।। নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

রাজশাহী মহানগরীর আলুপট্টি এলাকায় প্রবীণ নাগরিকদের আড্ডা প্রতিদিনই বসতো। এমনকি প্রথম দফায় করোনা সংক্রমণের বাড়াবাড়িতে লকডাউন দিলেও বিরামহীনভাবে চলেছে সেই ‘মাস্কবিহীন আড্ডা’। দুয়েকজনের মুখে মাস্ক থাকলেও তা ঝুলতো থুতনির নিচে। অনেকে সতর্ক করলেও তাদের বলতে শোনা যেতো- করোনা নাকি তাদের হবে না!

প্রথম ঢেউয়ের পর পরিস্থিতি খানিকটা শিথিল হলে তাদের সেই বিশ্বাস আরও পাকাপোক্ত হয়ে গেলো। কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউয়ের শুরুতেই করোনা সংক্রমিত হন তাদের একজন। হার্ট ও কিডনিজনিত অসুখ আগে থেকেই ছিলো তার। মাস্ক পড়তে যার উৎসাহ ছিলো না, সেই ব্যক্তি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে অক্সিজেন মাস্ক মুখে নিয়ে প্রায় ২০ দিন পড়েছিলেন কাতর হয়ে। চিকিৎসায় সুস্থ্য হয়েছেন বটে, তবে শারীরিক দুর্বলতা কাটেনি। কিন্তু মাস্কটা এখন ঠিকঠাক পড়ছেন।

তারই যুবক ছেলের কথা বলি। টগবগে সেই তরুণ প্রথম কিংবা দ্বিতীয় কোনো ঢেউয়েই মাস্ক মুখে তোলার প্রয়োজন বোধ করেননি। পিতার করোনা সংক্রমণের পরেও তিনি চলাফেরা করতেন মাস্ক ছাড়াই। শেষাবধি সেই তাকেও করোনা পজিটিভ হয়ে যেতে হয়েছে হাসপাতালে। এখনও তার চিকিৎসা চলছে। ১০ দিন পেরিয়ে গেছে, এখনও অক্সিজেন মাস্ক খুললেই রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা নেমে আসছে ৯০ এর নিচে। শুরু হচ্ছে শ্বাসকষ্ট।

আবার যে সময় স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা, তখন তা থোড়াই কেয়ার করে ঈদের পর ধুমধাম করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিয়ে খেতে গিয়েছিলো রাজশাহীর এক পরিবার। ফেরার পর পুরো পরিবারের করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়। দুদিনের ব্যবধানে সেই পরিবারের ৩০ বছর বয়সী এক নারী সদস্য ও ৬৫ বছরের এক পুরুষ সদস্য ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে।

করোনা সংক্রমণ শুরুর আগে পিতার কাছে শখ করে মোটরসাইকেলের বায়না ধরেছিলেন সদ্য স্কুল পেরোনো এক কিশোর। প্রথম ঢেউয়ের সময় নানাজনের নিষেধ কানে তোলেনি সে। বন্ধুদের সঙ্গে মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তো রোজই। মাস্কের কোনো বালাই ছিলো না। প্রথম ঢেউ শেষ হবার পর সেই মোটরবাইক-সফর কয়েক গুন বেড়ে যায়। দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর মোটরবাইক বাহিনী চলে যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ। ঘুরে ফিরে আসার পর থেকেই জ্বরে পড়ে কিশোর। চারদিন পর করানো হয় করোনা পরীক্ষা। পজিটিভ আসে। ততদিনে টগবগে সেই কিশোরের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেছে। হাসপাতালে ১৬দিন যমে-মানুষে টানাটানি শেষে অক্সিজেন স্যাচুরেশন বাড়ে। পরে করোনা নেগেটিভ হয়ে ফিরে আসে বাড়িতে।

দীর্ঘদিন ধরেই এমন অনেক মানুষ নানা সাবধান বাণীতে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করেননি। ‘করোনা আসছে’ এই কথাও তাদের মধ্যে পরিবর্তন আনেনি। ‘করোনা এসেছে’ এই বার্তায়ও তারা ভ্রুক্ষেপ করেননি। এ যেন ঠিক সেই রাখাল বালক আর বাঘের গল্প! তবে সেখানে রাখালটা মিথ্যে বাঘ আসার কথা বলতে বলতে একদিন সত্যিই বাঘ চলে এসেছিলো। আর বাস্তবে করোনার সত্যিটা বলার পরেও এই মানুষগুলো ভেবেছেন, এ বুঝি মিথ্যেবাদী রাখালরাই করোনাকে বাঘ সাজাচ্ছে! কিন্তু সেই ‘বাঘ’টি এখন সত্যি সত্যিই রাজশাহীতে এসে গেছে।

