।। ঘরে বাইরে ডেস্ক ।।

যেকোনো দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব আর নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য বিমানবাহিনীর বিকল্প নেই। শত্রুদেশের বিমান আক্রমণ মোকাবিলা এবং প্রতি আক্রমণের মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিটি দেশের নিজস্ব বিমানবাহিনী রয়েছে। যুদ্ধবিমানের ইতিহাসে কয়েকটি আইকন বিমান নিয়ে আজকের প্রতিবেদন।

এফ-১৬

এফ-১৬

এক নামে পরিচিত এই মার্কিন যুদ্ধবিমানটি। এফ-১৬ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি চতুর্থ প্রজন্মের মাল্টিরোল ফাইটার। মার্কিন প্রতিষ্ঠান জেনারেল ডাইনামিকস এ বিমানের নকশা করে। বর্তমানে লকহিড মারটিন কোম্পানি এ বিমান উৎপাদন করছে। মিগ-২৯ বিমানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মূলত এ বিমান নির্মাণ করা হয়। অফিসিয়ালি এই বিমানকে ফাইটিং ফ্যালকন বলা হলেও এর ভয়ঙ্কর ধ্বংস ক্ষমতার জন্য পাইলটরা একে ভাইপার বলে থাকেন। ১৯৭৮ সালে সার্ভিসে আসার পর থেকে এই বিমান পৃথিবীর বহু দেশে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর পরিচালন খরচ অন্যান্য বিমান থেকে কম হওয়ায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিমানবাহিনীর কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। বর্তমানে তুরস্কসহ আরও কয়েকটি দেশে এ বিমানের লাইসেন্সড ভার্সন তৈরি করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, তুরস্ক, ইসরাইল, গ্রিস, ভেনিজুয়েলা, আরব-আমিরাতসহ পৃথিবীর আরও অনেক দেশের বিমানবাহিনী এ বিমান ব্যবহার করে।

সুখোই এসইউ-২৭

সুখোই এসইউ-২৭

সুখোই এসইউ-২৭ সোভিয়েত রাশিয়া নির্মিত একটি সুপারসনিক যুদ্ধবিমান। এর ন্যাটো রিপোরটিং নাম হলো ফ্লাঙ্কার। ১৯৬৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকার এফএক্স প্রোগ্রাম সম্পর্কে জানতে পারে। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তারা টিপিএফআই প্রোগ্রাম গ্রহণ করে যার উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকার এফ-১৫ এবং এফ-১৬ বিমানগুলোকে আকাশযুদ্ধে প্রতিহত করার জন্য দ্রুতগামী ও শক্তিশালী বিমান নির্মাণ করা। ফলে সার্ভিসে আসে মিগ-২৯ এবং এসইউ-২৭ বিমানগুলো। এসইউ-২৭ একটি সুপার ম্যানুভারেবল ডেল্টাউইং বিমান যা অত্যাধুনিক রাডার, সেন্সর এবং ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত। দুটি শক্তিশালী ইঞ্জিনবিশিষ্ট এ বিমানের সর্বোচ্চগতি ম্যাক ২.৩৫ বা ২৫০০ কিলোমিটার-ঘণ্টা। ১৯৮৪ সালে সার্ভিসে আসার পর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিমানবাহিনী এ বিমান ব্যবহার করে। বর্তমানে রাশিয়া, চীন, এঙ্গোলা, বেলারুশ, ইথিওপিয়া, ভিয়েতনাম, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, ইউক্রেনসহ পৃথিবীর বহু দেশের বিমানবাহিনী এ বিমান ব্যবহার করছে।

