grand river view

।। চন্দন আনোয়ার ।।

কাজী নজরুলের ইসলামের প্রেমের ইতিহাসের দুই নারী—সৈয়দা খাতুন ওরফে নার্গিস আসার খানম ও আশালতা সেন ওরফে প্রমীলার নাম সকলের জানা ছিল। জীবনের কোন এক পর্যায়ে কোন এক বিদুষী উচ্চশিক্ষিত নারীর প্রতি প্রচণ্ড রকমের দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন নজরুল, এ কথা প্রায় অজানা ছিল। সৈয়দ আলী আশরাফ সম্পাদিত ‘নজরুলের প্রেমের এক অধ্যায়’ (করাচি বিশ্ববিদ্যালয়, আগস্ট, ১৯৬৭) প্রকাশের পরই এ সত্য জানা গেল। এই প্রণয়ের ইতিহাস এ যাবত প্রায় অজ্ঞাতই ছিল। এই প্রেমের সার্বিক বিষয় যিনি জানতেন এবং বলা চলে দূতের ভূমিকা পালন করেছিলেন যিনি, সেই কাজী মোতাহার হোসেন ছিলেন চাপা প্রকৃতির মানুষ। যে কারণে পত্রগুলো এতকাল অযত্নেই ছিল। অথচ তৃতীয় পত্রে নজরুল তাকে অনুরোধ করেছিলেন ‘আমার জীবনের সবচেয়ে গোপন সবচেয়ে করুণ পাতাটির লেখা তোমার কাছে রেখে গেলাম। আমার দিক দিয়ে এর একটা কী যেন প্রয়োজন ছিল।’ নজরুলের বিশ্বাস ছিল, কাজী সাহেব পত্রগুলো একদিন প্রকাশ করবেন। তবে তিনি এত নির্লীপ্ত ছিলেন কেন? বিষয়টি রহস্যজনকই বলা চলে। তারই জ্যেষ্ঠকন্যা মিসেস যোবায়দা মির্জার সন্ধান মোতাবেক সৈয়দ আলী আশরাফ পত্রগুলো উদ্ধার করেন। মোট প্রাপ্ত পত্রের সংখ্যা ছিল আটটি। এরমধ্যে সাতটিই কাজী মোতাহার হোসেনকে লিখেছিলেন। ফজিলাতুন্নেসাকে লিখেছিলেন একটি মাত্র পত্র। কাজী মোতাহার হোসেনকে লিখিত প্রথম পত্রটির দুটি অংশ দু-দিনে দুই স্থান হতে লেখা। প্রথম অংশ ২৪.০২.১৯২৮ খ্রি. তারিখ সন্ধ্যায় পদ্মার স্টিমারে এবং দ্বিতীয় অংশ ২৫.০২.১৯২৮ খ্রি. তারিখ বিকালে কৃষ্ণনগরে বসে লেখা। দ্বিতীয় পত্র ০১.০৩.১৯২৮ খ্রি. তারিখ বিকালে কৃষ্ণনগরে, তৃতীয় পত্র ০৮.০৩.১৯২৮ খ্রি. তারিখ সন্ধ্যায়, ১৫, জোলিয়াটোলা স্ট্রিট, কলকাতায়, চতুর্থপত্র ১০.০৩.১৯২৮ খ্রি. তারিখ, রাত্রি ২টা, ১৫, জোলিয়াটোলা স্ট্রিট, কলকাতায়, পঞ্চম পত্র ৩১.০৩.১৯২৮ খ্রি. তারিখ, ১১, ওয়েলেস্লি স্ট্রিট (সওগাত অফিস), কলকাতায়, ষষ্ঠ পত্র (তারিখ নেই), বৃহস্পতিবার, ১১, ওয়েলেস্লি স্ট্রিট (সওগাত অফিস), কলকাতায়, এবং সপ্তম পত্র (তারিখ নেই), ১৫, বেনিয়াটোলা স্ট্রিট, কলকাতায় বসে লেখা। ফজিলাতুন্নেসাকে একমাত্র পত্রটি লিখেছিলেন ১১, ওয়েলেস্লি স্ট্রিটের (কলকাতার) ‘সওগাত’ অফিসে বসে। পত্রে তারিখ উল্লেখ নেই। সময় উল্লেখ আছে শনিবার রাত ১২টা।

১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে নজরুল ঢাকায় এসেছিলেন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামক সংস্থার দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দিতে। এ সংস্থাটির যে আদর্শ এবং উদ্দেশ্যে, এ যাবৎকালে নজরুল একাই সে সংগ্রাম করে যাচ্ছিলেন। দ্বিতীয়বার সম্মেলনে এসে তিন সপ্তাহ ঢাকায় ছিলেন। উঠেছিলেন কাজী মোতাহার হোসেনের বাসায় এবং তাঁর মাধ্যমেই নজরুলের সঙ্গে ফজিলাতুন্নেসার পরিচয় ঘটে। ফজিলাতুন্নেসার বাসা ছিল ৯২, দেওয়ান বাজার রোডের পশ্চিমে হাসিনা মঞ্জিলের কাছে। ফজিলাতুন্নেসার প্রতি নজরুলের দুর্বলতার সূত্রপাত ঘটেছিল একটি হাস্যকর ঘটনার মধ্য দিয়ে। কাজী মোতাহার হোসেন বর্ণনা দিয়েছেন এই ভাবে :

