grand river view

।। মওদুদ রানা, রাজশাহী ।।

“সেদিন সকাল ৯টায় কাজ শুরু করি। দুপুর তিনটায় বাসায় আসি। ফ্রেস হয়ে চারটার দিকে সবেমাত্র খেতে বসেছি। এমন সময় মোবাইলে মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের কল। হাসপাতালে একটা মরদেহ আছে, করোনা নমুনা নিতে হবে। আগপিছ না ভেবে কোনরকমে হাত ধুয়ে বের হয়ে যাই। কারণ আমি যত দেরি করবো মরদেহটা তত সময় পড়ে থাকবে।”

কথাগুলো যিনি বলছিলেন তিনি আব্দুল্লাহ আল নোমান। বাড়ি ঝিনাইদহে। থাকেন রাজশাহী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আউটসোর্সিং কর্মী হিসেবে ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট পদে নিযুক্ত রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। তিনি জানান, এটি এমন একটি পেশা যার কারণে পাতের ভাত থেকে হাত তুলে বেরিয়ে যাবার ঘটনা তার বহুবার ঘটেছে।

“এখন আপনি বলতে পারেন আর কেউ কি ছিল না? হ্যাঁ ছিল। কিন্তু আমাদের টিমে মৃতদেহ থেকে কেউই নমুনা নিতে রাজী হয় না।”

নোমান জানালেন, তার কাজের ধরণটা হলো সরাসরি কোভিড রোগীদের সংস্পর্শে গিয়ে। এখানে তাদের জীবনের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। সংক্রমণ যতটাই বাড়ুক, ঝুঁকি যতই থাক, নমুনা সংগ্রহের কাজটা করতেই হবে। ভয় পেলে চলবে না।

তিনি বলছিলেন, নিজেও তিনবার করোনা সংক্রমিত হয়েছেন। মেনে নিয়েছেন তার জন্য বরাদ্দ নেই চিকিৎসা বা ঝুঁকি ভাতা। এসবে কখনও দমে যাননি। করোনা থেকে সুস্থ্য হয়েই কাজে ফিরেছেন। পরিতাপের বিষয়, চিকিৎসা বা ঝুঁকি ভাতা দুরে থাক, গত ৫ মাস তার বেতন হয়নি।

নোমানের মতো অন্তত ৯ জন রাজশাহীর মেডিকেলে টেকনোলজিস্ট ও ল্যাব অ্যাটেনডেন্টে পদে আউটসোর্সিং কর্মী হিসেবে এই করোনাকালে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে দিন রাত পার করছেন মানুষের সেবায়। প্রতিদিনই তারা রাজশাহী মেডিকেলে কলেজ পয়েন্ট ও নগরীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করেন। আবার কাজ করেন আরটিপিসিআর ল্যাবেও। অথচ তাদের সময়মতো মেলে না বেতন। এদের বেশিরভাগ একাধিকবার করোনা আক্রান্ত হলেও তাদের জন্য বরাদ্দ নেই চিকিৎসা বা ঝুঁকি ভাতা। টানা কাজ করলেও মেলে না ছুটি। নেই আইসোলেশন বা আলাদা থাকার ব্যবস্থাও।

এদের একজন সোহেল রানা রুবেল। কাজ করেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের আউটসোর্সিং কর্মী হিসেবে।

সোহেল রানা বলছিলেন, “মেডিকেল কলেজ পয়েন্টে এসে নমুনা দিলে ফি একশ টাকা। কিন্তু বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফি তিনশ টাকা। সরকার তাদের নির্দিষ্ট পয়েন্টের বাইরে থেকে নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে দুইশ টাকা বাড়তি ফি নিলেও, আমরা একটা টাকাও পাই না। আমরা যাদের নমুনা সংগ্রহ করি, তারা ভাবেন এই বাড়তি টাকা আমরা পেয়ে থাকি।কিন্তু সেটা ভুল ধারণা। আমাদের যাতায়াত খরচটুকুও দেয়া হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই ব্যয় করতে হয় নিজেদের পকেট থেকে।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আউটসোর্সিং কর্মী হয়ে রাজশাহী মেডিকেলে কর্মরত হুমায়ন কবীর বলেন, এখানে টানা কাজ করলেও নেই আলাদা থাকার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা।বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নেই সাপ্তাহিক ছুটি।

হুমায়ন বলছিলেন, “পরিবারের সাথে আলাদা সময় কাটানোর জন্য ছুটি বলতে বড় উৎসব। বিশেষ করে দুই ঈদ। যেহেতু ঈদের দিনও ল্যাব চলে সেকারণে কর্মীদের ভাগ করে একটা দল ছুটি পায়। আরেকটা দল পরের ঈদের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন।“

হুমায়ন কবীর যখন এসব বলছিলেন, তার চোখ দুটো তখন পানিতে টলমল করছিলো। গলা জড়িয়ে আসছিলো।

তিনি জানালেন, পরিস্থিতির বাস্তবতায় ছুটি মেলে তখনই, যখন তারা আক্রান্ত হন করোনায়। তাদের কাছে টানা ছুটি মানে করোনা পজিটিভ, নইলে না।

এমন ঝুঁকির পেশায় কোন ধরণের নিয়োগ ছাড়াই কাজ করা মানুষও রয়েছেন। তারা স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেন। পরিচয় স্বেচ্ছাসেবী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,ঝুঁকি জেনেও রাজশাহীতে অন্তত ৩০ জন স্বেচ্ছাসেবী কর্মী নিজেকে নিয়োজিত করেছেন করোনার সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে।

সম্প্রতি রাজশাহী জেলা প্রশাসন এমন স্বেচ্ছাসেবী একটি সংগঠন রাজশাহী জেলা জাতীয় তরুণ সংঘের ১৭ জন স্বেচ্ছাসেবী নমুনা সংগ্রহকারীকে ৮৫ হাজার টাকা অনুদান দিয়েছেন।  

সংগঠনটির একজন সদস্য স্যাম্পল কালেক্টর রুবিনা পারভীন। তিনি জানান, করোনাকালের শুরুতে যখন নমুনা সংগ্রহের জন্য কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন নিজেরাই মনস্থির করেন তারা মানবিক বিবেচনায় কাজটি করবেন। যেহেতু তার পড়াশোনা প্যারামেডিকেলে, চিন্তাটি কার্যকর করতে সময় লাগেনি। গতবছর প্রশিক্ষণ নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের হয়ে নমুনা সংগ্রহ শুরু করেন। বিগত কিছুদিন থেকে সিটি কর্পোরেশন তাদের মাসে ১২ হাজার টাকা করে ভাতা দেয়া শুরু করেছে।

রাজশাহীতে প্রকোপ বাড়ায় বর্তমানে ১৩টি পয়েন্টে র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট করেছে সিটি কর্পোরেশন। সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরাও নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার কাজটি করছেন।

তারা জানান,নিয়মিত সম্মানির বাইরে এর জন্য আলাদা করে কোন ভাতা দেয়া হয় না। যেহেতু স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মী, সেকারণে এই অতিমারিকালে মানবিক বিবেচনা বোধ থেকে সরাসরি কোভিড রোগীদের সংস্পর্শে গিয়ে কাজ করছেন।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের রাজশাহী জেলা সভাপতি ডা. চিন্ময় কান্তি দাস বলেন, “অতিমারির এই সময়ে নমুনা সংগ্রকারীদের সুযোগ সুবিধা বাড়ানো উচিত স্বাস্থ্য বিভাগের। এবং সেটি জরুরিভাবেই করা প্রয়োজন।”

Digiprove sealCopyright protected by Digiprove © 2021All Rights Reserved