grand river view

।। ভাষান্তর: মুহসীন মোসাদ্দেক ।।

……..

বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক হারুকি মুরাকামি। জাপানি এই লেখককে নিয়ে সাহিত্যমনা সকলের ভেতরে আগ্রহ রয়েছে তুমুল। মুরাকামির দৈনন্দিন সূচিতে দৌড়ানো অন্যসব প্রয়োজনীয় ও অভ্যস্থ কাজের মতোই অন্তর্ভুক্ত। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে তিনি নিয়ম করে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় দৌড়ান। শত বস্ততার মাঝেও তিনি দৌড়ানোয় কোনো বিরতি দেন না। মুরাকামি তার এই দৌড়ানোর স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন ‘হোয়াট আই টক অ্যাবাউট হোয়েন আই টক অ্যাবাউট রানিং’। এই স্মৃতিকথায় তিনি দৌড়ানো কীভাবে তার জীবনের অনুষঙ্গ হলো এবং কেন, তা জানিয়েছেন। সেইসঙ্গে তরুণ লেখকদের জন্য দিয়েছেন বেশ কিছু পরামর্শ। আলাদাভাবে দেয়া পরামর্শগুলো বাদ দিলেও, মুরাকামির জীবনের এইসব স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার বর্ণনাজুড়ে ছড়িয়ে আছে জীবনকে নতুন করে দেখা এবং অনেক কিছু নতুন করে শুরু করা বা ঢেলে সাজানোর টনিক। অন্তত আমি এমনটাই অনুভব করেছি। ঠিক এ কারণেই এই অনুবাদে আগ্রহ। তবে বিশেষভাবে বলে নিতে হচ্ছে, বইয়ের কোনো অংশ ধারাবাহিকভাবে এখানে অনুবাদ করা হয়নি। বইটির চতুর্থ অধ্যায় ‘মোস্ট অব হোয়াট আই নোও অ্যাবাউট রাইটিং ফিকশন আই লার্নড বাই রানিং এভরি ডে’-এ উল্লিখিত উপন্যাস নিয়ে তার ভাবনা ও পরামর্শের অংশটিকে ফোকাসে নিয়ে প্রথম, দ্বিতীয় এবং চতুর্থ অধ্যায় থেকে দৌড়ানো বিষয়ক কিছু বিচ্ছিন্ন অথচ সংশ্লিষ্ট অংশ যোগ করে এ লেখাটি দাঁড় করানো হয়েছে। যেহেতু চতুর্থ অধ্যায়ের একটা বিশেষ অংশকে ফোকাস করা হয়েছে, তাই এ লেখার শিরোনামে চতুর্থ অধ্যায়ের শিরোনামটির নির্যাস ব্যবহার করা হলো। দৌড়ানো নিয়ে তার বলা কথাগুলো উপন্যাস নিয়ে বলা কথাগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যদি শুধু উপন্যাস নিয়ে বলা কথাগুলো অথবা কেবল চতুর্থ অধ্যায়টি অনুবাদ করা হতো তবে একটা অপূর্ণতা ও ধোঁয়াশা থেকে যেত। এভাবে একজন লেখকের কোনো বই থেকে টুকরো টুকরো লেখা একত্র করা হয়তো নৈতিকভাবে সমর্থন করে না। তবু, বিশ্বাস করি, এ লেখা অনেকের উপকারে আসবে।

……..

অনেক অনেক দিন পেরিয়ে গেছে যখন থেকে আমি নিয়ম করে প্রতিদিন দৌড়ানো শুরু করেছি। বিশেষত, ১৯৮২ সাল থেকে, আমার তখন তেত্রিশ বছর বয়স।

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, সেন্দাগায়া স্টেশনের কাছে আমি একটা জ্যাজ ক্লাব চালাই। কলেজ পেরোনোর পরেই—আসলে আমি খণ্ডকালীন চাকরিতে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে কিছু ক্রেডিট কম থাকায় আমার স্নাতক আটকে ছিল এবং তখনও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষার্থী ছিলাম—আমি কোকুবুঞ্জি স্টেশনের দক্ষিণ প্রবেশদ্বারের কাছে একটি ছোট ক্লাব খুলেছিলাম এবং প্রায় তিন বছর এটি চালিয়েছি; তখন আমি যে বিল্ডিংয়ে ছিলাম তারা যখন সেটা পুনর্নিমাণ শুরু করল, আমি টোকিওর প্রাণকেন্দ্রের কাছাকাছি একটি নতুন ঠিকানায় চলে আসি। নতুন ভেন্যুটি তেমন বড় ছিল না, খুব একটা ছোটও বলা যায় না। আমাদের একটা বিশাল পিয়ানো ছিল এবং এরপরও যথেষ্ট ফাঁকা জায়গা ছিল। দিনের বেলায় আমরা কফি পরিবেশন করতাম এবং রাতে এটি ছিল বার। আমরা বেশ ভালো মানের খাবারও পরিবেশন করতাম এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিশেষ লাইভ পরিবেশনা থাকত। এই ধরনের লাইভ জ্যাজ ক্লাব তখন বেশ বিরল ছিল, এ কারণে আমরা কিছু ‘বান্ধা’ কাস্টমার পেয়ে যাই এবং আর্থিকভাবে সবকিছু ঠিকঠাক চলতে থাকে।

