আমার মায়ের চারপাশে মেঘের মত কেমন এক পাতলা কালো চাদরের ছায়া। সবসময় আমি এমনই দেখি আমার মাকে। অনেকটা ’এ ক্লাসিক হিরোইন অফ এ ট্রাজিক বুক’। কিন্তু এ বিষাদের কারণ ঠিক বুঝতে পারি না। বাবা যে মাকে ভালোবাসেন তাতে কোনো প্রকার সন্দেহ নেই। মাঝে মাঝে ফুলের তোড়া হাতে ঘরে আসেন। বলেন, অরু অরুণা কোথায় গেলে তুমি?

মা আসেন। ফুলের তোড়া নেন। তারপর একটু হেসে বলেন, আজ আবার কী পর্ব?

পর্ব! একমাত্র স্ত্রীকে একটু আদর করে ফুল দেব, পর্ব লাগবে নাকি। আমার বাবা সাজেদ সোবহান ছিলেন একটু রোমান্টিক মানুষ। চাঁদ উঠলেই বাড়ির ছাদে ওদের দুজনকে দেখেছি। বাবা গুন গুন করছেন। আর মা বাবার কাঁধে মাথা রেখে চুপচাপ, একেবারে নিথর। চাঁদের নিচে দুজন চাঁদপাগল মানুষ। আমি এমন দৃশ্য দেখে ফিরে এসেছি।

নানির বাড়িতে যেতে আমার খুব ভালো লাগতো। মা সবসময় নানির বাড়িতে যেতে চাইতেন না। মনে হয় মায়ের দুঃখের কারণ ওই নানি বাড়ি। মা কি বিয়ের আগে কাউকে ভালোবাসতেন? হতেও পারে। তারপর নানা নানিরা দুম করে মা’কে বিয়ে দিয়েছেন তার অমতে। এমনই কিছু হবে। নানা আর নেই। কোন কারণ নেই হঠাৎ দুই একদিন এমন দৃশ্য দেখেছি মা আঁচলে চোখ মুছছেন। এবং তখন আমার মনে হয়েছে এমন কী কারণ এখন তাকে চোখ মুছতে হবে। অনেকে সুখে কাঁদে আমার মা বোধকরি সেই কারণে কাঁদতেন। আমরা থাকতাম ঢাকার গুলশানে আর নানি থাকতেন পুরনো ঢাকায়। ওখানে যাওয়াটা একটু মুশকিল কিন্তু একবার ওখানে পৌঁছালে আনন্দ রাখার জায়গা ছিল না। নানি একজন অসাধারণ নারী। যিনি এককালে লেখালেখি করতেন। এখন লেখেন না। পড়েন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। নানির সঙ্গে কথা বলতে আমার বেশ লাগে। প্রাচীন বটগাছের মত ছায়া আর মায়ায় অপরূপ একজন। আমি যখন ছাদে যাই দেখি ছোট মামা ছাদে ঘুড়ি ওড়াচ্ছেন। আমার চাইতে তিন বছরের বড়। নানির শেষ সন্তান। বড় মামা সজীব আর সুজন পড়াশোনা শেষ করে ফেলেছে। ওরা চাকরি করে। একজন লন্ডনে একজন মনিট্রলে। তাই ও বাড়িতে কেবল নানি আর ছোটমামা। ছোট মামা বড় মামাদের চাইতে অনেক ছোট, প্রায় বিশ বছরের ব্যবধান। বড় মামারা দুই জমজ ভাই। সবচেয়ে বড় আমার মা। ছোট মামার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল একেবারে বন্ধুর মত। কমলকে আমি কখনো মামা বলতাম না। ওকে ডাকতাম, কমল করে। ও বলতো, তুই আমাকে মামা বলিস না কেন? আমি না তোর তিন বছরের বড়।

