চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায় একজন কিংবদন্তি। এই মহীরূহের সঙ্গে মধুর স্মৃতি রয়েছে বাংলাদেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা মোরশেদুল ইসলামের। সত্যজিতের কাছে পেয়েছেন কাজের অনুপ্রেরণা। এই আলাপচারিতায় কথা বলেছেন তাঁর ওপর সত্যজিতের প্রভাব, স্মৃতি ও বর্তমান চলচ্চিত্র নিয়ে। সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষে উত্তরকালের বিশেষ আয়োজন ‘শতকে সত্যজিৎ’-এর জন্য সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন শামীম হোসেন

শামীম হোসেন: কেমন আছেন? আপনার সঙ্গে তো কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতি রয়েছে। একটু শুনতে চাই।

মোরশেদুল ইসলাম: এই অতিমারির সময় অনেক গুণী মানুষ না ফেরার দেশে চলে যাচ্ছেন। একটু সতর্কভাবে চলাচল করছি। ভালো আছি। হ্যাঁ, সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে আমার দু’তিনটি স্মৃতি রয়েছে।

শামীম হোসেন: আপনার স্মৃতিরোমন্থনের আগে একটু জানতে চাই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায়ের প্রভাব কতটুকু?

মোরশেদুল ইসলাম: বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে সত্যজিৎ রায়ের প্রভাব বিশাল। সত্যজিৎ রায় ‘পথের পাঁচালী’ বানিয়েছেন ১৯৫৫ সালে আর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র কিন্তু শুরু হয়েছে ১৯৫৬ সালে, ‘মুখ ও মুখোশ’—এর মাধ্যমে। তারমানে এক বছর পরে আমাদের এখানে চলচ্চিত্র ডানা মেললো। ‘নদী ও নারী’ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকমের ছবি যারা বানিয়েছেন তারাও কিন্তু সত্যজিত দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন কমবেশি। সবচেয়ে বেশি প্রভাবটা দেখি ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ সিনেমাটিতে। মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী পরিচালিত ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ ৮৯ সালে রিলিজ হয়েছিল। সেই ছবিতে পথের পাঁচালীর অনেকটাই ছায়া দেখতে পাই তার নির্মাণ ভঙ্গিতে। সেখান থেকেই আমি বলবো বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ক্ষেতে একটা টার্নিং পয়েন্ট। সেখানে সত্যজিতের প্রভাব জোরালোভাবে ছিল। এবং তারপরের চলচ্চিত্রনির্মাতারা আলমগীর কবীর, সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী এরা যখন ছবি করেছে তারাও কিন্তু সত্যজিৎ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। আমরা জানি জহির রায়হান সত্যজিতের কোনো ছবি একাত্তরের আগপর্যন্ত দেখেননি। একাত্তরে জহির রায়হান যখন কলকাতায় যান তখন তার সত্যজিতের কয়েকটি ছবি দেখার সুযোগ হয় এবং ছবিগুলো দেখে জহির খুব অভিভূত হন। সত্যজিৎ রায়ও তখন জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমাটি দেখে প্রশংসা করেন।

শামীম হোসেন: তারপর কী ঘটলো?

মোরসেদুল ইসলাম: হ্যাঁ, বলছি। তারপরে জহির রায়হান দেশে ফিরে আসার পর রহস্যজনক অন্তর্ধান ঘটলো তার। এবং জহির রায়হানকে আর আমরা পেলাম না। পেলে হয়তো আমার ধারণা জহির রায়হানের পরবর্তী ছবিগুলোতেও সত্যজিতের প্রভাব আমরা লক্ষ্য করতাম। স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের যে জেনারেশনটা আমরাও কিন্তু ভীষণভাবে প্রভাবিত হয়েছি সত্যজিতের দ্বারা। যেমন তারেক মাসুদের বা আমি নিজেও এবং আরো অনেকেই প্রভাবিত হয়েছেন।

