সুব্রত কুমার পাল
grand river view

।। সুব্রত কুমার পাল ।।

করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ এর দিকে তাকালে একটি বিষয় সহজেই অনুমেয় যে স্বাস্থ্যখাত কতটা ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে বিরাজমান। যদিও এই স্বাস্থ্যখাত নিয়ে বহুবছর ধরেই চলছে আলোচনা-সমালোচনা। কিন্তু যারা এই খাতের রুগ্ন দশাকে ঠিক করবেন তাদেরই ছিলো না কোনো হেলদুল। স্বাস্থ্য খাতের সংকট আছে, এটি আমজনতা হিসেবে অনেকেরই জানা, কিন্তু এতটাই অসুস্থ, করোনা ভাইরাসের প্রকোপ ও প্রভাবের ফলে দুর্বলতা প্রকাশ্যে উঠে এসেছে। স্বাস্থ্যখাতে সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতির কারণে রুগ্ণ স্বাস্থ্যখাতের সবলতা আসেনি, স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্ধ যাই থাকুক না কেন তাও ঠিকমতো কাজে আসেনি। আমজনতার কাছে স্বাস্থ্যসেবা রয়ে গেছে হাতের অনেক দূরে।

আমজনতার হাসপাতাল, মানে সাধারণ জনগণের হাসপাতাল হিসেবে সবাই জানে সরকারি হাসপাতালের কথা। কিন্তু সঠিক ও যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ার ফলে হতাশ হয়েই শুধু বেঁচে থাকার আকুতি নিয়ে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকমুখী হচ্ছেন সাধারণ মানুষজন। সামর্থ্যের অংশটুকু না থাকলেও, সর্বশান্ত হলেও বেঁচে থাকার আশায়। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মূল্য আবার আকাশচুম্বী, যার ফলে সামর্থ্যবান মানুষই চিকিৎসা পাচ্ছে। অনেকসময় আমজনতাকে ফিরতে হচ্ছে শেষ সম্বলটুকুও হারিয়ে, পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা না পেয়েই। এমন ঘটনাও আমরা গণমাধ্যমে দেখেছি চিকিৎসার বিল মেটাতে না পেরে রোগীর স্বাজনদের আটকে রাখা বা মৃত দেহটিকে ছাড় না দেয়ার চিত্র। অথচ দেখা যায়, সরকারের দেয়া বরাদ্দকৃত বাজেটের একটি বড় অংশও খরচ করতে পারে না আমাদের স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্তাব্যক্তিরা।

আমাদের দেশের মোট চিকিৎসা ব্যয়ের মাত্র ৩০ ভাগ বেসরকারি খরচে চিকিৎসা নির্বাহ হয়। আর ৭০ ভাগ ব্যক্তি পর্যায়ে। এই ৭০ ভাগের মধ্যে পুরোটাই প্রায় সামর্থ্যবানদের। কিন্তু একটি বিষয আমাদের লক্ষ্য রাখা বাঞ্ছনীয়, অর্থনীতির আকার এবং বর্তমান পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ মোট জিডিপির ৫ শতাংশ দাবি করলেও তা এখনো ১ শতাংশে উন্নীত করতে পারেনি। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান শিক্ষার পাশাপাশি চিকিৎসার মতো মৌলিক একটি বিষয়ে যথাযথ বাজেট এবং বাস্তবায়নে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে বাজেটের আকার যতই  বাড়বে, দুর্নীতির মাত্রাও ততই বাড়বে বলে মনে করেন আমজনতা।

একটি কথা এখানে বলা প্রয়োজন, ২০২০ এর মার্চ মাস থেকে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ আমাদের দেশে শুরু হলেও সংশ্লিষ্ট মহলে সময় মতো কাজ শুরুর কোন চিত্র আমরা দেখতে পারিনি। সকলেই একটি কথা বলছেন, এটি একটি নতুন ইস্যু, যে কারণে দেরি হয়ে গেছে। দায় এড়ানোয় যেন ছিলো এক প্রতিযোগিতা। আমরা কাজের চেয়ে কথার দাপটই বেশি দেখেছি। চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা সামগ্রী দিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে সময় মতো প্রস্তুত করতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তারা কী নিয়ে এতো ব্যস্ত থাকেন, তা পরবর্তীতে গণমাধ্যমে উঠে আসা নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্রে অনুধাবন করা গেছে।

