grand river view

।। নুসরাত নুসিন ।।

রাজশাহীর লালনমঞ্চ। সময়টা সন্ধ্যা। কাছেই পদ্মার বিস্তৃত বালুচর। এই চরে পাখি নামে অনেক। দূরদেশ থেকেও পাখি আসে। সেই পাখি ধরে মোনজেল কবিরাজ। কবিরাজ অবশ্য তরুণ গল্পকার সুবন্ত যায়েদের গল্পের চরিত্র। পদ্মার এই চরাচরে কয়েকজনের পাখি ধরা নিয়ে তার গল্প। আর সত্যি কিনা এই বালুচরের মুখোমুখি দাঁড়ালে সবার আগে চোখ যায় দিগন্তের দিকে। তারপর আকাশে । সেটা পাখি দেখা ছাড়া আর কিছুই নয়। আকাশে দুএকটি মুক্ত প্রাণ দেখার জন্য আমাদের প্রাণটা উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। কেন? তা জানে না কেউ।

সেদিন মঞ্চে বসে বিস্তৃত এই বালুচরের দিকে তাকিয়ে পাখির কথা খুব মনে হবার কারণ ছিল বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। প্রথম তার ‘চরাচর’ দেখেছি বন্ধুর প্রেরণায়। তারপরে ‘জানালা’ দেখেছি। আর আজ তারই পাশে বসে দেখব ‘আনওয়ার ক্যা আজব কিচ্ছা’। আমি উদ্বেলিত। আমার একপাশে বসা বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত আর একপাশে কবি শামীম হোসেন। মাঝখানে আমি। ছবি শুরু হতে তখনো বাকি। ছবির এই মানুষটির সঙ্গে বসে চোখাচুখি হতেই কী বলব আর কী বলা যায় ভাবতে ভাবতেই বলে বসি, আমাদের ছবি আপনার কেমন লাগে? এরপরেই তার নম্রস্বর আমাকে আনন্দিত করলো। ভালো, ভালো-একই শব্দ পরপর দুবার উচ্চারণ করলেন তিনি। তারপর আমরা আস্তে আস্তে আরো কিছুক্ষণ কথা বললাম। পাশাপাশি বসে সেটা কিছুটা ফিসফাস করে কথা বলার মত। আমি বললাম, আপনার চরাচরের গল্পটা দারুণ। ছেলেটির স্বপ্নের জায়গাটি আমার ভালো লেগেছে!

প্রজেক্টরে শুরু হলো ‘আনওয়ার ক্যা আজব কিচ্ছা’। একটি মেয়ে হাইহিল জুতো পরে খটখট শব্দ তুলে গলি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কিন্তু কোথায় হেঁটে গেল আমরা তা পরে দেখতে পাই। এখানে আনওয়ারের গল্প। জীবনের চিকন অলিগলিপথ দিয়ে সে বের হয়ে যায় খোলাপথে। যেখানে তার শৈশব। যেখানে প্রেমসুধারস।

বুদ্ধদেব আশ্চর্য সাবলীল। তার সিনেমায় নির্মম ফলাটা সুক্ষ্নভাবে ভেতরে ঢুকছে, অত্যন্ত নির্মোহভাবে বিদ্ধ করছে কিন্তু সিনেমার বয়ানকারী হিসেবে তিনি নির্লিপ্ত। বুদ্ধদেবকে এভাবেই আবিষ্কার করেছি।

যদি বুদ্ধদেবের গল্প বলার ঢঙটি লক্ষ করি, তাহলে দেখব তা নিদারুণ সাধারণ। সাধারণ এই কারণে যে, তার সিনেমায় একইসঙ্গে বিপুল কলরব নেই। অনেকটা সরলরেখার মত। গল্প বলতে বলতে গন্তব্যে পৌঁছায়। যদি সত্যজিৎকে দেখি, তাহলে দেখব তার সিনেমায় অনেক স্পষ্ট বক্তব্য থাকে। গল্পের ভঙ্গিমায় জোর থাকে। আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি থাকে। আর ঋত্বিক, কখনো কখনো তিনি ফ্যানাটিক। মৃণালের বক্তব্যও জোরালো। গল্প বলার ভঙ্গিমায় একটা স্পিরিট থাকে। আর ঋতু বক্রময়। তার সিনেমার গল্প এক জটিল কোলাবেরেশন। যদিও তিনি স্লো কিন্তু তাঁর প্লট মনস্তত্বের জটিল ঘেরাটোপ। সাধারণ দৃষ্টিতে তা কখনোই সাধারণ নয়।

