।। আরাফাত কামাল, রাজশাহী ।।

২০১১ সাল। আমরা দুই ভাই কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। হঠাৎ বড় ভাই শহিদুল আহমেদ বিদেশি এক সিরিয়াল দেখে বলেন, এই ধরনের নকশি আয়না বানানো সম্ভব কিনা? সেই থেকে আমাদের নতুন আগ্রহ তৈরি হয়। টিভির আয়না ছোট ক্যামেরা দিয়ে ছবি ধারণ করে দোকানে নিয়ে যাই। দোকানদারকে আয়নার ডিজাইন দেখিয়ে বলি, এইভাবে কাচ কেটে দিতে হবে। পরে আমরা কাগজ লাগিয়ে দুই ভাই আয়নার নকশা বানাই।

এই কথাগুলো বলছিলেন তরুণ উদ্যোক্তা রাশেদ আহমেদ। রাশেদ রাজশাহী থিম ওমর প্লাজায় ‘কারুবিপণি’ নামে কারুশিল্পের শোরুম দিয়েছেন। ব্যবসায় সফলতা লাভ করেছেন অনেকটাই। তার শোরুমে পাওয়া যাবে বাঁশের তৈরি কলমদানি, কাঠের চুড়ি, মালা, পাটের পদ্মা, ক্যালেন্ডার, আয়না, নৌকা ছাড়াও বিভিন্ন কারুপণ্য। তরুণ এ উদ্যোক্তা এ পর্যন্ত সতেরটি মেলায় অংশ নিয়েছেন। রাজশাহীর চারঘাটে রয়েছে তার কারখানা।

কারুবিপণিতে কারুপণ্য

রাশেদ বলেন, প্রথমে দুই ভাই মিলে আয়না ও নৌকা ৫০ পিস বানাই। কিন্তু এক মাসেও তা বিক্রি করতে পারিনি। বিক্রি না হলেও আমরা হাল ছাড়িনি। পরে জানতে পারি বান্দরবনে একটা এসএমই আঞ্চলিক মেলা মেলা হচ্ছে। সেই মেলায় ৬০০ পিস পণ্য বিক্রি করি। এতে আমাদের বিশ্বাস বেড়ে যায়। এরপর বান্দরবান রাজার মাঠের ডেকোরেশনের জন্য এক লক্ষ টাকার কাজ পেয়ে যাই। তারপর কাজ বেড়ে যায়। প্রথমে পাঁচজন কর্মী নিই। পরে অর্ডারের সঙ্গে সঙ্গে কারখানায় কর্মী সংখ্যা বাড়াতে শুরু করি। পণ্য বিক্রি শুরু করি আট বিভাগে।

এক বৈশাখে বাংলাদেশ সরকারের দফতর থেকে ছয় লক্ষ টাকার পণ্যের অর্ডার পাই। আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ৪০ জন কর্মীকে নিয়ে কাজ শুরু করি। বর্তমানে কর্মীসংখ্যা ৫০ জন।

রাশেদের কারখানায় কাজ করছেন কর্মীরা

রাশেদের কারখানার পণ্যগুলোর কাঁচামাল হলো বাঁশ, কাঠ, কাগজ। এসব দিয়ে বানানো হয় আয়না, পাখা, নৌকা, পালকি, ডোরবেল, হাতি, গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি, রিকশা, ইত্যাদি। সেখান থেকে নিয়ে আসা হয় শোরুমে।

রাশেদ বলেন, শৈশব থেকে এই কাজ দেখে আসছি বাবার কাছে। আমার বাবার নাম জয়উদ্দিন। ১৯৪৭ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে মৃৎশিল্পের কাজ শুরু করেন বাবা। তিনি ছিলেন ঢাকা নগর মৃৎশিল্পের বহুমুখী সমবায় সমিতির একজন সদস্য ও শিল্পী। বাবা মারা যাওয়ার পরে বড় ভাই শহিদুল আহমেদ এই পেশার হাল ধরেছেন। এই পেশায় পরিবারের ছোঁয়া লেগে আছে।

রাশেদ জানান, মাত্র পাঁচ হাজার টাকা মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করে এখন মূলধন দাঁড়িয়েছে দশ লাখ টাকায়।

রাশেদের কারখানার কর্মী মাইশা খাতুন বলেন, এই কাজ করে আমি খুব ভালো আছি। চার বছর ধরে এই কাজের সঙ্গে আছি।

সফল এই তরুণ পড়াশোনা ডিগ্রি পর্যন্ত করেছেন। চাকরির পেছনে না ছুটে ব্যবসার দিকে আগ্রহী হয়ে পড়েন। তিনি মনে করেন, এই ব্যবসার ভেতরে তার মঙ্গল লুকিয়ে আছে।

রাশেদ বলেন, সরকার কোনো সুযোগ-সুবিধা দিলে আরও ভালো কিছু করবো। আমি আমার কাজে শতভাগ খুশি। তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে বলেন, চাকরির পেছনে না দৌড়ে নিজ ইচ্ছাশক্তি কাজে লাগালে সফলতা আসবেই।