।। ভাষান্তর: মনোজিৎকুমার দাস ।।

আপনি অবশ্যই বুঝতে পারবেন, আমি এই জীবনকে পছন্দ করি না। কিন্তু খদ্দেররা আমাকে পছন্দ করে। যেভাবেই হোক শৈশবেই আমাকে নাইট জবের জন্য তৈরি করে তোলা হয়। আপনি কি একে জব বলেন? আমার মাও এই জব করতো, তার মাও! আমি এ কাজ থেকে মুক্তি পাওয়ার কথাই ভাবতেই পারি না।

শীতের এক সন্ধ্যা, ৭টার কাছাকাছি। আমি নিশ্চিত আজ বৃষ্টি হবে না। বৃষ্টি হলে আমাদের ব্যবসা প্রায়ক্ষেত্রেই শূন্যের কোটায় পৌঁছে। আপনি জানেন প্রবল বৃষ্টির সময় রাস্তায় লোকজন থাকে না। মেঘ কেটে যাওয়ার পর নীল আকাশে তারা দেখা গেলে বৃষ্টি হবে না বলে আমি জানি। তখন আমাকে বলা হয়, তারাগুলো থেকেই বোঝা যাচ্ছে আকাশ আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।

ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! আমি শাদা পোশাক পরে আছি, শাদা পোশাকে আমার শরীরের আনাচে-কানাচে স্পষ্ট দেখা যায়। আপনি অন্য মেয়েদের লক্ষ্য করার চেষ্টা করলে দেখতে পাবেন শাদা রঙটা সত্যিই ভালো। আমার গায়ের রঙ কালো বলে আমি মেকআপ করে থাকি। আমার মা আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে মেকআপ করতে হয়। মেরুন লিপস্টিক আর একটু আই স্যাডো। আমার পায়ে ছয় ইঞ্চি উঁচু হিলের জুতো। ফ্যাশানের জন্য আমি ওটা পরিনি, ওটা পরেছি যাতে আমাকে ৫ ফুট ১ ইঞ্চি লম্বা দেখতে লাগে। আমিই ওখানকার একমাত্র ছোটখাট মেয়ে। আমি কোনো অন্তর্বাস পরি না। আমি জানি, এতে কাস্টমারা বুঝতে পারে আমি কি কাজে ওখানে এসেছি।

আমি বার্টোন স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে আছি, রাস্তাটা একটু এঁকেবেঁকে ইউসুফ লুলে রোডের দিকে চলে গেছে। অধিকাংশ মেয়েরাই ইতোমধ্যেই সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তাটাতে মোটেই আলো নেই। আমি আঁধারকে পছন্দ করি, আলোর কোনো চিহ্ন থাকার অর্থ আমাদের কারো না কারোর একজন গুরুত্বপূর্ণ মক্কেল আছে। রাস্তার পাশের বিল্ডিংগুলো অফিসের দিকে চলে গেছে। অফিসগুলোর প্রবেশ পথের গেটে পরিচিতিমূলক বড়সড় সাইনবোর্ড সাঁটা। এ সময়ে অফিসগুলোতে কোনো শব্দ থাকে না। হঠাৎ আলো এসে পড়লে আমি তাড়াতাড়ি শরীরটাকে বাঁকিয়ে ড্রাইভারের নজর কাড়তে পছন্দ করি, যাতে আমাকে সহজেই পছন্দ করতে পারে। আমার মুখটা তারা যাতে দেখতে পারে তার জন্য আমার শরীরটাকে সামনে এগিয়ে নিই। আমি মুচকি মুচকি হাসি। ওই সময়টাতে আমি সুন্দর করে হাসতে পারি। সুন্দর হাসি দেয়া আমাকে রপ্ত করতে হয়েছে। মিষ্টি হাসি দিয়ে আমি কিন্তু সুখ পাই না। আপনার সামান্যতম অনুরোধেই আমি হাসির জাদু দেখাতে পারি। এ চাকরির যোগ্যতাগুলোর মধ্যে এটা অন্যতম।

একটা কোরোনা কার ধীরে ধীরে আমার কাছে এসে থামলো। কার দেখেই আমি বলতে পারি যে মক্কেলটা আমার পছন্দ মতো মুক্তহস্তে দাম দেবে। আমি কিন্তু অনেক আগে থেকেই এটা জানতাম। একটা কালো মুখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি আমার চোখদুটো বিষ্ফারিত করে মুক্তঝরা দাঁত বিকশিত করে তাকে দেখলাম।