‘…ফজিলাতুন্নেসা অসামান্য সুন্দরীও ছিলেন না। অথবা ‘বিনানিন্দিতমঞ্জুভাষিণী’ও ছিলেন না। ছিলেন অংকের এমএ এবং একজন উঁচুদরের বাকপটু মেয়ে। তিনি আমার বান্ধবী ছিলেন এবং আমার কাছ থেকে তিনি শুনেছিলেন যে, কবি একজন সৌখিন হস্তরেখাবিদ। আমাকে তিনি কবির কাছে তাঁর হাতের রেখা দেখাবার জন্যে অনুরোধ করেন। যথারীতি একদিন কবিকে নিয়ে হাসিনা মঞ্জিলের কাছে দেওয়ান বাজার রাস্তার উল্টো দিকে অবস্থিত ফজিলাতুন্নেসার গৃহে আমি উপনীত হই। প্রায় আধঘণ্টা ধরে গভীর মনোযোগের সঙ্গে কবি ফজিলাতুন্নেসার হাতের মস্তিষ্করেখা, জীবনরেখা, হৃদয়রেখা সংলগ্ন ক্ষুদ্র রেখাসমূহ এবং সেই সঙ্গে ক্রস, ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ সমন্বিত অন্যান্য মাউন্ট, শুক্র, শনি, রবি, বুধ, মঙ্গল ও চন্দ্রের অবস্থানগুলো নিরীক্ষণ করলেন, কিন্তু এগুলোর সম্বন্ধসূত্রের ফলাফল নির্ণয় করতে ব্যর্থ হলেন। তিনি একজন জ্যোতিষীর মত সূর্য, চন্দ্রের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত তারকার অবস্থান টুকে নিলেন এবং রাত্রিতে তিনি বিশদভাবে এটা নিয়ে পরীক্ষা করবেন বলে জানালেন। ঘণ্টাখানেক পরে আমরা ফিরে এলাম। রাত্রে খাবার পর প্রতিদিনকার অভ্যাসমত আমরা শুতে গেলাম। তখন রাত প্রায় এগারোটা হবে। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোর হওয়ার আগে জেগে উঠে দেখলাম নজরুল নেই। বিস্মিত হয়ে ভাবতে লাগলাম নজরুল কোথায় যেতে পারে। সকালে নাস্তার সময় তিনি ফিরে এলেন এবং এমনভাবে অদৃশ্য হওয়ার কারণ বললেন, রাত্রি ঘুমিয়ে আমি স্বপ্নে দেখলাম একজন জ্যোতির্ময়ী নারী তাকে অনুসরণ করার জন্য আমাকে ইঙ্গিত করছে। কিন্তু জেগে উঠে সেই দেবীর পরিবর্তে একটি অস্পষ্ট হলুদ আলোর রশ্মি দেখলাম। আলোটা আমাকে যেন ইঙ্গিতে অনুসরণ করতে বলে আমার সামনে সামনে এগিয়ে চলছিল। আমি বিস্ময় ও কৌতূহল নিয়ে কিছুটা অভিভূত হয়ে সে আলোক রেখার অনুসরণ করছিলাম। মিস ফজিলাতুন্নেসার গৃহের কাছে না পৌঁছানো পর্যন্ত আলোটা আমার সামনে চলছিল। তাঁর বাড়ীর কাছে পৌঁছিতেই আলোটা অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি দেখলাম একটি ঘরের মধ্যে তখনও একটি মোমবাতি জ্বলছে। রাস্তার ধারে জানালার কাছে সম্ভবত পথিকের পায়ের শব্দ শুনে গৃহকর্ত্রী এগিয়ে এসে ঘরের প্রবেশ দরজা খুলে দিলেন এবং মিস ফজিলাতুন্নেসার শয়ন ঘরের দিকে আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন। ফজিলাতুন্নেসা তাঁর ঘরের দরজা খুলে আমাকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে গেলেন। কুমারী নেসা তাঁর শয্যার উপর গিয়ে বসলেন আর আমি তাঁর সামনে একটি চেয়ারে বসে তাঁর কাছে প্রেম যাঞ্চা করলাম; তিনি দৃঢ়ভাবে আমার প্রণয় নিবেদন অগ্রাহ্য করলেন। [উদ্ধৃত, আতাউর রহমান, নজরুলের জীবনে প্রেম ও বিবাহ (ঢাকা : শুভ্রা প্রকাশনী, ১৯৯৭), পৃ. (গ্রন্থে পৃষ্ঠাংকন নেই)]

ফজিলাতুন্নেসা

কাজী মোতাহার হোসেনের বক্তব্যে এ কথা স্পষ্ট, নজরুল ফজিলাতুন্নেসার প্রেমে পড়েছিলেন মুহূর্তের পরিচয়েই। ফজিলাতুন্নেসার জন্ম [১৯০৫] টাঙ্গাইলের করটিয়ার নিকটবর্তী কুমিল্লীনামদার গ্রামে। তিনি ওয়াহেদ খাঁ নামে এক মাইনর স্কুল শিক্ষকের মেয়ে। অসাধারণ প্রতিভা ছিল তাঁর। করটিয়াতে নিম্ন ও উচ্চ প্রাইমারি পড়ার সময় তিনি প্রতি ক্লাসেই প্রথম হতেন। কৃতিত্বের সঙ্গে মাইনর পাশ করেন। তারপর ভর্তি হন ইডেন হাইস্কুলে। ম্যাট্রিক পাশ করেন প্রথম বিভাগে ঢাকা বিভাগের প্রথম হয়ে [১৯২১]। মাসিক ১৫ টাকা বৃত্তিও পান তখন। তারপর ইডেন কলেজ হতে আইএ [১৯২৩] এবং কলকাতার বেথুন কলেজ হতে বিএ [১৯২৫] পাস করেন। উভয়টিতেই ডিস্টিংশনসহ পাশ করেছিলেন। অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে গণিতশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। আরও উচ্চতর শিক্ষার জন্য স্টেট স্কলারশিপ নিয়ে বিলেতও গিয়েছিলেন [সেপ্টেম্বর, ১৯২৮]। বিশ শতকের প্রথমার্ধের বাংলাদেশের নারীর প্রকৃত অবস্থা বিবেচনায় আনলে ফজিলাতুন্নেসার অসীম সাহসিকতা আমাদের বিস্মিত করে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম ছাত্রী। চেহারা ছিল বুদ্ধিদ্বীপ্ত ও উজ্জ্বল। দুর্জয় সাহসী এই মুসলমান যুবতী, আপাদমস্তক রক্ষণশীলতার চাদরে ঢাকা ঢাকা শহরের ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ে যেতে কোনোদিনই বোরখা পরেননি। এছাড়া হিন্দু-মুসলমান অনেককেই তাঁর বাসায় আসতে দিতেন এবং আড্ডা গল্পগুজব চলত গভীর রাত পর্যন্ত।

