করোনাকালে রাজশাহীর সাহেববাজারের বুধবারের চিত্র
grand river view

।। মওদুদ রানা, রাজশাহী ।।

চলতি মাসের শুরু থেকে করোনায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে মৃত্যুর তালিকায় বেশি নাম থাকতো চাঁপাইনবাবগঞ্জের। গত দুদিন ধরে সে চিত্র বদলেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের জায়গায় এখন লেখা হচ্ছে রাজশাহীর নাম। গত দুদিনে এই জেলায় ৯ জন মৃত্যুবরণ করেছেন।

“বিষয়টা উদ্বেগের”, বলছিলেন জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. চিন্ময় কান্তি। তিনি বলেন, “শুধু মৃত্যুই নয় আক্রান্তের হারও যথেষ্ট ভয় ও শংকা জাগানিয়া। র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন, আরটিপিসিআর, জেনএক্সপার্ট মিলে আজ (৯ জুন, বুধবার) আক্রান্ত ২০ শতাংশ। কিন্তু আরটিপিসিআর হিসেবে আক্রান্তের হার ৪০ শতাংশ ও জেনএক্সপার্ট ৫৭ শতাংশ। মহামারির প্রবণতাকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এচিত্র বেশ খারাপ।”

সিভিল সার্জন অফিসের হিসেবে, ৮ জুন সকাল ৮টা থেকে ৯ জুন সকাল ৮টা পর্যন্ত জেলায় সংক্রমিত হয়েছেন ৩৫৩ জন। এর মধ্যে সিটি কর্পোরেশনের বাসিন্দা ৩০০ জন। অর্থাৎ জেলায় মোট সংক্রমণের ৭৭ শতাংশই নগরীর।

সিটি কর্পোরেশনের হিসেবে, ৯ জুন সকাল ১০ টা থেকে নগরীর ১৩টি কেন্দ্রে র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট হয়। এতে ৯৭৭ জনে ১২৬ জন করোনা সংক্রমিত হন। আক্রান্তের হার ১২ দশমিক ৮৯ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত হওয়ার স্পট সাহেব বাজার।

জনস্বাস্থ্যবিদ চিন্ময় কান্তি জানান, অনেক সময় অ্যান্টিজেন টেস্টে নেগেটিভ হলেও আরটিপিসিআরে পজিটিভ আসে। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের মতে হিসেবে করলে, প্রকৃত চিত্র আরও বেশি। যেসব এলাকায় ভিড় বেশি, সেএলাকাতে সংক্রমণের হারও বেশি। এবং এ চিত্র প্রমাণ করে, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন এলাকায় সামাজিক সংক্রমন চলছে।

এদিকে জেলা প্রশাসনের হিসেবে, ৯ জুন উপজেলা পর্যায়ে র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টে ২৫৪টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে পজিটিভ হয়েছেন ৪২ জন। আক্রান্তের হার ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। সবচেয়ে বেশী শনাক্তের হার পুঠিয়া উপজেলায়।

যখন করোনার পরিসংখ্যান উদ্বেগ ছড়াচ্ছে, তখনও নগরীতে স্বাস্থ্যবিধি মানার খুব একটা গরজ নেই বেশিরভাগ মানুষের। সড়ক, শপিংমল কিংবা খাবার হোটেল- স্বাস্থ্যবিধি অধিকাংশক্ষেত্রেই উপেক্ষিত। সঙ্গে মাস্ক রাখার প্রবণতা বাড়লেও নাক-মুখ ঢাকার চেয়ে তা থুতনি বা কানে ঝুলিয়ে রাখার চিত্রই বেশি।

একই চিত্র উপজেলা পর্যায়ে। বিশেষ করে আম বাজারগুলোতে কোনো ধরনের স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। কাছাকাছি অবস্থানে গা ঘেঁষাঘেষি করে হাঁকডাকের মধ্যে চলছে আম কেনাবেচা। শুধু রাজশাহী নয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ একত্রিত হলেও সেখানে অধিকাংশের মুখে মাস্ক নেই।

অথচ চাঁপাইনবাবগঞ্জে মানুষের অপেক্ষাকৃত অধিক সতর্কতা ছিলো বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম। সম্প্রতি এ অঞ্চল সফর শেষে তিনি সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, “চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিধিনিষেধ মানার ক্ষেত্রে আন্তরিকতা দেখা গেছে।” তবে রাজশাহীতে এই প্রবণতা খানিকটা কম দেখেছেন বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।

রাজশাহী মহানগর পুলিশের কমিশনার আবু কালাম সিদ্দিক জানান, সাধারণ লকডাউনের বিধিনিষেধ ও স্থানীয় প্রশাসনের যেসব বিধিনিষেধ রয়েছে সেগুলো মানাতে পুলিশ মাঠে রয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি আর বিধিনিষেধ মানাতে তারা সাধ্যমত চেষ্টা করছেন।

রাজশাহী সিভিল সার্জন কাইয়ুম তালুকদার জানান, প্রকোপ দেখে মনে হচ্ছে সামাজিক সংক্রমণ হচ্ছে। যেহেতু সীমান্ত এলাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ৮০ ভাগ উপস্থিতি পেয়েছে, সে হিসেবে ধারনা করা যায় রাজশাহীতেও ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের উপস্থিতি রয়েছে। এসব সংক্রমিতদের আলাদা করতে বা আইসোলেশনে রাখতে বাড়ানো হয়েছে পরীক্ষা।

রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন জানিয়েছেন, সংক্রমণের গতি-প্রকৃতি পর্যবেক্ষন করা হচ্ছে।পরিস্থিতি অনুযায়ী করোনা প্রতিরোধ কমিটি ব্যবস্থা নিবে। একই সাথে সদর হাসপাতাল সংস্কার কাজ শুরু করতে তৎপরতা শুরু হচ্ছে। আবার বিকল্প হিসেবে খ্রিষ্টান মিশনারি হাসপাতালের কথাও ভাবা হচ্ছে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সুত্রে, এখানে চলতি মাসের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছেন ২৬ জন। গত ৯ দিনে করোনা সংক্রমিত ১ হাজার ৬৬০ জন। এরমধ্যে নগরীরই ১ হাজার ৩৭৪ জন।