আমার চেনা-জানা বেশিরভাগ লোক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে বারটি ভালো চলবে না। তারা ইঙ্গিত করেছিল শখের বসে কোনো প্রতিষ্ঠান চালানো কার্যকর কিছু হবে না। আমার মতো কেউ যে কিনা বেশ সাদাসিধা এবং সম্ভবত ব্যবসা চালানোর মতো সামান্য প্রবণতা যার নেই, সে এটা চালিয়ে যেতে সক্ষম হবে না। যাইহোক, তাদের পূর্বাভাস সম্পূর্ণরূপে ভুল ছিল। সত্যি বলতে, আমি মনে করি না ব্যবসার ঝোঁক আমার তেমন একটা ছিল। আমি কেবল অনুধাবন করেছিলাম, যেহেতু ব্যর্থতা কোনো অপশন নয়, সুতরাং আমার যা সামর্থ্য আছে তার সব উজাড় করে দিতে হবে। আমার একমাত্র শক্তিমত্তা হলো আমি সবসময় কঠোর পরিশ্রম করতে পারি এবং শারীরিকভাবে অনেক ভার বহন করতেও সক্ষম। আমি ঘোড়দৌড়ের ঘোড়ার মতো আয়েশি স্বভাবের ছিলাম না, বরং ক্ষেত-খামারে কাজ করা ঘোড়ার মতো পরিশ্রমী-উদ্যমী ছিলাম। আমি সম্ভ্রান্ত ‘স্যুটেড-বুটেড’  এক পরিবারে বেড়ে উঠেছি, তাই উদ্যোক্তা বিষয়ে তেমন কিছু জানা ছিল না, তবে সৌভাগ্যক্রমে আমার স্ত্রীর পরিবার একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাত, তাই ব্যবসা সম্পর্কে তার সহজাত অন্তর্দৃষ্টি আমার জন্য অতুলনীয় এক অবলম্বন ছিল। আমি যতই কর্মোদ্যমী ঘোড়া হই না কেন, কখনোই নিজে নিজে এটা করতে সক্ষম হতাম না।

কাজ মানেই একটি কঠিন বিষয়। আমি সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি যতক্ষণ না ক্লান্ত হয়ে পড়তাম কাজ করে যেতাম। আমার প্রায় সব ধরনের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা হয়েছিল এবং প্রচুর হতাশাও ছিল। তবে আমি পাগলের মতো কাজ করে গিয়েছি এবং শেষমেষ আমাকে সাহায্য করার জন্য অন্য লোক নিয়োগ দেয়ার মতো যথেষ্ট মুনাফা আয় করতে শুরু করি। এবং আমার বয়স যখন ত্রিশের কাছাকাছি, অবশেষে আমি একটু দম ফেলতে সমর্থ হই। বারের ব্যবসাটি শুরু করার জন্য আমি পরিচিতজনদের ভেতরে যেখান থেকে যতটা পেরেছি টাকা ধার করেছিলাম, এবং প্রায় সব ঋণ শোধ করে দিতে পেরেছিলাম। সবকিছু ঠিকঠাক মতো দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এ অবস্থায় পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত, কোনোমতে মাথা তুলে নিছক বেঁচে থাকার প্রশ্ন ছিল, এর বাইরে আর কিছু ভাবার অবকাশ আমার ছিল না। আমি অনুভব করলাম কিছু খাড়া সিঁড়ি পেরিয়ে চূড়ায় এসে পৌঁছেছি এবং মোটামুটি একটা ভালো জায়গায় অবস্থান করছি। সেইসঙ্গে আমি বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলাম, কারণ নিরাপদ একটা অবস্থানে এসে পৌঁছেছি, আকস্মিকভাবে ভবিষ্যতে যদি কোনো সমস্যায় পড়ি তবে তা সামলে বেঁচে থাকতে পারব। গভীর শ্বাস নিলাম আমি, ধীরে ধীরে আমার চারপাশে তাকালাম, যে সিঁড়ি বেয়ে এখানে এসে পৌঁছেছি তা একবার স্মরণ করলাম এবং পরবর্তী পর্যায়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম। ত্রিশের ঘরে পা দেয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। এমন একটা বয়সে পৌঁছে গিয়েছিলাম যখন আমাকে আর তরুণ বলে গণ্য করা যায় না। এবং বয়সের এ পর্যায়ে এসে বেশ অপ্রত্যাশিতভাবেই আমার ভেতরে উপন্যাস লেখার একটা ঝোঁক এসে যায়।

***

হাওয়াই আসার পর থেকে সপ্তাহের ছয় দিন প্রতিদিন আমি এক ঘণ্টা করে দৌড়াই। প্রায় আড়াই মাস হলো আমি আমার পূর্বের জীবনধারা পুনরায় শুরু করেছি, অনিবার্য কোনো কিছু না ঘটলে, প্রতিটা দিন আমি দৌড়াই। আজ আমি এক ঘণ্টা দশ মিনিট দৌড়িয়েছি, আমার ওয়াকম্যানে লোভিন স্পুনফুলের দুটি অ্যালবাম—ডে-ড্রিম এবং হামস অব লোভিন স্পুনফুল—শুনতে শুনতে যা আমি এমডি ডিস্কে রেকর্ড করে রেখেছিলাম।