আমি ছোটমামার গলা ধরে বলতাম, তুই না আমার বন্ধু কমল। বন্ধুকে মামা বলতে হবে নাকি? কমলের আঙুরের মত থোকা থোকা কালো চুল তার ভেতরে জেগে থাকে কমলের মত একখানা অপূর্ব মুখ। বড় বড় পল্লব কমলকে কেমন অসাধারণ করে তোলে। যেন এই পৃথিবীর ভাবনায় ভাবিত, ভাবুক, কমল নামের এই ছেলে, এই পৃথিবীর অপার সৌন্দর্যে যার কোনো ক্লান্তি নাই। এমন আঙুর গুচ্ছের মত চুল সচারাচর চোখে পড়ে না।

সময় পেলেই ও বলে, ঠিক আছে। চল ছাদে যাই। কমল আর আমি এবার নানিবাড়ির বিশাল ছাদে। মনে মনে ভাবতাম যখন ঢাকা শহর থেকে ছাদ চলে যাবে বড় বোরিং হবে সবকিছু। যেমন বোরিং হয়ে উঠছে অ্যাপার্টমেন্টের বস্তি। আমাদের গুলশানের বাড়িটা এখনো গাছপালা নিয়ে সেই প্রতিযোগিতায় নামেনি। আমার বাবা ওইসব অ্যাপার্টমেন্টের ডেড এগেনস্টে। বলেন, বাড়ি ভেঙে অ্যাপার্টমেন্ট? ওভার মাই ডেড বডি। মা ও তাই বলেন। বলেন, এই খোলামেলা বাড়ি আমার পছন্দ, ফ্লাটট্লাট নয়। বোধকরি সেই কারণে বাবা আর কোনদিন ফ্লাট করবার কথা ভাবছেন না। মা সেই কারণে খুশি। কিন্তু এই খুশির খবর বলতে গিয়ে মায়ের চোখ ছল ছল। বাবা বলেন, ফ্লাট হবে না বলে মন খারাপ, না বাড়িটা এমনই থাকবে সেই আনন্দে চোখ ছল ছল তোমার?

মা কোনো উত্তর দেন না। বাবার ছাদের বাগান থেকে একটি ফুল তুলে এনেছেন মায়ের মৌচাকের মত ঘন খোঁপায় পড়াবেন বলে। মা মাথা এগিয়ে দেন। বাবার এইসব কাজ কারবারে মা অভ্যস্ত।

মা আমি নানি বাড়ি যাব। ওখানে ছাদে ঘুড়ি ওড়াতে ভালো লাগে।

ওসব ঘুড়ি ওড়ানো ছেড়ে দাও মিতি।

কেন কী হয়? কমল তো ওড়ায়। মা বলেন, ঠিক আছে। কিন্তু এখন ষোলোয় পড়েছো। এখন এসব ছেলেমানুষী করা কী ঠিক।

কমল তো করছে। এবার ও আইএ পাশ করে য়ুনিভার্সিটিতে ঢুকেছে।

ও তো ছেলে মিতি।

মা কমলকে তোমার কেমন লাগে?

কেমন লাগে আবার? ভালো। মেধাবী ছেলে।

এই বলে মা চলে যান ঘরসংসারের কাজে। ঘর ঝাড়বেন, মুছবেন, ফুল বদলাবেন, ফটোগুলো কাপড় দিয়ে মুছবেন। শেলফের বই থেকে ধুলো ঝাড়বেন, রান্নাঘরের তাক গোছাবেন। তারপর বাবার ফিরে আসবার কথা ভেবে একটা মিষ্টি কিছু তৈরি করে রাখবেন। ছানার পায়েশ না হলে সুজির মোহনভোগ। আর এইসব কাজের মধ্যে দুই একবার বড় বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন। বুকের হাঁপড়ে বাতাস ভরে নেবার জন্য পেছনের দরজা খুলে বাগানে নেমে আসবেন। সেখানে একটা বড় গাছ আছে। তারি তলায় দাঁড়াবেন। তারপর ফিরে আসবেন বাগানের কাঁচা লংকা না হলে কিছু টমেটো তুলে এনে। না হলে একটু দেখবেন একটা প্রজাপতি কেমন করে হলুদ গাঁদায় এসে বসেছে।

সেদিন নানি আর ছোট মামা এসেছেন। মায়ের শরীরটা তেমন ভালো নেই। নানি বলেন, কী হয়েছে রে অরুণা। জামাই বেশ চিন্তিত।

আমি কী করে বলি বল?