মিগ-২১

মিগ-২১

মিগ-২১ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি ষাটের দশকের একটি যুদ্ধবিমান। এটি পৃথিবীর সর্বাধিক উৎপাদিত এবং বিক্রিত যুদ্ধবিমানগুলোর একটি। মিকোয়ান গুরেভিচ কোম্পানির নকশাকৃত এ বিমান এখনও পর্যন্ত পৃথিবীর বহু দেশ ব্যবহার করে। এই বিমানের ন্যাটো কোডনেম ফিশবেড। মিগ-২১ একটি সুপারসনিক জেট ফাইটার। এটি আকাশ থেকে মাটিতে এবং আকাশ থেকে আকাশে শত্রু বিমানের সঙ্গে যুদ্ধ করতে বিশেষ পারদর্শী। সুপারসনিক গতি এবং উন্নত ম্যানুভ্যারিটি ক্ষমতাসম্পন্ন এ বিমান শত্রুর ওপর নিমেষে আঘাত হেনে উড়ে যেতে পারে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে উত্তর ভিয়েতনাম এ বিমান ব্যবহার করে আমেরিকানদের বাঘা বাঘা বিমানকে ভূপাতিত করেছিল। কারগিল যুদ্ধে ভারতীয় পাইলটরা মিগ-২১ বিমান দিয়ে পাকিস্তানি এফ-১৬ বিমানকে তাড়া করেছিল। একজন দক্ষ পাইলটের পরিচালনায় এ বিমান এক ভয়ঙ্কর বিধ্বংসী মারণাস্ত্র। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীও অতীতে এ বিমান ব্যবহার করেছে।

দাসো রাফাল

দাসো রাফাল

রাফাল ফ্রান্সের দাসো অ্যাভিয়েশন নির্মিত একটি ডেল্টাউইং মাল্টিরোল ফাইটার। ১৯৭০ সালে ফ্রান্স সরকার তাদের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করে। তারা ইংল্যান্ড, জার্মানি, ইতালি ও স্পেনের সঙ্গে ১৯৮৩ সালে ইউরোফাইটার প্রকল্পে যোগ দেয়। কিন্তু এ প্রকল্প আশানুরূপ না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে ফ্রান্স প্রকল্প থেকে বেরিয়ে আসে এবং নিজস্ব প্রযুক্তি ও ডিজাইনে একটি কার্যকর মাল্টিরোল ফাইটার নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ফলে ২০০০ সালের ৪ ডিসেম্বর সার্ভিসে আসে রাফাল বিমানটি। রাফাল বিমানটিতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির রাডার, সেন্সর সিস্টেম, কম্পিউটার সংযোজিত হয়েছে। দুটি ইঞ্জিনসংবলিত এ বিমানটি অত্যন্ত দ্রুতগামী। এর সর্বোচ্চ গতিবেগ ম্যাক ১.৮ বা ২ হাজার ১৩০ কিলোমিটার-ঘণ্টায়। এটি দিবারাত্রি যুদ্ধের উপযোগী একটি অত্যন্ত কার্যকর বিমান। ফ্রান্সের নৌ ও বিমানবাহিনীতে বর্তমানে এ বিমান ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়াও ভারতীয় বিমান বহরে এই বিমান যুক্ত হয়েছে।

সাবজাস-৩৯ গ্রিপেন

সাবজাস-৩৯ গ্রিপেন

গ্রিপেন সুইডেনের তৈরি ডেল্টাউইং লাইটওয়েট মাল্টিরোল ফাইটার। ১৯৭৯ সালে সুইডেন সরকার একটি শক্তিশালী ও কার্যকরী বিমান নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে যা একই সঙ্গে আকাশযুদ্ধ, ভূমিতে বোমাবর্ষণ ও গোয়েন্দাগিরি করার জন্য বিশেষভাবে পারদর্শী। এটি প্রথম সার্ভিসে আসে ১৯৯৭ সালের ১ নভেম্বর। সুইডিশ এরোস্পেস কোম্পানি সাব নির্মিত সুপারসনিক এ বিমানটির সর্বোচ্চ গতি ম্যাক-২ (২ হাজার ২০৪ কিলোমিটার-ঘণ্টা)। ইউরোপিয়ান এবং ন্যাটো স্ট্যান্ডার্ডে তৈরি এ বিমানের পরিচালন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম। বর্তমানে সুইডেন ছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকা, থাইল্যান্ড, ইংল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেক প্রজাতন্ত্রের বিমানবাহিনীতে এ বিমান ব্যবহৃত হচ্ছে।