***

দৌড়রত মুরাকামি

প্রথম যখন আমি দৌড়ানো শুরু করি, তখন খুব বেশি দূরত্বে যেতে পারতাম না। মাত্র বিশ বা ত্রিশ মিনিট সময় দৌড়াতে পারতাম। এমনকি এটুকুতেই আমি হাঁসফাঁস করতাম, আমার হৃৎপিণ্ড ধড়ফড় করত এবং পা কাঁপতে থাকত। আমি আসলে অনেকদিন কোনো প্রকার অনুশীলন করিনি। প্রথম প্রথম খুব বিব্রতবোধ করতাম যখন দেখতাম প্রতিবেশীরা আমার দৌড়ানো দেখছে। কিন্তু আমি দৌড়ানো অব্যাহত রাখায় আমার শরীর মানিয়ে নিতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে আমার ধৈর্য বাড়তে থাকে। দৌড়বাজের রূপ ধারণ করি আমি, আমার শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং হৃদস্পন্দন ঠিকঠাক মতো চলতে থাকে। দৌড়ানোর গতি বা দূরত্ব আসলে মূল বিষয় নয়, বিরতি না দিয়ে প্রতিদিন দৌড়ানো অব্যাহত রাখাই মুখ্য বিষয়।

সুতরাং, খাওয়া, ঘুমানো, ঘরের কাজ ও লেখালেখির মতো দৌড়ানোটাও আমার দৈনন্দিন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। দৌড়ানোটা স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাওয়ায় এটা নিয়ে আমার বিব্রতবোধ কমে গিয়েছিল। আমি খেলাধুলার সামগ্রীর একটি দোকানে গিয়ে দৌড়ানোর জন্য কিছু পোশাক এবং কিছু সুন্দর জুতো কিনেছিলাম। একটা স্টপওয়াচও কিনেছিলাম এবং দৌড়ানো বিষয়ক একটি বই পড়েছিলাম।

পেছনে ফিরে দেখি, আমার জন্য সবচেয়ে সৌভাগ্যের বিষয় হলো আমি জন্মগতভাবেই একটি বলিষ্ঠ ও স্বাস্থ্যকর শরীর পেয়েছি। একমাত্র এ কারণেই পঁচিশ বছরের অধিক সময় ধরে নিয়মিত প্রতিদিন দৌড়ানো আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছে, একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি দৌড় প্রতিযোগিতায়ও অংশ নিয়েছি। আমি কখনো আহত হইনি, কখনো কোনো আঘাত পাইনি এবং একবারের জন্যও অসুস্থতা বোধ করিনি। আমি মোটেও কোনো দুর্দান্ত দৌড়বিদ নই, তবে আমি বেশ বলিষ্ঠ একজন দৌড়বাজ। আমার জীবনে গর্বিত হওয়ার মতো খুব কম সহজাত গুণের মধ্যে এটি একটি।

***

এই মুহূর্তে আমি আমার দৌড়ানোর পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্য ঠিক করেছি, সুতরাং দৌড়ানোর গতি একটি বড় বিষয়। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি নির্দিষ্ট দূরত্বে দৌড়াতে পারি, ততটুকুই আসলে আমার মনোযোগ। মাঝে মাঝে আমি বেশ জোরে দৌড়াই, তবে যখন আমি দৌড়ানোর গতি বাড়াই তখন দৌড়ানোর সময়টা কমিয়ে আনি। প্রতিদিনের দৌড়ের শেষে আমি যে প্রফুল্লতা অনুভব করি তা পরের দিন আমাকে আবার এই দৌড়ের ময়দানে টেনে আনে। আমি টের পাই উপন্যাস লেখার সময় ঠিক একই ধরনের প্রক্রিয়া প্রয়োজন। প্রতিদিন ঠিক সেই মুহূর্তে আমি লেখা থামিয়ে দিই যেখানে আমার মনে হয় আরও লিখতে পারব। এতে করে পরের দিনের কাজ আশ্চর্যরকম সহজ হয়ে যায়। আমার ধারণা, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ঠিক এই রকম কিছু একটা করত। চালিয়ে যেতে হলে আপনাকে ছন্দটি ধরে রাখতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলোর জন্য এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনি একবার গতি নির্ধারণ করে ফেলতে পারলে পরবর্তী সব আপনাআপনি তা অনুসরণ করবে।

***

জীবনের একটা পর্যায়ে বেশ কিছু অপ্রত্যাশিত ধাক্কা আসে এবং কাজের চাপ বাড়িয়ে দেয়। সে সময় লেখক হিসেবে আমার কিছুটা পরিচিতি এসে যাওয়া, নতুন প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘স্ট্রেঞ্জ টেলস ফ্রম টোকিও’ এবং এ সম্পর্কিত কিছু সাক্ষাৎকারের বায়না, রেমন্ড কারভারের অনুবাদটির নতুন সংস্করণ চূড়ান্তকরণ, পরের বছর প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ ‘ব্লাইন্ড উইলো, স্লিপিং ওমেন’-এর জন্য দীর্ঘ ভূমিকা লেখা, সেই সঙ্গে রানিং নিয়ে এই গদ্যগুলো লেখা যা লিখতে কেউ আমাকে প্ররোচিত করেনি—সবমিলিয়ে ব্যস্ততা বেড়ে যায়। ব্যবসার অনেক খুঁটিনাটি বিষয়ও আমাকে দেখতে হয়। এর মধ্যে আমাদের টোকিও অফিসে যে ভদ্রমহিলা সহকারী হিসেবে কাজ করছিলেন হঠাৎ করেই ঘোষণা করলেন পরের বছরের শুরুতে তিনি বিয়ে করবেন এবং এ কারণে চাকরি ছেড়ে দিতে চান। সুতরাং, আমাদের এখন তার বদলি খুঁজতে হবে। গ্রীষ্মের সময় অফিস বন্ধ রাখা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি লেকচারও দিতে হবে আমাকে, সুতরাং সে সবের প্রস্তুতিরও ব্যাপার আছে।

