grand river view

।। এম আবদুল আলীম ।।

কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের জন্মদিন আজ। তাঁর সান্নিধ্যলাভের সুযোগ যেমন ঘটেনি, তেমনি তাঁর সাহিত্যও খুব বেশি পড়া হয়নি। প্রথমত প্রবন্ধ-নিবন্ধ, গবেষণা ও সমালোচনা-সাহিত্য; দ্বিতীয় কবিতা; তৃতীয়ত ইতিহাস-ঐতিহ্য আমাকে যতটা টানে বা টেনেছে গল্প-উপন্যাস-নাটক ততটা টানেনি। পরীক্ষার বৈতরণী পার হওয়া কিংবা কর্মের ফরমায়েশে যতটুকু দরকার ততটুকুই পড়েছি গল্প-উপন্যাস-নাটক; এ আমার সীমাবদ্ধতা। এই সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই এজন্যে যে, সব মানুষ একজীবনে সবকিছু পড়তে পারে না, পড়া সম্ভবও নয়। একইভাবে সকলের সান্নিধ্যলাভের সুযোগও সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই!

২.

সেলিনা হোসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে ষাটের দশকে স্নাতক (সম্মান) এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি আর্জন করেছেন, একই বিভাগ থেকে আমিও বের হয়েছি তাঁর প্রায় চার দশক পরে। তিনিও কর্মসূত্রে ঢাকায় থিতু হয়েছেন, আমিও হয়েছিলাম কয়েক বছরের জন্য; আমি যখন ঢাকা কলেজে তখন বাংলা একাডেমির কর্মকাল শেষ করে লেখালেখিতে পূর্ণ মগ্ন। এক তো সতীর্থ, আরেক দিকে রাজধানীর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র শাহবাগ-বাংলা একাডেমি-শিল্পকলা ও শিশু একাডেমি এলাকায় নানা অনুষ্ঠানাদিতে প্রায়ই সাক্ষাৎ হওয়ার সুবাদে তাঁকে কাছাকাছি থেকে দেখার সুযোগ ঘটেছে অনেকবার, কথাও হয়েছে; কিন্তু আলাপ-পরিচয় সেভাবে জমে ওঠেনি। তবুও দূর থেকে যতটুকু দেখেছি এবং তাঁর বইপুস্তক অল্পবিস্তর যতটুকু পড়েছি তাতে এক ধরনের ভক্তির ভাব যে জন্মেছে, তাতে সন্দেহ নেই। আর সেজন্যেই তাঁর জন্মদিনে মনের কথাগুলো কলমের কালিতে নয়, কি-বোর্ড ও মাউসের স্পর্শে বের হয়ে এলো।

৩.

ব্যক্তি সেলিনা হোসেন আমাকে টানে তাঁর সহজ-সরল এবং অকপট জীবনাচারের কারণে; আর কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন টানে বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম টান এবং গভীর দেশপ্রেমের গুণে। ইতিহাসের নায়কদের যেমন তিনি সাহিত্যে স্থান দিয়েছেন, তেমনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনের রূপায়ণ ঘটিয়েছেন বিশ্বস্ততার সঙ্গে। সেলিনা হোসেনের শিশুসাহিত্য, আত্মস্মৃতিমূলক লেখা এবং প্রবন্ধাবলির অনেকগুলোই পড়ার সুযোগ হয়েছে; তাতে তাঁর সংগ্রাম, প্রতিষ্ঠা, সাহিত্য-সাধনার সিদ্ধি, সন্তানশোক এবং মানবীয় গুণাবলির প্রাঞ্জল বয়ান আমাকে মুগ্ধ করেছে। পত্র-পত্রিকার পাতায় এবং ইউটিউবে ভেসে থাকা তাঁর বহু সাক্ষাৎকার পড়া এবং শোনার সুযোগ ঘটেছে। সেসব থেকে মানুষ এবং কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনে মুগ্ধ হয়েছি।

৪.

