।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সিন্ডিকেট সভা স্থগিত করার জন্য উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলতে গেলে চাকরিপ্রত্যাশী ছাত্রলীগের সাবেক-বর্তমান নেতা–কর্মীরা ধাক্কা দিয়ে শিক্ষকদের সরিয়ে দিয়েছেন। মঙ্গলবার (৪ মে) সকালে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের জটলার মধ্যে থেকে এক ব্যক্তি শিক্ষকদের ‘গুলি করে দেয়ার’ হুমকি দেন।

আজ সকাল সাড়ে ১০টায় উপাচার্য বাসভবনে সিন্ডিকেটের ৫০৬তম নিয়মিত সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। সকাল নয়টার দিকে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ, ডিবি সদস্য ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের দেখা যায়। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের প্রায় অর্ধশত সাবেক ও বর্তমান নেতাকর্মী প্যারিস রোডে উপাচার্যের বাসভবনের পাশে অবস্থান নেন। এর পাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও দেখা গেছে। এ সময় সাবেক উপাচার্যের অনুসারী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের ‘দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষকবৃন্দ’ অংশের অন্তত অর্ধশত শিক্ষক উপাচার্যের বাসভবনের সামনের আমচত্বরে উপস্থিত ছিলেন।

সকাল পৌনে ১০টার দিকে প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের ‘দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষকবৃন্দ’ অংশের শিক্ষকেরা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। প্যারিস রোডে অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম এবং অধ্যাপক সফিকুন্নবী সামাদী পৃথকভাবে বলেন, ‘৬ মে উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এ সময় আজ সিন্ডিকেট সভার কী প্রয়োজন? আমরা আশঙ্কা করছি, আজকের সভায় প্রচুর অ্যাডহক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, ইজারাসহ নানা অনিয়ম হতে পারে। তাই আমরা উপাচার্যের কাছে গিয়ে তাঁকে সভা স্থগিত করতে বলব।’

শিক্ষকেরা সকালে অভিযোগ করেছিলেন, সিন্ডিকেট সভার জন্য সোমবার রাতে প্রশাসন ভবন ও সিনেট ভবনের তালা ভেঙে কাগজপত্র উপাচার্য ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে প্রক্টর মো. লুৎফর রহমান সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। তবে তিনি বলেন, ‘সিন্ডিকেট সভার জন্য যেখান থেকে যা কাগজ নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন, তা নিয়ে গিয়ে থাকবে।’ সিন্ডিকেট সভা ঘিরে শিক্ষকদের আশঙ্কার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আজকের সিন্ডিকেট রুটিন বিষয়গুলো নিয়ে। এখানে নিয়োগ বা ইজারার কোনো বিষয় নেই।’

মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় আমচত্বরে ঘটনাগুলোর বিষয়ে ‘দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষকবৃন্দ’ সংবাদ সম্মেলন করেন। তাঁদের মুখপাত্র অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, ‘আমাদের আশঙ্কা, উপাচার্য তাঁর শেষ সময় পর্যন্ত অনিয়ম-অপকর্ম করার চেষ্টা করতে পারেন। তাই আমরা শিক্ষকেরা তাঁর মেয়াদের বাকি দুই দিনও ওয়াচডগ হিসেবে ভূমিকা পালন করব, যেন তিনি কোনো অনিয়ম করতে না পারেন।’

সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ক্যাম্পাসে ‘বহিরাগতদের’ থাকা নিয়ে প্রক্টর মো. লুৎফর রহমানের সঙ্গে শিক্ষকদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। শিক্ষকেরা প্রক্টরকে দ্রুত তাঁদের বাইরে বের করে দিতে বলেন। তাঁরা অভিযোগ করেন, বহিরাগত ব্যক্তিরা ক্যাম্পাসে লাঠিসোঁটা এনে রেখেছেন। সেখানে অধ্যাপক সফিকুন্নবী সামাদী প্রক্টরকে বলেন, ‘আমাদের কাছে আইডি কার্ড আছে। আপনি বহিরাগতদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বের করে দেন।’

তবে সে সময় প্রক্টর এমন কোনো উদ্যোগ নেননি। এদিকে এ সময়ের মধ্যে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা উপাচার্য বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। এ সময়ে প্যারিস রোডেও অনেক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

শিক্ষকদের গুলি করার হুমকি

সকাল ১০টা ১০ মিনিটে শিক্ষকেরা উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তাঁর বাসভবনে ঢুকতে যান। এ সময় গেটের সামনে থাকা ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা বলেন, ‘না স্যার, ভেতরে ঢোকা যাবে না।’ এ বিষয় নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের কথা-কাটাকাটি হতে থাকে। এমন সময় ছাত্রলীগ নেতা–কর্মীদের সঙ্গে থাকা এক চাকরিপ্রত্যাশী বলে ওঠেন, ‘তাহলে কিন্তু স্যার গুলি করে দিব একদম।’

এতে শিক্ষকেরা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। এ সময় ছাত্রলীগের একজন ওই চাকরিপ্রত্যাশীকে কিছুটা দূরে সরিয়ে দেন।

গুলি করার হুমকি দেয়া ওই চাকরিপ্রত্যাশীর নাম আকাশ বলে জানিয়েছে ছাত্রলীগের একটি সূত্র। ছাত্রলীগের ওই সূত্রটি জানায়, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন মেহেরচণ্ডী এলাকার বাসিন্দা। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সঙ্গে ওঠাবসা করেন। তিনিও বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিপ্রত্যাশীদের একজন।

সকাল সোয়া ১০টার দিকে শিক্ষকেরা আবার উপাচার্যের বাসভবনে ঢুকতে যান। এতে ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীরা তাঁদের ধাক্কা দিয়ে পেছনে সরিয়ে দেন। শিক্ষকেরা দ্বিতীয়বার ঢুকতে গেলে প্রক্টরসহ অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম ও অধ্যাপক সফিকুন্নবী ধস্তাধস্তির শিকার হন। ফলে শিক্ষকেরা পেছনে সরে এসে দাঁড়ান। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা–কর্মীরা এসে বাসভবনের গেটে তালা লাগিয়ে সামনে অবস্থান নেন।

সিন্ডিকেট স্থগিত ঘোষণা

সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে বাসভবনের সামনে এসে সিন্ডিকেটের সচিব ও রেজিস্ট্রার আবদুস সালাম ঘোষণা দেন, সিন্ডিকেট সভা আজকের মতো স্থগিত করা হয়েছে।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.