।। মওদুদ রানা, রাজশাহী ।।

আশরাফুলের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায়। পরিবারের করোনাক্রান্ত সদস্যদের ভর্তি করিয়েছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে। স্বজনদের জীবন বাঁচাতে নিজে সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েই রাতদিন থাকছেন তিনি।

“প্রতিদিন এতো মৃত্যু হচ্ছে, আপনি না দেখলে বিশ্বাস করবেন না। কারো মৃত্যুতে এখন আর কেউ কাঁদে না। থাকে না হা-হুতাশ অথবা কান্নার রোল। হয়তো মন খারাপ হয়। চোখের কোনে হয়তো এক চিলতে পানি জমে, এই এতটুকুই।” বলছিলেন আশরাফুল।

কেন এরকম পরিস্থিতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এখানে সবাই নিজেকে নিয়ে শংকায় থাকে। কখন কী হয়। আর যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু দেখতে দেখতে সকলেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন আশেপাশের মৃত্যুর মিছিল কাউকে নাড়া দেয় না। বরং আমার নিজের মনে হয়, মৃত্যু নয় এ যেন যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাচ্ছে সবাই।”

রামেক হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ড ঘুরে দেখা মিললো বিভীষিকাময় দৃশ্যের। রোগীদের এমন যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতি ঠিক ভাষা দিয়ে বোঝানো দুস্কর। নানা বয়সী করোনাক্রান্ত মানুষ। সুস্থ থাকতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাস্ক পড়েছিলেন কি না জানান উপায় নেই। কিন্তু এই হাসপাতালের বিছানায় এখন তাদের সবার মুখে অক্সিজেন মাস্ক।  

কে জানে, হয়তো আমাদের একটু সচেতনতা, একটু মাস্ক ব্যবহার এই বৃদ্ধ মানুষটিকে এমন সংকটাপণ্ণ অবস্থায় ফেলতো না। অক্সিজেন মাস্ক মুখে বিভীষিকাময় যে দিন কাটছে এই মানুষটির, এখনই সতর্ক না হলে এই ফ্রেমে একদিন আপনার-আমার ছবিও যুক্ত হতে পারে।

আলোকচিত্রী: তারেক মাহমুদ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের ৬৫ বছর বয়সী মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ আলীর কথাই বলি। রোববার দুপুরে যখন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন তখন শরীরে জ্বর। সমস্যা হচ্ছিল শ্বাস নিতে। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক পরীক্ষা করে দেখেন মুক্তিযোদ্ধার শরীরে অক্সিজেন-এর মাত্রা মাত্র ৮০ ভাগ। চিকিৎসক দ্রুতই তাকে হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেন।

এক সপ্তাহ আগেও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন করোনা ও উপসর্গে রোগী ভর্তি হতো ১৫ জন। এখন সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ জনে। তাদের বেশিরভাগই ইউসুফ আলীর মতো শরীরে অক্সিজেন স্বল্পতা যখন প্রকট হয় তখন হাসপাতালের দ্বারস্থ হন।

রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, শরীরে অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯৭ ভাগ এর নিচে নেমে আসলে শ্বাসকষ্ট হওয়াটা স্বাভাবিক লক্ষণ। সে বিষয়ে সর্তক হওয়া খুবই জরুরি। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা হচ্ছে না। যখন শরীরে অক্সিজেন স্বল্পতা প্রকট হয় তখন তারা হাসপাতালে আসছেন। তিনি বলেন, “চিকিৎসকদের শত চেষ্টা থাকলেও অবস্থা বেগতিক হওয়ায় আমাদের বলতে গেলে কিছুই করার থাকে না।”

তিনি আরও জানান, এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও আছে। সেটি হচ্ছে স্যাচুরেশন কমে গেলেও বুঝতে না পারা। যাকে বলা হয় হ্যাপি হাইপোক্সিয়ার।

পরিচালক বলেন, “হ্যাপি হাইপোক্সিয়ার-এর বৈশিষ্ট্য এমন যে, শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা ৭০ থেকে ৫০ ভাগে নেমে গেলেও আক্রান্ত ব্যক্তি কোনও সমস্যাই টের পান না। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হল কোনও সমস্যাই দেখা না যাওয়ায় সময় মতো চিকিৎসাও শুরু করতে পারেন না আক্রান্তরা। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই হ্যাপি হাইপোক্সিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি হঠাৎ করেই মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন।”

সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে শামীম ইয়াজদানী বলেন, “অক্সিজেন স্বল্পতায় বা শরীরে অক্সিজেন-এর মাত্রা হঠাৎ করে নেমে যাওয়ায় হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে।”

