grand river view

জন্ম-মৃত্যু প্রকৃতির চিরায়ত লীলার অংশ; আস্তিকেরা এক্ষেত্রে স্রষ্টার একক কর্তৃত্ব স্বীকার করলেও অন্যেরা ব্যাখ্যা করেছেন স্ব-স্ব দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে। সেসব ব্যাখ্যায় না গিয়ে আমরা বরং সেদিকেই নজর দিতে চাই যে, আর দশটা প্রাণীর চেয়ে কোন্ স্বকীয়তায় মানুষ নিজের জন্মকে সার্থক করে তোলে? মানবজন্মের সার্থকতা তার কর্মে, কর্মেরও আবার রকমফের আছে; সুকর্ম এবং দুষ্কর্ম। কর্মের ভিত্তিতেই সক্রেটিস, হিটলার এবং আইনস্টাইনেরা মানবজাতির কাছে আজও নন্দিত-নিন্দিত হচ্ছেন।

২.

সকল মানুষের পৃথিবীতে আসার প্রক্রিয়া প্রায় একই হলেও সকলের জন্মদিন মানুষ স্মরণে রাখে না বা পালন করে না। সেই সকল মানুষের জন্মদিন মানুষ স্মরণ বা পালন করে, যারা কর্মগুণে তাকে স্মরণ করার উপযোগী করে তুলতে পারেন; তা কবি-সাহিত্যিক, দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, রাজনীতিক, ইতিহাসবিদ—সকলের ক্ষেত্রেই কথাটি প্রযোজ্য। কবির জন্মদিন কেন স্মরণ বা পালন করা হয়? উত্তর সহজ; কবির সৃষ্টি কবিকে স্মরণ করায়। কোনো কবি নান্দনিকতায়, কোনো কবি দেশ-কাল-সমাজ ভাবনায়, কোনো কবি দার্শনিকতায় স্মরণীয় হন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষের সুখ-দুঃখের সংগীত রচে অমরালয় গড়ে তুলেছিলেন। আর সে কারণেই এই সূর্যকরে, পুষ্পিত-কাননে, জীবন্ত হৃদয়মাঝে ঠাঁই লাভ করেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী নিয়ে এবং আরেক হাতে রণতূর্য-নিনাদ তুলে মানবহৃদয়ে ঠাঁই পেয়েছেন। এভাবে একেক কবি একেকভাবে আপন সৃষ্টির গৌরবে মানবহৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন এবং তার ফলে তাঁদের জন্মদিন স্মরণ ও পালনের তাগিদ এসেছে। আমাদের কালের কবি ওবায়েদ আকাশকে তাঁর জন্মদিনে আমরা শুভেচ্ছা জানাই তাঁর কবিত্বের গুণেই। কী তাঁর সেই কবিত্ব? জানা যাক কাব্য-কবিতার একজন সত্যিকারের সমঝদার বেগম আকতার কামালের বিশ্লেষণ থেকে; ওবায়েদ আকাশের কবিত্ব সম্পর্কে আকতার কামাল লিখেছেন: ‘ওবায়েদ আকাশ (১৯৭৩) সাহিত্যচর্চাকেন্দ্রিক কাজকর্মে নিবেদিত ও সক্রিয় একজন কবি। ঢাকার সাহিত্যালোচনাসভার সংগঠক হিসেবেই শুধু নয়, তিনি একটি মানসম্পন্ন সাহিত্য সাময়িকী ‘শালুক’-এর সম্পাদকও, পেশায় সাহিত্য-সাংবাদিক। তাঁর এই সক্রিয় জীবনচারণায় ঋদ্ধ ও হৃদ্য হতে থাকে কাব্যকলার পরিসর ও কথনভঙ্গি। যদিও যখন কবিতা রচনার কাজ করেন তখন থাকেন একা। নব্বইয়ের দশকে তাঁর কাব্যযাত্রার শুরু, বর্তমান পর্যন্ত অব্যাহত, ভবিষ্যতেও থাকবে প্রসার্যমান—আশা করাই যায়।… ওবায়েদ আকাশের কবিস্বভাবে শৈশবের স্মৃতিকাতরতা আছে, তার সঙ্গে জড়াজড়ি করে থাকে বর্তমান সময়জাত সমাজবাস্তবতার চূর্ণ রূপ, তাতে এক ধরনের সমাজবাস্তব অভিব্যক্তিবাদী কাব্যরীতি গড়ে ওঠে, যেখানে জড়ো হয় পরাবাস্তবতা, নিসর্গ নিয়ে স্মরণের সংস্কৃতি। ফলে তাঁর উচ্চারণ ভিন্ন হয়, উচ্চারণকে কথনক্রিয়ায় উত্তীর্ণ করার প্রয়াস চলে, সর্বোপরি এই নান্দনিক মিশ্ররীতিটিতে কবির মনোনিবেশ বিনত থাকে মূলত শব্দশক্তিতে। শব্দগ্রন্থনায় তিনি সচেতনভাবই থাকতে চান ভিন্ন ও স্বকীয়। … তাঁর কবিতাবাক্যে মোচড় আছে। … শ্লেষ অলঙ্কার ব্যবহারে এই কবির পারঙ্গমতা আছে। তাঁর চিত্রকল্পগুলি সর্বদাই দৃষ্টিকল্পের হাত ধরে বীভৎসতা সত্ত্বেও সৌন্দর্যতা আহরণ করে নেয় অনায়সে।’ ওবায়েদ আকাশের বিভিন্ন কবিতা থেকে দৃষ্টান্ত তুলে ধরে প্রায় চোদ্দ পৃষ্ঠার এক প্রবন্ধে এভাবে মূল্যায়ন শেষে বেগম আকতার কামাল লিখেছেন: ‘ওবায়েদ আকাশকে যেতে হবে বহুদূর, নিজ মনোধর্ম আর ডিকশনকেই ভাঙতে হবে—ভিন্নতায় যাওয়ার জন্য, যেখানে বোধ হবে বোধি, বস্তুজ্ঞান হবে প্রজ্ঞার দীপে প্রজ্বলিত। তাঁকে পেতে হবে সেই বোধির নাগাল পাওয়ার জন্যে শিল্পনিয়নদীপের জিয়ন কাঠি। যাতে শব্দকুশলতা ও শব্দায়নের নানা জটিল স্তরার্থ এক অর্থাতীত অনির্নেয় সূক্ষ্ম নীরবতার পরিসরে পৌঁছতে পারে, জীবনের ভিশনে কবিতা উত্তীর্ণ হতে পারে। অপেক্ষায় রইলাম।’ ওবায়েদ আকাশের কবিতা নিয়ে এভাবে অনেকেই লিখেছেন, তবে বেগম আকতার কামালের মূল্যায়ন তুলে ধরার পর আর কারও লেখা উদ্ধৃত করে কবির জন্মদিনের শুভেচ্ছালিপি বাগ্বিস্তারপূর্ণ করতে চাই না।

