ফজলে হোসেন বাদশা
grand river view

।। ফজলে হোসেন বাদশা ।।

১৯৭৩ সালের ৫ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত হয় জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন বা ন্যামের চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলন। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমবারের মতো সেই সম্মেলনে অংশ নেন। গুরুত্বপূর্ণ এই সম্মেলনের স্বাগত ভাষণে বঙ্গবন্ধু ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করেন।

৮ সেপ্টেম্বর সেই ভাষণে বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদবিরোধী নিপীড়িত জনগণের ন্যায্য সংগ্রামের প্রতি সমর্থনে জানাতে ‘জোটনিরপেক্ষ নীতি’ বাংলাদেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বোঝাই যায়, দেশের সংবিধানে বিদেশ নীতি হিসেবে যা উল্লেখ করা হয়েছে, তার গোড়ার কথা হলো একটি উপনিবেশ-সাম্রাজ্যবাদ-বর্ণবাদ-বিরোধী বিশ্ব প্রধান লক্ষ্য। সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অভ্যুদয় হওয়া দেশটির স্থপতি সে কারণেই জোটনিরপেক্ষ নীতিকেই অনুসরণ করার কথা বলেছেন।

এ শুধু কথার কথা নয়। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে এই নীতি অনুসরণ করেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কৌশল নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু নিজে তার জীবদ্দশায় যে এই পথ ধরেই হাঁটতে চেয়েছেন, তার বহু নজির রয়েছে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যারা ক্ষমতায় এসেছেন, একটা দীর্ঘ সময় তারা সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে উপেক্ষা করেই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চেয়েছেন। বাংলাদেশকে বোঝার ক্ষেত্রে এই তফাৎটার যথাযথ মূল্যায়ন আমাদের বিদেশি বন্ধুদের জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।  

শুরুতেই এসব কথা বলার কারণ, সাম্প্রতিক এক বিতর্ক। এর কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের একটি যৌথ নিরাপত্তা প্রচেষ্টা। কোয়ড্রিল্যাটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ বা কিউএসডি অথবা কোয়াড বলে পরিচিত এই যৌথ উদ্যোগ আসলে আনুষ্ঠানিক কোনো জোট হয়ে ওঠেনি এখনও। অংশগ্রহণকারীরাও একে অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তা সংলাপ বিষয়ক মঞ্চ হিসেবেই এখনও উপস্থাপন করে চলেছেন। ২০০৭ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত এখানে নতুন কোনো সদস্য নেয়া হয়নি এবং হবে কি না সে ব্যাপারে কোনো প্রকাশ্য তৎপরতাও চোখে পড়েনি।

আপাতত কোয়াডের আনুষ্ঠানিকতার ধারেপাশে কোথাও বাংলাদেশ নেই। চারদেশের এই নিরাপত্তা সংলাপের মঞ্চ থেকে বাংলাদেশকে যোগ দেয়ার কোনো আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। আবার বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও এখানে যুক্ত হতে কোনো আগ্রহ দেখানো হয়নি। কিন্তু আলোচনাটা বাংলাদেশকে ছুঁয়েছে, যখন ‘কোয়াডে যোগ দিলে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে’- সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমে ঢাকাস্থ চীনা রাষ্ট্রদূত এমন প্রকাশ্য মন্তব্য করেছেন। চীনা দূতের এই মন্তব্য নিয়ে বাংলাদেশ তার অবস্থান জানিয়েছে, যেখানে এ ধরনের মন্তব্যকে আগ বাড়িয়ে দেয়া হিসেবে মনে করা হচ্ছে। আবার পরে চীনা দূতাবাসের পক্ষ থেকে মন্তব্যটিকে ভাষাগত সমস্যা হিসেবে দেখানো হয়েছে, যদিও চীন কোয়াডের বিরুদ্ধে তাদের কঠোর মনোভাব সেদিনও ব্যক্ত করেছে। চীন খানিকটা নীরবেই তাদের কূটনীতি চালিয়ে গেলেও কূটনৈতিক মহলে অনেকে চীনের এই প্রকাশ্যে সরব হওয়ার বিষয়টিকে নজিরবিহীন বলে মনে করছেন।

প্রশ্ন হলো, চীন কেন এমন আচরণের দিকে গেলো? ট্রাম্প প্রশাসনের শেষ দিকে গেলো বছরের অক্টোবরে হঠাৎ করেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি স্টেট সেক্রেটারি স্টিফেন বেইগান ঝটিকা সফরে বাংলাদেশে আসেন। দিল্লি হয়ে ঢাকায় এসে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘ বৈঠক সারেন। এরপর সংবাদমাধ্যমের সামনে জানান, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ইন্দো-প্যাসিফিকে অন্যতম মূল অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। দীর্ঘদিন ধরেই চীন ভূরাজনৈতিকভাবে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের সঙ্গে কোয়াডকে সম্পৃক্ত হিসেবে দেখে থাকে।

