।। মওদুদ রানা, রাজশাহী ।।

শুক্রবার বিকেল ৫টা। সাইরেনের শব্দ মিলিয়ে যেতেই থেমে গেলো গাড়ির বহর। র‌্যাব সদস্যরা নামলেন সাহেব বাজারে। দাঁড়ালেন সারিবদ্ধ হয়ে।

৫টা ২ মিনিট। বোয়ালিয়া জোনের ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকারসহ বেশ কয়েকজনের একটি দল বাজার এলাকা ঘুরে এসে দাঁড়ালেন জিরো পয়েন্টে। ততক্ষনে সাহেববাজারের পুরো দোকানপাট বন্ধ। বানেশ্বর যাওয়ার অপেক্ষায় কয়েকটা হিউমান হলার।

৫টা ৫ মিনিট। পুলিশ সদস্যরা প্রস্তুতি নিলেন। হলেন সারিবদ্ধ। আশেপাশের সমস্ত যানবাহন চলে যেতে বাধ্য করলেন।

৫টা ১৫ মিনিট। জিরো পয়েন্টে আসেন নগর পুলিশের কমিশনার আবু কালাম সিদ্দিক। সাথে নগর পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা। পুলিশ কমিশনার কথা বলেন গণমাধ্যমের সাথে। তিনি জানালেন, নগর পুলিশের যে এলাকা রয়েছে সে এলাকায় বিধিনিষেধ কার্যকর করতে সবসময় তৎপর রয়েছে পুলিশ। জেলা প্রশাসকের দেয়া বিধিনিষেধগুলো যেকোন মুল্যে কার্যকরভাবে প্রতিপালন করা হবে।

আবু কালাম সিদ্দিক জানান, এই লকডাউন বাস্তবায়নে মহানগর পুলিশের সকল সদস্য ও রেঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কোনোভাবেই মহানগরে কাউকে প্রবেশ করতে এবং মহানগর থেকে বাইরে বের হতে দেয়া হবে না।

গণমাধ্যমে কথা শেষ করে মহানগর পুলিশ কমিশনার আবু কালাম সিদ্দিকসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা লকডাউন পরিস্থিতি তদারকিতে বের হন।

৫ টা ২০ মিনিট। লক্ষীপুর মোড়। ইতস্তত কিছু লোকের ঘোরাফেরা তখনও বন্ধ হয়নি। সাধারণ মানুষের অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণে তৎপর পুলিশ।

৫টা ২২ মিনিট। বর্ণালীর মোড়। চায়ের দোকানে বসে গল্প করছিলেন কয়েকজন। ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন আসার খবরে গেট ফেলেছেন গেটম্যান। এপারে-ওপারে মোটরসাইকেলে পার হওয়ার অপেক্ষায় অনেকট যানজট লেগে যাওয়ার দৃশ্য।

৫টা ২৩ মিনিট। দড়িখড়বোনা মোড়। ওপাশে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অভিযান চলমান। পথ চলতি মানুষকে বাড়ি ফেরাতে ব্যস্ত তারা।

৫টা ২৪ মিনিট। কামারুজ্জামান চত্বর। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা জনা বিশেক মানুষের মিছিল। মাথায় বস্তা ও পিঠে ব্যাগ। এসব নির্মাণ শ্রমিক রাজশাহী হয়ে যাবেন গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ।

৫টা ২৫ মিনিট। রেলগেট। গাড়ির অপেক্ষায় থাকা মানুষের ছোটখাটো জটলা। অবশ্য স্টেডিয়ামের সামনে পুলিশী তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মত।

৫টা ২৬ মিনিট। শালবাগান। রাস্তায় রিকশা আর মোড়ে মানুষের উপস্থিতি। সবমিলিয়ে স্বাভাবিক দিনের দৃশ্য।

৫টা ২৭ মিনিট। আলিফ লাম মিম ভাটার মোড়। নতুন সড়কের পাশে বসে গল্প করছেন বেশ কয়েকজন। মাস্ক ছিল না কারো মুখে। মোড়ের এ পাশে তিন চাকার যানবাহনে শ্রমিকের দল। অপেক্ষা তাদের বাড়ি ফেরার।

৫টা ২৮ মিনিট। পোস্টাল একাডেমির সামনে। নগরীর দিকে প্রবেশের রাস্তায় পুলিশের চেকপোস্ট। নগর পুলিশ ও রেঞ্জ পুলিশ সদস্যরা কাজ করছেন একসাথে। বেশ কয়েকটি প্রাইভেটকার আটকেছেন তারা। আটকে পড়া মানুষগুলো দিচ্ছেন নানা অজুহাত। পুলিশের মন গললে পাচ্ছেন যাওয়ার অনুমতিও, তবে হেঁটে।

