grand river view

।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

টিকটক চীনের তৈরি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি অ্যাপ। বিশেষ করে তরুণদের কাছে এর জনপ্রিয়তা আকাশছোঁয়া। ভিডিয়ো তৈরি ও শেয়ার করার অ্যাপটিতে আসক্ত হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের তরুণ-কিশোররাও। অ্যাপটি সহজ হওয়ার সামাজিক অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে।  

টিকটক কী?

ভাইরাল হওয়া মজার মজার নাচ ও ঠোঁট মেলানো হাস্যকৌতুকের ভিডিয়ো তৈরি ও শেয়ার হয় এই টিকটক অ্যাপে। অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদের কাছে এই অ্যাপ খুবই জনপ্রিয়। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীর চাহিদা মতো যে কোনো কিছুর সঙ্গে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে ছোট ছোট ভিডিয়ো তৈরি করে তা শেয়ার করা যায়। আবার এর সাহায্যে নিজের পছন্দের গানের সঙ্গে নাচ বা নানা ধরনের কমেডিও তৈরি করা সম্ভব। স্টিকার, ফিল্টার ও অগম্যান্টেড রিয়েলিটিও ব্যবহার করা যায় এসব ভিডিয়োতে। ফ্রি এই অ্যাপটিকে ভিডিয়ো শেয়ারিং অ্যাপ ইউটিউবের ছোটখাটো সংস্করণ বলা চলে। টিকটক ব্যবহারকারীরা এখানে এক মিনিট লম্বা ভিডিয়ো পোস্ট করতে পারেন এবং এখানকার বিশাল তথ্যভাণ্ডার থেকে গান ‍ও ফিল্টার বাছাই করতে পারেন।

টিকটক দিয়ে অল্পবয়সী ছেলে-মেয়েরা পরিচিত ফিল্মী ডায়লগ বা গানের সঙ্গে নিজেরা অভিনয় করে মজার মজার ভিডিয়ো তৈরি করে থাকে। একজন ব্যবহারকারীর যখন এক হাজারের বেশি ফলোয়ার হয় তখন তিনি তার ভক্তদের জন্য লাইভে আসতে পারেন। শুধু তাই নয়, এখানে তিনি ডিজিটাল উপহারও গ্রহণ করতে পারেন যা অর্থের সঙ্গেও বিনিময় করা যায়। একজন ব্যবহারকারী যাকে অনুসরণ করেন তিনি তার ভিডিয়ো দেখতে পারেন। এছাড়াও তিনি আগে যেসব বিষয়ে ভিডিয়ো দেখেছেন তার ওপর ভিত্তি করেও তিনি নতুন নতুন ভিডিয়ো দেখতে পারেন। ব্যবহারকারীরা নিজেদের মধ্যেও ব্যক্তিগত বার্তা আদান প্রদান করতে পারেন এই অ্যাপের মাধ্যমে। যারা কিছুটা অভিনয় করেন বা কমেডি করতে পারেন, তাদের নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরার জন্য এই টিকটক একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উঠে এসেছে। মজার মজার ভিডিয়ো তৈরি ও শেয়ার করা যায় এই টিকটকে যা তরুণদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

কত বড় এই অ্যাপ?

২০১৯ সালের শুরু থেকেই ডাউনলোড চার্টের শীর্ষের কাছাকাছি অবস্থান করছে টিকটক। গত বছর ইন্সটাগ্রাম ও স্ন্যাপচ্যাটকে টপকে বিশ্বের চতুর্থ সর্বোচ্চ ডাউনলোডকারী অ্যাপে পরিণত হয় এটি। এই কোম্পানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৭৫ বিলিয়ন ডলার যা রাইড শেয়ারিং অ্যাপ উবারের চেয়েও বেশি।

করোনাভাইরাস সঙ্কটের সময় টিকটকের জনপ্রিয়তা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। লকডাউনের কারণে ঘরবন্দি মানুষের তীব্র আগ্রহ তৈরি হয় এই অ্যাপের প্রতি। বলা হচ্ছে, টিকটক ও তার সহযোগী অ্যাপ দোইনের মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৮০ কোটি। দোইন অ্যাপটি শুধু চীনেই ব্যবহার করা যায়।

জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ভারতে টিকটক নিষিদ্ধ করার আগে এটি সেখানে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। সেদেশে দশ কোটিরও বেশি মানুষ ইতোমধ্যে টিকটক ডাউনলোড করেছে। ২০১৮ সালে আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড করা অ্যাপ ছিল এই টিকটক। ইকোনমিক টাইমস পত্রিকা লিখছে, প্রতিমাসে গড়ে প্রায় দুই কোটি মানুষ টিকটক ব্যবহার করছে।

বাড়ছে সামাজিক অপরাধ

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে টিকটক মোবাইল অ্যাপটি তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, এর মাধ্যমে সমাজে পৌঁছে যাচ্ছে ভুল বার্তা। বাড়ছে ধর্ষণ, নারী পাচার ও কিশোর অপরাধ। আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে অশ্লীলতা ও সামাজিক সহিংসতা। টিকটকের ফাঁদে পড়ে ঘটছে নারী পাচারের ঘটনা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকটকের মতো অ্যাপ সমাজে কিশোর অপরাধের ঘটনা উসকে দিচ্ছে এবং কিশোর-কিশোরীদের নৈতিকতা ধ্বংস করছে। এছাড়া এসব অ্যাপের মাধ্যমে উঠতি বয়সীরা ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠছে। তারা আরও বলেন, এই অ্যাপ ব্যবহারে কোনো বিধিনিষেধ না থাকার কারণে অ্যাপটির যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। যদি সরকারিভাবে এটি নিয়ন্ত্রণ করা হতো তাহলে অ্যাপটির এত অপব্যবহার হতো না। বেশ কয়েক দিন পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় যে, তরুণী ও কিশোরীরা টিকটকের ভিডিওগুলোতে উগ্র সাজে সজ্জিত হয়ে অশ্লীল নাচ-গান ও অভিনয়ের পাশাপাশি নিজেদের মাদক গ্রহণ করার মতো ভিডিয়ো আপলোড করছে। বেশ কিছু ভিডিয়োতে তরুণ-তরুণীরা লাগাতার সহিংস অভিনয় করে সেগুলো আপলোড করছে।

নেই কোনো শিক্ষণীয় বার্তা

দেশের টিকটক ভিডিয়োগুলোর বেশির ভাগেই নেই কোনো শিক্ষণীয় বার্তা। উল্টো এসব ভিডিয়োর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে চলে যাচ্ছে ভুল বার্তা। বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় এই অ্যাপটির অপব্যবহারের কারণে এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আবার বিব্রতকর, অনৈতিক ও অশ্লীল ভিডিয়ো যা পর্নোগ্রাফিকে উৎসাহিত করে তা প্রচার করায় বিভিন্ন দেশ থেকে এর ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তানে এরই মধ্যে নিষিদ্ধ হয়েছে টিকটক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত এই অ্যাপগুলোর মধ্যে এক ধরনের ‘শো অফ’-এর বিষয় থাকে। দেখা যায় টিকটকের কিছু ভিডিয়োতে বাইক স্টান্ট থাকে। আবার কিছু ভিডিয়োতে চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকাদের অনুকরণ করা হচ্ছে। মাতৃভাষার বদলে হিন্দি ভাষায় অ্যাকাউন্টধারীরা লিপ সিং করছে। কেউ কেউ অশ্রাব্য ভাষায় অভিনয় করছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকার কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরাও টিকটক অ্যাপ ব্যবহার করছে। তারা সেখানে গ্রুপ করে অন্য সদস্যদের যুক্ত করছে। ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটি কিশোর গ্রুপ আছে, যারা টিকটক গ্রুপ নামেই বেশি পরিচিত। গ্রুপটির নাম ‘ল্যারা দে’। আশঙ্কাজনক যে, গ্রুপটি ক্রমেই সন্ত্রাসী গ্রুপে পরিণত হচ্ছে। তারা টিকটকে বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট পোস্ট করে অন্য কিশোরদেরও এই গ্রুপে সংযুক্ত হওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। সম্প্রতি ভারতে পাচারকৃত এক বাংলাদেশি নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের একটি ভিডিয়ো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় নির্যাতনকারী হিসেবে দেশের আরেক টিকটক ব্যবহারকারী ‘টিকটক হৃদয়’-কে এরই মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে।