এর মধ্যে বুদ্ধদেব গল্প বলায় নিশ্চিতভাবে সরল ও একরৈখিক। সে গল্পের ভাষা যেন কোনো স্বপ্নবান তরুণের হেঁটে যাওয়ার ভাষা। জীবনের বিপুল কলরবের বাইরে জীবনের গহ্বরে প্রবেশের গল্প। সে গল্পের মধ্যে যুক্ত হয় এক নম্র ভঙ্গিমা, সাধারণ দৃশ্যকল্প, জীবনের অতি পরিচিত সঙ্গীত। যে সঙ্গীত জীবনের মূলে ফেরাবে।

বুদ্ধদেবের ছবি দেখলে মনে হয়, জীবনের লক্ষ্য হলো দুটি। একটি হলো সামনে এগিয়ে যাওয়া। অপরটি হলো পেছনে ফিরে যাওয়া। বুদ্ধদেব সামনে থেকে পেছনে ফিরতে চান। সভ্যতার অগ্রগতি থেকে পেছনে মূলে ফেরত যেতে চান। কিন্তু সেখানে তো আর যাওয়া সম্ভব নয়! তাহলে যে জীবন সামনে এগিয়ে নিয়ে চলেছি তার পেছনে যেতে পারি। কিন্তু সেখানে কেন যাওয়া? আমরা যদি ‘জানালার’ কথা বলি, তাহলে দেখব সেখানে অতীব সুন্দর একটি কারুকাজ করা জানালার গল্প আছে। সে জানালায় দুইটি ডানামেলা পাখি। জানালা এখানে মেটাফোর। শৈশব আর ডানাময় পাখি একই অর্থ বহন করে কিন্তু। সেখানে সে বারবার যাচ্ছে কারণ সেখানে তার ডানা ছিল। এবং জানালাটি কিন্তু আগের মত নেই। নায়কের নিজের ডানা যেমন আশাহত আর সেই জানালাটির পাখিগুলোও ঘুনে ঝুরঝুর। নতুন নকশা ও নতুন ডানার জানালা সে স্কুল ঘরটিতে লাগাতে চায় কিন্তু তা শেষপর্যন্ত হয়ে ওঠে না। ঠিক এই এখানেই জীবনের অতিপ্রিয় বিধুরতা যোগ হয়ে যায়।

‘চরাচর’ সিনেমার লখা পাখি সে বেঁচবে না। গ্রাম্য-সাধারণ এই যুবকের প্রাণটি পাখিজীবনের মত। লখা পাখি বেঁচার আগে পাখির নিয়তির কথা ভাবে। পাখিজীবন শহুরে মানুষরা বুঝবে না। ডানার মর্মার্থ তারা জানে না। শহরে মানুষেরা আস্ত পাখি ফ্রাই করে খায়। তারা যদিও বা পোষে কিন্তু খাঁচায় বন্দি করে রাখে। খাবার দেবে ঠিকই কিন্তু সারাদিন ব্যস্ততায় তারা একা পাখিটিকে ঘর-বারান্দায় রেখে দেবে। পাখির এ নিয়তি লখা ভাবতে পারে না। সে পাখি বেঁচতে পারবে না। পারে না। শুরু হয়ে গেল জীবিকা ও জীবনের দ্বন্দ্ব। ইচ্ছা ও অনিচ্ছার দ্বন্দ্ব। ব্যক্তির জন্য এই ইচ্ছা ও অনিচ্ছার দ্বন্দ্বটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে যুক্ত থাকে সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। সময়ের দ্বন্দ্ব থেকে সে যেতে চায় অতীতে। যেখানে নির্দ্বন্দ্ব চরাচর। সীমানাহীন। আর শৈশব।