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “চাঁপাইনবাববগঞ্জ থেকে রাজশাহীতে মৃত্যুর হার কম। এর কারণ রাজশাহীতে কারও শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে সে দ্রুত হাসপাতালে আসতে পারছে, এবং চিকিৎসা নিয়ে অনেকাংশে জীবন রক্ষা করতে পারছে। কিন্তু চাঁপাইনবাববগঞ্জ থেকে আসতে সময় লাগে। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি উপসর্গ বুঝে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলেও দেরিতে চিকিৎসা শুরু হওয়ায় মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছে।”

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দক্ষিণের শেষপ্রান্তে অবস্থিত ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ড। তার পাশেই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)। এগুলো মূলত ব্যবহার করা হচ্ছে করোনা চিকিৎসায়। ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের সামনে দেখা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার রানাউল ইসলামে সঙ্গে। রানাউলের নানা ও মামা এখানে চিকিৎসাধীন। তার দাবি, গত কয়েকদিনে তিনি চোখের সামনে অন্তত ২০ জনকে মৃত্যুবরণ করতে দেখেছেন।

রানাউল বলছিলেন, “একজন আক্রান্ত ব্যক্তি হয়তো একটু ভালো আছেন। শুয়ে, বসে থাকছেন। কিন্তু হঠাৎ করে দেখবেন, কমে যাচ্ছে তার শরীরে অক্সিজেন। কমে যাচ্ছে রক্ত চাপ। বাড়ছে হৃদস্পন্দন। সেই লোকটা তখন পাগল প্রায়। ঘন ঘন শ্বাস র চেষ্টা করছেন। কিন্তু পারছেন না। পেট ফুলে যাচ্ছে, খিঁচুনি হচ্ছে, হাত পা ছোঁড়াছুঁড়ি করছেন। কিন্তু অক্সিজেন শরীরে প্রবেশ করছে না। পুকুরে অক্সিজেনের অভাব হলে পানির উপরে উঠে মাছেরা যেমন খাবি খায় ঠিক তেমন। এরকম করতে করতেই একসময় মৃত্যু হয়। তখন অক্সিজেন দিয়েও আর কাজ হয় না।”

চারপাশে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর মিছিল। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় এতটুকু বাতাসের জন্য আকুলি বিকুলি করা প্রাণ। এ যেন চোখের সামনে নরক-যন্ত্রণা। তার মাঝে স্বজনকে বাঁচাতে মানুষের অসহায় অপেক্ষা। কে জানে, মহামারির এই ক্রান্তিকালে যদি সবাই অন্তত মুখগুলো মাস্কে ঢাকতো, তাহলে হয়তো অন্যদের এমন দুঃসহ দিন দেখতে হতো না।

আলোকচিত্রী: তারেক মাহমুদ

প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লেখ করা সেই আশরাফুল জানান, করোনা ওয়ার্ডে রোগীদের সঙ্গে যারা অ্যাটেন্ডেন্ট হিসেবে থাকছেন, তাদেরও দুর্বিষহ দিন পার করতে হচ্ছে। কখনো কখনো মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। তার বক্তব্য, “আক্রান্তরা আমার আপনজন। মা, বাবা, চাচাকে ফেলে কোথায় যাবো। আজ যদি আমি তাদের না দেখি, বিপদে পড়লে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাকে দেখবে না।”

রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা যে শুধু বয়স্ক বা মাঝবয়সীদের বিপদে ফেলছে, তাই নয়। কম বয়সী বা যুবকদের ক্ষেত্রেও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। রাজশাহী নগরের যুবক সৈকত প্রায় এক সপ্তা ধরে করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অক্সিজেন মাস্ক খুলে দিলেই তার শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা ৯০-এর নিচে নেমে চলে আসছে। চিকিৎসা চলাকালেও এই চিত্র বলে দেয়, বিপদের মাত্রাটা।

হাসপাতালের হিসেব মতে, গত ৯ দিনে রামেক হাসপাতালে মারা গেছেন অন্তত ৬১ রোগী। যার মধ্যে ৩২ জন পজিটিভ এবং ২৯ জন করোনা উপসর্গে আক্রান্ত। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২১৬ রোগী ভর্তি। এরমধ্যে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ১৬ জন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, “বেলা ১২টা পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি ২১৬ জন। ভর্তি রোগীর দিক থেকে এটি সর্বোচ্চ। গত বছর সর্বোচ্চ রোগী ছিল ১৩৬ জন। এখন গড়ে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ জন রোগী ভর্তি হচ্ছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক।” 

এই প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের গাইডলাইন ও যথাযথ দূরত্ব মেনে পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রীসহ প্রতিবেদক ও আলোকচিত্রী কাজ করেছেন। চিকিৎসাসেবায় ব্যাঘাত সৃষ্টি কিংবা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে এমন যেকোনো আচরণ থেকে সংবাদসংগ্রহকারী দল বিরত ছিলো।