কামনাফলের দিকে নুসরাত নুসিন রিভিউ

।। আব্দুল ওদুদ ।।

‘সকল নিশ্চয়তাই বেঁকে যাচ্ছে দিকের দিগন্তে
কীভাবে পেরিয়ে যাব এই মন্থর মাঠ? পঙক্তি? কাব্যকারবালা?
অতিক্রমণের কাল এখনও কুসুমে ফোটেনি।’

আরম্ভের প্রথমেই যেন এই কবির সৃষ্টিচেতনার এক নম্র ধ্বনিরূপ পাওয়া যায়! কোনো কিছুই যে আপাত পরম নয়, আপেক্ষিক অনিশ্চয়তায় ভরা। এই সত্য জেনেই কবি যেন বিচরণ করতে যাচ্ছেন গভীর অরণ্যে পরমের সন্ধানে!

আমি সাধারণ পাঠক। পাঠশেষে মনে হয়েছে, এ বইটি স্তর-পাঠকের জন্য অনুকূল, সকল পাঠকের নয়! কবিতাগুলোর মধ্যে অনেক আভাস রয়েছে, আবার কোথাও কিছু কিছু বিরোধাভাসও আছে, যেটাকে কবিতার স্বাভাবিক প্রকৃতি বলা যেতে পারে! বর্তমান সময়ে কবিতার যে প্রধান দাবি, প্রথাগত কবিতাধারণা ভেঙে নতুন নির্মাণের উদ্ভাস, সেটি নুসিন দক্ষতার সঙ্গেই করেছেন! ভরপুর এই কবিতাকল্পের আয়োজনে ব্যবহারক্লান্ত বৃত্ত ভেঙে বিস্তারে ছড়িয়ে পড়লেও তেমন কেন্দ্রচ্যুতি নেই!

কবিতার দেহে ঢোকার যে সহজ প্রবেশদ্বার ‘Fine Access’, সবক্ষেত্রে হয়তো সেটা নেই, কোথাও কোথাও শব্দের চাতুরিতে গিমিকের ছায়াও বোধ হয়েছে! আবার এমনও হতে পারে এসব আমার পাঠগ্রহণে কম যোগ্যতার প্রতিফলন। আমি হয়তো সেই পূর্ণাঙ্গ বোধির জাতক নই।তবে সেই যে জোছনালোকিত রাত্রে ছায়ার ঘোমটার আড়ালে আলো-আঁধারির লুকোচুরি, সেটা কিন্তু পুরো কাব্যটিতে প্রবলভাবে মুখর।

‘এ পৃথিবী সুন্দর—দেহজুড়ে খেলা করে
মাছের কামনা। অবিরাম ফুটে ওঠে শিমুলের রঙ।’

এটি নুসরাত নুসিনের লেখা কবিতা পুস্তক ‘কামনাফলের দিকে’-র ক্ষুদ্রতম পূর্ণাঙ্গ কবিতা, মাত্র দু’লাইনের।

নুসিনের কিছু কবিতা রয়েছে বৃত্তভূক বিন্দুর মতো! যে বিন্দুপাথরটি চিন্তার শান্ত নদীতে ছুঁড়ে দিলেই তার থেকে বৃত্ত ছুটে যায় পরিধির দিকে অজস্র বিস্তারে। তখন দৃশ্যমান হয় নামমাত্র শব্দ সঙ্কোচে কী অমিত বৈভব লুকিয়ে ছিল।

‘এ পৃথিবী সুন্দর’—সরল এই বর্ণক্রম বলে দেয়, এই কবি বড্ড আশা জাগানিয়া (অপটিমিস্টিক)। এ পৃথিবীতে অসুন্দরও কম নেই! দুঃখ, বেদনা, দহন, কষ্ট, বিদ্বেষ, বঞ্চনা, হাহাকার, জরা-মরণ-জর্জরিত পৃথিবীতে সুন্দর অংশকে এই কবি আমলে নিয়েছেন। তারপর বর্ণনাকে প্রসারিত করছেন অদ্ভুত এক দৃশ্য-উপমায়! ‘দেহজুড়ে খেলা করে মাছের কামনা’। এই কবিতার মূল শব্দতীর্থ হচ্ছে এই ‘মাছের কামনা’। সেটি কেমন, মাছের জীবনলগ্নিত চাওয়া একটি নিরাপদ, সুষম, উন্মুক্ত জলাশয়, পর্যাপ্ত খাদ্য! ইচ্ছার অনুপাতে বিস্তারিত জলাভূমিতে তার বেড়ে ওঠা, উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার খোলা স্বপ্ন! তেমনি এই পৃথিবীরও গভীর অন্তরে যেন খেলা করে এমনি এক অমল স্বপ্ন। হয়ে উঠতে চায় সুন্দর থেকে সুন্দরতর! আপন খেয়ালে বিচিত্র বিভঙ্গে ফোটাতে চায় নিজস্ব সুষমা।সেই বিভঙ্গ ভাণ্ডারের একটি নির্ণায়ক নিদর্শন হিসাবে চিত্রায়িত করেছেন, ‘অবিরাম ফুটে ওঠে শিমুলের রঙ’।

একদম, অজস্র সুন্দরকে যেন রঙের ছটায় বর্ণিল দৃশ্যব্যঞ্জনায় উন্মুক্ত করেছেন শিমুল ফুলের উপমায় এবং লক্ষ্যণীয় যে, ‘ফুটে ওঠে’, ‘ফুটে আছে’ নয়! অর্থাৎ এই সুন্দরের প্রকাশ চলমান… দুটি ভিন্নতর অর্থের শব্দকে একটি সমলয়ে সম্পৃক্ত করে এই যে একটি কবিতার সমাপন, সত্যি অসাধারণ!

হয়তো এখানেই শেষ নয়! আমরাও যেমন এই পৃথিবীর অংশ, পৃথিবীও তেমন আমাদের অংশ! তাই আমাদেরও সুন্দরে ফুটে ওঠার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত যেন এই কবিতার প্রতি ছত্রে ছায়ারূপে ফুটে আছে।

বইটির শেষ কবিতায় উচ্চারিত হচ্ছে—

‘সে জানে, রাত গাঢ় হলেই একটি শুভ্র সকাল ধরা দেবে তাকে।
পাখিদের চোখে তখন ঘুড়িবাসনা—
ঝরাপাতাও শোনাবে নিশ্চুপ খসে পড়ার গান।’

বইয়ের প্রচ্ছদ

এই যে একটি শুভ্র স্বপ্নের শান্ত নিবিড় আশাবাদ, তারপর ধীরে ধীরে ঝরাপাতার খসে পড়ার গান! আহা, বিদায়ের হলুদ বেদনাকে গানের মতো আনন্দের সৌন্দর্যসত্তায় রূপায়িত করা, এ শুধু একজন সু-কবির পক্ষেই সম্ভব!

যেকোনো বিদগ্ধ পাঠকের কাছে এ বই যেন অমৃত সমান! পড়ে দেখুন, হয়তো অধিক কোনো প্রাপ্তি আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।

গ্রন্থতথ্য কামনাফলের দিকে: নুসরাত নুসিন, প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত, প্রকাশক: বৈভব, মূল্য: ২৫০ টাকা

প্রচ্ছদ অবলম্বনে অলংকরণ শিবলী নোমান

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.