৩.

কোন্ কবি প্রথম জন্মদিন পালন করেছিলেন বা কীভাবে কবিদের জন্মদিন পালনের রেওয়াজ চালু হয়, তার দিন-ক্ষণ-তারিখ নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রে কবিদের স্থান না থাকলেও সেই আদিকাল থেকেই রাজসভায় কবিরা সমাদর লাভ করেছেন। একইভাবে তিরস্কার কিংবা রাজরোষও অনেক কবির ভাগ্যে জুটেছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন প্রথম পালনের ঘটনা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। দিনটি ছিল শনিবার, ১৮৮৭ সালের মে মাসের ৭ তারিখ। ঐদিন তিনি সাতাশে পা রাখেন। সস্ত্রীক বাস করতেন ৪৯নং পার্ক স্ট্রিটে, মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ও মেজবৌঠান জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর সঙ্গে। কবির ভাগনি সরলা দেবী (স্বণূকুমারী দেবীর কন্যা) খুব ভোরে কাশিয়া বাগান থেকে দাদা জ্যোৎস্নানাথকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হন পার্ক স্ট্রিটের বাড়িতে। সঙ্গে নেন নিজ হাতে গাঁথা বকুল ফুলের মালা; পথে কেনেন বেলফুলের মালাসহ আরও নানান ফুল। এছাড়া উপহার হিসেবে নেন একজোড়া ধুতি-চাদর, একটি ইংরেজি কবিতার বই (দি পেয়েমস অব হাইনে)। এসব নিয়ে পার্ক স্ট্রিটের বাড়িতে গিয়ে নিঃশব্দে প্রবেশ করেন রবির ঘরে। ঘুমন্ত মামার পায়ের কাছে এসব নৈবেদ্য রেখে প্রণাম করেন। এরপর আশপাশের ঘর থেকে একে একে পরিবারের অন্য সদস্যরা এসে রবিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালেন, আশীর্বাদ ও প্রণাম  করলেন। সারা বাড়িতে কবির জন্মদিনের আনন্দে সাড়া পড়ে গেল। এভাবেই ঘটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন পালনের সূত্রপাত। এরপর পারিবারিক-সামাজিক নানাপরিসরে তাঁর জন্মদিন পালিত হয়েছে। জীবদ্দশায় মেষবারের মতো পঁচিশে বৈশাখের শঙ্খধ্বনি বেজেছিল অর্থাৎ কবির জন্মদিন পালিত হয়েছিল ১৯৪১ সালের পয়লা বৈশাখে। সেদিন রবীন্দ্রনাথ নাতি সৌমেন্দ্রনাথের দাবি রক্ষায় লিখেছিলেন মানবের জয়গান ‘ঐ মহামানব আসে’; এবং জন্মোৎসবে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তার নাম দিয়েছিলেন ‘সভ্যতার সংকট’। কবি ওবায়েদ আকাশের প্রথম জন্মদিন কবে পালিত হয়, তা জানি না, তবে করোনার এই দুর্বিষহ সময়ে আটচল্লিশতম জন্মদিন যে ঘটা করে পালন করা হচ্ছে না, এটা নিশ্চিত। সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে তাঁর ভক্ত-সুহৃদ-শুভাকাঙ্ক্ষীরা জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