সুতরাং, আমার হাতে থাকা স্বল্প সময়ের মধ্যে আমি চেষ্টা করছি সবকিছু যথাসম্ভব সামলে নেয়ার। এবং নিউইয়র্ক সিটি ম্যারাথনের প্রস্তুতি নিতে আমার দৌড়ানোও অব্যাহত রাখতে হবে। আমার মতো দুজন মিলেও সবকিছু সময়মতো সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না। যেভাবেই হোক না কেন, তবুও আমি দৌড়ানো চালিয়ে গিয়েছি। প্রতিদিন দৌড়ানো ব্যাপারটা আমার জন্য এক ধরনের লাইফলাইন, সুতরাং কেবল ব্যস্ত থাকার কারণে আমি তা থামিয়ে দেয়া বা বন্ধ রাখতে পারি না। আমি যদি ব্যস্ততাকে না দৌড়ানোর অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাই, আমার আর কখনোই দৌড়ানো হবে না। সুতরাং, আমি আমার দৌড়ানো অব্যাহত রাখি এবং সবকিছু সুন্দরভাবে সামলে নিতে পেরেছি।

***

লেখার টেবিলে হারুকি মুরাকামি

এবার উপন্যাস নিয়ে কিছু বলি।

প্রতিটি সাক্ষাৎকারেই আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, একজন ঔপন্যাসিকের সবচেয়ে মুখ্য কোন গুণটি থাকা প্রয়োজন? এটি বেশ স্পষ্ট: প্রতিভা। আপনি লেখায় যতটা উদ্যম ও প্রচেষ্টা ঢেলে দিন না কেন, আপনার যদি সাহিত্যসুলভ প্রতিভার যথেষ্ট ঘাটতি থাকে তবে আপনি ঔপন্যাসিক হওয়ার কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। এটা যতটা না মুখ্য গুণাবলী তারচেয়েও বেশি পূর্বশর্ত। যদি উপযুক্ত জ্বালানি না থাকে,তবে সেরা গাড়িটিও কখনো চলবে না।

তবে প্রতিভার ক্ষেত্রে সমস্যাটি হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বীয় ব্যক্তি এর পরিমাণ বা মান নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। আপনার কাছে মনে হতে পারে যেটুকু প্রতিভা পেয়েছেন তার পরিমাণ যথেষ্ট নয় এবং আপনি তা বাড়াতে চান, অথবা প্রতিভাটুকুকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য সংযত বা হিসাবি হতে চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই ব্যাপারগুলো সহজে কার্যকরী নয়। প্রতিভার নিজস্ব একটা প্রকৃতি আছে এবং সে যখন চায় জেগে ওঠে, আবার একসময় নির্জীব হয়ে যায়।

যদি আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়, একজন ঔপন্যাসিকের জন্য পরবর্তী কোন মুখ্য গুণটি থাকা প্রয়োজন, এটাও খুব সহজ: ফোকাস—আপনার সমস্ত সীমাবদ্ধ প্রতিভা দিয়ে নির্দিষ্ট মুহূর্তে যা কিছু গুরুত্বপূর্ণ তার দিকে মনোনিবেশ করার দক্ষতা। এটি ছাড়া আপনি মূল্যমানের অর্থাৎ বলার মতো কিছুই অর্জন করতে পারবেন না, অপরদিকে আপনি কার্যকরভাবে ফোকাস করতে পারলে আপনি অনন্য প্রতিভা ধারণ বা এমনকি এর অভাবও পূরণ করতে সক্ষম হবেন। আমি সাধারণত প্রতিদিন সকালে তিন থেকে চার ঘণ্টা লেখার প্রতি মনোনিবেশ করি। আমার টেবিলে বসে আমি যা লিখছি তার ওপর সম্পূর্ণরূপে ফোকাস করি। এ সময় আমি অন্য কোনো দিকে তাকাই না বা অন্য কিছু নিয়ে ভাবি না। এমনকি একজন ঔপন্যাসিক, যিনি অনন্য প্রতিভাধর এবং দুর্দান্ত নতুন আইডিয়াতে যার ভাবনা পরিপূর্ণ, সম্ভবত তিনিও কিছু লিখতে পারবেন না, যদি তিনি দাঁতের ক্ষয়ে যাওয়া অংশের ব্যথায় ভোগেন। ব্যথা মনোনিবেশ বা নিবিষ্টতায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক এটাই নির্দেশ করি, যখন আমি বলি যে ফোকাস করা ছাড়া আপনি কোনো কিছুই অর্জন করতে পারবেন না।