কমল মায়ের বিছানার কাছে দাঁড়িয়ে বলে, আপি কেমন আছো তুমি?

যেন কমলের মুখ নয় আলোর জ্যোতি। মা তাকিয়ে আছেন ওর মুখের দিকে। অনেকক্ষণ। বোধকরি ভাবছেন এত সুন্দর এই ছেলে কী আমার ভাই? বিশ্বাস হতে চায় না। বড় দুই মামা মোটামুটি। মাও তেমন কিছু সুন্দর নয়। চুল অরণ্য, আর চোখ দুটো অগাধ আকাশের ছায়া ফেলে বিপুল সুন্দর। এছাড়া আমার কালো মা ছোট ভাইয়ের সৌন্দর্যের কাছে একেবারে কিছুই না।

আমি? ভালো। এই বলে দেয়ালের দিকে মুখ করেন। নানি বলেন, এই কমল তুই আর মিতি স্ক্রাবল না হলে ব্যাক গামোন খেল। রোগীর ঘরে বিরক্ত করতে নেই।

রোগীর ঘর? কী হয়েছে আপির? কমল ছটফটিয়ে বলে। জানালা দিয়ে একটু আলো এসে পড়েছে কমলের কোঁকড়া সুন্দর চুলে। যেন কার্লারে ওর চুলগুলোকে কেউ এমন করেছে। ওর চোখ দুটো মায়ের মত। এখানেই দুই ভাইবোনের মিল। দুজনের বিশাল চোখে পুরো আকাশের ছায়া। মায়ের সঙ্গে আর কোনো মিল নেই কমলের। দেয়ালে মুখ ফেরানো আমার মা বলেন, কি হয়েছে? যমদূতে ডাকছে।

কী বললি। নানি বিরক্ত হন। বলেন, পিঠে হাত রেখে, এত তাড়াতাড়ি যম কেন ডাকবে তোকে? মিতিকে বিয়ে দিতে হবে না?

কমল হেসে বলে, আমার বিয়ের পর তুই মারা যাস আপি।

বুঝতে পারে সকলে মায়ের দেয়ালের দিকে ফেরানো চোখে এখন দুর্নিবার অশ্রু। নানি চোখ মুছতে মুছতে বলেন, তোরা চলে যা। দেখছিস না আবার আমার অশ্রুকণা কাঁদছে। নানি মায়ের এই কান্নার রোগ দেখে মাকে ওই নামে ডাকেন, অশ্রুকণা। নানি মাঝে মাঝে বলেন, এমন সুখের সংসারে কেঁদে কেঁদে মেয়েটা সত্যিই একটা সত্যিকারের দুঃখ ডেকে আনবে।

নানির ভবিষ্যত বাণী সত্যি হলো। ‘অংকোলজিস্ট’ বলেন মায়ের ক্যান্সার হয়েছে। বাঁচতে পারে ছয়মাস খুব বেশি হলে আড়াই বছর। খুব বেশি হলে তিন বছর। তাহলে মা দুঃখ করতে করতে সত্যিই একটা সত্যিকারের দুঃখ ডেকে আনলেন। যা মাকে নিয়ে যাবে বলে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। আমিও চোখ মুছি। কমল আমার হাত ধরে বলে, চল আমরা ওই ঘরে যাই।

বাবা সেই সংবাদের ধকল সামলে বলেন, এই কয়দিন তোমাকে আমি সুখে রাখবো। বলো, কী চাই তোমার? বলো কোনো গোপন ইচ্ছা আছে তোমার? কোনো সুপ্ত বাসনা?