‘উত্তরা’ চলচ্চিত্রেও শেষপর্যন্ত শিশুই মুখ্য হয়ে ওঠে। একটি শিশু যা অনুভব করে তা কুস্তি লড়াইকারীরা দেখে না। সুন্দরের দিকে, ইতিহাস, ঐতিহ্যের দিকে তাদের কোনো নজর নেই।

বোঝা যায়, বুদ্ধদেব স্বল্পভাষী। ফলে তার ভাষাপ্রসঙ্গে যে কথা বলা যায়, তা হলো এককথায় সরল। আড়ম্বরহীন ভাষা। আর সরল বলেই তা আমাদের কাছে প্রিয় ও আকর্ষণীয়। অন্যান্য নির্মাতাদের থেকে ক্যারিশমাটিক হয়ে ওঠে। আলাদাভাবে চোখে লাগে। গল্প বলতে গিয়ে যেটুকু কথা বলা দরকার সেটুকু কথাই তার চরিত্ররা বলে।

শুধু কি চরিত্রদের স্বল্পভাষা! একটি গল্প বলতে গেলে নেহাৎ যেটুকু দৃশ্যচিত্র দেখানো দরকার তিনি সেটুকুই দেখান। বেশি দেখানোয় তার আগ্রহ নেই। এমনকি যদি বলি, অনেক সংকটের কথা বুদ্ধদেব বলতে চান না। তিনি জীবনের কয়েকটি বিষয় নিয়েই কথা বলতে চেয়েছেন। একই বিষয় অনেকটা ঘুরেফিরে অন্য ইঙ্গিতে আসে যেন।

আন্দ্রেই তারকোভস্কির ছবিতে এই বৈশিষ্ট্য আমরা দেখতে পাই।

আর এই যে তার সিনেমা প্রসঙ্গে একটি কথা প্রায় সকলেই বলে থাকেন যে তিনি সিনেমার কবি। তারা এ কথা বলেন হয়তো তার দৃশ্য ব্যবহার, এমনকি কখনো কখনো তার দীর্ঘদৃশ্যের ব্যবহারের কারণে। কবিতায় দৃশ্য ব্যবহার হয় জীবনের একটি ভাবনাকে সমান্তরাল করে ফুটিয়ে তোলার জন্য। সেখানে রিদম থাকে, ভাষায় গীতলতা আসে। ঠিক বুদ্ধদেব চলচ্চিত্রেও দেখালেন যে একটি দৃশ্য কীভাবে স্থির করে ধরে রাখলে দর্শক ভাবনার স্পেসটি পায়। কবিতা বেশি কথা বলে না। কিন্তু তার গভীরতাটি পৌঁছে যায় বিস্তৃত ক্যানভাসে। অনেক অর্থময়তা তৈরি হয়। আর ঠিক এই বৈশিষ্ট্যটি প্রয়োগ করার জন্য সিনেমার কবি তাকে বলাই যায়। কথা কম, কিন্তু তার অর্থময়তা বেশি।

কম কথা বলে বক্তব্যকে অর্থময় করে ফুটিয়ে তুলতে গেলে আরো যা যা লাগে, বুদ্ধদেব সেসব কলাকৌশল ব্যবহার করেছেন। বড় কোনো খণ্ড গল্প না বলে মেটাফোরের ব্যবহার করেছেন কখনো। দৃশ্যের রিদম তৈরির জন্য করেছেন সঙ্গীতের যথার্থ ব্যবহার।

আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, লোকজ মোটিভ ব্যবহার। লোকজ গীত সাধারণ জীবনের অনেক কথাই অবলীলায় বলে। পরিচালককে অনেক কথা বলার দরকার নেই। একটি উপযুক্ত সময়ে একটি যথার্থ গীত ব্যবহার করলে তার অনেক মানে দাঁড়িয়ে যায়।

