শিবলী নোমান

।। শিবলী নোমান ।।

প্রতিদিন হাসপাতাল থেকে পাই মৃত্যুর পরিসংখ্যান। কজন মারা গেলেন, কার বাড়ি কই ইত্যাদি সংখ্যা সেগুলো। প্রতিদিনই এই তথ্য উদ্বিগ্ন করে, সংখ্যা বেশি, তাই। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার খানিক আগে হাসপাতাল থেকে সহকর্মী ফোন করে সংখ্যা নয়, দিলেন এক টগবগে তরুণের মৃত্যুর খবর। হয়তো সেই তরুণ আমার পরিচিত না হলে এদিনও আমার কাছে তা স্রেফ সংখ্যাই হয়ে থাকতো।

হ্যাঁ, সে আমার পরিচিত। রাজশাহী শহরে আমি যে বাসাটায় এখন ভাড়া থাকি, তার ঠিক ওপরের ফ্ল্যাটেই থাকতো সে। বয়সে বেশখানিক ছোট আমাদের। সেই হিসেবে বয়স খুব বেশি হলে হয়তো ৩৫। তার নাম আতিকুল হাসান সৈকত। ও মারা গেছে বৃহস্পতিবার। করোনার সঙ্গে লড়ছিলো হাসপাতালে। হেরে গেলো।

বছর পাঁচেক আগে সৈকতের সঙ্গে পরিচয়। সদ্য নির্মিত ভবনটির আটতলার একটি ফ্ল্যাট সবে ভাড়া নিয়েছি। পার্কিংয়ে পরিচয়, জানলাম, ওরা উঠেছে নয়তলার আমাদের ঠিক উপরের ফ্ল্যাটটাতেই। স্বভাবত যা হয়, পরস্পরকে ভাই-ই বললাম পরিচয়ের শুরুতে। এক বা দুদিন পরই দেখলাম আওয়ামী লীগ নেতা আমানুল হাসান দুদু উঠছেন লিফটে। তাঁকে অনেকদিন ধরেই ভাই ডাকি। ঠিক রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে তার খুব একটা মিল নেই। সদালাপী, হাস্যোজ্জ্বল মানুষটার সঙ্গে পরিচয় মোটামুটি বছর পনেরোর। তো, সেদিনই প্রথম জানলাম, সৈকত দুদু ভাইয়ের একমাত্র ছেলে। ব্যাপারটা তাহলে এই দাঁড়ালো, বাবা-ছেলে দুজনই ভাই আমার! সমাধানও সৈকতই করেছিলো। কীসের কী! সৈকত-শিবলী ভাই ভাই! ওর মা মানে দুদু ভাইয়ের স্ত্রী হেসে বলেছিলেন, “ঠিকই আছে। দুটাই যে মোটা!”

অল্পদিনের মধ্যে গল্পে গল্পে আরেকটা মিল খুঁজে পেয়েছিলাম আমরা। দুজনের কেউই ঢাকা পছন্দ করি না। আর দুজনই রাজশাহীতে কিছু একটা করতে চাই। সৈকত নিশ্চিত চাকরির জীবন ছেড়ে চলে এসেছিলো এখানে। উদ্যোক্তা হতে চেয়েছিলো। সেটা হতে গিয়েও নানা সমস্যা-প্রতিবন্ধকতা এসেছে। দমেনি সৈকত। নিজের ব্যবসা দাঁড় করিয়েছে।

বিশ্বাস করেন, এই অল্প কবছরে জমা ওর সঙ্গে অসংখ্য স্মৃতি আজ বারবার ঘুরেফিরে মাথায় আসছে। শুরুর দিকেই পুরো পরিবারের সঙ্গে সখ্য হলো। ফ্ল্যাট ওপর-নিচ আর পার্কিংয়ে দুজনের গাড়ি পাশাপাশি। প্রায় দিনই সকালে বেরোবার পথে দেখা। বাবার মতোই আমুদে দেখেছি ওকে সব সময়। কিছুদিন আগেই ফুটফুটে একটা সন্তান এসেছে ওদের কোলে। বড় ছেলে সুরা স্কুলে যায়। ওদের নিয়েও কত না স্মৃতি সৈকতকে ঘিরে।

সৈকত

কী করে জানি একদিন সৈকত জেনেছে, আমি টুকটাক আঁকতেও পারি। একদিন নাহয় আমার ছবিও এঁকে দেন! সেই আবদার যে ওর জীবদ্দশায় পুরণ করতে পারবো না, তা কখনও ভাবিও নি। আজ চোখের জলে ভিজিয়ে ওকে এঁকেছি। এই লেখায় সেই ছবিটাকেই ব্যবহার করেছি।