মা বলেন, না। কেবল কষ্ট আমার তোমাকে নিয়ে। তুমি বড় নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে সাজেদ। তুমি আমাকে যা দিয়েছো সে অনেক। কেউ একশ বছর সংসার করেও এত কিছু পায় না। এই বলে কেঁদে বালিশ ভেজান।

বাবা বলেন, এসব থাক।

বাবার কাজ হলো এরপর মায়ের কাছে কাছে থাকার। ঘরটাকে একটা ফুলবাগান করে ফেলে। মায়ের ঘরে সুরের অর্নিবাণ আলোয় ঘরের ভেতরে আনন্দনদী বইয়ে দেওয়া। আর তাই এ ঘরে অনেক সাহিত্যিক বাবার পাঠে ফিরে আসেন। অনেক বুলবুল গান করেন। বাবা মায়ের কাছে বসে নানা সব বই পাঠ করেন। না হলে গান বা গিটার ভায়োলিন ছেড়ে দেন। মা এসব শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যান। বাবা একটা রকিং চেয়ারে দোলেন।

সেদিন শুক্রবার। মা কে নাস্তা খাইয়ে বাবা বসেছেন কোনো এক বই নিয়ে। এক বছর চলে গেছে। ছয় মাসের প্রোগনসিস মিথ্যা করে তিনি বেঁচে আছেন। তবে মারা যাবেন সে ব্যাপারে ডাক্তারের কোনো সন্দেহ নেই। বলেন গোপনে বাবাকে, আমি জানি অনেক ক্যান্সার রোগী যারা ছাব্বিশ বছর পর্যন্ত বাঁচে। এমন দু একটা পেশেন্ট আমার আছে। কিন্তু সোবহান সাহেবও কিন্তু আড়াই বছরের বেশি বাঁচবে না। মানে আরো দেড় বছর।

সে তো অনেকদিন। বাবা বলেন। দেখা যাক এই সময়টুকু ওর জন্য সুন্দর ও আনন্দময় করা যায়। 

আমি এখন কলেজে যাই। কমল বিএ অর্নাস পড়ছে। ইংরেজিতে। ভয়ানক ভালো লাগছে ওর। প্রফেসরদের প্রিয় ছাত্র।

বলে একদিন মাকে, আপি তোর ভাই এত ভালো করছে সবগুলো সেমিস্টারে তোর ভালো লাগছে না। তোর প্রিয় বিষয়রে আপি। ইংরেজি সাহিত্য!

একটা নিস্পৃহ স্বর বলে, লাগছে কমল।

কমল স্বভাব সুলভ ছটফটানো সুরে বলে, তুই জেলাস তাই না রে আপি? নানি বলেছেন তুই ইংরেজিতে ভর্তি হয়ে দুই বছরের বেশি পড়তে পারিস নি। তারপর তোর বিয়ে হয়ে যায়? আর আমি পড়ছি। তাই জেলাস।

মা একটু হেসে বলেন, জেলাস? ঠিক তাই। তুই এখন এই ঘর থেকে ভাগ। আমি ঘুমাবো।

ঘুমাও হে ঘুম-সুন্দরী। ঘুমাও। আবার দেখা হবে। কমল চলে আসে আমার ঘরে।

আমার ঘরে ঢুকে ওর পড়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা করে কমল। কত সব সাহিত্যিক! স্টেইনবেক, হেমিংওয়ে, টনি মরিসন এবং এদের উপরে শেক্সপিয়ার। আমি এখনো য়ুনিভার্সিটিতে যাইনি। গেলে বাবার সাবজেক্ট ইকোনমিক্স পড়বো বলে ঠিক করেছে। বলে ও, ওই ঠাণ্ডা দেশ রাশিয়াতে এত বড় বড় দিকপাল কী করে যে জন্ম নিল ভাবতে পারি না। টলস্টয়, শোলোকভ, দসতেয়াভস্কি, বরিস প্যাস্টারনেক এবং আরো কত। ইস সাহিত্যের মত বিষয় আর হয় না রে মিতি। কত সব চরিত্র, কত সব ঘটনা। ঈশ্বর তো কেবল দুই প্রকার মানুষ সৃষ্টি করেন, ভালো আর মন্দ। আর ওইসব দিকপাল নানা ধরনের। ভালো, মন্দ, জটিল, কুটিল, কঠিন, সহজ, আনন্দময় যেমন তোর বাবা। 