৩.

ওবায়েদ আকাশের জন্ম ১৯৭৩ সালের ১৩ জুন, জন্মস্থান রাজবাড়ী জেলার সুলতানপুর গ্রামে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনকারী এই কবি কর্মরত আছেন ‘দৈনিক সংবাদ’-এর সাহিত্য-সম্পাদক হিসেবে। তাঁর সম্পাদিত লিটিলম্যাগ ‘শালুক’ বাংলা সাহিত্যপত্রিকার জগতে স্থান করে নিয়েছে সম্পাদকের মুন্সিয়ানায়। ওবায়েদ আকাশ রচিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগুলো হলো: পতন গুঞ্জনে ভাসে খরস্রোতা চাঁদ (২০০১), নাশতার টেবিলে প্রজাপতিগণ (২০০৩), দুরারোগ্য বাড়িঘর (২০০৪), কুয়াশা উড়ালো যারা (২০০৫), পাতাল নির্মাণের প্রণালী (২০০৬), তারপরে তারকার হাসি (২০০৭), শীতের প্রকার (২০০৮), বিড়ালনৃত্য প্রেতের মস্করা (২০০৯), যা কিছু সবুজ সঙ্কেতময় (২০১০), প্রিয় কবিদের রন্ধনশালায় (২০১১)। এছাড়া প্রকাশিত হয়ে ওবায়েদ আকাশের কবিতা/আদিপর্ব (২০০১)। তিনি অনুবাদ করেছেন ফরাসি কবিতা। রয়েছে ঘাসের রেস্তরাঁ (২০০৮) ও লতাপাতার শৃঙ্খলা (২০১২) নামের গদ্যগ্রন্থ। সম্পাদনা করেছেন ‘দুই বাংলার নব্বইয়ের দশকের নির্বাচিত কবিতা (২০১২)। সৃষ্টি ও কর্মের স্বীকৃতি-স্বরূপ লাভ করেছেন ‘এইচএসবিসি-কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার’ সহ (২০০৮) নানা পুরস্কার ও সম্মাননা।

৫.

সম্পাদক ও কবি হিসেবে ওবায়েদ আকাশ যেমন প্রাতিস্বিকতা লাভ করেছেন; তেমনি সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ, বন্ধুবৎসল এবং সংসারধর্মে নিপুণ একজন মানুষ হিসেবেও নিজেকে পরিচিত করেছেন। বহুমাত্রিক ওবায়েদ আকাশকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে তাঁর কবিবন্ধু সরকার আমিন ফেসবুকে লিখেছেন: ‘কোনো কোনো মানুষ হয় একদম নিজের মতো—গণমানুষের মতো না। কবি ওবায়েদ আকাশ এমনই একজন। কবিতায়, সম্পাদনায়, সংসারপণায়, সাহিত্য তৎপরতায় ওবায়েদ অনন্য। এত প্রাণ কোথায় পায় বিস্ময়ে ভাবি!’ এ বিস্ময় আমারও। তবে আমার মূল্যায়ন আরেকটু ভিন্নতরো, তা হলো: কলুষিত আত্মা দ্বারা মহৎ সৃষ্টি সম্ভব নয়, ওবায়েদ আকাশের ‘শালুক’ ও তাঁর কবিতারাজি সাক্ষ্য দেয় শুদ্ধাচারী জীবন ও আত্মার পরিশুদ্ধতার। ওবায়েদ আকাশ এভাবেই মহৎ থেকে মহোত্তর সৃষ্টির পথে ক্রমাগত এগিয়ে যাবেন। এমন প্রত্যাশায় তাঁকে জানালাম আটচল্লিশতম জন্মদিনের শুভেচ্ছা।