grand river view

।। সাদিয়া রহমান মৌ, রাজশাহী ।।

রিকশা চালাতে চালাতে গান গায় মঈনউদ্দীন। তার পছন্দ ভাটিয়ালি। রিকশায় যাত্রী উঠলে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে দিতে মঈনউদ্দীন শোনায় তার সুমধুর কণ্ঠের গান।

বারো বছর বয়স থেকে পরিবারের খাবার জোটানোর জন্য তাকে সারাদিন রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রিকশা চালাতে হয়। তবু মেলে না সুখের দেখা। কখন যে তার শৈশব রিকশার প্যাডেলের সঙ্গে আটকে গেছে সেটা সে নিজেও জানে না।

বছর দুয়েক আগেও তাদের সংসার ভালোই চলতো। কিন্তু মঈনউদ্দীনের বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় সংসারে নেমে আসে দুর্ভোগ। সেই দুর্ভোগ কাটাতেই রিকশা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় মঈনউদ্দীন। তবে শুরুর দিকে সহজ ছিল না। জমানো টাকা না থাকায় কিস্তি নিয়ে কিনতে হয় একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা।

অসুস্থতা আর বয়স হয়ে যাওয়ায় মঈনউদ্দীনের বাবা কাজ করার শক্তি পান না। বাড়িতে প্রতিবন্ধী দুই ভাই ও অবিবাহিত বড় বোন। সবমিলিয়ে মইনউদ্দীন সিদ্ধান্ত নেয় রিকশা চালানোর।

এলাকায় মঈনউদ্দীন ‘মোনা’ নামেই বেশি পরিচিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসুদেবপুর আলিয়া মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র তিনি।

মঈনউদ্দীনের বয়স এখন ১৪ বছর। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার চর অনুপনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুল লতিফের ছেলে। বাবা-মা ও ভাইবোনসহ তাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছয়জন। চার ভাইবোনের মধ্যে মঈনউদ্দীন ছোট। বড় দুই ভাই শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় তেমন কোনো কাজ করতে পারে না। মা গৃহিণী। বড় বোন পড়াশোনা করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি পলিটেকনিকে।

মঈনউদ্দীন জানায়, বাবা-মাকে এত কষ্ট করতে দেখে খুব খারাপ লাগে। কিন্তু রিকশা ছেড়ে পড়াশোনা করে বড় চাকরি করতে চাই। তখন আর আমাদের সংসারে কোনো অভাব থাকবে না।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বাসুদেবপুর ইউনিয়নের স্লুইচগেট বাজার এলাকার আশেপাশে রিকশা চালান তিনি। তবে ছোট বলে অনেকেই তার রিকশায় উঠতে চায় না। রিকশা চালাতে কষ্ট হলেও হাসিমুখে সহ্য করতে হয়। নয়তো তাদের মুখে খাবার তুলে দেয়ার কেউ নেই।

একজনের উপার্জনে পরিবারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয়। লকডাউনে কমে গেছে দৈনিক রোজগার। আগে আয় হতো ৬০০-৭০০ টাকা। এখন ৪০০ টাকা।

সারাদিনে যত টাকা রোজগার হয় বাড়ি ফিরে সেটা তুলে দেয় মায়ের হাতে। কষ্ট হলেও বাবা-মা ও ভাইবোনদের মুখে খাবার তুলে দিতেই তার এই জীবন-সংগ্রাম। সুযোগ পেলে পড়াশোনা করে জীবনে বড় কিছু হতে চায় মঈনউদ্দীন।