grand river view

।। জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

সকাল দশটা। রাজশাহী নগরের তালাইমারী চেকপোস্ট। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি এক তরুণী। কেন এসেছেন নগরে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি তার ব্যাগ থেকে বের করে দেখালেন চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র। পুলিশ খুঁটিয়ে দেখলেন সেটি।

এরপর তাকে ব্যবস্থাপত্র দেখিয়ে বললেন, এতে তো ২০১৭ সাল লেখা। চার বছরের আগের ব্যবস্থাপত্র কেন? কোন সদুত্তর নেই। মুখ কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। উপায়ন্ত না পেয়ে পুলিশ শেষমেষ ওই তরুণীকে প্রবেশ করতে দিলেন নগরে।

এর আধাঘণ্টা পর তাকে দেখা গেলো বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। কারো অপেক্ষায় তিনি। ওই তরুণী এসেছেন দুর্গাপুর থেকে।

বিকেল সাড়ে পাঁচটা। কাশিয়াডাঙ্গা মোড়ের পুলিশ চেকপোস্ট। মধ্যবয়সী লোকটির গায়ে শার্ট। পরনে প্যান্ট। ট্রাফিক পুলিশের জেরার মুখে জানালেন, তিনি কৃষক। যাবেন কাঠালবাড়িয়া মোড়। কৃষক বলে কথা, পুলিশ তাকে ছেড়ে দিলেন।

নগর পুলিশের ট্রাফিক সার্জেন্ট আরমান আশিক বললেন, লোকটির বেশভূষায় বোঝা যাচ্ছে তিনি কৃষক নন। যেহেতু কৃষি বিভাগ লকডাউনের আওতামুক্ত, সেই সুবিধা নেয়ার জন্য মিথ্যে বলছেন এটা শতভাগ ঠিক। কিন্তু এটা বুঝতে পারলেও আমি তো প্রমাণ করতে পারবো না তিনি কৃষক না। এক্ষেত্রে কী করার আছে?

লকডাউনের দ্বিতীয় দিনে এমন নানা অজুহাতের কারণে পুলিশ নগরের প্রবেশপথের চেকপোস্টগুলো থেকে যাতায়াতকারীদের যানবাহন থেকে নামিয়ে দিয়ে গন্তব্যে হেঁটে যেতে বাধ্য করেছেন।

মূল সড়কে পুলিশি তৎপরতায় লকডাউন কঠোর মনে হলেও, ধারণা বদলে গেল কাশিয়াডাঙ্গা মোড় থেকে শহরের দিকে আসতে। সেখানে সড়কের দুপাশে খোলা বেশ কয়েকটা দোকান। একটু দূরে দাঁড়িয়ে পুলিশ। হঠাৎ করেই ওয়্যারলেস সেটে আসলো বার্তা। উর্ধ্বতনরা যাবেন এ পথেই। বদলে গেল পরিস্থিতি। তৎপরতা বাড়লো পুলিশের। গালাগালি শুরু হতেই দুপাশের দোকানের ঝাপ পড়লো টপাটপ৷ দশ মিনিট পেরোতে না পেরোতে আবারও যেকার সেই!

বিকেল পাঁচটা। আমচত্বর পুলিশ চেকপোস্টের ওপাশে অটোরিকশা থেকে নামলেন নগরের বিসিক এলাকার সজীব হোসেনসহ ছয় জন। পার হলেন চেকপোস্ট। মুখে মাস্ক না থাকলেও তার সঙ্গে থাকা পাঁচ নারীর পরনে উৎসবের সাজসজ্জা। জানা গেল, তারা গিয়েছিলেন বায়া এলাকায় একটি বিয়ে বাড়িতে। এখন ফিরছেন।

রাস্তায় আসতে সমস্যা হয়েছে কি না জানতে চাইলে প্রশান্তির হাসি মুখে নিয়ে বললেন, ওপাশে অটোরিকশা, এপাশেও অটোরিকশা, মাঝে চেকপোস্ট। ঝামেলা না বরং একটু হেঁটে ঠিকঠাক হজম হলো পেটের ভাত! 