ফোকাসের পরে, একজন ঔপন্যাসিকের জন্য পরবর্তী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, ধৈর্য। আপনি যদি দিনে তিন বা চার ঘণ্টা লেখায় মনোনিবেশ করে এক সপ্তাহ পর ক্লান্ত বোধ করেন, তবে আপনি দীর্ঘ কোনো লেখা লিখতে সক্ষম হবেন না। একজন কথাসাহিত্য লেখকের জন্য যা প্রয়োজন—অন্তত যিনি কোনো উপন্যাস লিখবেন বলে সংকল্প করেছেন—তা হলো অর্ধবছর বা এক বছর, কিংবা দুবছর ধরে প্রতিদিন মনোনিবেশ করার কর্মশক্তি। আপনি এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্রিয়ার সঙ্গে তুলনা করতে পারেন। মনোনিবেশ বা নিবিষ্টতা যদি কেবল শ্বাস ধরে রাখার প্রক্রিয়া হয়, ধৈর্য হলো ধীরে ধীরে, শান্তভাবে শ্বাস নেয়া এবং একই সঙ্গে ফুসফুসে বাতাস সংরক্ষণের শিল্প। আপনি যদি উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারেন, দীর্ঘকাল ধরে পেশাদারভাবে উপন্যাস লেখা আপনার জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।

সৌভাগ্যক্রমে, এই দুটি বিধি—ফোকাস এবং ধৈর্য—প্রতিভা থেকে ভিন্ন, যেহেতু চর্চার মাধ্যমে এগুলো অর্জন এবং শাণিত করা যায়। আপনি যখন প্রতিদিন আপনার লেখার টেবিলে বসবেন এবং একটি নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুতে ফোকাস করার চর্চা করবেন তখন আপনি প্রকৃতিগতভাবেই নিবিষ্টতা ও ধৈর্য উভয়ই শিখে নিতে পারবেন। এটা অনেকটা মাংসপেশির প্রশিক্ষণের অনুরূপ। মাংসপেশিগুলো পালিত পশুর মতো, যা দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে। আপনি যদি সাবধানে ভার বাড়িয়ে দেন, ধাপে ধাপে, তারা এটিকে আয়ত্ত করতে শিখে নেয়। প্রকৃতপক্ষে কতটা ভার তাদের বহন করতে হবে দৃষ্টান্তের মাধ্যমে তা দেখিয়ে দিয়ে তাদের কাছে আপনার প্রত্যাশাগুলো যখন বুঝিয়ে দিতে পারবেন, আপনার মাংসপেশিগুলো তা মেনে চলবে এবং ক্রমান্বয়ে তা শক্তিশালী হয়ে উঠবে। অবশ্য, রাতারাতি এমনটা হয়ে যাবে না। তবে আপনি যত সময় নেবেন এবং পর্যায়ক্রমে তা করবেন, তারা তাতে আপত্তি করবে না—সাময়িক অবসন্নতাকে পাশ কাটিয়ে—এবং তারা খুব ধৈর্যশীলতা ও আনুগত্যের সঙ্গে আরও দৃঢ় হয়ে উঠবে। পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে আপনি আপনার মাংসপেশিগুলোতে এই বার্তা প্রবেশ করাবেন যে ‘এই এতটা’ কাজ তাদের সম্পাদন করতে হবে। আমাদের মাংসপেশিগুলো যথেষ্ট নিষ্ঠাবান। যতক্ষণ আমরা সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করব, তারা কোনো আপত্তি করবে না।

আপনাকে ক্রমাগত আপনার ফোকাসের বিষয়বস্তুকে সমগ্র শরীরে সঞ্চারণ করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যে আপনার প্রতিদিনের লেখা ও চলমান কাজে মনোনিবেশ করার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে একত্রিত করে। এবং আপনি যা করতে সক্ষম তার পরিসর ক্রমান্বয়ে প্রসারিত করবেন। প্রায় অগোচরে আপনার মানদণ্ড উন্নীত হতে থাকবে। প্রতিদিন জগিংয়ের মাধ্যমে পেশি শক্তিশালী করতে এবং একজন দৌড়বিদের দৈহিক বিকাশে এই একই প্রক্রিয়া জড়িত। একটি উদ্দীপনা যোগ করুন, চালিয়ে যান এবং পুনরাবৃত্তি করুন। ধৈর্য এই প্রক্রিয়ায় আবশ্যক একটি বিষয়, তবে আমি নিশ্চয়তা দিতে পারি ফলাফল আসবে।

ব্যক্তিগত পত্রের মাধ্যমে, বিখ্যাত রহস্য-রোমাঞ্চ লেখক রেমন্ড চ্যান্ডলার একবার স্বীকার করেছিলেন যে, কোনো কিছু না লিখলেও, তিনি প্রতিদিনই তার লেখার টেবিলে বসতেন এবং লিখতে মনোনিবেশ করতেন। এই কাজটির পেছনে কী উদ্দেশ্য তা আমি উপলব্ধি করতে পারি। এই প্রক্রিয়ায় চ্যান্ডলার দৈহিক কষ্টসহিষ্ণুতা অর্জন করে নিঃশব্দে তার ইচ্ছেশক্তিকে শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছিলেন যা একজন পেশাদার লেখকের প্রয়োজন। এই ধরনের প্রতিদিনকার চর্চা তার জন্য অপরিহার্য ছিল।