করোনা ভাইরাসের এই সময়ে আমাদের যে জনবল বিশেষ করে চিকিৎসক ও  দক্ষ টেকনিশিয়ান প্রয়োজন এটিও বুঝতে বেশ সময় লেগেছে। কিন্তু কোনো দায় স্বীকার করতে দেখেনি জনগণের জন্য সেবা দেয়ার ব্রত নিয়ে শপথ নেয়া সেই মহান মানুষগুলোকে। করোনা শনাক্তের হার যখন জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলছিল, তখনো কেউ কেউ তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলছিলেন সব কিছু ঠিক মতো চলছে, সমস্যা নেই। দিন গেল, মাস গেলো, বছর পেরোলো সনাক্তের হার এখনো ১০ শতাংশের নিচে নামলো না। এটি কি আমাদের খামখেয়ালিপনা ছিলো না? এই প্রশ্নই এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে চারিপাশে। মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসায় আইসিইউ বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র এখনো নেই অনেক জেলায়। যেটির পরিকল্পনা থাকলেও কাজে লাগাননি।

সীমান্তঘেঁষা জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের কথা এখানে জরুরি। ঊর্ধ্বমুখী করোনা সংক্রমণের হারে কুপোকাত সেই জেলার সংক্রমিত মানুষ। আইসিইউ ব্যবস্থা না থাকায় পাশের জেলা রাজশাহীতে দলে দলে আসছেন করোনা ভাইরাসে শনাক্ত রোগী। এর মধ্য দিয়ে যেমন বাড়ছে রোগীর চাপ, অন্যদিকে জেলা রাজশাহীও করোনা হটস্পটে পরিণত হচ্ছে। শুরুতেই যদি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতো, তাহলে হয়তোবা এই ঝুঁকি এড়ানো যেত।

স্বাস্থ্যখাতের বেহাল এই দশায় আমরা খোদ পরিকল্পনা মন্ত্রীর হতাশা দেখতে পেয়েছি। সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর হতাশা কিন্তু চোখে আঙুল দিয়েই দেখিয়ে দেয়, আসলে আমরা আছি কোথায়? করোনা মহামারিতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, স্বাস্থ্যখাতের জন্য বাজেটে যে বরাদ্দ থাকে সেটাও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে মানুষের দোরগোড়া পর্যন্ত পৌছানো সম্ভব হয়নি। আমজনতার সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকের পেছনে সরকারের কাঁড়ি কাঁড়ি ব্যয় করলেও তারা ছোটেন প্রাইভেট প্র্যাকটিসে, একজন রোগীর পেছনে সর্বোচ্চ কতটুকু সময় দেন চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত আমাদের শ্রদ্ধার মানুষগুলো তাও সকলের জানা।

এখন এই স্বাস্থ্যখাত নিয়ে বাজেট বরাদ্দের পরিস্থিতি কী, তা একটু খতিয়ে দেখা যাক। প্রস্তাবিত ২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্যাকসিন কার্যক্রম ও করোনা চিকিৎসায় এবারও ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। ভালো কথা। নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো, ব্যাপরটা এরকম আর কী! থোক বরাদ্দের এই টাকার খরচের যদি সুষ্ঠু ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না যায় তাহলে যেই লাউ, সেই কদুর মতো অবস্থা হতে বেশি সময় লাগবে না।

করোনা মহামারি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থনীতিকে টালমাটাল করে দিয়েছে। তাই পরপর দুই অর্থবছরের বাজেটে গুরুত্ব পাচ্ছে স্বাস্থ্যখাত। করোনা ও স্বাস্থ্যখাতের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দ সাড়ে ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা ছিলো। তবে স্বাস্থ্যখাতের বাজেট বাস্তবায়নের গতি বরাবরই অন্য মন্ত্রণালয়ের তুলনায় অনেক কম। সেই সঙ্গে আছে এ খাতের কেনাকাটায় নানা মাত্রার দুর্নীতির অভিযোগ।

স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন নিয়ে অনেকেই মনে করেন, যা আছে তাই তো খরচ করতে পারেন না, বাড়ানোর প্রয়োজনই বা কী! কিন্তু একটি বিষয় অবশ্যই আমাদের মনে রাখতে হবে, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর সামর্থ্য বৃদ্ধি, উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের প্রণোদনা দেওয়া, ভবিষ্যত গড়ার সুযোগ এবং আবাসন ও অন্যান্য সুবিধা দেওয়া, এসডিজি অর্জনের অঙ্গীকার অনুযায়ী দেশের সব নাগরিকের জন্য ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ নিশ্চিত করা, মানসম্মত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আরও পদ সৃষ্টি করে চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ করা। দেখেছি স্বাস্থ্যখাতের জন্য যে অতিরিক্ত বরাদ্দ করা হয়েছে তার বেশিরভাগ খরচ করা হয়নি। আমরা জানি, স্বাস্থ্যখাতে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা হয়েছে- স্বাস্থ্যখাতে সংস্কার নিয়ে এবং স্বাস্থ্যখাতের পুরো প্রক্রিয়াটাকে একটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে বলে আমরা মনে করি।

‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে’ ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য বাজেটে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। একই সাথে করোনা মহামারিকালে জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য আরো ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে করোনা ভাইরাস মহামারির বাস্তবতা ও চিন্তা মাথায় রেখে, স্বাস্থ্যখাত বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। পরে সংশোধনী বাজেট বেড়ে ৩১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা করা হয়। পাশাপাশি জরুরি চাহিদা মেটানোর জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। মূল বরাদ্দের হিসাবে তাই এবারের স্বাস্থ্য বাজেটে টাকার অংকে বরাদ্দ বেড়েছে ১ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা, অর্থাৎ ৪ শতাংশ। গেল অর্থবছরের স্বাস্থ্য বরাদ্দের আকার ছিল মূল বাজেটের ৫ দশমিক ১ শতাংশ, এবার তা ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে আমজনতা সকলেই একদিকে যেমন স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বাড়ানোর দাবি করে আসছিলেন একই সাথে অত্যন্ত দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সাথে যাতে বাজেট বাস্তবায়ন করা যায়, তার দাবিও ছিলো বহাল। কিন্তু আমরা গত ২০২০-২০২১ অর্থবছরের দিকে তাকালে দেখতে পাই, বরাদ্দকৃত বাজেটের একটি বড় অংশই ব্যয় করতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাহলে কী করলেন তারা- এই প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

দেশের স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান কাঠামো অনেক বেশি পুরোনো, যা ঢেলে সাজানোর দিক নির্দেশনা বাজেটে নেই। শুধু বাজেট বরাদ্দই যথেষ্ট নয়, থাকা প্রয়োজন ছিলো সুস্পষ্ট নির্দেশনা। স্বাস্থ্যখাতে থোক বরাদ্দের ১০ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে, তা দিয়ে টিকা ক্রয় ও অন্যান্য কাজ করা যাবে। কিন্তু আমরা যদি ধরেও নিই, মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ নাগরিককে টিকার আওতায় আনবো, তাতেও কি এই অর্থ যথেষ্ট?

২০২১-২২ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেট আসলে মহামারি নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়ন্ত্রণ পরবর্তী কার্যক্রমকে চাহিদার সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ এটিও বাজেটে স্পষ্টকরণ প্রয়োজন ছিলো। আমাদের স্বাস্থ্যখাতের একটা পরিবর্তন একান্ত প্রয়োজন। করোনাভাইরাস মহামারি সেই সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, কিন্তু আমরা তা কাজে লাগাতে পারলাম না। লাগাম ধরতে পারলাম না দুনীর্তির। আমাদের এখন একদিকে যেমন কোভিডকে গুরুত্ব দিয়ে মোকাবেলা করতে হবে, অন্যদিকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় দিতে হবে নজর। স্বাস্থ্যের বহুমাত্রিক যে দিকগুলো রয়েছে, সেগুলো পাল্টানোর জন্য যে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল তা দেয়া হয়নি।

গত অর্থবছরের সঙ্গে তুলনা করলে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে নতুন তেমন কিছু নেই। অর্থমন্ত্রী স্বাস্থ্যখাতের জন্য ৩২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা প্রস্তাব করেছেন, যা মোট বাজেটের পাঁচ দশমিক ৪২ শতাংশ অথবা জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। যা ছিল মোট বাজেটের পাঁচ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং সংশোধিত বাজেটে যার আকার বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ, এই খাতে মোট জিডিপির পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ থাকতে হবে। কিন্তু আমরা তার কোনো লক্ষণ তো এখনো দেখতে পেলাম না। বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দকৃত উন্নয়ন বাজেটের ২৪ শতাংশ অব্যবহৃত ছিল। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বরাদ্দ দেওয়া অর্থের মাত্র ২৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ অর্থ ব্যবহার করতে পেরেছে। এটি হতাশাব্যঞ্জক। প্রত্যাশা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতাও সুস্পষ্ট পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে বাজেট বাস্তবায়নে স্বাস্থ্যখাত এক নতুন চেহেরায় ফিরবে।

সুব্রত কুমার পাল রাজশাহীতে বসবাসরত একজন সুশাসন বিশ্লেষক