৫টা ২৯ মিনিট। নওদাপাড়া বাজার। রাস্তার মাঝখানে দু-হাত জোড় করে মাফ চাইছেন এক পথচারী। একজন পুলিশ সদস্য তাকে লকডাউনের গুরুত্ব বোঝাচ্ছেন। অমান্য করলে কী শাস্তি হবে তার বর্ণনাও দিচ্ছিলেন। আশেপাশে তখন উৎসুক মানুষের ভীড়। কেউ হাসছেন, কেউবা মজা দেখছেন। অন্তত বিশ জন মানুষের জটলা। বেশীরভাগের মুখে মাস্ক নেই।

৫টা ৩০ মিনিট। আম চত্বর মোড়। পবার দিকে সড়ক ধরে একটু আগালে পুলিশের চেক পোস্ট। ওপাশে অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। পুলিশ যানবাহন থামিয়ে যাত্রীদের নামিয়ে দিচ্ছেন। আর যাত্রীরা ব্যাগ-বোচকা নিয়ে হাঁটছেন নগরীর দিকে।

৫টা ৩১মিনিট। জনা দশেক নারী ও শিশুর দল। যাবেন নগরীর তালাইমারী। যানবাহন না থাকায় হেঁটেই রওয়ানা দিলেন তারা।

৫টা ৩২ মিনিট। তিন চাকার যানে ১৫জন নির্মাণ শ্রমিক। কারো মুখেই মাস্ক নেই। কাজ শেষে ফিরছেন তারা। মিনিট দশেক আটকে থাকার পর মিললো মুক্তি।

আম চত্বরের পাশেই ইসলামিক কমপ্লেক্স। সেখানে ভ্যানের উপর ইসলামী বইসহ বিভিন্ন ধরনের পন্য বিক্রি করছিলেন একজন। আশেপাশে ক্রেতাও বেশ। পাশেই পারভেজের ফলের দোকান। তার পাশে জামের পসরা নিয়ে বসেছিলেন লুৎফর রহমান।

কেউ দোকান বন্ধ করতে বলেছে কিনা জানতে চাইলে লুৎফর রহমান বললেন, না বলেনি। তবে মুখে মাস্ক পরতে বলেছে। তার পাশেই খোলা মুদি দোকান।

৫টা ৩৫ মিনিট। আবারও চেকপোস্টে। দূর থেকে দেখলে ছোটখাটো মিছিল বা জমায়েত বলেই মনে হয়। যাত্রীরা বিভিন্ন যানবাহন থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে রওয়ানা হচ্ছেন গন্তব্যে। স্ত্রীকে সাথে নিয়ে আসা স্বপন বললেন, ‘নগরীর ডাবতলা থাকি। সেখানেই যাবো।’ লকডাউন সর্ম্পকে জানতেন কি না জিজ্ঞেস করতেই বললেন,‘বিশেষ, সর্বাত্মক, সাধারণ, কঠোর এরকম আর কত লকডাউন মনে রাখবো বলেন তো!’

৫ টা ৪০মিনিট। হন্তদন্ত হয়ে চোখেমুখে রাজ্যের আতংক নিয়ে চেকপোস্ট পার হচ্ছিলেন মহসীন আর তার সাথে লাজুক এক নারী। মহসীন জানালেন, যাবেন পাবনা। নতুন বিয়ে। বউ আনতে গিয়েছিলেন শ্বশুরবাড়ি। দুপুরে খেয়ে দেয়ে রওয়ানা হতে দেরি হয়েছে। এখন হেটে যেতে হবে। গাড়ি পাবেন কি না সেটি নিয়ে উদ্বেগ তার।

৬টা। আমচত্বরের মাছ বাজারের পাশেই বিক্রি হচ্ছে আম। অন্তত জনা পনেরো  ক্রেতা। আম বিক্রির বাধা নিষেধ নেই, তাই বিক্রি করছেন। তার পাশেই খোলা মুদি দোকান। সিগারেটে দম দিচ্ছেন চারজন। একগাল ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে দাবি করলেন, “করোনা প্রোপাগান্ডা ছাড়া আর কিছু না!”

