grand river view

।। নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময় নানা কারণে আলোচিত ও বিতর্কিত হয়েছেন ইব্রাহিম হোসেন মুন। ছাত্রলীগের কর্মী থেকে সংগঠনের কঠিন সময়ে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি আলোচিত। আবার ক্যাম্পাসজীবন শেষ করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ভূমিকায় তিনি হয়েছেন বিতর্কিত। সবশেষ অবৈধ হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিহ্নিত নিয়োগপ্রক্রিয়ার সঙ্গেও জড়িয়েছে তার নাম। বর্তমানে তিনি যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য। একটি রেস্টুরেন্টের পাশাপাশি এমএস এন্টারপ্রাইজ নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি এখন।

আরও পড়ুন: মুন ও তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব তলব করেছে এনবিআর

২০০০ সালে আওয়ামী লীগের তৎকালীন শাসনক্ষমতার মেয়াদের শেষ দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল তুঙ্গে ওঠে। নিজ দলের একাংশের হামলায় হলের রুমে নির্মমভাবে আহত হয়ে ক্যাম্পাস ছাড়েন তৎকালীন সভাপতি ও বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাখায়াত হোসেন শফিক। ২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠনের পর ক্যাম্পাসে অস্তিত্বের সংকটে পড়ে যায় ছাত্রলীগ। সংগঠনের জন্য প্রতিকূল সেই সময়ে কামরুজ্জামান চঞ্চলকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠনের পর থেকে ধীরে ধীরে ফের সক্রিয় হতে শুরু করে তারা। ২০০৬ সালে ইব্রাহিম হোসেন মুনকে সভাপতি ও বর্তমান সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রলীগের নতুন কমিটি গঠন করা হয়।

বিরুদ্ধ রাজনৈতিক স্রোতের প্রতিকূলতার মধ্যে তাদের নেতৃত্বে সাংগঠনিক তৎপরতা চালাতে থাকে ছাত্রলীগ। এসময় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের হাতে নিগৃহীতও হতে হয় তাদের। সেই সময় এই দুই নেতার ভূমিকা প্রশংসিত হয় সংগঠনে। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট সরকার গঠন করলে ২০১০ সালে নতুন কমিটি পায় ছাত্রলীগ। সেই সময় থেকেই ছাত্ররাজনীতির অবসান ঘটে ইব্রাহিম হোসেন মুনের। আর তার কিছুদিন পর থেকেই নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়তে থাকে মুনের নাম।

ছাত্ররাজনীতির পাট চুকে গেলেও ক্যাম্পাসের একটি মার্কেটে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় নামেন তিনি। পরবর্তীতে জড়িয়ে পড়েন ঠিকাদারি ও জমি কেনাবেচাসহ নানা ব্যবসায়। শুরু থেকেই অধ্যাপক আবদুস সোবহানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখেন মুন। ভিসি হিসেবে তার প্রথম মেয়াদে ভর্তি নিয়ে বিতর্কে জড়ায় মুনের নাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজে (আইবিএস) ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে এমফিল ডিগ্রি নিতে ভর্তি হন মুন। অভিযোগ ওঠে যোগ্যতা না থাকলেও তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহানের নির্দেশে তাঁকে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়। তারপরেও অধ্যাপক সোবহানের প্রথম মেয়াদের পুরো সময় এই ভর্তি নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

অধ্যাপক সোবহানের প্রথম মেয়াদ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রশাসন এলে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এতে জীব ও ভূবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. আব্দুল লতিফকে প্রধান করা হয়। তদন্তে মুনের ভর্তির যোগ্যতা না থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। ফলে কমিটি ২০১৫ সালের ২৪ আগস্ট ২৩৮ তম শিক্ষা পরিষদে তার ভর্তি বাতিলের সুপারিশ করে। এরই ভিত্তিতে সে বছরের ২৯ আগস্ট ৪৬১ তম সিন্ডিকেটের সভায় তার ভর্তি বাতিলের বিষয়টি চূড়ান্ত অনুমোদন হয়।

এরপর ইব্রাহিম হোসেন মুন জন্ম দেন আরেক বিতর্কের। নিয়ম অনুযায়ী আইবিএস’র ফেলো থাকা অবস্থায় তার নামে বরাদ্দকৃত ফ্যামিলি স্যুট ‘সি’ বাসার বকেয়া পরিশোধ করে ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাসা ছাড়ার নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু নির্দেশিত সময়ের মধ্যেও বাসা খালি না করায় তাকে ওই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর বাসা খালি করার শেষ সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। সেই সময় ২০১৪ সাল থেকে তার ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিলও বকেয়া ছিলো। আইবিএস হোস্টেলের তৎকালীন ওয়ার্ডেন ড. মো. কামারুজ্জামান সেই সময় ইব্রাহিম হোসেন মুনের বিরুদ্ধে তাকে নানাভাবে হুমকি দেয়ার অভিযোগ করেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে। তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার প্রফেসর ড.এন্তাজুল হক সে বছরের ২২ সেপ্টেম্বর মতিহার থানায় ইব্রাহিম হোসেন মুনের নামে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।

এরপর থেকে মুন মনোযোগী হন তার নিজ এলাকা পাবনা-১ আসনে দলীয় মনোনয়ন পাবার চেষ্টায়। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি সফল হননি। তবে এর মধ্যেই তিনি জড়ান আরেক বিতর্কে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে রাজশাহীর কাজলায় বিশ্ববিদ্যালয় মার্কেটে তার মালিকানাধীন সিয়ামুন চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত বন্ধের জন্যও তিনি চাপ দেন। এ অবস্থায় তার বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগ এনে মামলা করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেফতার করা হয় তাকে। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।

সবশেষ ইব্রাহিম হোসেন মুনের বিরুদ্ধে অধ্যাপক সোবহানের মেয়াদের শেষদিনে দেয়া নিয়োগপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে জানতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ইব্রাহিম হোসেন মুনের সংযোগ পাওয়া যায়নি।