ফজিলাতুন্নেসা ছিলেন বুদ্ধিমতী, আত্মসচেতন, সুকৌশলী এবং উচ্চাভিলাষী নারী। এত বড় উচ্চশিক্ষিত একজন নারীর পক্ষে নজরুলের মত স্বল্প শিক্ষিত একজন পুরুষের প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া দেবার মতো যৌক্তিক কারণ ছিল না। প্রায় শতবছর আগে কেন, আজকের দিনের উচ্চশিক্ষিত কোনো মেয়ের পক্ষে কি তা সম্ভব? সঙ্গতকারণেই ফজিলাতুন্নেসা নজরুলের প্রেম প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এবং তা করেছিলেন কঠোরভাবেই। তারপরও নজরুল ছিলেন নাছোড়বান্দা, আশা ছাড়েননি। কাঙালের মত প্রেম চেয়ে গেছেন ক্রমাগত। কাজী মোতাহার হোসেনকে লেখা সাতটি এবং ফজিলাতুন্নেসাকে লেখা একটি মোট আটটি প্রেমাকুতিপূর্ণ পত্র তার প্রমাণ। প্রেমিকার প্রত্যাখ্যান, অবহেলা, অবজ্ঞাকে নজরুল খুব বেশি আমলে আনতেন না। সম্মোহিতের মতোই পিছু ছুটতেন। প্রেমিকার প্রতারণা, ষড়যন্ত্রও ক্ষমা করতেন। আর যে কারণেই নার্গিসের মত ছলনাময়ীও তাঁর প্রাণের আশীর্বাদ বঞ্চিত হন না। নজরুল তাঁর কাঙ্ক্ষিত প্রেম না পাওয়ার জন্য ফজিলাতুন্নেসাকে দায়ী করেননি। কাজী মোতাহের হোসেনকে লেখা প্রথম পত্র হতে জানতে পারি, ফজিলাতুন্নেসার প্রেম প্রত্যাখ্যানে সে যতটা ব্যথিত ছিলেন, তার চেয়ে বেশি ব্যথিত ছিলেন অংকশাস্ত্রের পাষাণপুরী হতে মুক্তি দিতে না পেরে। তাঁর ভাষায় ‘কোন নারী- সুন্দরের উপাসিকা নারী-কোন অঙ্কশাস্ত্রীর কবলে পড়েছে, এই আমি সইতে পারিনে।’ কবি হিসেবেও নজরুলের কষ্ট এখানেই,  খড়গহস্তও। ‘অঙ্কের পাষাণ-টবে ঘিরে রেখে তিলোত্তমাকে তিলে তিলে’ মারছে যে অঙ্কশাস্ত্রী, তাঁর বিরুদ্ধে ছিল নজরুলের তীব্র আক্রোশ। আর এই সৌভাগ্যবান ব্যক্তিটি ছিলেন ঢাকা কলেজের গণিতের শিক্ষক ড. নলিনী মোহন বসু। ক্ষিপ্ত নজরুল তাকে বলেছেন ‘প্রাণহীণ যক্ষ’ এবং সে ‘অকারণ ভূতের মত রত্ন মানিক আগ্লে বসে আছে’। আর ফজিলাতুন্নেসাকে বলেছেন ‘অঙ্কশাস্ত্রের ভাড়ার রক্ষী’। নজরুল নিজেকে বলেছেন ‘মৌমাছি’ ও ‘মৌ-মক্ষী’। গান গেয়ে প্রাণ প্রাচুর্য নিয়ে কবি বাগানে ঢুকতে পারলেও পাষাণ মালী অঙ্কশাস্ত্রীর জন্য ব্যর্থ হয়েছেন মধু সংগ্রহে। অর্থাৎ ফজিলাতুন্নেসার প্রেম নজরুলও পেতে পারতেন কেবল অঙ্কশাস্ত্রই তার মূর্তিমান বাধা ছিল। অঙ্কশাস্ত্র নজরুলের মনে কি পরিমাণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, তা তাঁর লেখা চতুর্থ পত্রটি পড়লেই বোঝা যায়।

‘গণিতের প্রতি আমার ভয় কি কোনদিনই যাবে না? গণিতজ্ঞ লোকেরা বড্ডো কঠোর-নিষ্ঠুর হয়—এ অভিযোগের সদুত্তর তুমি ছাড়া বুঝি আরেকটি নেই জগতে। ওদের কেবল intellect, heart নেই। আমাদের যেমন কেবল heart, intellect নেই। একেবারে যাকে বলে “সিলি ফুল।”

নজরুলের পত্র

কিন্তু, একটা সত্যি কথা বল্ব? হেসো না কিন্তু। আমার এতদিনে ভারি ইচ্ছে র্কছে অঙ্ক শিখ্তে। হয়ত চেষ্টা র্কলে বুঝতে পারি এখনও জিনিষটে। আমি আমার চেনা এক অঙ্কের অধ্যাপকের কাছে পরশু অনেকক্ষণ ধ’রে আলাপ-আলোচনা র্কলাম অঙ্ক নিয়ে। এম-এ ক্লাশে কি অঙ্ক র্কতে হয়—সব শুন্লাম সুবোধ বালকের মত রীতিমত মন দিয়ে। শুনে তুমি অবাক হবে, যে আমার এতে উৎসাহ বাড়ল বই কমল না। কেন যেন এখন আর অত কঠিন বোধ হচ্ছে না ও জিনিষটে। আমি যদি বি-এ টা পাশ করে রাখতাম তা হ’লে দেখিয়ে দিতাম, যে, এম-এ তে ফার্ষ্ট ক্লাস ফার্ষ্ট কবিও হ’তে পারে ইচ্ছে র্কলে।

ওকে ব’লো “অবুঝের মত অত্যাচার” র্কতে হয়তো এখন থেকে ভয়ই হবে। …

অঙ্কের মহিমা আছে বল্তে হবে!

কিন্তু মন কেন এমন ক’রে অবুঝের মত কেঁদে উঠে? ওখানে যে আমি নাচার!