৬ টা ৫ মিনিট। আমচত্বর থেকে সিটি বাইপাসের দিকে আসতে ডানে তাকাতেই মানুষের ভীড়। নারী-পুরুষ অবাক চোখে দেখছেন সড়কে মানুষের আসা-যাওয়া। জিজ্ঞেস করতেই জানালেন, তারা ঘরের বাইরে এসেছেন লকডাউন দেখতে।

৬ টা ৭ মিনিট। সিটি বাইপাস মোড়। পশু হাটের প্রবেশের বিপরীতে ভ্যানে আম বিক্রি করছেন কয়েকজন। তাদের ঘিরে বেশ কিছু মানুষ।

৬টা ১১মিনিট। সিটি হাট থেকে লিলি সিনেমার মোড় পর্যন্ত আসতে দেখা গেল ১০টি অটো রিকশা, ৩টি ভ্যান, ৫টি মোটরসাইকেল ও ১১টি ট্রাকের চলাচল। এরমধ্যে দুটি মোটরসাইকেলে আরোহী তিনজন করে। কারো মুখে নেই মাস্ক, নেই হেলমেটও। অটোরিকশা ভরা মানুষ। লিলি সিনেমা হলের মোড়ের আশেপাশে উৎসুক মানুষের ভীড়।

৬টা ১২ মিনিট। মোল্লাপাড়া দারুশা। বাড়ির সামনে গায়ে বাতাস লাগিয়ে খোশগল্পে মেতেছে এলাকাবাসী।

৬টা ১৩মিনিট। কোর্ট স্টেশন মোড়। পুলিশের ব্যস্ততা। ট্রাফিক পুলিশের বাঁশি বেজেই চলেছে অবিরাম। লাঠি হাতে তেড়ে যাচ্ছিলেন এক অটোরিকশার দিকে। ওদিকে স্টেশনের রেললাইনে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন বস্তিবাসী। রেল লাইনের দু’পাতে মুখোমুখি বসেছেন শতাধিক। একঝলক দেখলে মনে হয়, অনেক দিন পর খানিকটা ফুসরৎ পেয়েছেন, তাই খোশগল্পে মেতেছেন তারা।

৬টা ১৫ মিনিট। হড়গ্রাম বাজার। অলিগলিতে রিক্সার টুং টাং শব্দ। মূল রাস্তা থেকে যাত্রী নিয়ে এগলি ওগলি মাড়িয়ে যাচ্ছেন গন্তব্যে।

৬টা ১৭মিনিট। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে আসতেই দেখা গেল র‌্যাবের গাড়ির বহর। কয়েকটা রিকশা চলছে এদিক-ওদিক।

৬টা ১৯মিনিট। নির্বাচন অফিস থেকে রাজপাড়া থানার দিকে যাওয়ার সড়কে কয়েকজন যুবকের হৈ-হুল্লোড়। পাশেই ভ্রাম্যমান চা বিক্রেতা চলেছেন ক্রেতার সন্ধানে।

৬টা ২০ মিনিট। সিঅ্যান্ডবি মোড়। মোড় ফাঁকা। পুলিশ তৎপর। বয়স্ক দম্পতি হেটে যাচ্ছেন তাদের গন্তবে।

৬টা ২১ মিনিট। সার্কিট হাউজ পার হতেই নজরে আসে বেঞ্চে বসা তরুণ-তরুণীদের। মাস্ক ছাড়াই কথা বলছেন খুব কাছাকাছি আর আন্তরিকভাবে। একটু এগিয়ে যেতেই বাঁধের উপর বসা দু’দল নর-নারী। কাঁধে হাত রেখে গল্প করলেও মুখে নেই মাস্ক।

৬টা ২২ মিনিট। সীমান্ত অবকাশের সামনে ৫ জন তরুণী ও ৬ তরুণের দল। এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন আর বাঁধের সড়ক ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন ঈদগাঁর দিকে।

৬টা ২৪ মিনিট। ফায়ার সার্ভিস মোড়ে কিছু লোকের ইতিউতি ঘোরাঘুরি। কেউ কেউ ধরেছেন নদীর পথ।

৬টা ২৫ মিনিট। রাজশাহী কলেজের সামনে কাজ করছেন নির্মাণ শ্রমিকেরা। দিনের ব্যস্ততো শেষে একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন। কাজের সময় শ্বাস নিতে কষ্ট হয় তাই তারা পরেননি মাস্ক।

৬টা ২৭ মিনিট। সাহেব বাজার জিরো পয়েন্ট। গোল হয়ে গল্প করছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। কেউ কেউ নিচ্ছেন লাইভের প্রস্তুতি। পাশেই পুলিশের তৎপরতা চোখে পড়ার মত।

৬টা ৩৭ মিনিট। সাহেববাজারের পিছনের সড়কে চলছে রিকশা। সড়কে মানুষের উপস্থিতিও বেশ। ভ্রাম্যমাণ চায়ের দোকান থেকে চা নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন ৩জন।

৬টা ৩৯ মিনিট। কুমারপাড়া মোড় থেকে বোয়ালিয়া থানা পর্যন্ত কুরিয়ারে  দারুন ভীড়। অনেকে ব্যস্ত দূর গন্তব্যে আম পাঠাতে। বেশীরভাগের মুখেই ছিল না মাস্ক। ছিল না স্বাস্থ্যবিধি মানার গরজ।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.