গত ১২ দিনের মৃত্যুর পরিসংখ্যান দেখুন এখানে

পরিসংখ্যান বলছে, সংক্রমণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে। দেশে মৃত্যুর বেশিরভাগই এখন রাজশাহী অঞ্চলের। এই অঞ্চলের একমাত্র সম্বল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রোগী বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। ৪টি ওয়ার্ডে ২৩২ জন ধারনক্ষমতার করোনা ইউনিট উপচে পড়ছে এখন। হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস শুক্রবার বিকেলে জানান, ধারনক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী এখন করোনা ওয়ার্ডগুলোতে। বাধ্য হয়ে মেঝেতে বিছানা দিয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করে কোনোমতে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। প্রয়োজনের তাগিদে আরও একটি সাধারণ ওয়ার্ডকে করোনা ওয়ার্ডে রূপান্তর করে শনিবার থেকে সেখানে রোগী ভর্তি শুরু করার কথা জানান তিনি।

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী রীতিমতো উদ্বিগ্ন পরিস্থিতি নিয়ে। তার মতে, যে হারে সংক্রমণ হয়েছে এবং রোগী আসছে, তাতে সামাল দেয়া কঠিন হয়ে যাবে। তিনি বলেন, “অন্য অনেক জায়গায় একাধিক হাসপাতাল রয়েছে। যেমন বগুড়ায় ওরা কোভিড পেশেন্টদের মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে রাখছে। কিন্তু আমাদের এখানে তার উপায় নেই। এই একটিই হাসপাতাল, যেখানে আমরা সাধারণ রোগীদের পাশাপাশি কোভিড পেশেন্টদের ট্রিটমেন্ট করছি। তার ওপর এখানে আশেপাশের ৪ থেকে ৫টি জেলার রোগী আসেন। এখন যেভাবে রোগী বাড়ছে, তাতে আরও সাধারণ ওয়ার্ডকে করোনা ওয়ার্ড হিসেবে প্রস্তুত করতে হবে। সেটা কত সংখ্যক হবে এখনও জানি না। কিন্তু আমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি।”

পরিচালক তুলে আনেন এক ভিন্ন সংকটের শঙ্কা। তিনি বলেন, “এভাবে যদি সাধারণ ওয়ার্ডকে করোনা রোগীদের জন্য একের পর এক ছেড়ে দিতে হয়, তখন সাধারণ রোগীদের চিকিৎসায় সংকট দেখা দিতে পারে। তখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। সাধারণ রোগীদের মধ্যে অনেকে ক্রিটিক্যালও থাকেন। তাদের জন্য পর্যাপ্ত সেবা নিশ্চিত করতে না পারলে তা হবে ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ।”

একদিনে রেকর্ড মৃত্যুর তথ্য দেখুন এখান থেকে

রাজশাহীর জেলা প্রশাসক আবদুল জলিল জানান, এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তারা সদর হাসপাতালকে সংকটকালে ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছেন। এই হাসপাতালে রামেক হাসপাতালের কয়েকটি নন-কোভিড ওয়ার্ড স্থানান্তর করে সেখানে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা তাদের।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. চিন্ময় কান্তি দাস বলেন, “আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি, করোনা যতটা না ব্যক্তির রোগ, তার থেকে বেশি ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে এই রোগের ব্যাপক সংক্রমণ বড় ও উন্নত দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও বেহাল করে দেয়ার উদাহরণ আমরা দেখেছি। সে কারণেই বারবার এতো কথা বলা হয়েছে। মাস্ক পড়তে, কঠোর লকডাউন দিতে, স্বাস্থ্যবিধি মানতে ও মানাতে বলা হয়েছে অসংখ্যবার। কিন্তু দুঃখজনক হলো, এসবের কিছুই হয়নি ঠিকমত। যার ফলাফল দেখতে শুরু করেছি। রাজশাহীর মতো একটা জায়গায় বিরাটাকারের সামাজিক সংক্রমণ ও মৃত্যুর হারের এমন ঊর্ধ্বমুখি প্রবণতা আশঙ্কা জাগানোর মতো ব্যাপার।” ডা. চিন্ময় মনে করেন, বিধিনিষেধ কঠোরভাবে মানতে ও মানাতে ব্যর্থ হলে এ অঞ্চলের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে।

এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত কেসস্টাডিগুলোর ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও আক্রান্তদের পরিচয় সামাজিক নিরাপত্তা ও চিকিৎসা গোপনীয়তার কারণে প্রকাশ করা হয়নি।