ওঁকে একটা অনুরোধ র্কবে বন্ধু আমার হয়ে? বলো—“যাকে ভাসিয়ে দিয়েছ স্রোতে, তাকে দড়ি বেঁধে ভাসিয়ো না? ওকে তরঙ্গের সাথে ভেসে যেতে দাও, পাহাড় কি চোরাবালি কি সমুদ্দুর এক জায়গায় গিয়ে সে ঠেকবেই।” যেই সে স্রোতে ভাস্তে যাবে, অম্নি দড়ি ধ’রে টান্বে—এ হয়ত তাঁর খেলা, আমার কিন্তু এ যে মৃত্যু।’

নজরুল বরাবরই ছিলেন লাজুক প্রকৃতির। তাঁর জীবনের প্রণয় ঘটিত যে সব নাটকীয় ঘটনা ছিল, সে সব গল্পের ছলেও কাউকে বলতেন না। এমন কি নার্গিসের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল কি না, এ নিয়ে যে সন্দেহ ও বিতর্ক, তা তাঁর এক কথাতেই সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু কোনোদিনই এ বিষয়ে মুখ খোলেন নি। ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে  তাঁর প্রেমের বিষয়েও নিশ্চুপ ছিলেন। কেবল কাজী মোতাহার হোসেনই জানতেন। এমনকি তিনিও প্রথমে ধরতে পারেননি যে, ফজিলাতুন্নেসার প্রতি নজরুলের মনে দুর্বলতা জন্মেছে। কবির একান্ত কাছের মানুষ মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনও জানতেন না। ‘সওগাত’ অফিসে বসে গভীর রাতে ফজিলাতুন্নেসার কাছে চিঠি লিখতে গিয়ে ধরা পড়েন। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সেদিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন:

‘সওগাত মজলিসে’ অনেক অন্তরঙ্গ বন্ধুর সাথে তিনি মেলামেশা করতেন। তাঁদের কারো কাছেও কোনো প্রণয় কাহিনী ব্যক্ত করেননি। সাধারণভাবে নারীর প্রতি তিনি সম্মানপ্রদর্শন করতেন এবং নারী জাতির উন্নয়নের ব্যাপারে প্রায়ই আলোচনা করতেন। কিন্তু একদিন গভীর রাতে ‘সওগাত’ অফিসে বসে ঢাকায় মিস্ ফজিলাতুন্নেসার কাছে একখানা পত্র লিখবার সময় আমার কাছে তিনি ধরা পড়ে যান। তিনি জানালেন—ও কিছু নয়, ফজিলাতুন্নেসা আমাকে চিঠি দিয়েছিলেন অনেকদিন আগে, তারই একটা উত্তর দিলাম।

চিঠির কতক অংশ আমি দেখেছিলাম। বললাম: এত বড় চিঠি, আর তাতে এই উচ্ছ্বাস! এ ত সাধারণ চিঠি নয়।

কবি বললেন : আমি এমনি করেই চিঠি লিখি, যান শোন গিয়ে, রাত প্রায় একটা বাজে।

আমিও শুয়ে পড়ি।

তিনি এমনি করে চিঠি লেখেন বলাতে আমি এ বিষয়ে আর কোনো প্রশ্ন করলাম না বা এতে কোনো গুরুত্ব দিলাম না। [মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন, সওগাত-যুগে নজরুল ইসলাম (ঢাকা : নজরুল ইন্সটিটিউট, ১৯৮৮), পৃ. ২৫৮]

পত্রটি লেখার সময়কাল ছিল ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের শেষভাগ। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন পরে অবশ্য জানতে পারেন, এ চিঠি সাধারণ চিঠি ছিল না। দীর্ঘ চিঠিতে নজরুল প্রত্যক্ষভাবে ফজিলাতুন্নেসাকে প্রেম সম্পর্কিত কিছু লেখেন নি। বরং তাঁর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের নিদর্শন আছে। এক ধরনের অনুরোধ, সংকোচ ও দ্বিধা মিশ্রিত ভাষায় চিঠি লিখেছিলেন। নজরুলের হস্তাক্ষরসহ চিঠিটি সৈয়দ আলী আশরাফের ‘নজরুল জীবনে প্রেমের এক অধ্যায়’ গ্রন্থে মুদ্রিত হয়েছে।

পত্রটিতে নজরুলের সীমাহীন সম্ভ্রম ও অভাবনীয় সৌজন্যের প্রকাশ ঘটেছে। ফজিলাতুন্নেসার কাছে তেমন বড় কোনো প্রত্যাশাও নেই কবির। শুধু দুলাইনের উত্তরের করুণ প্রার্থনা। নজরুল প্রেমে একনিষ্ঠ ছিলেন। ফজিলাতুন্নেসাকে ভালোবেসেছিলেন পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে। কাজী মোতাহার হোসেনকে লিখিত তৃতীয় পত্রে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করে বলেন, ‘তাকে ব’লো বন্ধু তাঁর কাছে আমার আর চাওয়ার কিছু নেই। আমি পেয়েছি-তাকে পেয়েছি-আমার বুকের রক্ত চোখের জলে। …বলো বন্ধু, আমার সকল হৃদয় মন তারি স্তব গানে মুখরিত হয়ে উঠেছে। আমার চোখে মুখে তারিই জ্যোতি-সুন্দরের জ্যোতি-ফু’টে উঠেছে। পবিত্র শান্ত মাধুরীতে আমার বুক কানায় কানায় ভরে উঠেছে। পূর্ণিমার রাতে বুড়িগঙ্গায় যেমন ক’রে জোয়ার এসেছিল তেমনি করে। আমি তার উদ্দেশ্যে আমার শান্ত স্নিগ্ধ অন্তরের পরিপূর্ণ চিত্তের একটি সশ্রদ্ধ নমস্কার রেখে গেলাম।’ [সৈয়দ আলী আশরাফ (সম্পা.), নজরুল-জীবনে প্রেমের এক অধ্যায় (করাচি: বাংলা সাহিত্য বিভাগ, করাচি বিশ্ববিদ্যালয়, আগস্ট, ১৯৬৭), পৃ. ৫১।]