এইসব নানা গল্প করে ও চলে যায়। ওর কথা শুনতে বেশ।

আর বিকালবেলা মায়ের ফলের রস দিয়ে ও ঘরে ঢুকতে গিয়ে দেখতে পাই বাবা ঝুঁকে আছে মায়ের মুখের দিকে আর মা কী যেন বলছেন। আমি পর্দার ওপারে একটু থমকে দাঁড়াই। মা বলছেন, সাজেদ তোমাকে কথা দিতে হবে।

কী কথা বল।

আগে আমার শরীর ছুঁয়ে বলো আমার কথা রাখবে।

একটু থেমে বাবা বলেন, রাখব। বলো কী কথা।

আমি মারা যাবার চল্লিশ দিনের ভেতর তুমি আবার বিয়ে করবে। কোনো এক সুন্দর হাসিখুশি মেয়েকে। যে তোমাকে সারাক্ষণই আনন্দময় রাখবে। আমার মত এমন একজন নয় যে তোমার সমস্ত সময় বিষাদে ভরিয়ে রাখে। বলো আমার এ কথা তুমি রাখবে?

বাবা মায়ের হাত ধরে আছেন। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ঠিক আছে। বলেন আবার, আমার জীবনপাত্র উচ্ছলিয়া মাধুরী করেছো দান। তুমি জানো নাই তুমি জানো নাই তার মূল্যের পরিমাণ।

মা বলেন, ঠিক আছে। বুঝলাম। কিন্তু তুমি কথা দাও তুমি আমার কথা রাখবে। 

বাবা তখন বেশ একটু সিরিয়াস আর দুখী মানুষের মত মায়ের হাত ধরে বলে, রাখব অরু।

মেয়েটাকে সুন্দরী হতে হবে আর তোমার মত রোমান্টিক।

চেষ্টা করব। কথা হলো দোকানে এমন মেয়ে পাওয়া যায় না। খোঁজাখুঁজির ব্যাপার আছে। তারপর সময় আবার চল্লিশ দিনের ভেতর। আল্লাহ সহায়।

এত দুঃখেও মা হেসে ফেলেন। 

খানিকপর আমি ঘরে ঢুকে ফলের রস মাকে পান করাতে যাই। বাবা বলেন, আমাকে দাও মিতি।

সময় চলে যায়। মা দিন দিন ক্ষয় হতে থাকেন। ক্যান্সার কারো প্রেমিক নয়। যাকে ধরে তাকে একেবারে শেষ করে। বলা যায় ক্যান্সার হলো নাছোড়বান্দা প্রেমিক। মৃত্যু অবধি তার থাকা চাই। মা শেষ হবেন আমরা জানি। নানি আর মা’তে কী যে সব কথা হয় আমরা শুনতে পাই না। কমল একটু দেখে আমার ঘরে চলে আসে। ও ইংরেজিতে খুব তাড়াতাড়ি অনার্স শেষ করবে। এবং একটা রেকর্ড ব্রেকিং নাম্বার পাবে। কমল বলে, আপিটা এই পৃথিবীকে ভালোবাসতে পারেনি। তাই এমনভাবে অসুখটা ওকে ধরে ফেলেছে। অবাক লাগে তোমার বাবার মত অসাধারণ একজন মানুষকে কাছে পেয়ে কেউ কী করে এত দুঃখী হয়। কমল কখনো আমাকে তুই আবার কখনো তুমি বলে।

কী জানি রে কমল। এরপর বলি, তুমি একটু সাহিত্যের গল্প করো না। ও বলে, আজ থাক। খানিক আগে যে বিছানায় একেবারে মিশে গেছে তার দিকে তাকিয়ে কোনো গল্প ওর মনে পড়ছে না। বলে ও, মিতি আমি পরীক্ষার রেজাল্টের পর অক্সফোর্ড যাব। প্রথমে পড়বো তারপর পড়াবো।

পড়াবে? অক্সফোর্ডে? কেমন করে?

