।। ঘরে বাইরে ডেস্ক ।।

আজ ৩ জুন, বিশ্ব সাইকেল দিবস। প্রতিবছর এই দিনে বিশ্বজুড়ে উদযাপন করা হয় দিবসটি। বিশ্বের সাইক্লিস্টদের জন্য বিশেষ দিন এটি। ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় এই তারিখটিকে বিশ্ব সাইকেল দিবস হিসাবে উদযাপন করতে প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন। ১৯ শতকে ই্উরোপে সাইকেলের উদ্ভব। সাম্প্রতিক সময়ে ২০১৪ সালে বাংলাদেশে সাইকেলের জনপ্রিয়তা লক্ষ করার মতো। পরিবেশ বান্ধব এই বাহনটির নানাবিধ উপকারিতার কারণে প্রতি দিনই বেড়ে চলেছে এর ব্যবহার। ২০০৩ সাল পর্যন্ত সারা বিশ্বে ১০০ কোটিরও বেশি সাইকেল তৈরি করা হয়েছে। আর পেছেনে রয়েছে মজার ইতিহাস। উত্তরকালের আজকের আয়োজন সাইকেলের জন্মকথা নিয়ে।

সাইকেল জন্মের আগে এসেছিল চাকা

চাকা

পৃথিবীতে সাইকেল জন্মের আগে এসেছিল চাকা। আজ আমরা রাস্তায় যে যানবাহন দেখি না কেন তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এই গোল চাকা। এই গোল চাকা আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পরিবহন যাত্রা বদলে যায়। চলাচলের পথ নিয়ে বদলে যায় মানুষের চিন্তাভাবনা। একটি সাইকেলের চাকার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নেই। তাই, আমাদেরকে সাইকেল জানার আগে এর চাকার ব্যাপারটিও জানতে হবে। ইতিহাসবিদরা সাধারণত একমত হন যে, চাকার উদ্ভব মেসোপটেমিয়ায় খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ সালের দিকে হয়েছিল। প্রথমদিকের চাকাগুলো গাড়ির সঙ্গে সংযুক্ত করে বিভিন্ন প্রাণীদের দ্বারা চালনা করা হতো। শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ চাকাযুক্ত যানবাহনগুলোকে আরও ব্যবহারিক করে তোলার জন্য চেষ্টা করতে থাকে।

ইতিহাসের চরকিতে

রোমানদের রাস্তা নির্মাণ

২০১০ সালে এক চীনা ইতিহাসবিদ তার তথ্য উপাত্ত নিয়ে দাবি করেন, সম্ভবত ২৫০০ বছর আগে একজন চীনা উদ্ভাবক লু বান সাইকেল আবিষ্কার করেছিলেন। তার সাইকেলের ছিল তিনটি চাকা এবং প্যাডেল। এটি ছিল অনেক বড়। লু বানের সাইকেলকে আমরা ট্রাই সাইকেলও বলতে পারি। তবে এখন পর্যন্ত অনেক ইতিহাসবিদের কাছে এই আবিষ্কার স্বীকৃত হয়নি।

রোমানরা প্রথম জাতি যারা বর্তমানের আধুনিক রাস্তার মূল কারিগর। চাকা আবিষ্কার ও তার ব্যবহারের সাথে দরকার ছিল ভালো রাস্তা। রোমানরা প্রথম এটি বুঝতে পেরেছিল। তাই, তারা পাকা রাস্তাগুলি আরো বৃহত্তর আকারে বানানো শুরু করে। বহু শতাব্দী ধরে রাস্তার প্রযুক্তি উন্নতির সাথে সাথে চাকার ব্যবহার প্রশস্ত হওয়া শুরু করে।

১৫৩৪

গিয়াকোমো ক্যাপ্রোটি (লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ছাত্র) সম্ভবত ১৫৩৪ সালে সাইকেলের স্কেচ তৈরি করেছিলেন। অনেক প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ যেমন এই প্রমাণের সত্যতাটিকে নকল হিসাবে পরামর্শ দিয়েছেন তেমনি অনেকে এর বৈধতা স্বীকার করেছেন।

১৭৯০

১৭৯০ সালের সাইকেলের মডেল

বলা হয় যে, এই সাইকেলটির কোনো স্টিয়ারিং ছিল না, কোনো প্যাডেলও ছিল না তবে এটি ছিল সাইকেলের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। কাহিনি অনুসারে, এর চার চাকা ছিল (যদিও কোনো কোনো ইতিহাসবিদ কেবল দুচাকার কথা বলেছেন) এবং একটি আসন ছিল। চালকরা তাদের পা দিয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে খুব অল্প দূরত্বে চালাতে পারতো।