‘ভেতরে এসো।’ অধৈর্য হয়ে লোকটি চিৎকার করে উঠলো। কেউ তাকে দেখতে না পারে তাই সে গাড়িতে স্টার্ট দিলো। আমি হাসতে হাসতে লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। আমি জানি না আমরা কোথায় যাচ্ছি। আমাকে কত দাম দেবে সে সর্ম্পকে পরিষ্কার হতে হবে। ‘দূরে, না কাছে?’ আমি ভ্রুকুটি করে উচ্চকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম। আমি এটা সবসময়ই জেনে নিই। লোকটি চিৎকার করে বললো, ‘দূরে, কত দিতে হবে?’ দূরে যাওয়া কষ্টকর ব্যাপার, তাই আমি ভেবে বললাম—‘পঞ্চাশ হাজার শিলিং’, ‘ওকে’ সঙ্গে সঙ্গে লোকটা বলে। আমি অনুমান করলাম কার নতিন্দাতে যাচ্ছে। ওখান থেকে ফিরে আসতে বেশি খরচ হবে না, আমি মনে মনে ভাবলাম। আমি নালিয়াতে থাকি। আমরা যেখানে যাচ্ছি সেখান থেকে নতিন্দা কাছেই।

আমরা ম্যাক্স মোটেলে পৌঁছালাম। প্রত্যেকেই নতিন্দার স্পটটাকে পছন্দ করে। আমরা কার থেকে বাইরে এলাম। লোকটা দ্রুতগতিতে আমার আগে আগে চলতে লাগলো। আমি অবাঞ্ছিত কুকুর ছানার মতো তাকে অনুসরণ করছি। তারা প্রথমে সবসময়ই এমন ব্যবহার করে যেন তারা তোমাকে আনুকূল্য দান করছে। এমন আচরণকে আমি ঘৃণা করি। আমরা রুমের মধ্যে প্রবেশ করার পর লোকটি একটুও সময় নষ্ট না করে তার পোশাক খুলে ফেলে ধূসর রঙের পুরু কম্বল পাতা ডবল বেডে শুয়ে পড়ল। এই মোটেলের সবকিছুই আলো-আঁধারিতে ঘেরা। ধূসর রঙের পর্দাগুলো কম্বলের সঙ্গে ম্যাচ করা। ক্রিম কালারের ওয়াল আর সাধারণ আসবাবপত্র দেখে মনে হচ্ছে আশেপাশের প্রাইমারি স্কুল থেকে যেন এগুলো নিয়ে আসা হয়েছে। আলো-আঁধারিতে ঘেরা এই মোটেলের সবকিছুই লোকচক্ষুর অন্তরালে চলছে।

বিভিন্ন ধরনের মক্কেল এখানে আসে, তারা বোডাবোডা নামের ক্যারিয়ার বাইকেও এখানে আসে। নগরে দিনের বেলা আয়-উপার্জন ভালো হলে বোডাবোডা বাইকের চালকরা নিজেরাও এখানে আনন্দ ফুর্তি করতে আসে।

আমি লোকটার দিকে তাকালাম, লোকটা সুঠামদেহী। সাধারণ মক্কেলদের চাইতে অন্যরকম। এক কথায় ভালোই দেখতে। সে কাঙ্ক্ষিত চোখে আমার দিকে তাকালো। আমি এমনভাবে তাকানোকে ঘৃণা করি। শুরুতেই আমি আমার পোশাক খুলে ফেললাম। যদিও সে আমাকে ভালো দাম দেবে, তবুও আমি তাকে অল্প সময় দিতে সংকল্প করলাম। আজ আমার বেশি সময় দেয়ার মতো মনের অবস্থা নেই। তবুও আমি তাকে আনন্দ দেবো যাতে সে বলতে না পারে মজা পাইনি। তাকে বেশি মাত্রায় খুশি করাকে আমি ঘৃণা করতে পারি না। আমি মোটেলের অন্য বেড থেকে ক্যাচ ক্যাচ শব্দ শুনতে পাচ্ছি। পাশের রুমগুলো থেকে একই ধরনের শব্দও অল্পস্বল্প শোনা যাচ্ছে। শব্দ যেন সংগীতের ছন্দের মতো ভেসে আসছে। লোকটাকে দেখে আমার মনে হলো, তার মুখটা যেন ব্যথায় ভরে উঠেছে। আমি এ থেকে বুঝতে পারলাম আমি আমার কাজ ভালোভাবেই করতে পেরেছি। তার মানে, তার মুখে চুমু দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি দু’একটা কামড়ও দিয়েছি।

আমি নিশ্চিত, লোকটার এখানে এবারই প্রথম আসা। সে আমাকে আমার দামের কথা জানতে চাইলো। কাজটা হয়ে যাওয়ার পর কেউই এটা জিজ্ঞেস করে না। এ সম্বন্ধে ভেবে আমি ভালোভাবে নিশ্চিত হলাম আমার ধারণাই ঠিক। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমি এটাকে ঘৃণার চোখে দেখি। এটা একটা ঘৃণ্য কাজ।

ঘৃণ্য কাজে বাধ্য করায় আমি আমার মাকে নিন্দা করতে শুরু করি এবং প্রত্যেক মুহূর্তে আমার মায়ের কান্নার স্মৃতি মনের কোণে ভেসে উঠতো। বিভিন্ন ধরনের লোকদের মা বাড়িতে নিয়ে আসতো। সে সময় আমি বিস্মিত হতাম—এই ভেবে কী কারণে মা এতটা অসুখি। আমাদের মানুষ করার জন্য আমার মায়ের প্রচুর অর্থকড়ি ছিল। সে একজন ভালো মা। আমি বড় হয়ে সব কিছু বুঝতে পারলাম।

