।। মওদুদ রানা, রাজশাহী ।।

শনিবার (৫ জুন) দুপুর দুটা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পেছনের করিডরের মেঝেতে বসা এক নারী আর  ফুটফুটে শিশু সন্তান। দুহাত পেছনে দিয়ে দেয়ালে মাথা ঠেস দিয়ে বসে আছেন তিনি। মাঝেমধ্যেই হেঁচকি তুলছেন। পাশে বসা মেয়েটির চোখে মুখে ভয় আর উদ্বেগের ছায়া। চোখ দিয়ে পড়ছে টপটপ করে পানি। কাছে যেতেই ইশারা করলেন দূরে থাকতে। কারণ, তিনি করোনা আক্রান্ত।  

নাম তার শিউলী বেগম। বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহারাজপুর। স্বামী বিদেশ থাকেন, সুবাদে মেয়েকে নিয়েই তার সংসার। গত তিন দিন আগে করোনা প্রমাণিত হলে ভর্তি হন চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে শনিবার সকাল দশটায় আসেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মাঝেমাঝেই শ্বাসকষ্ট হচ্ছে তার।

শিউলী বেগম জানান, হাসপাতালে এসে জরুরি বিভাগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের রেফার্ডের কাগজ দেখান। তাতে করোনা পজিটিভ উল্লেখ থাকলেও নেয়নি ভর্তি। সেসময় শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ায় বসে পড়েন জরুরি বিভাগের মেঝেতেই। কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে বের করে দেন আয়ারা। এরপর উপায়ন্তর না পেয়ে আশ্রয় নেন পাশের করিডোরে।

শিউলী বেগমের চিকিৎসায় সহায়তা করতে এসেছেন তার মা ও ভাই সামাদ আলী। বোনের ভর্তি করাতে না পেরে তখন হাসপাতালের এ মাথা থেকে ও মাথা ছুটছেন তিনি। হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট যাকেই পাচ্ছেন, তার কাছেই করছেন বোনকে ভর্তির কাকুতি মিনতি। শিউলীর মায়েরও ছিল প্রাণান্তকর চেষ্টা। কিন্তু করোনাক্রান্ত রোগীতে উপচে পড়া ওয়ার্ডে কে কাকে ভর্তি করায়!

যখন শিউলীকে ভর্তি করার জন্য রীতিমত যুদ্ধ চলছে তখন জরুরি বিভাগের বারান্দায় শুয়ে একই জেলার কৃষক জবদুল। শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসছেন তিনি। এর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার মাথার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন জামাতা আবুল হোসেন।

আবুল হোসেন জানান, তার শ্বশুরের বয়স ৭০ বছর। গত বুধবার শ্বাসকষ্ট শুরু হলে ভর্তি করান চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে। অবস্থার অবনতি হলে শুক্রবার সন্ধ্যায় আসেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু জরুরি বিভাগ কোনোভাবেই ভর্তি নেয়নি। উপায় না পেয়ে জরুরি বিভাগের বারান্দায় অবস্থান নেন তারা।

আবুল হোসেন বলছিলেন, “রাতে হঠাৎ করেই শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। স্থানীয়ভাবে ম্যানেজ করা হয় অক্সিজেন।” তিনি জানান, রাতটা কোনোমতে পার হলে সকালে আবারও চেষ্টা শুরু করেন ভর্তির। ব্যবস্থা হয়েও যায়। ‍চিকিৎসক পাঠিয়ে দেন ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে। কিন্তু সেখানে পৌঁছাতেই বিধিবাম।

আবুল হোসেনের অভিযোগ, ওয়ার্ডের সেবিকা ভর্তির কাগজ দেখার পরও সাফ জানিয়ে দেন বেড খালি নেই, যেতে হবে ফেরত। আবারও জরুরি বিভাগে ফেরত আসেন জবদুল।

দুপুর সাড়ে বারোটায় এই প্রতিবেদকের সাথে দেখা হয় আবুল হোসেনের। চারপাশে এমন যন্ত্রণাক্লিষ্ট মানুষের হাহাকার ছুঁয়ে যায় পেশাদারিত্বকেও। প্রতিবেদক জবদুলের জামাতা আবুল হোসেন আর শিউলী বেগমের ভাই সামাদ আলীকে পরামর্শ দেন হাসপাতাল পরিচালকের সঙ্গে দেখা করার।

পরিচালকের ওয়েটিং রুমে দেখা হয় নওগাঁর আরেক ভুক্তভোগীর সাথে। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি জানান, তার স্বজন নিয়ামতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি ছিলেন। সকালে নিয়ে এসেছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু ভর্তি করাতে পারছেন না।

একপর্যায়ে অপেক্ষার ১৯ ঘণ্টা পর জবদুল, ৪ ঘণ্টা পর শিউলী, ২ ঘণ্টা পর নওগাঁর রোগীটি ভর্তির সুযোগ পান। সেটিও সম্ভব হয় পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের পর, বিশেষ ব্যবস্থায়।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, রোগীর চাপের তুলনায় চিকিৎসার সক্ষমতা বিবেচনায় শুধুমাত্র যাদের নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেনের প্রয়োজন তাদেরকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি নেয়া হচ্ছে। যাদের বাড়িতেই চিকিৎসা সম্ভব, তাদের  হাসপাতালে ভর্তি থাকতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এমন নির্দেশনার কারনে হয়তো অপেক্ষার ঘটনা ঘটেছে। এতো সীমাবদ্ধতার পরেও তারা কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে না ঘটে তা দেখবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন।

জবদুল ভর্তির পর বেড পেয়েছেন। শিউলী বেগম ২২ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। করোনা ওয়ার্ডের পাশে কথা হয় সেখানে থাকা রোগীর স্বজন রাশেদ আল মাহফুজের সঙ্গে।

তিনি জানান, এখন পর্যন্ত রোগীদের থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসা সবকিছু ঠিকঠাক আছে। কিন্তু যেভাবে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে তাতে  চিকিৎসা সেবা দিনকে দিন চ্যালেঞ্জে পরিনত হচ্ছে বলেই উপলব্ধি তার। তিনি বেড খালি পাওয়ার ব্যাপারে বলেন, করোনা ওয়ার্ডগুলিতে সবসময় প্রাণ রক্ষায় অক্সিজেনের জন্য আকুলি বিকুলি চলে। বাস্তবতা হচ্ছে, একজন রোগীর চলে যাওয়া মানেই অক্সিজেন, বেডসহ আরেকজনের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ। সে চলে যাওয়া সুস্থ্য হয়ে হোক, অথবা চিরযাত্রাতেই!

এই প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের গাইডলাইন যথাযথ দূরত্ব মেনে পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রীসহ প্রতিবেদক আলোকচিত্রী কাজ করেছেন। চিকিৎসাসেবায় ব্যাঘাত সৃষ্টি কিংবা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে এমন যেকোনো আচরণ থেকে সংবাদসংগ্রহকারী দল বিরত ছিলো।