তরুণ মুরাকামি

উপন্যাস লেখা আমার কাছে মূলত এক ধরনের কায়িক শ্রম। লেখালেখি স্বয়ং এক প্রকার মানসিক শ্রম, তবে পূর্ণাঙ্গ একটি বই সম্পন্ন করা অনেকটা কায়িক শ্রমের মতোই। এটা ভার উত্তোলন, দৌড়াদৌড়ি বা লম্ফঝম্ফের মতো নয়। যদিও অধিকাংশ লোকই লেখালেখির কেবল বাহ্যিক বাস্তবতাটুকু দেখেন এবং ভাবেন লেখকেরা তাদের চর্চার মধ্য দিয়ে নিরীহ, বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের সঙ্গে জড়িত। আপনার যদি কফির একটি কাপ উত্তোলনের মতো শক্তি থাকে, তবে তারা ধরে নেয় আপনি উপন্যাস লিখতে পারবেন। তবে একবার এতে হাত দেয়ার পর আপনি দ্রুতই টের পাবেন, যেমনটা মনে হয় এটা মোটেও তেমননির্বিঘ্ন কোনো কাজ নয়। পুরো প্রক্রিয়াটিতে—লেখার টেবিলে বসে মনকে একটা লেজার রশ্মির মতো ফোকাস করা, অন্ধকার দিগন্তের ভেতরে কিছু কল্পনা করা, একটা গল্প বানানো, একের পর এক উপযুক্ত শব্দ বাছাই করে গল্পের পুরো প্রবাহকে একটি সঠিক পথে রাখা—দীর্ঘসময়ের জন্য এত বেশি কর্মশক্তির প্রয়োজন যা বেশিরভাগ লোক চিন্তাও করতে পারবেন না। আপনার শরীর হয়তো সঞ্চালিত হয় না, তবু এক অমানুষিক, কঠোর পরিশ্রম চলতে থাকে আপনার শরীরের ভেতরে। চিন্তাভাবনা করার সময় প্রত্যেকেই তাদের অন্তরকে কাজে লাগায়। কিন্তু একজন লেখক আখ্যান (ন্যারেটিভ) নামক একটি পোশাক গায়ে চাপান এবং সমগ্র সত্তা দিয়ে চিন্তা করেন; এবং একজন ঔপন্যাসিকের ক্ষেত্রে প্রায়শই অত্যধিক মাত্রায় শারীরিক সমস্ত সঞ্চয় দাবি করে।

লেখকেরা অবচেতনেই এই প্রক্রিয়া সম্পাদনের প্রতিভা পেয়ে থাকেন, কিছু ক্ষেত্রে অনমনস্ক ভাবও কাজ করে। বিশেষত তারা যখন তরুণ থাকে, যতক্ষণ তাদের ভেতরে নির্দিষ্ট মাত্রার প্রতিভা থাকে, তাদের পক্ষে উপন্যাস লেখা তেমন কঠিন কিছু নয়। তারা সহজেই সমস্ত বাধা পেরিয়ে যেতে পারে। তরুণ হওয়া মানে আপনার পুরো শরীর প্রাকৃতিক প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ। ফোকাস এবং ধৈর্য প্রয়োজন অনুযায়ী এসে যায় এবং আপনার নিজে থেকে এগুলো সন্ধান করার প্রয়োজন পড়ে না। আপনি যদি তরুণ এবং প্রতিভাবান হন, ব্যাপারটা অনেকটা ডানা থাকার মতো।

যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, তারুণ্যের ঔজ্জ্বল্য বিবর্ণ হয়ে গেলে, এই ধরনের মুক্তরূপটি তার প্রাকৃতিক প্রাণশক্তি ও উজ্জ্বলতা হারায়। একটা নির্দিষ্ট বয়স পেরিয়ে যাওয়ার পর, আপনি যে কাজগুলো সহজে করতে সক্ষম ছিলেন, তা আর এত সহজ থাকবে না—যেমন একজন ফাস্টবল পিচারের (বেসবল খেলায় বল নিক্ষেপকারী) গতি সময়ের সঙ্গে কমতে থাকে। তবে অবশ্যই, বয়সের পরিপক্বতার মাধ্যমে প্রাকৃতিক প্রতিভার ক্ষয় পূরণ করে নেয়া সম্ভব। যেমন, একজন ফাস্টবল পিচার যখন পরিবর্তনের ওপর আস্থা রেখে নিজেকে কৌশলী পিচার হিসেবে রূপান্তর করে। তবে এখানেও একটা সীমা আছে। এবং অবশ্যই ক্ষয়ে যাওয়ার একটা বোধ থেকে যায়।