‘দাম মিটিয়ে দিন।’ আমি চিৎকার বলে উঠলাম। সে সময় আমি হাসতে পারছিলাম না। দাম বুঝে নেয়ার সময় আমার আর হাসার প্রয়োজন নেই। ‘তোমার দাম খুবই বেশি’ লোকটা আমাকে ভোগ করার পর আমাকে বললো। কাজের পরে আমি কোনো যুক্তি শুনতে রাজি নই। আমি তার দিকে শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে পঞ্চাশ হাজার শিলিং এর নোট বের করল। আমি ওইগুলো তার হাত থেকে আঁকড়ে ধরে আমার বক্ষবন্ধনীর মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়ার সময় লোকটা দিগম্বর অবস্থায় পাশের বাথরুমে শরীরটা ধোয়ামোছা করতে গেল। লোকটা আসলেই এ কাজে প্রথম।

আমি আর সময় নষ্ট করতে চাই না। তার টাউজারটাতে খুঁজে পেতে কিছুই পেলাম না। আমি তার শার্ট চেক করে কয়েকটা পকেটে ভাঁজ করা দশ হাজার শিলিং পেয়ে ওইগুলো মুঠো করে ম্যাক্স থেকে বের মেইন রোডে এসে পৌঁছি। আমাকে এখন একটা বোডাবোডা ক্যারিয়ারকে ডাকতে হবে। ভালোয় ভালোয় আমি এখন বাড়িতে পৌঁছে গেছি। আমার দিকে মুচকি হেসে মা দরজা খুলে দিয়ে জানতে চাইলো, আমি তার জন্য কিছু অর্থ নিয়ে এসেছি কিনা।

অনেক দিন আগের থেকেই মা পুরুষদের বাড়িতে আনা বন্ধ করেছে। বয়স পঞ্চাশের বেশি হলে বড়শিতে গেঁথে তোলার মতো কোনো পুরুষ পাওয়া যায় না। আমি নিজে ওই বয়সে কবে পৌঁছাব? আমি নিজেও বুঝতে পারি না। আমি খেয়াল করি আমার মা প্রত্যেকদিন মেকআপ করে আর আমাকে বলে ‘তুই তোর শরীরের প্রতি যতœ রাখ, তুই এখনো জানিস না বেঁচে থাকার জন্য তোর শরীরটার প্রয়োজন হবে।’

এটা করলে হয়তো আমি রিসিপসনিস্টের চাকরি পেতে পারি আর সেখান থেকে আমার আয় উপার্জন হবে। আমি সেটাই মাকে বললাম। সে আমার কথা বিশ্বাস করার ভান করলো। আমি জানি না সে এটা আসলেই বিশ্বাস করেছে কিনা। মা তার ছোট্ট হাত বাড়িয়ে অপেক্ষায় আছে। এমনকি পঞ্চশ বছর বয়সেও তার চেহারায় সুঠাম। যদিও সে আর নিজেকে পুরুষের কাছে সঁপে দেয়ার জন্য এখন আর তেমন সুন্দরী নয়। তাই তার রাতের চাকরি আমার ওপর বর্তেছে। প্রত্যেক হাসির পেছনে কালোছায়া পড়ে। ওই কারণে আমি সিরিয়াসলি নাইট জবে যবনিকা টানতে যাচ্ছি। কয়েকদিন পরে, আমি মায়ের হাতে পঞ্চশ হাজারের বেশি নোট পৌঁছে দিলাম। সে এত অর্থ পেয়ে মুচকি হেসে গর্ব অনুভব করে বললো, ‘ওকে’। আমি আসলেই মায়ের বাসনাকে ঘৃণা করি। আমি রুমের দিকে হাঁটা দিলাম। আগামীতে আমার জীবনে দীর্ঘসময় পড়ে আছে। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমাকে অবশই বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসে সোশিয়লোজি পরীক্ষায় বসতে হবে।

[জোয়ানিতা ম্যালে তরুণ আফ্রিকান লেখক। জন্ম ও বেড়ে ওঠা উগান্ডার কাম্পালায়। তিনি আফ্রিকান সাহিত্যে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি। ম্যালে বাবা মায়ের সঙ্গে থাকেন। তারাই তাকে লেখালেখিতে অনুপ্রাণিত করেন। জোয়ানিতা ইংলিশ লেখক এনিড ব্লিটনের লেখা বই পড়ে বেড়ে উঠেন। তারপর তিনি চিমামান্দা নগোজি এদিচিই এবং বিলি কাহোরার মতো আফ্রিকান লেখকদের লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হন। জোয়ানিতা ম্যালে সম্প্রতি বেশকিছু গল্প লিখেছেন, যা প্রশংসিত হয়েছে।]

অলংকরণ শিবলী নোমান