নজরুলের প্রেম যত গভীরই হোক, ফজিলাতুন্নেসার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না। তিনি জেনে শুনে সচেতন জ্ঞানে এবং সুকৌশলে নজরুলকে এড়িয়ে চলতেন। কোনো পত্রের উত্তর দিতেন না। বুদ্ধিমতী ও দূরদর্শী ফজিলাতুন্নেসা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন, নজরুলকে প্রশ্রয় দিলে পরিণতি শুভ হবে না। উপরন্তু নজরুল বিবাহিত এবং সন্তানের জনক। ফজিলাতুন্নেসার মনোভাব জানার পরও কাজী মোতাহার হোসেনের কাছে নিয়মিত পত্র লেখার একটাই উদ্দেশ্য ছিল, কাকুতি-মিনতি করে মন ফেরানো। পত্রগুলো নজরুলের হা-হুতাশ, বিরহ বেদনার দীর্ঘশ্বাসে ভরা। প্রথম পত্রেই নজরুল লেখেছিলেন ‘আমি বিশ্বাস করি যে, যে আমায় এমন করে চোখের জলে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে-সে আমার আজকের নয়, সে আমার জন্ম-জন্মান্তরের, লোক-লোকান্তরের দুঃখ জাগানিয়া!’ [সৈয়দ আলী আশরাফ (সম্পা.), নজরুল-জীবনে প্রেমের এক অধ্যায় (করাচি: বাংলা সাহিত্য বিভাগ, করাচি বিশ্ববিদ্যালয়, আগস্ট, ১৯৬৭), পৃ. ৩৫।]  পত্রের শেষে অনুরোধ করেন, ‘সব খবর দিও, বুকের ব্যথা হয়ত কমবে। এখন কী ইচ্ছে করছে জান? চুপ করে শুয়ে থাকতে সমস্ত লোকের সংশ্রব ত্যাগ ক’রে পদ্মার ধারে একটী একা কুটিরে! হাসিগান- আহার নিদ্রা সব বিস্বাদ ঠেকছে!’ [সৈয়দ আলী আশরাফ (সম্পা.), নজরুল-জীবনে প্রেমের এক অধ্যায় (করাচি: বাংলা সাহিত্য বিভাগ, করাচি বিশ্ববিদ্যালয়, আগস্ট, ১৯৬৭), পৃ. ৩৯।]

ফজিলাতুন্নেসার প্রতি অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ নজরুলের জীবনের এক করুণ অধ্যায়। একথা নজরুল নিজেই বলেছেন। এ ঘটনায় সংসার উদাসীনও হয়ে পড়েছিলেন কিছুদিনের জন্য। নজরুল স্বপরিবারে তখন কৃষ্ণনগরে থাকতেন। দীর্ঘ দিন ঢাকায় থাকার জন্য প্রমীলার সংসারে নিদারুণ অভাব দেখা দিয়েছিল। একাধিক চিঠি লিখে এবং টেলিগ্রাম করে নজরুলের কোনো উত্তর পায় নি প্রমীলা। প্রায়ই নাট্যকার আকবর উদ্দিনের স্ত্রীর কাছে যেতেন এবং সব কথা বলে কেঁদে ফেলতেন। এছাড়া ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে নজরুলের প্রেমের খবর প্রমীলার কানে পৌঁছে ছিল বলে ধারণা করা যায়। সম্ভবত, ঢাকা হতে কেউ চিঠি লিখে জানিয়ে থাকতে পারে।

কবিকে দুঃখ দিলে, সে দুঃখ কবি শুধুই অন্তরে পুষে রাখেন না, অক্ষরে অক্ষরে গাঁথেন। নজরুলের জীবনে নার্গিস, প্রমীলার মতো ফজিলাতুন্নেসাও প্রভাব বিস্তারকারী এক রহস্যময়ী নারী। ফলে তাঁর কবিতা-গানে ঐ দুজনের মতো ফজিলাতুন্নেসার উপস্থিতিও দৃশ্যমান। ফজিলাতুন্নেসার প্রেমকে নজরুল ঋণ হিসেবেই মনে করতেন। আর সে ঋণ শোধ করে গেছেন চোখের জলে ও কলমের কালিতে। ১৩৩৪ সালের চৈত্রমাসে ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের ‘এ মোর অহংকার’ কবিতাটি ফজিলাতুন্নেসাকে উদ্দেশ্য করে লেখা। নজরুল তাঁর কবিতা-গানে ফজিলাতুন্নেসার প্রেমকে চিরকালের করে রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন কবিতাটিতে।

নাই বা পেলাম কণ্ঠে আমার তোমার কণ্ঠহার
তোমায় আমি করব সৃজন-এ মোর অহংকার!
এই ত আমার চোখের জলে,
আমার গানের সুরের ছলে,
কাব্যে আমার, আমার ভাষায়, আমার বেদনায়,
নিত্য কালের প্রিয় আমায় ডাকছ ইশারায়।
(এ মোর অহংকার, জিঞ্জীর)

পরের মাসে অর্থাৎ ১৩৩৫ সালের বৈশাখ মাসের ‘সওগাত’ সংখ্যায় ‘রহস্যময়ী’ নামে দশ পৃষ্ঠার একটি কবিতা লিখেছিলেন নজরুল। পরে কবিতাটির নাম বদল করে ‘তুমি মোরে ভুলিয়াছ’ নামে ‘চক্রবাক’ কাব্যে মুদ্রিত হয়। কবিতাটির সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে রয়েছে ফজিলাতুন্নেসাকে না পাওয়ার আর্তি। সম্ভবত, ফজিলাতুন্নেসা নজরুলকে একটি পত্র লিখে থাকবেন। যে পত্রের কঠোর ও কঠিন ভাষাতে কবি আহত হয়েছিলেন এবং কিছুটা ভয়ও পেয়েছিলেন। কাজী মোতাহার হোসেনকে লিখিত পত্রে এ ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কবিকে নিয়ে এই যুবতী নিদারুন কৌতুক করেছে বলে কবিতায় অভিযোগ করে বলেছেন:

তুমি বসে রবে উর্ধ্বে মহিমা শিখরে
নিষ্প্রাণ পাষাণ-দেবী? কভু মোর তরে
নামিবে না প্রিয়ারূপে ধরার ধূলায়?
লো কৌতুকময়ী! শুধু কৌতুক লীলায়
দোলাবে আমারে লয়ে? আর সব ভুল?
ভুল করে ফুটেছিল আঙিনায় ফুল!
(তুমি মোরে ভুলিয়াছ)