এ বছরের শুরুর দিকেই ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের ঢাকা সফর নিয়েও কূটনৈতিক মহলে কৌতূহল ছিলো। সেই সময় অনেকের ধারণা ছিলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোয়াড নিয়ে বাংলাদেশকে উৎসাহী করতেই তাদের এই সফর। যদিও অফিসিয়ালি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এই সফরকে দেখানো হয়। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সেই সফরেই একটি ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি ব্রিফিংয়ে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কানেকটিভিটি নিয়ে কথা বলেন। এর মধ্যে তৃতীয় দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে বলেও মত দেন। এরপরই গত মাসে পড়িমরি করে চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিন উইফেং ঝটিকা সফরে আসেন। রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই সফরে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোয়াড নিয়ে তাদের অস্বস্তির ইঙ্গিত দিয়ে যান বলেই কূটনীতিক মহলে প্রচার আছে।

কাজেই, দেখা যাচ্ছে, চীনা দূত কোয়াড নিয়ে হঠাৎ করেই কথা বলেছেন- এমন নয়। বিষয়টি নিয়ে দৌড়ঝাঁপ চলছে দুই তরফেই এবং তার ধারাবাহিকতায় লি জিমিং কথা বলেছেন। স্পষ্ট বোঝা যা্চ্ছে, কোয়াড নিয়ে ভারত মহাসাগরের এই অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ হতে চলেছে। এর একপক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারত। অন্যপক্ষে কোয়াডের বিরোধিতায় কোমর বেঁধেছে চীন। আপাতত চীন একা কথা বলছে। তবে এ অঞ্চলে মার্কিন অভিপ্রায় ঠেকাতে যে তাদের পাশেও কৌশলগত মিত্ররা থাকবে, তা বোঝা যায়। কিন্তু আমাদের কাছে যে প্রশ্নটা এখন সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো, বাংলাদেশ কীভাবে এই নতুন সময়ের ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে?

সেই প্রশ্নের জবাব খোঁজার জন্যই জোটনিরপেক্ষ নীতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিভঙ্গি ও বাংলাদেশের সংবিধানে বিদেশনীতিতে তার প্রভাব নিয়ে এই আলোচনা শুরু করা হয়েছে। একটু ভাবলেই বোঝা যায়, শুধু কোয়াড নয়, ভবিষ্যতের যেকোনো ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর জোটনিরপেক্ষ নীতির আলোকে আমাদের সংবিধান নির্দেশিত পথে ভূমিকা রাখতে পারলেই আর কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যে কোয়াড, সেখানে আমাদের ঐতিহাসিক মিত্র ভারত রয়েছে। তাদের সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক, তার সূত্র বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে গাঁথা। আবার জাপান দীর্ঘ সময় ধরেই আমাদের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী। তাদের সহায়তায় বাংলাদেশে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে ও হচ্ছে।

অন্যদিকে চীনও গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী। অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও আমাদের দেশের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক অনেক দূর এগিয়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্বমণ্ডলে চীনের সঙ্গে যে রাশিয়ার সুসম্পর্ক, তাদের সঙ্গেও আমাদের একটা ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। সেই সম্পর্কটিও আবার বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গেই যুক্ত। যদিও কোয়াড নিয়ে চীনের যে প্রকাশ্য বিরোধিতা, সেখানে এখনও রাশিয়া সরব হয় নি। কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এই বিরোধ খানিকটা গড়ালে রাশিয়ার কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোয়াডের পক্ষে থাকার সুযোগ নেই। 

এই সবগুলো দেশের সঙ্গেই আমাদের পৃথক যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক তা অত্যন্ত সহায়তাপূর্ণ ও দৃষ্টান্তমূলক। কিন্তু সেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সুতো ধরে তাদের কোনো বহুপাক্ষিক সম্পর্ক, বিশেষত যেখানে আলোচনায় সামরিক জোট, সেখানে যুক্ত হবার দায় আমাদের নেই। আমাদের সংবিধান অনুসৃত বিদেশনীতিতেই সেই সুযোগ নেই।

শুরুর দিকে বলছিলাম, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সংবিধানকে যারা কাটাছেঁড়া করেছিলেন, তাদের কথা। বিদেশি বন্ধুদের জন্য এই আলোচনা প্রাসঙ্গিক এখানেই। ১৯৭২ সালের সংবিধানে বিদেশ নীতির ক্ষেত্রে আমাদের সার্বজনীন নীতি ফুটে ওঠে। ২৫ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ‘আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও সংহতির উন্নয়ন’ অংশে বলা হয়-

“জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা-এই সকল নীতি হইবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এই সকল নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র­­

(ক) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ পরিহার এবং সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করিবেন; 

(খ) প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করিবেন; এবং 

(গ) সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করিবেন।”

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সামরিক ফরমান জারির মাধ্যমে সংবিধানে যে কাটাছেঁড়া চলে, তার কোপানলেই এই চমৎকার ভারসাম্যপূর্ণ ও সার্বজনীনতার দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠা বিদেশনীতি বদলে যায়। জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৮ সালের দ্বিতীয় ফরমানের চতুর্থ আদেশে ২৫ অনুচ্ছেদটিকে দুটো অংশে ভাগ করা হয়। বাহাত্তরের সংবিধানে থাকা অংশটুকুকে দফা ১ হিসেবে রেখে আরেকটি দফা নিচে সংযুক্ত করে দেয়া হয়। সেখানে লেখা হয়-

“রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করিতে সচেষ্ট হইবেন।”

অর্থ্যাৎ, রাষ্ট্রধর্ম ইত্যাদির অনুপ্রবেশের মধ্য দিয়ে যেভাবে তারা অসাম্প্রদায়িক ও উদার বাংলাদেশের পথচলাকে বিঘ্নিত করেছিলো, সেই একই ধারায় তারা ভারসাম্যপূর্ণ বিদেশনীতিকেও সাম্প্রদায়িক অবস্থানের ভিত্তিতে একটি পক্ষের দিকে ঠেলে দেয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূলনীতিগুলোর পথে বাংলাদেশকে ফেরাতে বহু রাজনৈতিক সংগ্রাম করতে হয়েছে। ১৪ দলের ব্যানারে একটি অসাম্প্রদায়িক জোট গড়ে ওঠার পর জনরায় নিয়ে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ২৫ ধারার দফা ২ বাদ দিয়ে ফিরিয়ে আনা হয় জোটনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা প্রতিফলিত বিদেশনীতি।

কাজেই সংবিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বে কোনো ধরনের সামরিক মেরুকরণে পক্ষপাত নেবে না এমনটাই আমাদের নীতি। দুই দিক দিয়ে এই বিদেশনীতি পর্যালোচনার দাবি রাখে, প্রথমত দেশের বাইরে সামরিক বাহিনীর কার্যক্রম জাতিসংঘের সিদ্ধান্তের সাথে সংগতিপূর্ণ কিনা; দ্বিতীয়ত নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন ব্যতিরেকে বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর সামরিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে একাত্ম হলে ভূরাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কী হবে। যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বা অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের নীতি আমাদের নেই। সংবিধানে সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধেও সুস্পষ্ট অবস্থান আছে। ফলে যেকোনো বিবাদমান পরিস্থিতিতে একটি পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়া আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য এবং আঞ্চলিক ও বৈদেশিক নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এ কারণেই নানাবিধ আলোচনা থাকরেও সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কোনো সামরিক চুক্তিতে যুক্ত হয়নি।

উপরন্তু, বাংলাদেশ বিশ্বের যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই অবস্থান নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সব থেকে আলোচিত ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটেও আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য আছে। ফিলিস্তিনী জনগণকে যেভাবে হামলার মুখে পড়তে হয়েছে, তার নিন্দা বাংলাদেশ করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, ইসরায়েলের এই ভূমিকার পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহায়তা রয়েছে। আজ  বার্নি স্যান্ডার্সের মতো মার্কিন রাজনীতিক ও নোম চমস্কির মতো মার্কিন বুদ্ধিজীবীরাই একথা জোর দিয়ে বলছেন। এর আগে আমরা মধ্যপ্রাচ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে ভূমিকা দেখেছি। মুখে শান্তির কথা বললেও তাদের কোনো তৎপরতাই শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, বরং আরও অশান্তি চড়িয়েছে। কাজেই তাদের নেতৃত্বাধীন কোনো সামরিক জোট শান্তি ও সহাবস্থান প্রতিষ্ঠায় কতটা ভূমিকা রাখতে পারে- তা নিয়ে সন্দেহ থাকাটাই স্বাভাবিক। আর বাংলাদেশের বিদেশনীতিতে এই শান্তি ও সহাবস্থানই অগ্রাধিকার পায়।

দীর্ঘ সময় ধরে এই অঞ্চলে চীন ও ভারতের মধ্যে নানা কারণে সম্পর্কের সংকট তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই সংকটে বাংলাদেশের অবস্থান কোনোভাবে যেনো কারো জন্য অস্বস্তিকর না হয়, সে ব্যাপারে তৎপরতা ছিলো এবং আছে। বিশেষ করে অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যারাই এদেশে রাজনীতি করেছে, তারা এই বিষয়টি যথেষ্ট সক্ষমতার সঙ্গে নিশ্চিত করেছে। চীন বা ভারত কারো জন্যই তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি উস্কে দেয়া বা সহায়তা করার মতো কোনো অবস্থানকে আমরা কোনোভাবেই সঠিক মনে করি না। বরং আমরা আশা করি, এ অঞ্চলের এই দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যেও পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক গড়ে উঠুক। কিন্তু অবশ্যই সেটা তাদের যার যার রাষ্ট্রের ব্যাপার। বাংলাদেশ ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় দুটি রাষ্ট্রের সঙ্গেই যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে যুক্ত, তার পরিচর্যা যথাযথভাবে করতে চায়। পাশাপাশি আমরা আশা করি, ভবিষ্যতে আমাদের বন্ধুরাও আমাদের এই বাস্তবতা বুঝে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যেই কাজ করবে।

ফজলে হোসেন বাদশা: বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য