১৮১৭

এই সাইকেলকে বলা হতো ‘রানিং মেশিন’ বা ‘শখের ঘোড়া’। এটি আবিষ্কার করেছিলেন জার্মান আবিষ্কারক ব্যারন কার্ল ভন ড্রাইস। যদিও আধুনিক সাইকেলগুলোর সঙ্গে  তুলনা করলে এটি সাইকেল হিসেবে অচেনা হতে পারে। এই সাইকেল চালানোর জন্যে বসেই পা দিয়ে ঠেলে ঠেলে চলতে হতো। সামনের চাকার দিকে একটি হ্যান্ডেলবারও ছিল। ঐসময় ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের বেশ কয়েকটি নির্মাতারা তাদের নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করেছিল।

শখের ঘোড়া

১৮৩৯

প্রমাণ রয়েছে যে, স্কটিশ কামার কিরকপ্যাট্রিক ম্যাকমিলান সম্ভবত প্রথম যান্ত্রিকভাবে চালিত দ্বি-চাকাযুক্ত গাড়িটি তৈরি করতে পেরেছিলেন। এই সাইকেলের বসার সিটটি ছিল নিচু। বসতে কিছুটা কষ্ট হতো। পেছনের চাকা সামনের চাকার তুলনায় ছিল বড়।

১৮৬০

এই সাইকেলটির নাম ছিল ভেলোসিপিড যা একটি দ্বি-চাকাযুক্ত সাইকেল। যার সম্মুখ চাকায় প্যাডাল এবং ক্র্যাঙ্ক ছিল। সাইকেলটির ধাতব টায়ার কাঠের ফ্রেমের সংমিশ্রণে গঠিত যা বাঁকা রাস্তায় খুব অস্বস্তিকর ছিল। এই সাইকেলে আপনি চালালে আপনার পুরো শরীর কাঁপতে থাকবে। এই কারণে এই সাইকেলটি Bone shaker ডাকনাম অর্জন করে। ১৮৬০ এর দশকের সময় এটি ফ্রান্সে উদ্ভাবিত হয়েছিল এবং ১৮৬৭-১৮৬৯ এর মধ্যে মাইচাক্স সংস্থা প্রথম বাজারজাত শুরু করেছিল।

১৮৭০

‘বোনশেকার’ এর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ইউগেন মায়ার ডিজাইনের উন্নতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এই সাইকেলটির সামনের চাকাটি ছিল বেঢপ বড় আর পেছনের চাকা ছিল খুব ছোট। সামনের বড় চাকার ওপর বসে চালাতে হতো। প্যাডেল ও হ্যান্ডেলার ছিল সামনের চাকায়। আগেকার সাইকেলের তুলনায় এই সাইকেল নিয়ন্ত্রণ কিছুটা সহজ ছিল। এটিই  প্রথম মডেল সাইকেল যা বাইসাইকেল হিসাবে পরিচিতি পায় এবং ১৮৭০ থেকে ১৮৮০ সালের মধ্যে খুব জনপ্রিয় ছিল। এই সাইকেলের ছিল রাবারের টায়ার, যা চালককে পূর্বের চেয়ে বেশি আরাম দিতো।

বোনশেকার সাইকেল

১৮৭৬

১৮৭৬ ​​সালে একজন ইংরেজ হ্যারি জন লসন এই বিপ্লবী সাইকেলটি আবিষ্কার করেছিলেন যা আধুনিক সাইকেলের রূপ বলা হয়। এই বাইকটিতে তিনি একটি শক্তিশালী ধাতব চেইন দেন যার সঙ্গে যুক্ত করেন দুটি প্যাডেল ও দুটি চাকা। বলা যায় তখন সত্যিকারের সাইকেলের জন্ম হয়। সমসাময়িকদের তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি দামের কারণে লসনের এই মডেলটি বাজার ধরতে ব্যর্থ হয়েছিল। পরে আরেক ইংরেজ জন কেম্প স্টারলি প্রথম বাণিজ্যিকভাবে মডেলটির সফল সংস্করণ ‘রোভার’ তৈরি করেন। পূর্বসূরীদের তুলনায় এই সাইকেলগুলো প্রথম দিকের সাইকেলগুলোর তুলনায় অধিক সুরক্ষিত ছিল। এটিতে সরাসরি স্টিয়ারিং যুক্ত ছিল বলে খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।