তারপরেই প্রচুর ব্যর্থ প্রেমের গান লিখেছেন নজরুল। তার মধ্যে প্রায় সবই বহুল জনপ্রিয় গান। যেমন— ‘কেমনে রাখিব আঁখি-বারি চাপিয়া’, ‘গহীন রাতে কে ঘুম এলে ভাঙাতে’, ‘কেন আন ফুল ডোর’, ‘সাধ না মিটিতে নিশি পোহায়’, ‘জনম জনম গেল আশা পথ চাহি’, ‘দিতে এলে ফুল হে প্রিয়কে আজি’ ইত্যাদি। বিরহকাতর সময়ে লেখা নজরুলের প্রায় গানেই ফজিলাতুন্নেসার সজীব উপস্থিতি লক্ষ করি। কবির এই প্রেমিকা আনন্দ, বেদনা, তৃপ্তি এবং আঘাত সবই  দিয়েছে। উচ্চশিক্ষিত এই প্রেমিকার কাছ হতে কবি যেন প্রেমের নতুন পাঠ নিলেন। আর এই নবচেতনাই পরিলক্ষিত হয় এ সময়ে লেখা গান-কবিতাতে।

নজরুল মূলত পত্র-কবিতা-গান দিয়ে ফজিলাতুন্নেসার মন জয়ের চেষ্টা চালিয়েছেন। ‘না জানি কী শাস্তি ভোগ করতে হবে আবার।’—বুকে এই ভয় নিয়ে বই-কবিতাও পাঠিয়েছিলেন। বাস্তবে দুজন মুখোমুখি হলে, নজরুল চুপ থাকতেন। প্রেম যেখানে গভীর, ভাষা সেখানে নীরব। তুখোড় আড্ডাবাজ, চঞ্চল নজরুল ফজিলাতুন্নেসার মুখের দিকে তাকিয়ে একটি কথাও বলতে পারতেন না। এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের বক্তব্য উল্লেখ করা যায়:

আমরা দেখতে পাই, নজরুল শুধু চিঠি আর কবিতা লিখেই ফজিলাতুন্নেসার প্রতি প্রেম নিবেদন করেছেন। কিন্তু  তাঁর সম্মুখে এসে, তাঁর মুখের দিকে চেয়ে একটি কথাও বলতে পারেননি। ঢাকা থেকে কলকাতা এসে ফজিলাতুন্নেসা ‘সওগাতে’র বাড়ীতে আমাদের সাথে থাকতেন। এখানে নজরুলের উপস্থিতিও নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। আমি, ফজিলাতুন্নেসা ও নজরুল একই ঘরে বসে কথাবার্তা বলেছি; কিন্তু নজরুল ও ফজিলাতুন্নেসা এত সংযতভাবে কথা বলতেন যে, তাদের মধ্যে পূর্বে ঘটিত এত সব ঘটনার আদৌ কোন আভাস পাওয়া যেত না। ফজিলাতুন্নেসা বাইরে কোথাও গেলে প্রায়ই আমাকে সঙ্গে নিতেন কিন্তু নজরুলের সাথে কখনো বেড়াতে বের হন নি। মনে হত, তাঁদের মধ্যে সাধারণ পরিচয়ের অতিরিক্ত আর কোন সম্পর্ক ছিল না। [মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন, সওগাত-যুগে নজরুল ইসলাম (ঢাকা: নজরুল ইন্সটিটিউট, ১৯৮৮), পৃ. ২৬৬]

১৩২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফজিলাতুন্নেসার উচ্চশিক্ষার্থে বিলাত গমন উপলক্ষে ‘সওগাত’ অফিসে এক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল। ফজিলাতুন্নেসার চলে যাওয়ার বিষয়টি নজরুল মানতে পারেননি। সংবর্ধনার দিন তাঁকে বিষণ্ন দেখাচ্ছিল। অফিসের ভেতরে একা বসে ছিলেন। ভাগ্যের কি পরিহাস, এই অনুষ্ঠানে নজরুলকে গান লিখতে ও গাইতেও হয়েছিল। গানটির প্রথম দুটি লাইন: জাগিলে ‘পারুল’ কিগো ‘সাত ভাই চম্পা’ ডাকে/উদিলে চন্দ্রলেখা বাদলের মেঘের ফাঁকে।।

বিলেতে থাকা অবস্থায় ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে খান বাহাদুর আহসান পুত্র সলিসিটর শামসুদ্দোহার পরিচয় এবং সম্প্রীতি ঘটেছিল। অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁর ঘটকালিতে দুজনের বিবাহ বন্ধন গড়ে উঠেছিল। ফজিলাতুন্নেসার বিয়ের সংবাদে মর্মাহত নজরুল এই গানটি লেখেছিলেন: বাদল বায়ে মোরে/নিভিয়া গেছে বাতি।/তোমার ঘরে আজ /উৎসবের রাতি।/তোমার আছে হাসি/ আমার আঁখি-জল,…

ফজিলাতুন্নেসাকে নজরুল কতটুকু কাছে পেয়েছিলেন তা আজও অজ্ঞাত। কাজী মোতাহার হোসেনের কাছ হতে প্রাপ্ত পত্রগুলো, মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনসহ প্রমুখ নিকটজনের তথ্য মতে, ফজিলাতুন্নেসা নজরুলের প্রেমে সাড়া দেন নি মোটেই। কাজী মোতাহার হোসেনের একটি বক্তব্য এ প্রসঙ্গে ভাবিয়ে তোলে। তিনি বলেছেন ‘কিন্তু আরও একটি বিস্ময়ের ব্যাপার তখনও আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। ঐ দিন দুপুরে লক্ষ্য করলাম ফজিলাতুন্নেসার গলায় লম্বা মটর মালার হারটা ছিঁড়ে দু’খান হয়ে গিয়েছে। পরে সেটা সোনারুর দোকান থেকে সারিয়ে আনতে হয়েছিল। অত্যন্ত কাছ থেকে জোরাজুরি ছাড়া এমন একটা কাণ্ড কেমনে ঘটতে পারে আমার পক্ষে তা বুঝে ওঠা মুশলিক।’ [উদ্ধৃত, আতাউর রহমান, নজরুলের জীবনে প্রেম ও বিবাহ (ঢাকা: শুভ্রা প্রকাশনী, ১৯৯৭), পৃ. (গ্রন্থে পৃষ্ঠাংকন নেই)] এ বক্তব্যে একটা ইঙ্গিত সুষ্পষ্ট, নজরুল প্রথম পরিচয়েই শক্তি প্রয়োগ করে ফজিলাতুন্নেসার মন জয় করতে চেয়েছিলেন। কাজী মোতাহার হোসেনও মনে করতেন, অঘটন একটা ঘটেছিল যে কারণে নজরুল ফজিলাতুন্নেসার মন জয় করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

