।। শামীউল আলীম শাওন ।।

‘ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা নিজের পরিচয়ে পরিচিত হবো। তাই অন্য কোনো পেশার চেয়ে ব্যবসাটাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। কারণ আমার কাছে মনে হয়েছে এটা একাটা স্বাধীন পেশা। আর এখানে নিজ পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার সুযোগ আছে। তাই নিজেকে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিভিন্ন সময় নানান ধরনের ব্যবসায়িক উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। কিন্তু তাতে ব্যর্থ হয়েছি। পরিবার থেকে নেয়া অর্থগুলো বিনিয়োগ করে পানিতে গেছে। তবুও থেমে থাকিনি। নিজের মধ্যে আগ্রহ ধরে রেখেছি। বারবার চেষ্টা করে গেছি।’

কথাগুলো একভাবে বলে গেলেন হার না মানা একজন সফল তরুণ নারী উদ্যোক্তা মাহবুবা আক্তার জাহান বাঁধন। তিনি ‘বাঁধন ফুড’ এর স্বত্বাধিকারী ও উইমেন এন্ড ই-কর্মাস ফোরাম-উই’র রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি। তার বাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার বজরাপুর এলাকায় হলেও বর্তমানে থাকেন রাজশাহীর রাজপাড়া থানাধীন পুলিশ লাইন এলাকায়। তিনি জেলার পবা থানাধীন হাট রামচন্দ্রপুর ডিগ্রি কলেজে ডিগ্রিতে পড়াশোনা করছেন।

তরুণ নারী উদ্যোক্তা মাহবুবা আক্তার জাহান বাঁধন জানান, বারবার ব্যর্থ হওয়ার পরও আমি হাল ছেড়ে না দিয়ে বরং শক্ত হয়ে চেষ্টা করেছি। এভাবেই চেষ্টা করতে গিয়ে ‘উইমেন এন্ড ই-কর্মাস ফোরাম-উই’ গ্রুপে যুক্ত হই। সেখানে যুক্ত হয়ে নতুন উদ্যোগের উৎসাহ পাই। ব্যবসা করে সফলতা অর্জন করার মত আইডিয়া বা কনসেপ্ট পাই। সেটা নিয়ে অগ্রসর হই।

কীভাবে উই গ্রুপে যুক্ত হওয়ার এমন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গিয়ে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত সংবাদে জানতে পারি যে একজন নারী উদ্যোক্তা সপরিবারে অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। সেই সংবাদের মধ্যেই উই সম্পর্কে জানতে পারি। উনিও খুব সম্ভবত উই এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরে এ অগ্নিদগ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে একটি শোকবার্তা লিখে উই গ্রুপে প্রথম পোস্ট করি। সেখান থেকেই আমার যাত্রা শুরু উই গ্রুপে।

শুরুতেই পণ্যকে নয় বরং নিজেকে পরিচিত করে তোলার উদ্দেশ্যে রাজশাহী জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও দর্শনীয় স্থানগুলো নিয়ে গ্রুপে পোস্ট দিতাম। এর মাধ্যমে খুব অল্পসময়ের মধ্যেই গ্রুপে পরিচিতি লাভ করি। পরিচিত লাভের পরে রাজশাহীর বিখ্যাত আম নিয়ে পোস্ট দিই। সেখানে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিই খাঁটি পণ্যের নিশ্চয়তার। চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিজস্ব জমিতে উৎপাদিত ভেজালমুক্ত খাঁটি পণ্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হই। যা গ্রুপের সকলের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে ও গ্রহণযোগ্যতা পায় বলে জানান তিনি।

এই নারী উদ্যোক্তা বলেন, আমের মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই চিন্তা করি নিজের ব্যবসাকে কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়। সেই চিন্তা থেকেই মাথায় আসে ভেজালমুক্ত খাঁটি খেজুরের গুড়ের। যেই চিন্তা সেই কাজ। শুরু করে দিই গুড় নিয়ে কাজ। হতাশ হতে হয়নি। আমের মতই বরং বলা যায় তার চেয়েও বেশি সাড়া ফেলে খেজুরের গুড়। শুধু আম যেখানে বিক্রি হয় এক লক্ষ টাকার মত সেখানে উই’তে প্রায় ২৩ লক্ষাধিক টাকার খাঁটি খেজুরের গুড় বিক্রি করি। মাত্র তিন মাসে প্রায় ১৫ হাজার কেজিরও বেশি খেজুরের গুড় বিক্রি হয়।

আম আর খেজুরের গুড়ের পাশাপাশি তিনি ঘরোয়াভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন রকমের খাঁটি মসলা, দেশি হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলের মাংস, মেশিনে ও গরুর ঘাঁনিতে ভাঙা সরিষার তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করতে থাকেন। এদিকে স্পেশাল আইটেম হিসেবে তার নিজস্ব পদ্ধতিতে উৎপাদিত ঝালমুড়ি মশলার বিক্রিও চলে। যা বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়। ফলে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তা অবধি তিনি শুধু ঝালমুড়ি বিক্রি করেছেন প্রায় দেড় লক্ষাধিক টাকার।

সফল নারী উদ্যোক্তা বাঁধন বলেন, নারীরা কেন পুরুষের আয়ে নির্ভরশীল হয়ে বাড়িতে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকবে? সেটা আমার কাম্য নয়। এই আদি প্রথাকে ভেঙে দিতে সক্ষম হয়েছি। আমি নিজে আমার সংসারের দায়িত্ব নিয়েছি। ছেলে-মেয়েদের ব্যয়ভার গ্রহণ করেছি। আমি মনে করি পুরুষ যদি স্বামী হিসেবে স্ত্রী আর সন্তানদের দায়িত্ব নিতে পারে তবে নারী কেন স্ত্রী হিসেবে স্বামী ও সন্তানদের দায়িত্ব নিতে পারবে না?

এখনও সফল উদ্যোক্তা হতে পারিনি বলে মন্তব্য করে হার না মানা এই নারী উদ্যোক্তা বলেন, আমি মনে করি আমার শেখার এখনও বাকি আছে। অনলাইনে সফল উদ্যোক্তা হতে হলে যেসব জ্ঞান, দক্ষতা আর অভিজ্ঞতা থাকা প্রয়োজন সেইসব এখনও পূর্ণতা পায়নি। অর্জন করতে পারিনি।