অপরদিকে, যে লেখকেরা প্রতিভা দ্বারা তেমন আশীর্বাদপুষ্ট হন না—তাদের নিজের চেষ্টায় শক্তি তৈরি করতে হয়। ফোকাসে উন্নতি করার জন্য, ধৈর্য বাড়ানোর জন্য তাদের নিজেদের নিজেকে প্রশিক্ষিত করতে হয়। নির্দিষ্ট পরিসরে তারা জোর পরিশ্রম করে প্রতিভার বিপরীতে এই গুণাবলিগুলোকে দাঁড় করায়। এবং তারা যখন এটা অর্জন করে, প্রকৃতপক্ষে তারা তাদের ভেতরে সত্যিকার লুক্কায়িত প্রতিভা আবিষ্কার করে। এটা ভাগ্যের বিষয়, তবে এই সৌভাগ্য সম্ভব হয় ক্রমাগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যা তাদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়। আমার ধারণা, বিলম্বে বিকশিত সকল লেখক এই প্রক্রিয়া পেরিয়ে এসেছেন।

স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বে প্রতিভা দ্বারা সাংঘাতিক আশীর্বাদপুষ্ট এমন কিছু মানুষ আছেন (অবশ্যই অল্প কজন) যারা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্লান হন না এবং যাদের কাজ সর্বদা সর্বোচ্চ মানের। এই ভাগ্যবানদের প্রতিভার এমন একটি জলাধার থাকে যা কখনো শুকায় না, তাতে যত ছিদ্র থাকুক না কেন। সাহিত্যের জন্য, এটি কৃতজ্ঞ হওয়ার মতো বিষয়। শেক্সপিয়ার, বালজাক এবং ডিকেন্সের মতো ব্যক্তিত্ব ছাড়া সাহিত্যের ইতিহাস কল্পনা করা কঠিন। কিন্তু গুরুরা শেষ পর্যন্ত গুরুই—ব্যতিক্রমী, কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব। অবশিষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ লেখক যারা এই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেন না (অবশ্যই আমিসহ) তারা যে উপায়েই হোক না কেন, তার মাধ্যমে তাদের ভাণ্ডারে অনুপস্থিত প্রতিভার পরিপূরক কিছু একটা প্রস্ফুটিত করবেন। অন্যথায় তাদের পক্ষে মানসম্মত উপন্যাস লেখা চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব। পরিপূরক করার জন্য একজন লেখক যে পদ্ধতি এবং দিক-নির্দেশনা গ্রহণ করেন সেগুলো সেই লেখকের স্বকীয়তার অংশ হয়ে যায়, যা তাকে বিশেষ করে তোলে।

লেখালেখি সম্পর্কে আমি যা জানি তার বেশিরভাগই শিখেছি প্রতিদিন দৌড়ানোর মধ্য দিয়ে। এগুলো ব্যবহারিক ও শারীরিক অনুশীলন। আমি নিজেকে কতটা চাপ দিতে পারি? কতটুকু বিশ্রাম উপযুক্ত এবং কতটা হলে অতিরিক্ত? কোনো কিছুকে আমি কতদূর নিয়ে যেতে পারি এবং শোভন ও ধারাবাহিকভাবে ধরে রাখতে পারি? কখন তা সংকীর্ণমনা ও অসহিষ্ণু হতে পারে? বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে আমার কতটা অবগত হওয়া উচিত এবং আমার অন্তর্জগতের দিকে কতটা ফোকাস করা উচিত? আমার দক্ষতার প্রতি নিজের কতটুকু আত্মবিশ্বাস থাকা উচিত এবং কখন নিজেকে সন্দেহ করা শুরু করব? আমি জানি যে, ঔপন্যাসিক হয়ে ওঠার সময় আমি যদি দূরপাল্লার দৌড়বাজ না হতাম তবে আমার লেখাগুলো ভিন্নরকম হতো। কতটা ভিন্ন? বলা কঠিন। তবে অবশ্যই কিছু না কিছু ভিন্ন হতো।

আমি তৃপ্ত যে, কোনো কিছুর পরিণামেই এতগুলো বছরে কখনো দৌড়ানো বন্ধ করিনি। কারণ হলো, আমার লেখা উপন্যাসগুলো আমি খুব পছন্দ করি। এবং সত্যিই তাকিয়ে থাকি পরবর্তী দিনগুলোতে আমি কেমন উপন্যাস প্রকাশ করব, তার দিকে। যেহেতু আমি সীমিত প্রতিভার একজন লেখক—একজন অসম্পূর্ণ মানুষ, অপূর্ণ, সীমিত জীবনযাপন করে—ব্যাপারটা যে আমি এখনো এইভাবে অনুভব করতে পারি এটিই সত্যিকারের একটি অর্জন। এটিকে অলৌকিক ঘটনা বলা অত্যুক্তি হতে পারে, তবে আমি সত্যিই এমনটাই অনুভব করি। এবং প্রতিদিন দৌড়ানো যদি আমাকে এটি অর্জন করতে সহায়তা করে থাকে, তবে আমি দৌড়ের প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।

যারা নিয়মিত দৌড়ায় কিছু লোক প্রায়ই তাদের কটাক্ষ করে বলে, আরও দীর্ঘজীবন বেঁচে থাকতে চায় বলে তারা দৌড়ায়। তবে আমি মনে করি না যে এই কারণেই বেশিরভাগ মানুষ দৌড়ায়। বেশিরভাগ দৌড়বিদ কেবল বেশি দিন বাঁচতে চায় বলে দৌড়ায় না, বরং তারা জীবনটাকে পরিপূর্ণভাবে যাপন করতে চায় বলেই দৌড়ায়। আপনি যদি আদর্শভাবে বছরের পর বছর কাটাতে চান, তবে কুহেলিকার ভেতরে বেঁচে থাকার চেয়ে স্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে পরিপূর্ণ জীবনযাপন অনেকগুণে ভালো, এবং আমি বিশ্বাস করি নিয়মিত দৌড়ানো আপনাকে এতে সহায়তা করবে। নিজেকে আপনার নিজস্ব পরিসরে বা সীমাবদ্ধতার ভেতরেই পরিপূর্ণরূপে নিবেদিত করা: এটাই দৌড়ানোর সারমর্ম এবং জীবনের একটি রূপক—আমার ক্ষেত্রে তা লেখার জন্যও। আমার বিশ্বাস, অনেক দৌড়বিদও এতে একমত হবেন।