ইউগেন মায়ারের ডিজাইন করা সাইকেল

১৮৮৮

১৮৮৮ সালে জন আইরিশ উদ্ভাবক জন বয় ডানলপ বিদ্যমান শক্ত-রাবারের টায়ারের পরিবর্তে রাবারের টায়ারে বায়ু ভরাট করার ধারণাটি নিয়ে এসেছিলেন। এই উদ্ভাবকের ধারণাটি আসে তার ছেলের জন্য। তার ছেলের একবার ভারি সর্দি হয়। একজন ডাক্তার তাঁর এই ভারি সর্দি কাটাতে তার ছেলেকে সাইক্লিং করতে বলেছিলেন। ডানলপ লক্ষ্য করলেন যে, তার ছেলেকে খুব অস্বস্তির সঙ্গে সাইকেল চালাতে হতো। তিনি তার ছেলের সাইকেল চালানোটা কিছুটা সহজ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি সাইকেলটিতে বায়ু ভর্তি রাবারের সঙ্গে তৈরি টায়ারে লাগালেন। তার ছেলেকে এবার এই টায়ারের সাইকেল চালাতে বললেন। এরপর ছেলের সাইক্লিং দেখে বুঝতে পারলেন তিনি কী সাফল্য রচনা করেছেন। তাই, তিনি দ্রুত এটি পেটেন্ট করেন। তার আবিষ্কারটি শিগগিরই বিখ্যাত সাইক্লিস্ট উইলি হিউমের সহায়তায় আসে। যারাই সেই সময়ের রেসিং ইভেন্টগুলোতে ডানলপের এই টায়ার গ্রহণ করে এবং তারাই প্রথম হয়ে যায়।

রোভার সাইকেল

চাকা ঘুরতে ঘুরতে…

বিংশ শতাব্দীতে সাইকেলের নকশাগুলোতে আক্ষরিক অর্থে বিস্ফোরণ ঘটেছিল। সাইকেল এর সাসপেনশন থেকে শুরু করে টায়ার ডিজাইনের উন্নতিও করা হয়েছিল। সাইকেলগুলো আরও হালকা এবং শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নকশায় হয়ে উঠেছিল আকর্ষণীয়। এখনকার দিকের সাইকেলগুলো অনেক ক্যাটাগরির দেখা যায়। পাহাড় পর্বতের জন্য যেমন একধরনের সাইকেল তেমনি রেসিং এর জন্য আরেক রকম। বিভিন্ন দেশে সাইকেলের জন্য আলাদা রাস্তাও রয়েছে। আশা করা যায়, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাইকেলের আরও পরিবর্তন হবে।

সাইকেল চালানোর উপকারিতা

সাইক্লিং হাসি

কার্ডিওভাস্কুলার সুস্থতা: বিভিন্ন স্টাডি এবং রিসার্চ এবং কমন সেন্স বলে যেযেকোনো এরোবিক ব্যায়ামের মত সাইক্লিং করলেও হার্ট স্ট্রং হয়, হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যায়।

ক্যালোরি বার্ন করে ওজন কমাতে সাহায্য করে: ৭০ কেজি ওজনের একজন ব্যাক্তি ১ ঘণ্টা সাইকেল চালালে প্রায় ৪৫০ ক্যালোরি বার্ন করতে পারে।

মাশল বাড়ে ও শক্তি বৃদ্ধি পায়: সাইকেল চালালে প্রচুর পেডেল মারতে হয় যাতে পায়ের, ঊরুর, নিতম্ব এবং সম্পূর্ণ বডির কোর স্ট্রেংথ বৃদ্ধি পায়, অর্থাৎ সাইক্লিং আপনাকে লিন মাশল তৈরি করতে সাহায্য করবে।

চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি পায়: সাইক্লিং করলে ব্রেনের হিপোক্যাম্পাস অঞ্চলের কোষ তৈরি হয় যা স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করে। University of Illinois এর কয়েকজন গবেষক বের করেছেন যে যারা নিয়মিত সাইক্লিং করে তারা সাধারণ মানুষের তুলনায় মেন্টাল টেস্টগুলোতে প্রায় ১৫% এগিয়ে থাকে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে: University of North Carolina এর কয়েকজন গবেষক জানিয়েছেন যে, যারা নিয়মিত সাইকেল চালায় তাদের অসুস্থ হওয়ার প্রবণতা প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়।

টাকা ও সময় সাশ্রয়: সাইকেল চালালে সবখানে রিকশা, ট্যাক্সি ব্যবহার বন্ধ হবে যাতে অনেক টাকা বেঁচে যাবে! আজকাল সবজায়গায় যে ভয়াবহ ট্র্যাফিক জ্যাম লেগে থাকে তাতে একটা সাইকেল থাকলে খুব সহজেই সাইকেল লেন বা গাড়ির চিপা (!) দিয়ে পার হয়ে যাওয়া যায়।

পরিবেশ-বান্ধব: সাইকেল থেকে তেলের গাড়ির মত বিষাক্ত ধোঁয়া বের হয় না তাই সাইকেল চালিয়ে হয়তো আপনি দুনিয়াটাকে গ্লোবাল ওয়ার্মিং থেকে বাঁচাতে সাহায্য করবেন!