শামীম হোসেন: কীভাবে সত্যজিতের কাজের দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেন? আপনি তো নিজেও অনেক সিনেমা নির্মাণ করেছেন।

মোরশেদুল ইসলাম: হ্যাঁ, আমি নিজেও সত্যজিৎ দ্বারা ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত ও প্রভাবিত। আমাদের তো ধ্যান-জ্ঞান ছিল সত্যজিৎ রায়। সত্যজিৎ রায়ের মতো এমন একজন বিশাল মাপের বাঙালি চলচ্চিত্রকার আমাদের জন্য একটা বড় পাওয়া। সুতরাং  তার প্রভাব থাকতেই হবে। যদিও ব্যক্তিগতভাবে সত্যজিতের সঙ্গে আমার তিনবার দেখা হবার সুযোগ হয়েছিল। এটা আমার সৌভাগ্য!

মোরশেদুল ইসলাম

শামীম হোসেন: সত্যিই তো এটা সৌভাগ্যের ব্যাপার। একটা স্মৃতি যদি শোনান।

মোরশেদুল ইসলাম: আমি প্রথম তার সঙ্গে দেখা করি ১৯৮৫ সালে। আমি সেসময় কলকাতায় যাই। তখন তার সঙ্গে দেখা করি, তার বাসায় গিয়ে। আমাকে আমার প্রয়াত শিক্ষক আলমগীর কবির তার ফোন নম্বর ও ঠিকানা দিয়েছিলেন। তখন তো আমি একেবারেই তরুণ। খুব ভয়ে ভয়ে তাঁকে ফোন করলাম এবং বললাম, ‘আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’ উনি বললেন, ‘চলে আসুন।’ সত্যজিৎ সবাইকে আপনি করে সম্বোধন করতেন। পরের দিন আমি তাঁর বাসায় গেলাম। এবং সেইখানে তারসঙ্গে আমার দেখা হলো। বেশ কিছুক্ষণ বসে ছিলাম মুখোমুখি। তিনি একমনে খাতায় এঁকে যাচ্ছিলেন। কোনোদিকে তাকাচ্ছেন না। কথাও বলছেন না। আমি চুপচাপ বসেছিলাম। তারপর অনেকক্ষণ পর তিনি বললেন, কোনো কথা বলছেন না কেন? আমার কথা বলার তখন তো কোনো অবস্থা নেই। আমি বললাম, ওকে ঠিক আছে।

সেই বছরেই কিন্তু আমার প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আগামী’ ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্‍সবে শ্রেষ্ঠ পরিচালনার জন্য ‘রৌপ্য ময়ূর’ পুরস্কার পেয়েছিল। আমি সেটাও ভয়ে ভয়ে তাঁর কাছে উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, হ্যাঁ আমি শুনেছি। আমার কাছে তিনি বাংলাদেশের ফিল্মের কথা জিজ্ঞেস করলেন। বাংলাদেশের ছবি কেমন হচ্ছে, আমলগীর কবীরের কথা জিজ্ঞেস করলেন। সত্যজিতের সঙ্গে এটা ছিল আমার প্রথম সাক্ষাৎ। কিন্তু তারো আগে আমার একটি স্মৃতি আছে। যদিও সরাসরি আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি। সেটা ছিল ১৯৮১ সালে। আমাদের তখন ঢাকা লিটিল থিয়েটার নামে একটা ছোটদের নাটকের দল ছিল। সেই নাটকের দলে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম একবার সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ আমরা মঞ্চে আনবো। তখন তার অনুমতি চেয়ে আমরা একটা চিঠি দিলাম। সেই চিঠিটা দিয়েছিলাম মাহমুদা চৌধুরীর হাতে। মাহমুদা আপা একসময় চলচ্চিত্র সমালোচনা লিখতেন বিচিত্রায়। মাহমুদা আপা সত্যজিতের সঙ্গে দেখা করে অনুমতি চাইলেন। সত্যজিৎ রায় চমৎকার হাতের লেখায় আমাদের অনুমতি দিলেন। সেই চিঠিটা পরে কিশোরবাংলা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।  যদিও পরে আমার কাছ থেকে সেই চিঠিটা হারিয়ে গেছে দুর্ভাগ্যজনকভাবে। সেইটা ছিল আমার কাছে তাঁর প্রথম স্মৃতি। ১৯৮৫ সালে তার সঙ্গে সরাসরি দেখা হবার সুযোগ হয়। যা আগেই বলেছি। এরপর ৯১-তে আমরা যখন আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করা শুরু করি, সেই উৎসবে সত্যজিতের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে শো করার পরিকল্পনা করি। তখন তার সঙ্গে দেখা করে অনুমতি চাইলাম। তিনি সানন্দে অনুমতি দিলেন। যদিও সেই উৎসবে তিনি আসতে পারেননি। তবে বেশকিছু ছবি দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করেন। এই দুইবার তার সঙ্গে আমার তার বাসায় দেখা হয়েছিল। আরেকবার তাকে আমি কোনো একটা অনুষ্ঠানে দেখেছিলাম নন্দনের সামনে।