দীর্ঘদিন পর ফজিলাতুন্নেসার কাছ থেকে প্রাপ্ত একটি ডায়েরিতে নজরুলের স্বহস্তে লেখা নয়টি গান (বুলবুল গ্রন্থের) ও চার লাইনের দু’টি কবিতা একটি নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। এ ডায়েরি ফজিলাতুন্নেসার দেবর বদরুদ্দোজা দিয়েছিলেন পুস্তক ব্যবসায়ী মাহফুজুর রহমান খানকে। তিনি ‘এম্পায়ার বুক হাউস’ প্রকাশনার মালিক। এ প্রকাশনা হতে ফজিলাতুন্নেসার মারফতে নজরুলের গানের বই ‘জুলফিকার’ প্রকাশিত হয়েছিল। কলকাতার ক্যাম্পবেল হাসপাতালে অসুস্থ অবস্থায় থাকার সময় ফজিলাতুন্নেসার বিছানা হতে ডায়েরিটি সংগৃহীত হয়। ডায়েরির গানগুলো এ কথা প্রমাণ করে যে, হয়ত কোনো বিশেষ মুহূর্তে নজরুল ফজিলাতুন্নেসার কাছাকাছি এসেছিলেন। নইলে ফজিলাতুন্নেসার ডায়েরিতে নজরুলের স্বহস্তে লেখা এতগুলো গান আসল কিভাবে? ফজিলাতুন্নেসা নজরুলকে এড়িয়ে গেছেন প্রকাশ্যে একথা প্রমাণিত সত্য। যাকে ভালবাসলেন না, যার প্রেম প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন নির্দয়ভাবেই, তার প্রেমাকুতিপূর্ণ গানগুলো এত যত্নে জীবনসায়াহ্ন পর্যন্ত রাখলেন কেন? স্বভাবতই আমাদের ভাবনায় আসে, সম্ভবত, ফজিলাতুন্নেসার অন্তরে নজরুলের জন্য কিছুটা জায়গা ছিল। আর  তা নজরুলও জানতেন। এবং এ জন্যই ফজিলাতুন্নেসার মনের খবর মুখে জানতে এত ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলেন। আর যদি নাই হবে তবে ফজিলাতুন্নসা কেন এবং কোন দাবিতে নজরুলকে অতিরিক্ত চা ও পান খেতে নিষেধ করেছিলেন। আর তাঁর মুখের নিষেধের এত শক্তিই বা কোথা থেকে এলো যে, পরবর্তীতে চা ও পান মুখে তুলতেই নজরুলের হাত কাঁপতো। সুতরাং এ কথা জোর দিয়েই বলতে পারি, প্রথম সাক্ষাতেই ফজিলাতুন্নেসা নজরুলের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। পরে নিজের ক্যারিয়ারের কথা বিবেচনা করে এবং নজরুলের বাড়াবাড়ি দেখে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। 

ফজিলাতুন্নেসাকে ঘিরে নজরুলের যে মনোবেদনা, অপ্রাপ্তির অতৃপ্তিজনিত দীর্ঘশ্বাস, তা অনেকাংশে সেধে নেওয়া। সবই যেন কবির স্বেচ্ছাকৃত ভুল। কবি ভুল করে ফুল ফুটাতে। নজরুলও তাই করেছেন। তাঁর ঢাকা সফর ছিল ‘তীর্থযাত্রা’। তাই তাঁর সব পত্র, কবিতা, গান, আবেদন-নিবেদন, হা-হুতাশ সম্পূর্ণভাবেই এক পক্ষীয়। one side love বা এক পক্ষীয় ভালোবাসা বলতে যা বোঝায়, তাই ঘটেছিল। নজরুল একাই ভালোবেসেছেন, একাই চেয়েছেন, একাই বিরহ-বেদনায় ভুগেছেন। নিজেও জানতেন, উচ্চশিক্ষিত, বুদ্ধিমতী এই যুবতীর কাছে তাঁর আবেগ-উচ্ছ্বাসের বিশেষ কোনো মূল্য নেই। বাস্তবতার মানদণ্ডে কবি যে ফজিলাতুন্নেসার যোগ্য নন, এই ব্যাপারে তিনি সচেতন ছিলেন। তৃতীয় পত্রে তাঁর সরল স্বীকারোক্তি, ‘সত্যিই তা তার-আমার সুন্দরের-চরণ ছোঁয়ার যোগ্যতা আমার নেই, আমার দুহাত মাখা কালি। বলো, যে কালি তার রাঙা পায়ে লেগেছিল, চোখের জলে তা ধুয়ে দিয়েছি। আর-অগ্রদূত! তোমায়ও আমি নমস্কার—নমস্কার করি। তুমি আমার তারালোকের ছায়াপথ। তোমার বুকেই পা ফেলে আমি আমার সুন্দরের ধ্রুব-লোকে ফিরে এসেছি। তুমি সত্যই সেতু-আমার স্বর্গে ওঠার সেতু।’ আর তাই ফজিলাতুন্নেসাকে নজরুল ‘প্রার্থনার অঞ্জলি’ করে রাখতে চেয়েছেন, ‘বুকের মালা’ করবার সাহস করেননি। সুন্দরের কবি প্রেম পাননি বলে ফজিলাতুন্নেসার নারীত্বের অবমাননা করেননি। বরং স্বর্গের দেবতার কাছে যেমন সুন্দরের ধ্যান করে থাকে পূজারী, নজরুলও তাই করেছেন। ফজিলাতুন্নেসার প্রতি প্রবল আবেগ নিয়ে ধাবিত হয়েছিলেন নজরুল। কোনমতেই যখন ফজিলাতুন্নেসা সাড়া দিচ্ছেন না, বরং কঠোর মনোভাব দেখাচ্ছেন, এদিকে কবির পাগলামি দিনে দিনে বাড়ছে বৈ কমছে না, তখন ভাই-বোন পাতিয়ে একপাক্ষিক এই প্রেমের সমাপ্তি ঘটাতে চেয়েছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন। যাকে প্রেমিকা হিসেবে কামনা করেছেন, যার মুখচ্ছবি ধ্যান করে অসংখ্য বিনিন্দ্র প্রহর কাটিয়েছেন, সেই নারীকে বোন বানিয়ে মুখোশ পরার মতো আত্ম-প্রবঞ্চনা করতে পারেন না নজরুল। সপ্তম পত্রে সে ত বলেছে ‘আমাকে ভয় করার তাঁর কিছু নেই। আমি তাঁর বিনা অনুমতিতে গিয়ে বিরক্ত র্কব না—বা তাঁর শান্তির ব্যাঘাত র্কব না। বন্ধু, তুমি, অনুগ্রহ করতে গিয়ে আর আমায় দুঃখ দিয়ো না।’