কেন আর সব অধ্যাপক আছেন না? তেমন করে।

ওরা তো সব ডাকসাইটে ইংরেজ না হলে আমেরিকান না হলে পশ্চিমের কেউ।

এবার এই পূর্বের কমল সে কাজ করবে।

তুমি কী করে শিওর হলে ওখানে তুমি কাজ পাবে?

আই টসড দ্য কয়েন। বলেই ও হাসে। অসম্ভব শব্দটি শুনেছি বোকাদের ডিকশনারিতে থাকে। বলে, দুঃখ এই আপিটা হয়তো সে খবর জানবে না। ওর ও সখ ছিল য়ুনিভার্সিটির ইংরেজির অধ্যাপক হওয়া। মা বলেছেন। পারেনি। অর্নাস এমএ কোনোটা শেষ করতে। বোধকরি সে দুঃখটা ভুলতে পারেনি।

আমরা তখন চুপচাপ। আমাদের চা দিয়ে গেছে কাজের মেয়েটা। ভালো রাঁধে। তাই দু একটা পিঠে। শীত এসে গেছে। আর আমার মা শীতের পাতার মত বিবর্ণ হতে শুরু করেছে। ঝরাপাতার স্তূপঘেরা একটি শয্যা অনন্তকালের নৌকোর মত কোন অসীমে চলে যাবে বলে দিন গুনছে।

এরপর বসন্ত এলো। বসন্ত যখন আমাদের জগতে সুন্দর পাখা মেলে রবীন্দ্রনাথের গান হয় কিরণমাখা পাখা হয়ে রঙ ছড়ায়, ঠিক তখনি কমল চমৎকার রেজাল্ট করে বের হলো এবং সত্যিই অক্সফোর্ডে পড়বার স্কলারশিপ পেয়ে গেল। মাকে সে খবর দেওয়া হলো। মা কাঁদলেন। এবং সেইসময় ঠিকমত কাঁদতে তার কষ্ট হয় যদিও তবু চোখের বড় বড় ফোটা গাল বেয়ে তার চিবুকের উপর জেগে রইলো, শিশিরের মত, এই ফোটা নদী হয়ে মিশে যাবে সমুদ্রে। অনেকসময় কমল মায়ের হাত ধরে বসে রইলো। অক্সফোর্ড যাবে বলে সুন্দর একটি স্যুট ফেরদৌস থেকে বানিয়ে দিয়েছেন নানি। নীলচে রঙ, চমৎকার ভিনসেন্ট ব্লু টাই। সত্তরের নানি মায়ের চাইতে তরুণ। বললো ও, আপি যাই? মায়ের চোখ খুলে গেল। মা তাকিয়ে রইলেন। বাবা তখন নেই। মা আর কমল। দরজায় আমি। থোকা থোকা চুলের, অলিভ রঙের দৃপ্ত কমল। মা হঠাৎ যে নামটি বললেন আমরা তাকে কেউ চিনি না।—পাওলো। তুমি?

আপি ভুল বকতে শুরু করেছেন। এই বলে ধীর পায়ে একজন উজ্জ্বল তরুণ সাকসেসের মইতে কেবল প্রথম ধাপে পা রেখেছেন। তার সামনে এখন পুরো জগতের দরজা খোলা।

সেদিন রাতে মা মারা গেলেন।

নানি পাওলো কে?