আর নিশ্চিতভাবে তার সঙ্গীত ব্যবহার ছবিকে পূর্ণতা দেয়ার একটি উপাদান। যেখানে গল্পের শেষ সেখানে সঙ্গীতের ব্যবহার। মুহূর্তেই একটা টোটাল কম্পোজিশন দাঁড় হয়ে যায়। সেখানে সিনেমা শেষ হলেও রেশ পৌঁছে যায় বহুদূর।

আমরা যদি বাস্তবে তাকাই তাহলে দেখবো যে, যে মানুষটি স্বল্পভাষী তাকে খুব সহজেই আলাদা করা যাচ্ছে। বুদ্ধদেবের চলচ্চিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য ঠিক এখানেই লুকিয়ে আছে। তার চলচ্চিত্র স্বল্পভাষার চলচ্চিত্র। কিন্তু তার অর্থ যেন বহুদূরের ইঙ্গিত দেয়।

বুদ্ধদেবের সিনেমা নিয়ে আর যা যা বলা যেতে পারে, তার চলচ্চিত্র কলরবের বাইরের এক জগৎ। সে জগতে থাকে কেউ কেউ। লখা, বিমল, আনওয়ারের মত স্বপ্নবান তরুণরা। যারা ফিরতে চায় নিজের অভ্যন্তরে। যাদের মন সংবেদনায় ভরা। এ পৃথিবীটাকে দেখতে চায় সত্যিকারের চোখ দিয়ে। সে চোখ মমতায় ভরা। স্বপ্নের আবেশ-জড়া।

‘তাকে বোলো না
সেই
রহস্যময় মানুষটির
কথা।
সমস্ত দিনের পর
সে এখন
জামা-পাজামা খুলে
দাঁড়িয়ে আছে
শাওয়ারের তলায়।
তার এখন।
মনে পড়ছে না
ঘাম-চমচপে মানুষ
ভিড়ে ভাজাভাজা
রাস্তা
অফিস
নর্দমা
ফাইল
টেবিল
পাশের বাড়ির টিভি।
তার এখন
মনে পড়ছে না কোনো কিছু।
সে এখন
পৃথিবীর
সমস্ত রহস্যময়
মানুষের মতো
সিগারেট খাচ্ছে
আর
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে
উঠে পড়ছে বিছানায়।
বৌ-বাচ্চা রেখে
তার বিছানা
এখন তাকে নিয়ে
বেরিয়ে পড়েছে
দূরে—
বহু দূরে
ঘুরে ঘুরে
এখন চলেছে উড়ে
মেঘের ভেতর,
মেঘ ছেড়ে
গ্রহের পরের গ্রহ ছেড়ে
আরো আরো গ্রহে
উড়ে উড়ে
কোনো এক গ্রহে
এখন দেখেছে সে
চকিতেই
রোবট মানুষ—
বিষণ্ণ
গম্ভীর
গালে হাত
উদাস
উদাস চোখ—
তাকে দেখে
সরে গেছে চকিতেই।
কালকে সকালবেলা
আবার
আবার অফিস
কোর্ট ও কাছারি
ভয় ও
কাছাখোলা দৌড়।
কিংবা
ইঁদুরের মতো
ক্রমাগত
রাশি রাশি ফাইল
বা ফাইলের রাশি রাশি
শব্দের ভেতর
দাঁত গোঁজা
মুখ গোঁজা ও
গুঁজে গুঁজে
স্বপ্ন দেখা
স্বপ্নপারের।
কোনোদিন
কোনোদিন তাকে
বোলো না
সেই
রহস্যময় মানুষটির কথা।’

(মানুষের রহস্যের কথা, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত)

ঠিক এই মানুষই তার সিনেমায় কথা কয়ে উঠেছে বারবার। ফলে তার সিনেমা হয়ে উঠেছে মানুষের রহস্যময় জীবনখণ্ড। অথচ যা কোনোভাবেই রহস্য নয়।