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, দুঃখকে কবি উপভোগ করেছেন। উচ্চশিক্ষিত ও প্রখর ব্যক্তিত্ববান ফজিলাতুন্নেসার প্রতি দুর্বার আকর্ষণের মধ্য দিয়ে এক ধরনের তৃপ্তি পেয়েছেন কবি নজরুল। তাই যুগপৎ উচ্ছ্বাস ও আনন্দ দেখতে পাই তাঁর মধ্যে। মহৎ শিল্প সৃষ্টির জন্য এ ধরনের উচ্চাভিলাষী দুঃখের প্রয়োজন হয়। এই দুঃখ ব্যক্তি নজরুলের জন্য বিশেষ প্রয়োজন না থাকলেও কবি নজরুলের জন্য ছিল আশীর্বাদ স্বরূপ। আর এই প্রত্যাখ্যান ট্র্যাজেডির জন্য নজরুলের ‘বিশুষ্ক মরুভূমি’র মত জীবন দীর্ঘ প্রতীক্ষার অতিক্রম করেছেন, কত যে ‘দেশ দেশান্তরে, গিরি নদীবন পর্ব্বত মরুভূমি’ ঘুরেছেন কবি চোখের জল ফেলতে ফেলতে। প্রথম পত্রেই তাঁর স্পষ্ট ঘোষণা, ‘আমি চাচ্ছিলাম এই দুঃখ, বেদনা।’ ফজিলাতুন্নেসার প্রেম প্রত্যাখ্যানের বেদনায় নীলকণ্ঠ নজরুল তাঁর বেদনাকে ফরহাদ, মজনু ও সাজাহান এইসব বিশ্ববিরহীর সমগোত্রীয় ভেবেছেন। তাই প্রত্যাখ্যানজনিত এই মহৎ বেদনাকে কবি মর্যাদা দিয়েছেন কবিতার মারফতে। উন্মাদ প্রেমিক ফরহাদ তাঁর প্রেমিকা শিরীকে পাওয়ার জন্য পাহাড় কেটে অথবা প্রেমিক মজনু সাধারণ মেয়ে লাইলিকে প্রেমের দেবীর আসনে প্রতিষ্ঠিত করে যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, প্রেমিক নজরুলও ফজিলাতুন্নেসাকে এমনি করে সৃষ্টি করে যাবেন তাঁর কবিতা ও গানে, এই ধরনের কথা লিখেছিলেন প্রথম পত্রে। ফজিলাতুন্নেসার পর নজরুলের জীবনে আর কোন প্রেম এসেছে বলে জানা যায় না। ঢাকাতে প্রতিভা সোম ওরফে রানু সোম (পরে বুদ্ধদেব বসুর স্ত্রী) এবং উমা মৈত্র ওরফে নোটন (ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ সুরেন্দ্র মিত্রের কন্যা) নামে দুইজন তরুণীর সঙ্গে নজরুলের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠলেও তা প্রেমে রূপান্তর ঘটেনি।

প্রেমিকার প্রেম প্রত্যাখ্যান-প্রতারণা-বঞ্চনা সৃজনশীল প্রতিভার জন্যে অনেক সময় আশীর্বাদের হয়ে ওঠে। ‘প্রেম বঞ্চিত প্রতিভাবান ব্যক্তির সৃজনীশক্তি প্রায়শই পৃথিবীর জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। বিষয়টা অনেকটা শাপে বরের মত। আঘাত পেয়ে জেগে ওঠা। প্রতারণায় সৃষ্টিমুখর নব জীবন লাভ। যেমন নজরুলের ক্ষেত্রে ঘটেছে; প্রেমোত্তর বিরহ পর্বে হয়ে উঠেছেন তিনি অধিকতর সৃজন সফল।’ (মো: হারুন-অর-রশীদ, চিরঞ্জীব নজরুল, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০০০, পৃ. ৯৮)। বিশ্বসাহিত্যে এ ধরনের ঘটনার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। দান্তে তাঁর প্রেমিকা বিয়াত্রিচকে, শেলী তাঁর প্রেমিকা এমিলিয়াকে, কীটস্ তাঁর প্রেমিকা ফ্যানি বাউনকে পাননি বলেই মহৎ কবিতা লিখতে পেরেছেন। নজরুলও নিজেকে শেলী-কীট্সের মতোই ভাবতেন—

‘আচ্ছা আমার রক্তে রক্তে শেলীকে কীট্সকে এত করে অনুভব করছি কেন? কীট্সের প্রিয়া ফ্যানিকে লেখা তার কবিতা পড়ে মনে হচ্ছে যেন এ কবিতা আমিই লিখে গেছি। কীট্স-এর “সোর-থ্রোট” আর তাতেই মরল ও শেষে—অবশ্য তার “সোর্স” হার্ট কিনা কে বলবে। কণ্ঠপ্রদাহ রোগে আমি ভুগছি ঢাকা থেকে এসে অবধি, রক্তও উঠছে মাঝে মাঝে—আর মনে হচ্ছে আমি যেন কীট্স। সে কোন ফ্যানির নিষ্করুণ নির্মমতায় হয়ত বা আমার বুকের চাপ—ধরা রক্ত তেমনি করে কোন দিন শেষ ঝলক উঠে আমায় বিয়ের বরের মত করে রাঙিয়ে দিয়ে যাবে।

তারপর হয়ত বা বড় বড় সভা হবে। কত প্রশংসা-কত কবিতা বেরুবে হয়ত আমার নামে। দেশ প্রেমিক, ত্যাগী, বীর বিদ্রোহী বিশেষণের পরে বিশেষণ। টেবিল ভেঙে ফেল্বে থাপ্পড় মেরে-বক্তার পর বক্তা।

এই অসুন্দর শ্রদ্ধা নিবেদনের শ্রাদ্ধ দিনে—বন্ধু! তুমি যেন যেয়ো না।’

অলংকরণ শিবলী নোমান