নানি বললেন, তোর মায়ের সঙ্গে পড়তো। ইতালিয়ান অ্যামবাসেডেরের ছোট ভাই।

এরপর নানি বললেন, শোন ও তোর মাকে ভালবাসতো। মানে দুজনে দুজনকে। কিন্তু দেশে গিয়ে ছেলেটা আর ফিরে আসেনি। ওখানে সাঁতার দিতে গিয়ে সাগর ওকে টেনে নিয়ে যায়।

অনেকদিন তোর মা পাগলের মত ছিল। শুধু তোর মায়ের সঙ্গে পড়বে বলে ও ঢাকা য়ুনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিল। দুই বছর একসঙ্গে পড়েছিল।

নানি থামলেন। কন্যার শোকে চোখ মুছলেন। বললেন, একটা কথা আজ তোকে বলছি মিতি। আশাকরি তুই কাউকে বলবি না।

কী কথা?

তোর মা তখন প্রেগনান্ট ছিল যখন পাওলো মারা যায়। সকলে বলেছিল বাচ্চাকে নষ্ট করতে। তোর নানাও বলেছিল। কেবল আমি রাজি হইনি। তারপর কেমন করে সেই ছেলে আমার ছেলে হলো, সে এক দীর্ঘ গল্প। মস্ত এক উপন্যাস। সেসব এখন বলে আর কী হবে। কেমন করে পঞ্চাশের এক নারী আবার মা হলেন সে গল্প এক লাইনে শেষ হবে না।

তোমার ছেলে নানি? তুমি কী কমলের কথা বলছো।

নানি হাসলেন। মাথা নাড়লেন। বললেন, বোধকরি এই কারণে তোর মা জীবনেও সুখী হতে পারেনি। প্রথম কারণ নিজের সন্তানকে নিজের সন্তান বলবার অধিকার নেই। দ্বিতীয় কারণ মনে হয়েছে সারাজীবন তোর বাবার মত এমন একজন মানুষকে ঠকিয়ে গেল এমন কোনো ভাবনা। আর তৃতীয় কারণ ও কোনোদিন ওর সেই প্রেম পাওলোকে ভুলতে পারেনি।

বাবা কী সব জানতেন?

জানতেন। জেনে শুনে এগিয়ে এসেছিলেন। এবং জানিস তো কোনো কোনো প্রেম হলো আগুনের মত। যত কিছু অশুভ, অশোভন, আপত্তিকর সবকিছুকে পুড়িয়ে ছাই করে শিখা আকাশে বিস্তার করতে পারে। প্রেমের পথে সব জঞ্জালকে সরাতে পারে। একা এক হাতে। তোর বাবা সেই অসাধারণের একজন।

বাবা তো সুখী ছিলেন নানি।

কোনো কোনো প্রেম কেবল দিতে চায়, দিতে পেলে সুখী হয় তেমন কোনো প্রেম ছিল তোর বাবার। এমন মানুষ এই পৃথিবীতে আর দুটি হয় না। অরুণাও ওকে ভালবাসতো কিন্তু এক গিল্টি কনসাস কোনোদিন ওকে সুখী হতে দেয়নি। ক্যান্সার ওকে বাঁচিয়ে দিল, নানা দ্বন্দ্ব থেকে।

নতুন মা মিষ্টি। আমার ভালো লেগেছে। আমার বাবা আর নতুন মাকে একা রেখে আমি চলে এসেছি নানির বাড়িতে। বাবার খানিকটা সময় একটু একা থাকা দরকার। ওরা দুজনে আনন্দময় থাক। একটা স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাক আমার বাবা। ঠিক পঞ্চাশ দিনের ভেতর নতুন মাকে কোথা থেকে খুঁজে এনেছিলেন আমার অসামান্য নানি কে জানে। কমল চলে গেছে। ও বাড়িতে এক রাশ স্মৃতির ভেতর নানি একা। নানি বলেন, পদ্মের জন্ম পাঁকে। আমার কমল তাই আজ সূর্যের মত অবিনশ্বর।

নানি কমল কী কিছু জানে?

না। ওর জানার দরকার নেই রে মিতি। বিষ আমার কাছে থাক। অমৃত ওর হোক।

অলংকরণ শিবলী নোমান