grand river view

।। নুসরাত নুসিন, রাজশাহী।।

বাংলা সিনেমায় সত্যজিত, ঋত্বিক, মৃণালের পর যার নাম উচ্চারিত হবে তিনি বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। সিনেমা যারা বোঝেন, তারা তাকে মানেন সিনেমার কবি হিসেবে। শুধু সিনেমায় নয়, কলকাতার সাহিত্যপাড়াতেও কবি হিসেবে তিনি সুপরিচিত। সিনেমা ও কবিতার এই কবি আজ সকালে নিজ বাসভবনে ঘুমের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন।

খ্যাতিমান এই চিত্রপরিচালক রাজশাহীর চলচ্চিত্র সংসদগুলোর আমন্ত্রণে পরপর দুবার রাজশাহীতে এসেছিলেন। তিনি এখানকার চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে মিশেছেন। একসঙ্গে বসে ছবি দেখেছেন। আড্ডা দিয়েছেন। সেই বন্ধনসূত্রে তার মৃত্যুতে ‍রাজশাহীর চলচ্চিত্রকর্মীদের মনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের সভাপতি ড. সাজ্জাদ বকুল বলেন, সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘উড়োজাহাজ’ ছবির কথা মনে পড়ছিল। বুদ্ধদেব যখন রাজশাহীতে এসেছিলেন, এই ছবি নিয়ে অনেক আলাপ করেছিলেন। সেই আলাপ মনে পড়ছিল। ভাবছিলাম, অনেকদিন যোগাযোগ হয় না। কেমন আছেন তিনি? তার পরপরই ম্যাজিক লণ্ঠন সম্পাদক ও সহকর্মী কাজী মামুন হায়দার তার মৃত্যুর খবর দিলেন। ১৯৯৮ সালে ওনার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। ঢাকায় একটি চলচ্চিত্র কর্মশালায় এসেছিলেন তিনি। তারপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ ও রাজশাহী ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে রাজশাহী এসেছিলেন দুইবার। প্রথমবার এসেছিলেন ২০১৫ সালে। দ্বিতীয়বার এসেছিলেন ২০১৬ সালে।

সাজ্জাদ বকুল বলেন, উনি খুবই নম্র ও সরল ছিলেন। সত্যজিৎ যেমন রাশভারী লোক ছিলেন। শোনা যায়, তার কাছাকাছি যেতে মানুষ ভয় পেতেন। কিন্তু বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত ছিলেন তার বিপরীত। শাদামনের মানুষ ছিলেন।

সিনেমা প্রসঙ্গে বকুল বলেন, তার ছবি অসাধারণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত কবি ছিলেন বলেই তার সিনেমায় মেটাফোর, সংগীত, দ্যোতনা সবমিলিয়ে একটা কবিতার মত আবহ তৈরি হত। ফলে তিনি ছিলেন চলচ্চিত্রেরও কবি। চলচ্চিত্রের যে একটি ভাষা আছে তার ছবি দেখলে তা বোঝা যায়।

সাজ্জাদ বকুল আরো জানান, রাজশাহীকে উনি পছন্দ করতেন। একারণেই সম্ভবত পরপর দুবার তিনি এসেছিলেন। কলকাতায় গেলেও উনি রাজশাহীর কথা তুলতেন। হাসান আজিজুল হকের ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসের প্রশংসা করতেন। তার ছোটগল্প নিয়ে ফিল্ম বানাতেও চেয়েছিলেন তিনি। হাসান আজিজুল হক কলকাতাতে অনেক জনপ্রিয়- এ কথা জানিয়েছিলেন।

রাজশাহী ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি ও চলচ্চিত্রকর্মী আহসান কবীর লিটন বলেন, ব্যক্তি ও চলচ্চিত্রকার বুদ্ধদেবের মধ্যে কোনো ফারাক ছিল না। তিনি যখন রাজশাহীতে এসেছিলেন তখন আমার বাড়িতে ছিলেন। একসঙ্গে গোল হয়ে বসে খেতে পছন্দ করতেন। তিনি ছিলেন খুবই আন্তরিক একজন মানুষ। পরিচয় না দিলে বুঝতে পারবেন না, যে তিনি খ্যাতিমান চিত্রপরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। এমন সাধারণ ছিলেন তিনি। রাজশাহী শহরের প্রকৃতি ও পরিবেশ এতটাই পছন্দ হয়েছিল যে তিনি এই পদ্মাতীরে বাড়ি বানানোর ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন, মাঝে মাঝে এসে থাকবেন এখানে। খুব পছন্দ করেছিলেন এই শহরের নির্মল পরিবেশ। তিনি ছিলেন ঋত্বিক ঘটকের ভক্ত। মিঞাপাড়ায় ঋত্বিক ঘটকের বাড়ি পরিদর্শন করেছেন। এমনকি সেই বাড়ি রক্ষার জন্য আন্দোলনেও একাত্মতা জানিয়েছিলেন তিনি।

লিটন বলেন, পদ্মার তীরে খোলামঞ্চে ছবি প্রদর্শনের বিষয়টিকে তিনি খুব পছন্দ করেছিলেন। সময় টিভিতে মোরশেদুল ইসলামের সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, চলচ্চিত্রকে সবসময় মনে করা হয় এটা বদ্ধ ঘরে দেখার জিনিস। কিন্তু খোলা জায়গাও যে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা যায়, সেটা রাজশাহীর চলচ্চিত্র সংসদগুলো দেখালো। প্রচুর তরুণ দর্শক ছবি দেখছে। তাতেই বোঝায় যায়, এখানে চলচ্চিত্র বিকাশের সম্ভাবনা অনেক।

লিটন আরো বলেন, বুদ্ধদেব রাজশাহীতে আসতে চেয়েছিলেন আবারও। যে দুইবার তিনি এসেছিলেন, পাঁচ-ছয়দিন করে ছিলেন। একদম আত্মীয়ের মত মিশেছেন। তাকে ভুলে থাকা কঠিন।

রাজশাহীর সংস্কৃতিকর্মী ও ফটোসাংবাদিক জাবীদ অপু বলেন, খুব আফসোস হচ্ছে। ওনার সঙ্গে রাতভর আড্ডা দিয়েছি। সেইসব আড্ডার কথা মনে পড়ছে।