ভালোবাসা যদি থাকে, তাই দেখেই মন্দ ভালো হয়ে উঠবে। কারণ মন্দ মানুষ বলে কিছু নাই। পরিবেশই মানুষকে মন্দ করে। আর পরিবেশকে উত্তম করে তোলার দায়িত্ব আমাদের। সাধ্যমতো যে যতটুকু পারি।’ এ বাক্য কয়টি আমাকে এতটাই ঘোরে ফেলে যে তা কাটতে কিছুটা সময় লাগে। বাক্যগুলো পড়ে ঘোর লেগেছিল সরদার ফজলুল করিমের বিনয় এবং স্নেহপরায়ণতার উচ্চমাত্রার রূপায়ণ দেখে। আনিসুজ্জামানের আত্মজীবনীর পাতায় পাতায় আছে তাঁর সরদার ভাইয়ের নানা গুণ ও মহানুভবতার কথা।  

৩.

জীবন্ত একজন দার্শনিককে আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি, তিনি রমেন্দ্রনাথ ঘোষ; ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক। তাঁর পুত্র ডা. সন্দীপন ঘোষ আমাদের সাঁথিয়া উপজেলায় মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে বদলি হলে তিনি মহাচিন্তায় পড়েন। চিন্তার বোঝা কিছুটা হালকা করতে প্রায়ই আমাকে ডেকে পাঠাতেন, তাঁকে আমার সন্ধান দিয়েছিলেন আমার শিক্ষক অধ্যাপক ড. আবদুল খালেক। সেটা ২০০৩-২০০৪ সালের কথা। সাঁথিয়া তখন সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য; লক্ষ্মীপুর, আতাইকুলা, বনগ্রাম, ধুলাউরি প্রভৃতি গ্রামে প্রায় প্রতিদিনই একটি-দুটি-তিনটি-পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতো; যার খবরে পত্রিকার পাতা লাল হয়ে যেতো। যা হোক, আমি প্রায় প্রতিদিনই তাঁর ফোন পেতাম এবং গিয়ে বলতাম, সাঁথিয়া উপজেলা সদর এবং আমাদের গৌরীগ্রাম ও আশ-পাশের এলাকার মানুষ শান্তিপ্রিয়; সর্বোপরি সাঁথিয়ায় পাওয়া যায় বিলের তাজা মাছ, গাভির খাঁটি দুধ এবং টাটকা শাক-সবজি। তিনি বাংলাদেশের ম্যাপ হাতে সাঁথিয়া উপজেলা বের করে আলাদা কাগজে লাইন টেনে টেনে সাঁথিয়ার কোন্ এলাকা কেমন তাঁর খোঁজ নিতেন এবং তাঁর ছেলে সাঁথিয়ায় কেমন দিনকাল কাটাচ্ছে তারও গল্প করতেন। প্রায়ই স্মৃতিচারণ করতেন তাঁর অক্সফোর্ডে কাটানো দিনগুলো সম্পর্কে। ‘ভারতীয় দর্শন’ বইটি লিখতে তিনি কত হাজার বই পড়েছেন তারও ফিরিস্তি তুলে ধরতেন। সময় সময় শিশুর মতো এমন সব আবেগমাখা কথা বলতেন, যা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলতো। একদিন বিকেলে গেছি। যথারীতি ম্যাপ নিয়ে বসলেন, বললেন, ‘তোমার কলম দাও’। সেদিন কলম নিয়ে বের হইনি। তিনি গম্ভীর স্বরে বিস্ময়ের সুরে টেনে টেনে বললেন, ‘জা-আ-নো, এখনকার ছাত্র-শিক্ষকদের পকেটে কলম থাকে-এ-এ-না, টেবিলে বই থাকে না। ব্যাগভর্তি বই-খাতা নয়, ডায়েরির পাতা ছিঁড়ে জিন্সের প্যান্টের পেছনের পকেটে ভরে তারা ক্লাশে যায়, শিক্ষকরা যায় ডায়েরি হাতে; মাথায় নয়, ঐ ডায়েরির মধ্যে থাকে তাদের সকল বিদ্যা!’ একেক দিন জুড়ে দিতেন ভারতীয় দর্শনের মূল প্রবণতা কী, সে সম্পর্কিত আলাপ। এই দার্শনিকের লেখা ‘ভারতীয় দর্শন’ এখনো আমার টেবিলে থাকে, আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদেরও সে বইপড়া বাধ্যতামূলক। আরেকজন জীবন্ত দার্শনিক আমি দেখেছি, নাম আমিনুল ইসলাম। ঢাকায় বেশ কয়েকটি সেমিনারে তাঁর বক্তৃতা শুনে বিমোহিত হয়েছি। তাঁর ‘বাঙালির দর্শন: প্রাচীন কাল থেকে সমকাল’ বইটিও সারাক্ষণ থাকে আমার পড়ার টেবিলে। 

৪.