শামীম হোসেন: বর্তমানে বাংলাদেশে যে তরুণ চলচ্চিত্রনির্মাতারা কাজ করছেন—তারা কতটুকু সত্যজিতকে ধারণ করছে বলে আপনি মনে করেন?

মোরশেদুল ইসলাম: আমি সেটা বলতে পারবো না, তারা কতটুকু তা ধারণ করছেন। তবে সত্যজিতকে ধারণ না করে কোনো বাঙালি চলচ্চিত্রকারের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব না। সত্যজিৎ ছাড়া বাংলা চলচ্চিত্র অচল। তরুণরা কেউ হয়তো সরাসরি ধারণ করেন, কেউ হয়তো স্বীকার করেন না কিন্তু বিভিন্নভাবে তার প্রভাবটা রয়েই যায়।

শামীম হোসেন: আপনার প্রিয় সিনেমা কোনটি, যেটা আপনি বারবার দেখেন?

মোরশেদুল ইসলাম: প্রিয় সিনেমা তো অনেক। একটার কথা কীভাবে বলি। তবে আমার বেশি ভালো লাগে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’। এইটা আমার প্রিয় ছবির মধ্যে একটা। এছাড়াও ‘চারুলতা’ ও ‘পথের পাঁচালী’ ভালো লাগে। আর তাঁর ছবি ভালো লাগে না এমন তো বলা যাবে না!

শামীম হোসেন: সত্যজিৎ রায় একাধারে ছিলেন চলচ্চিত্রকার, লেখক ও চিত্রশিল্পী। শুধু সিনেমা নির্মাণেই তিনি থেমে যাননি। যেমন লিখেছেন, এঁকেছেনও। কিন্তু এখন তো অনেকেই রাতারাতি চলচ্চিত্রকার বনে যাচ্ছেন, তাই না।

মোরশেদুল ইসলাম: সত্যজিতের ছিল সর্বব্যাপী গুণ। উনি শুধু চলচ্চিত্রকার নন, ভালো লেখকও। সব ছবির চিত্রনাট্য তিনি নিজেই লিখেছেন। অনেক সিনেমার সেট, কসটিউম ডিজাইন. মিউজিক পরিচালনা নিজেই করেছেন। চলচ্চিত্রের বিভিন্ন শাখায় তিনি কাজ করেছেন। তাঁর মতো এমন মানুষ তো খুঁজে পাওয়া মুশকিল! এখনকার চলচ্ত্রিকাররা হয়তো সেদিকে যাচ্ছেন না, এটা তাদের সীমাবদ্ধতা। সবাই যে সত্যজিৎ রায়ের মতো এত গুণে গুণান্বিত হবেন, এত বেশি ব্যাপ্তি থাকবে এটা ভাবা যায় না।

শামীম হোসেন: উত্তরকালকে সময় দেবার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মোরশেদুল ইসলাম: তোমাকেও ধন্যবাদ। জন্মশতবর্ষে সত্যজিৎ রায়ের প্রতি প্রণতি।