***

যখন কাউকে বলি যে আমি প্রতিদিন দৌড়াই, কেউ কেউ বেশ অভিভূত হয়। তারা আমাকে বলে, ‘তোমার নিশ্চয় ইচ্ছাশক্তির জোর অনেক।’ অবশ্যই, অবজ্ঞার স্বীকার হওয়ার চেয়ে এমন প্রশংসিত হওয়া অনেক বেশি ভালো। তবে আমি মনে করি না, কেবল ইচ্ছাশক্তির জোরেই এভাবে নিয়মিত দৌড়ানো অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছি। দুনিয়া এতটা সহজ নয়। সত্য বলতে কী, প্রতিদিন দৌড়ানোর সঙ্গে ইচ্ছাশক্তি থাকা বা না থাকার খুব একটা সম্পর্ক আছে বলে আমার মনে হয় না। আমার মনে হয়, আমি যে পঁচিশ বছরের অধিক সময় ধরে নিয়মিত দৌড়ানো অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছি তার কারণ একটাই: এটা আমার সঙ্গে যায় বা আমার জন্য এটা মানানসই। অথবা, আমি এর ভেতরে তিক্ত কিছু অন্তত পাইনি। মানুষ স্বভাবতই তাদের পছন্দনীয় কাজগুলো চালিয়ে যেতে চায়, এবং তারা তা কখনোই বজায় রাখে না যা তাদের পছন্দ নয়।

এ কারণেই আমি কখনো অন্যদের দৌড়ানোর পরামর্শ দিই না। যদি কারও দূরপাল্লার দৌড়ে আগ্রহ থাকে, তবে সে নিজে থেকেই তা শুরু করবে। যদি সে এতে আগ্রহী না হয়, কোনো প্রকার প্ররোচনায় কোনো ভিন্নতা আসবে না। ম্যারাথন দৌড় সবার জন্য উপযোগী একটি খেলা নয়, ঠিক তেমন ঔপন্যাসিক হওয়াও সবার কাজ নয়। কেউ কখনো পরামর্শ বা এমনকি সুপারিশও আমাকে করেনি যে আমি ঔপন্যাসিক হতে পারি—বস্তুত কেউ কেউ আমাকে থামাতে চেষ্টা করেছিল। আমার কেবল একজন ঔপন্যাসিক হওয়ার চিন্তা ছিল, এবং আমি তা হয়েছি। মানুষ দৌড়বাজ হয় কারণ তার সে অভিপ্রায় থাকে।

যাই হোক না কেন, আমি এভাবেই দৌড়ানো শুরু করি। তেত্রিশ বছর—আমার বয়স তখন এটাই ছিল। তখনও যথেষ্ট কম বয়স, যদিও আর যুবক নই। এই বয়সেই যিশু খ্রিষ্ট মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এফ. স্কট ফিটজগারাল্ড এমন বয়স থেকেই জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে। এটা এমন একটি বয়স যা জীবনের জন্য নতুন এক বাঁক হতে পারে। এই বয়সেই দৌড়বাজ হিসেবে আমার জীবন শুরু হয়েছিল এবং বিলম্বিত হলেও এই বয়স থেকেই ঔপন্যাসিক হিসেবে আমার সত্যিকার যাত্রা শুরু হয়।

[বর্তমান সময়ে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম ঔপন্যাসিক ও গল্পকার হারুকি মুরাকামির জন্ম ১২ জানুয়ারি, ১৯৪৯ সালে জাপানের কিয়োটোতে। তার লেখা পঞ্চাশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তার সাবলীল ও সরল ভাষায় লেখা গদ্য অনায়াসেই টেনে নেয় যেকোনো স্তরের সাহিত্য পাঠককে। ভাষার এ সরলতা এতটাই জাদুকরি যে দুর্বোধ্য বিষয়কেও সরল অনুভূতিতে রূপান্তরিত করতে পারে। আর হারুকি মুরাকামি লেখার যে বিষয়বস্তু নির্বাচন করেন বা বিষয়বস্তুকে যেভাবে উপস্থাপন করেন তা অনেকটা অদ্ভুত কিংবা বলা যায় সাধারণভাবে যা কেউ ভাবে না, দেখা পরিবেশটা যেভাবে কখনো কেউ দেখে না—ঠিক সেভাবেই তিনি ভাবেন এবং দেখেন। এ কারণে তাঁর লেখা পড়ার পর আমরা টের পাই চেনা পরিবেশের ভেতরেই অচেনা জগৎ উঠে আসছে সামনে। তিনি ফ্রানৎস কাফকা পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।]

অলংকরণ শিবলী নোমান