।। শোবিজ প্রতিবেদক ।।

“বুদ্ধদা যখন আমাকে বললেন, তার পরের সিনেমায় আমাকে নেবেন, বিশ্বাস করেন, আমি অন্যকিছু না ভেবেই হ্যাঁ বলে দিয়েছিলাম! এমনকি টাকা-পয়সা কী পাবো না পাবো ওসব নিয়েও কথা বলিনি। স্রেফ জানিয়ে দিয়েছিলাম, আমি কাজটা করবো।” একালের হিন্দি সিনেমার শক্তিশালী অভিনেতা নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী এভাবেই বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে তার একমাত্র কাজটির স্মৃতিচারণ করছিলেন।

কিংবদন্তি এই চলচ্চিত্র পরিচালয়ের প্রয়াণের একদিন পর ইয়াহু লাইফে ছাপা হওয়া সেই সাক্ষাৎকারে স্ট্রাগলিং অ্যাক্টর থেকে প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠা নওয়াজুদ্দিন বলেন, “আমি যখন এনডিএস-এ অভিনয়ে পড়াশোনা করছিলাম, তখন থেকেই আমি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সিনেমা সম্পর্কে জানতাম। তার ‘আন্ধি গালি’ বা ‘তাহাদের কথা’র মতো কাজগুলো তো রীতিমত আধুনিক সিনেমার ক্ল্যাসিক। কাজেই এমন পরিচালকের সঙ্গে আমার মতো কোনো অভিনেতার কাজ করার সুযোগ রোজ মেলে না। সে কারণেই আমি কালবিলম্ব না করে রাজি হয়ে যাই।”

২০১১ সালে ‘আনওয়ার কা আজাব কিস্‌সা’র চিত্রনাট্যের কাজ শুরু করেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। ওই সময়ই তিনি নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকীকে নামভূমিকায় অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। এই সিনেমার চরিত্রের সঙ্গে বোঝাপড়া তৈরির জন্য নওয়াজুদ্দিন বারবার কলকাতা এসেছেন। তিনি বলেন, “একে তো এটা বুদ্ধদার ছবি। তার ওপর এটা হিন্দি। বুদ্ধদা হিন্দি ছবি খুব কমই বানিয়েছেন। বাঘ বাহাদুরের পবন মালহোত্রার কথা মনে হলো। আমি রাজি হলাম। এরপর শুরু হলো বুদ্ধদার সঙ্গে আমার ‘আনওয়ার’ যাত্রা।”

“আমি জানতাম যে, মিঠুনদার মতো অভিনেতা অসংখ্য ছবির ব্যস্ততার মধ্যেও বুদ্ধদার ছবি করেছেন। বিনা বাক্যব্যয়ে তিনি তাহাদের কথা ও কালপুরুষের জন্য সময় দিয়েছেন। কারণটা হলো, টাকা আসে, কিন্তু বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের মতো পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ  জীবনে বারবার আসে না। আর বুদ্ধদার মতো পরিচালকের সঙ্গে কাজ করা আসলে অমূল্য,” বলেন নওয়াজুদ্দিন।

‘আনওয়ার কা আজাব কিস্‌সা’য় কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বুদ্ধদার কাজ করার ধরনটাই আলাদা ছিলো। দীর্ঘ ট্রলি শট, সত্যিকারের দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। সেখানে আবার তিনি লংশট আর ক্লোজআপগুলো একই সঙ্গে ধারণ করছিলেন। আমি এমনধারার কাজ আর দেখিনি। কিছু কিছু ছবি থাকে, যেখানে কাজ করতে পেরে একজন অভিনেতা পরম ‍তৃপ্তি পান, নিজের অভিনয় জীবনের অর্থ খুঁজে পান, এটা ছিলো আমার জন্য তেমন একটা সিনেমা।”

এই সিনেমার জন্য লোকেশন ঠিক করা হয়েছিলো বিহারে। সেখানকার জামুই জেলার শিমুলতলা এলাকায় মাওবাদী তৎপরতা ছিলো। কিছুটা ঝুঁকি থাকলেও বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত সেখানেই লোকেশন চূড়ান্ত করেন। ২০১৩ সালের শীতে পাহাড়ের ওপরের অসাধারণ সেই লোকেশনে ঘটেছিলো এক বিব্রতকর ঘটনা। নওয়াজের ভাষ্যে, “এক শুক্রবারে আমরা শ্যুটিং শেষ করে পাহাড়ী রিসোর্টটাতে এসে উঠেছি। বুদ্ধদা খুব বেশি একটা আড্ডা-টাড্ডা দিতেন না। সেদিনও আমরা কথা বলছি, এমন সময়, আমাদের কাছে ফোন এলো একটা। মাওবাদী পরিচয় দিয়ে আমাদের বলা হলো, শ্যুটিং ওখানে করা যাবে না। ওখানে এমন একজনও ছিলো না, যে মাওবাদীদের এই হুমকিকে ছোট করে দেখেছে। কাজেই স্থানীয়দের চাপাচাপিতে শনিবার আমাদের ফিরে আসতে হয়। বাকি শ্যুটিং কলকাতায় করেছি।”

যদিও সিনেমাটি নিয়ে ভারতের পরিবেশকদের অনাগ্রহ ব্যথিত করে নওয়াজুদ্দিনকে। তিনি বলেন, “এমন অসাধারণ একটা মুভি! কাজ শেষ করার পর বুদ্ধদা মুম্বাই এলেন ছবি বিক্রির জন্য। অনেকের সঙ্গেই কথা বললেন। আমার সঙ্গে সেই সময় দেখা হলো। তিনি জানালেন, উপযুক্ত দাম দিয়ে কেনার মতো ক্রেতা নেই। ভাবা যায়!” অথচ সেই ছবিই ‘স্নাইফার’ নামে বিশ্ব চলচ্চিত্র উৎসবগুলো মাতিয়েছে।

আজ কয়েক বছর পর এসে ২০২০ সালে ‘আনওয়ার কা আজাব কিস্‌সা’ ওটিটি প্লাটফর্মে দেখার সুযোগ মিলেছে। নওয়াজুদ্দিন মনে করেন, এটা অন্তত ভারতের দর্শকদের সৌভাগ্য।