প্রশাসন কী বলছে

টিকটক-লাইকিসহ বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের অপরাধীদের তালিকা করা হচ্ছে জানিয়ে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, টিকটকসহ বিতর্কিত অ্যাপসগুলো নিষিদ্ধ করার সময় এসেছে।

গত শনিবার (৫ জুন) ঢাকায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনে (এফডিসি) ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত ‘কিশোর অপরাধ বৃদ্ধিতে সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার’ নিয়ে ছায়া সংসদ বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘৮২ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থাকে। বিভিন্ন অপরাধের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও অনেকাংশে দায়ী। প্রযুক্তিকে গ্রহণ করে নেতিবাচক দিকগুলো পরিহার করতে হবে। যেকোনো ধরনের অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই, অপরাধ করে এখন আর কেউ পার পাচ্ছে না। এরপরও কেউ অপরাধ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

কিশোর গ্যাং ও জঙ্গিবাদের মতো যে কোন অপরাধের জন্য অভিভাবকদের সন্তানের প্রতি নজর রাখারও আহ্বান জানান র‌্যাব প্রধান। তিনি বলেন, ‘যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করলে অপরাধ কমে যাবে।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, বেশ কিছু মোবাইল অ্যাপ উঠতি বয়সের কিশোর-কিশোরীদের এক ধরনের বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই অ্যাপসগুলো বন্ধ করার জন্য প্রকৃত সংস্থা হচ্ছে বাংলাদেশে টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)। এছাড়া সংশ্লিষ্ট যারা বিষয়টি মনিটরিং করছে তারা চাইলেও এসব অ্যাপ বন্ধ করা সম্ভব। তাদের মতে, যেহেতু এসব ভিডিয়ো পোস্ট করার জন্য কেউ সরাসরি ফৌজদারি অপরাধে জড়ায় না, এ জন্য প্রাথমিকভাবে এসব কিশোর-তরুণের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়াও সম্ভব হচ্ছে না।

প্রয়োজন সেন্সরশিপ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মাহফুজা খানম বলেন, দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কিশোর-কিশোরীরা তাদের এনার্জি লেখাপড়ার বদলে টিকটকের মতো অ্যাপে খরচ করছে। এর মাধ্যমে তারা বিনোদন ও উত্তেজনা খুঁজে নিচ্ছে। এই বয়সী শিশুদের আকর্ষণ করার মতো উপাদান টিকটকের আছে। এ জন্য একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সময় শিশু-কিশোররা এখন টিকটকের পেছনে ব্যয় করছে। কিন্তু এসব বিষয়ে সেন্সরশিপের প্রয়োজন আছে। এ ধরনের অ্যাপ ব্যবহারে কোনো বিধিনিষেধ না থাকায় এর যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। যদি সরকারিভাবে এটি নিয়ন্ত্রণ করা হতো তাহলে এর এত অবাধ ব্যবহার হতো না। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, টিকটক কিশোর অপরাধের মতো ঘটনা উসকে দিচ্ছে। কিশোরদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তারা যে অপরাধগুলো করে তা একাকী নয়, দলগতভাবে করে থাকে। এ ক্ষেত্রে যেসব কিশোর-কিশোরীর চিন্তাভাবনা একই ধরনের, তারা যখন কোনো নেতিবাচক কাজ করে তা দলগতভাবেই করে। এর ফলে এই কম বয়সীদের মাদক গ্রহণ ও সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়।