ইউরোফাইটার টাইফুন

ইউরোফাইটার টাইফুন

ইউরোফাইটার টাইফুন একটি অত্যাধুনিক ডেল্টাউইং মাল্টিরোল ফাইটার। এটি মূলত ইংল্যান্ড, জার্মানি, ইতালি ও স্পেনের চারটি বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের একটি যৌথ প্রকল্প। ১৯৮৩ সালে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও স্পেনের অংশগ্রহণে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। কিন্তু পরে ফ্রান্স এ প্রকল্প থেকে বেরিয়ে আসে এবং পরবর্তী সময়ে তারা রাফাল নামে একটি নতুন ফাইটার তৈরি করে। ফ্রান্স এই প্রকল্প থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর বাকি দেশগুলো তাদের এ প্রকল্প অব্যাহত রাখে। ফলে ২০০৩ সালে প্রথম সার্ভিসে আসে ইউরোফাইটার টাইফুন। এটি দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট একটি অসম্ভব দ্রুতগতির সুপারসনিক সেমি-স্টিলথ ফাইটার।

দাসো মিরেজ-২০০০

দাসো মিরেজ-২০০০

মিরেজ-২০০০ ফ্রান্সের দাসো অ্যাভিয়েশন নির্মিত একটি চতুর্থ প্রজন্মের মাল্টিরোল ফাইটার। এটি একটি হালকা ধরনের বিমান যা ৭০-এর দশকের বিমান মিরেজ থ্রির উন্নত সংস্করণ হিসেবে সার্ভিসে আসে। দাসো অ্যাভিয়েশন প্রস্তাবিত মিরেজ-২০০০ প্রজেক্টটিকে ফ্রান্স সরকার ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭৫ সালে অনুমোদন করে এবং ১৯৮২ সালে মিরেজ ২০০০ প্রথম সার্ভিসে আসে। মিরেজ-২০০০-এর অনেক আপগ্রেড ভার্সন নির্মিত হয়েছে। এ বিমানটির সর্বোচ্চ গতি ম্যাক ২.২ অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় ২৫৩০ কিমি.। এটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির রাডার, এভিয়নিক, ককপিট ও ক্ষেপণাস্ত্র সজ্জিত একটি বিমান যা একই সঙ্গে এয়ার টু এয়ার কমব্যাট এবং ভূমিতে বোমাবর্ষণের জন্য অত্যন্ত পারদর্শী। বর্তমানে ফ্রান্সের বিমানবাহিনী ছাড়াও ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তাইওয়ান, গ্রিস, মিসর, কাতার, পেরু, ব্রাজিল ইত্যাদি দেশের বিমানবাহিনী মিরেজ-২০০০ বিমানটি সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করে আসছে।

মিগ-২৯

মিগ-২৯

মিগ-২৯ বর্তমান সময়ের অন্যতম ভয়ঙ্কর একটি যুদ্ধবিমান। এটি সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান যা ১৯৮৩ সালে প্রথম সোভিয়েত বিমানবহরে অন্তর্ভুক্ত হয়। এর ন্যাটো কোডনেম হলো ফুলক্রাম। মিগ-২৯ একটি মাল্টিরোল কমব্যাট ফাইটার যা একই সঙ্গে আকাশ ও ভূমিতে হামলার জন্য অত্যন্ত পারদর্শী। এর শক্তিশালী আফটার বার্নিং টার্বো ফ্যান ইঞ্জিন নিমেষেই বিমানকে সাবসনিক থেকে সুপারসনিক গতিতে নিয়ে যেতে পারে। অত্যাধুনিক কোবরা ম্যানুভ্যারিটি ক্ষমতাসম্পন্ন এ বিমান শত্রু বিমানের মিসাইলকে ফাঁকি দিয়ে পুনরায় পাল্টা আক্রমণ চালাতে পারে। সোভিয়েতরা এ বিমানকে তাদের স্টেট অব আর্ট হিসেবে পরিচয় দেয়। এটি দীর্ঘদিন পশ্চিমা এবং ইউরোপিয়ান দেশগুলোর ফিয়ার ফ্যাক্টর ছিল। মিগ-২৯ বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত একটি বিমান যা পৃথিবীর বিভিন্ন বিমানবাহিনীতে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পরিচালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে বর্তমানে মিগ-২৯ বিমান রয়েছে।