নাসিফা নগর থেকে ভ্যানে চড়ে এসে নামলেন ঠিক চেকপোস্টের পাশেই। যখন ভাড়া মেটাচ্ছিলেন তখন জানতে চাইলে বললেন, সকালে নিজ বাড়ি পবা থেকে এসেছিলেন সাগরপাড়ায়। এখন ফিরছেন। দিনভর ছিলেন বান্ধবীর বাসায়। কী কাজে জানতে চাইলে বললেন, একসঙ্গে পড়ালেখা করছিলাম। বই-খাতার ব্যাগ কই? প্রশ্ন শুনে উত্তর না দিয়ে হাঁটা দিলেন হন হন করে।

মলিন মুখ, ময়লাটে শার্ট। নাসিফা মধ্যবয়ষ্ক ভ্যানচালক কুতুব আলীর ভ্যানেই এসেছেন এপর্যন্ত। তিনি থাকেন নগরের বস্তিতে। চোখাচোখি হতে কাছাকাছি এসে এক পুলিশ বললেন, এই ব্যাডা, জানোস না লকডাউন চলে। ভ্যান নিয়ে রাস্তায় আইছস ক্যান? 

লোকটি অনুনয় করতে লাগলেন। বললেন, প্যাট তো আর লকডাউন মানে না। এতেই কাজ হলো। ঘুরলেন তিনি আমচত্বরের দিকে। ছয় যাত্রী নিয়ে আবারও রওয়ানা হলেন নগরের পথে।

নগরের শাখাওয়াত সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন হোসেন আলী। বাড়ি তানোরে। বিকেলে বাড়ি ফেরার পথ ধরেছেন। চেকপোস্টে দেখা হলে জানালেন, পুলিশ বেশ তৎপর। তবে কোনো সমস্যা নেই। পরিচয় দিলে ছেড়ে দেয়। বললেন, কারখানা খোলা আছে, যেভাবেই হোক আসতে হবে।

নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার মষিবাথান গ্রামের শহীদুলসহ একই এলাকার পাঁচজনের কাজ পড়েছে নগরে। লকডাউনের কারণে নগরে না থেকে, থাকছেন বায়ার এক আত্মীয়ের বাসায়। আলাপে জানালেন, শহরে আসতে আজ কোনো ঝক্কি ঝামেলা ছিল না। লকডাউন কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে চেকপোস্ট পার হয়ে নিচুস্বরে বললেন, ‘বজ্র আটুনি ফোস্কা গেরো’।

উন্নয়ন কর্মী সুব্রত কুমার দিনভরই খোঁজখবর রাখছেন লকডাউনের। কখনও টিভি স্ক্রিনে, কখনও আবার ওয়েব পোর্টালে। ফোন করে পরিস্থিতি জেনেছেন বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে। সরেজমিনে ঢুঁ মেরেছেন বাড়ির আশেপাশের গলিতে। জানালেন, তার পরিচিত একজন ঢাকা থেকে আজ রাজশাহী এসেছেন। ওই ব্যক্তির বরাত দিয়ে সুব্রত কুমার জানান, পুলিশের দুটি চেকপোস্ট পেরিয়েছেন হেঁটে, ঢাকা থেকে আসতে এছাড়া আর কোনো বাধা বিপত্তি ছিল না।

তিনি বলেন, পুলিশ চেষ্টা করছে বিধিনিষেধ মানাতে। কিন্তু মানুষ মানতে রাজি নয়। নানা অজুহাতে বাড়ির বাইরে আসছেন। অলিতে গলিতে মানুষ গিজগিজ করছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ চিন্ময় কুমার দাস বলেন, বাঙালি জাতি নৃতাত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটু বেশি সাহসী। তারা রোগ-শোক, জরা, মৃত্যু এসবে খুব বেশি ভয় পায় না। এটাই মূলত সমস্যা। লকডাউন মানাতে হলে পুলিশকে হতে হবে আরো কঠোর। আর চলমান সংক্রমণের ভয়াবহ চেহারা ঠেকাতে এর বিকল্পও নেই।

জরিমানা

এদিকে রাতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্বাস্থ্যবিধি ও লকডাউন না মানায় রাজশাহীতে জেলা প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ৫৭ জনের কাছ থেকে ৩৪ হাজার ৮০০ টাকা জরিমানা আদায় করেছে।