ফরমায়েশি পড়ার বাইরে সেলিনা হোসেনের অন্তত তিনখানি বই বার কয়েক পাঠের সুযোগ ঘটেছে; বই তিনখানি হলো : ‘শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ’, ‘লারা’ এবং ‘পূর্ববঙ্গ থেকে বাংলাদেশ/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’। ২০০০ সালে প্রকাশিত ‘লারা’ গ্রন্থটি পড়তে পড়তে অকালপ্রয়াতা কন্যার ব্যথায় মাতৃহৃদয়ের তীব্র রক্ষক্ষরণে গভীর বেদনা অনুভব করেছি। এতে কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন অপেক্ষা মা সেলিনা হোসেন আমার পাঠকমনকে বেশি আচ্ছন্ন করেছে। সেলিনা হোসেনের কন্যা লারার মৃত্যু হয় ১৯৯৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। এয়ার পারাবত বিমানের শিক্ষানবিস পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণের শেষ দিনে লারার মৃত্যু হয়। লারাকে স্মরণ করে এই বই লেখেন ২০০০ সালে। মৃত কন্যাকে তিনি যেন পুনর্জীবন দান করেছেন এখানে। শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধে তিনি দেশ-কাল-সমাজ-সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের নানা প্রসঙ্গ স্থান দিয়েছেন। ‘পূর্ববঙ্গ থেকে বাংলাদেশ/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গবন্ধুর জীবন, চিন্তা, কর্ম ও দর্শনের বস্তুনিষ্ঠ বয়ান হাজির করেছেন।

৫.

সেলিনা হোসেনের জন্ম ১৯৪৭ সালের ১৪ জুন; জন্মস্থান রেশমশিল্প প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পিতার কর্মস্থল রাজশাহী শহরে, পৈত্রিক নিবাস লক্ষ্মীপুর জেলার হাজিরপারা গ্রামে। রাজশাহী শহরে কেটেছে তাঁর শিক্ষাজীবনের অধিকাংশ সময়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে কর্মের সন্ধানে ঢাকায় পাড়ি জমান। ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমির সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ২০০৪ সালে পরিচালক হিসেবে অবসরগ্রহণ করেন। লেখালেখি শুরু শিক্ষাজীবনেই, সেটা ষাটের দশকের মাঝামাঝি। বিভিন্ন পত্রিকায় লিখতেন নিয়মিত। দেশি-বিদেশি সাহিত্য, মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন প্রমুখের বিচিত্র লেখা আত্মস্থ করেই সাহিত্যক্ষেত্রে নেমেছিলেন। তবে বইপত্র পাঠ তাঁর সাহিত্যিক হওয়ার ক্ষেত্র যতটা না প্রস্তুত করেছিল, তার চেয়ে বেশি করেছিল শৈশব-কৈশোরে মানুষ ও প্রকৃতি পাঠের অভিজ্ঞতা। এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন: ‘বইপত্র পড়ে লেখক হওয়ার প্রস্তুতি আমার হয়নি। কিন্তু আমি মনে করি আমার শৈশবটি ছিল একটি আশ্চর্য সোনালি শৈশব। এই শৈশবে আমি প্রকৃতি ও মানুষ দেখেছি। মাঠেঘাটে, নদীতে, বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর এক অবাধ স্বাধীনতা ছিল আমার। আর মানুষের সঙ্গে মানুষের বিচিত্র সম্পর্ক দেখার সুযোগ হয়েছিল। এই সবকিছুই আমাকে লেখালেখিতে আসার প্রেরণা দিয়েছে’ প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘উৎস থেকে নিরন্তর’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ, শিশুতোষ-গ্রন্থ, কাব্য-অনুবাদ-প্রবন্ধ ও সম্পাদনাগ্রন্থ মিলিয়ে গ্রন্থসংখ্যা শত পার হয়ে গেছে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো: হাঙর নদী গ্রেনেড, নীল ময়ূরের যৌবন, চাঁদবেনে, পোকামাকড়ের ঘরবসতি, নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি, কাঁটাতারের প্রজাপতি, কালকেতু ও ফুল্লরা, আগস্টের একরাত, গেরিলা ও বীরাঙ্গনা প্রভৃতি। ইংরেজি, রুশ, কানাড়ি প্রভৃতি ভাষায় তাঁর সাহিত্যকর্ম অনুবাদ হয়েছে। সাহিত্য-সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ লাভ করেছেন আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কার, সার্ক সাহিত্য পুরস্কারসহ জাতীয় আন্তর্জাতিক নানা পুরস্কার ও সম্মাননা। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে প্রদান করেছে ডি-লিট উপাধি।

৬.

সেলিনা হোসেন এখনও লিখে চলেছেন নিরন্তর। তিনি শতায়ু হোন; এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যেন তাঁর লেখনী সচল থাকে। ৭৫তম জন্মদিনে তাঁকে জানাই শ্রদ্ধা।