বাংলাদেশের আরও দুজন দার্শনিক সম্পর্কে আমার আগ্রহ প্রবল; একজন ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, আরেকজন আরজ আলী মাতুব্বর। ছোটবেলায় শুনেছিলাম একজন প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিহীন দার্শনিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাশ নেয়! সেই থেকে আরজ আলী মাতুব্বর সম্পর্কে আগ্রহ জন্মে। ছাত্রজীবনেই তাঁর রচনাবলি পড়ে শেষ করেছিলাম। তেমন বুঝিনি কিছু, তবে ভাসা ভাসা যা মনে আছে, তার সারকথা হলো—আরজ আলী মাতুব্বর জগত-জীবন এবং সৃষ্টিরহস্য সম্পর্কে ক্রমাগত প্রশ্ন করেছেন এবং নিজের মতো করে সমাধান খুঁজে সে বিষয়ে বয়ান হাজির করেছেন। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেবের বই সংগ্রহ ও পাঠ শুরু করেছি। তবে সরদার ফজলুল করিমই আমার প্রিয় দার্শনিক। ‘সরদার ফজলুল করিম: বুদ্ধিজীবী ও দার্শনিক’ এই শিরোনামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখার চিন্তা মাথায় এসেছে বছর দুই আগে। তারপর তাঁর জীবন ও চিন্তা সম্পর্কে যতই পড়ি ততই বিস্মিত হই, কিন্তু লিখতে বসলে খেঁই হারাই; কোথায় শুরু করবো আর কোথায় শেষ করবো, তা বুঝতে পারি না! সরদার ফজলুল করিমের বেশ কয়েকটি বই পড়েছি, এখনো পড়ছি কিছু বই; পড়তে চাই তাঁর রচনাবলির পুরোটাই; একবার নয়, বারবার। তারপরই লিখবো তাঁর সম্পর্কে। আজ আমার দার্শনিকের প্রয়াণ নয়, মহাপ্রয়াণ-দিবস। তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।

৫.

সরদার ফজলুর করিমের জন্ম ১ মে ১৯২৫, মৃত্যু ১৫ জুন ২০১৪। লেখাপড়া করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অর্জন করেন কৃতিত্বপূর্ণ ফল। শিক্ষকও হয়েছিলেন সেখানকার; কিন্তু পার্টির নির্দেশে তা ত্যাগ করেন। একইভাবে ত্যাগ করেন বিলেতে যাওয়ার সুযোগও। চাকরি ও জীবনের ভোগ-বিলাসিতা ত্যাগ করে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থেকে পার্টির কাজ করেছেন; সন্ধান করেছেন সাধারণ মানুষের মুক্তির। জেল খেটেছেন বছরের পর বছর। সবই করেছেন দেশের জন্য, মেহনতী মানুষের মুক্তির জন্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় গ্রেফতার হয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন হলে আবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনায় ফিরে আসেন। এবার রাজনীতি নয়, জ্ঞান-সাধনায় মগ্ন হন। রাজনীতি এবং সমাজ নিয়ে যে ভাবেননি, এমন নয়। ভেবেছেন, ঢের ভেবেছেন এবং লিখেছেন। তাঁর কোমর শক্ত, মেরুদণ্ড সোজা, বুক টান এবং মাথাটি ছিল উঁচু। দেহটি ছোট হলেও সমকালের অনেকের চেয়ে তাঁর মাথাটি উঁচু দেখাতো। অকপটে যা সত্য, তা বলতেন। তোয়াক্কা করতেন না লাভা-লাভের কিংবা ভয় পেতেন না কারো রক্ষচক্ষুর। রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন; লিখেছেন সমাজ, দর্শন, রাজনীতি, ব্যক্তিগত জীবনাভিজ্ঞতা নিয়ে। অনুবাদ করে বাঙালির সামনে উন্মোচন করেছেন দর্শনের নিত্য-নতুন দিগন্ত। সবার উপরে ছিল তাঁর দেশপ্রেম, মনুষ্যত্ব, নীতিবোধ এবং বুদ্ধিজীবীর দায়বোধ। সেই দায় থেকেই তিনি জীবনের পথ চলেছেন। এই মহান দার্শনিক এবং সহজ মানুষকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।