দুদু ভাইয়ের সঙ্গেও সম্পর্কটা অনেকদিন ধরেই অধিকারের। সেখানে পেশা নেই-পরিচয় নেই, সম্পর্কটাই মুখ্য। করোনার প্রথম ঢেউয়ের শুরু থেকেই দুদুভাইকে প্রায় দিনই বলতাম, সাবধানে থাকতে। তাঁর হার্ট-কিডনির সমস্যা। দ্বিতীয় ঢেউয়ের শুরুর দিকে তাঁর সংক্রমণ শনাক্ত হলো। হাসপাতালে যমে-মানুষে টানাটানির পর ফিরে এলেন সুস্থ হয়ে। ঈদের পরে সৈকতের সঙ্গে দেখা বাসার সামনে। ধমকের সুরেই বলেছিলাম, মাস্ক কই? মাস্ক নাকে মুখে দেন! সৈকত হেসে পকেট থেকে মাস্ক বের করে লাগিয়ে বললো, এবার খুশি?

সেই সৈকত চলে গেলো চিরতরে। প্রায় একমাস অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছে টগবগে স্বপ্নবান তরুণটি। এরপর নিভে গেলো সব স্বপ্ন। সকালবেলাতে পার্কিং কিংবা লিফটে আর কেউ জানতে চাইবে না, অমুক ব্যাপারটার কী হলো, ভাই, বলেন তো? কিংবা রাতে ফেরার সময় দেখা হলে কেউ আর রেগেমেগে বলবে না, ভাই আপনারা সাংবাদিকতা করেন না ঘাস কাটেন? অমুক জিনিসটা চোখে পড়ে না!

বিশ্বাস করেন, এই লেখাটি লিখতে গিয়ে বারবার আমার চোখ ভিজে যাচ্ছে। বুকের ভেতর হাহাকার করছে। আবার ঠিক পাবলিক পরিসরে মৃত্যুর এলিজিও আমি লিখি না। কিন্তু সৈকতের জন্য লিখছি। কেন লিখছি, জানেন? পরিচিত বলে? হয়তো। কিন্তু তারচেয়েও বড় কারণ, মৃত্যুর পরিসংখ্যানে রাখা সংখ্যাগুলো যেন আপনার জন্য আবার কোনো প্রিয় মানুষের মৃত্যুতে রূপান্তরিত না হয়।

শুনতে পেলাম, আইসিইউ পূর্ণ থাকায় মৃত্যুর আগে ওকে সেখানে নেয়া সম্ভব হয়নি। অথচ আমাদের সবই চলছে সমানে! একদিকে, আমাদের ‘ফুটানি’র কেনাকাটা-খানাপিনা-ঘোরাফেরা সবই চলমান। ওদিকে অনেকে আবার দোকান না খুললে আন্দোলনের হুমকি দেন। অন্যদিকে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা তো তার চিরপরিচিত চেহারাতেই আছে!

কাজেই রাজনীতিকদের, খোদ ফ্রন্টলাইনার চিকিৎসকদের প্রয়োজন মনে হলেও আমলাদের লকডাউনের দরকার মনে হতে নাহয় আরও বহুদিন লাগলো! তাঁদের কিছু বলার ফন্দি খুঁজতে খুঁজতেই না কফিনে চলে যাই! আবার বিগদ্ধজন তাঁরা, হয়তো আরও সংক্রমণ ছড়ালে, তখন তাঁরা লকডাউনকে প্রয়োজনীয় মনে করেন! সহায়তার কথা না হয় বাদই দিলাম! তাই অন্তত আপনাকে-আমাকে বাঁচার চেষ্টাটা করতে হবে! তাই যদি সৈকতের এই মৃত্যু আপনাদের একটু ভাবায়। যদি একটু সচেতন হই আমরা সবাই। মাস্ক ব্যবহার করি, স্বাস্থ্যবিধি মানি, অন্তত কয়েকটা সপ্তাহ। করজোরে মিনতি করি সবার কাছে, আসুন, রাজশাহীটাকে বাঁচাই, দেশটাকেও বাঁচাই। নইলে হয়তো আর কারো মৃত্যুতে এলিজি লিখতে আমরা কেউই থাকবো না।    

শিবলী নোমান রাজশাহীতে বসবাসরত একজন সংবাদকর্মী, লেখক ও চিত্রনির্মাতা

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.