।। রহমান রাজু ।।

কিশোর সত্যজিতকে নিয়ে সুপ্রভা দেবী শান্তিনিকেতনে গেলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। সত্যজিতের অটোগ্রাফ খাতায় রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘বহুদিন ধরে, বহুক্রোশ দূরে/বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে/ দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু/দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শীষের উপরে/ একটি শিশির বিন্দু।’ সুপ্রভা দেবীকে তিনি এ-ও জানালেন যে, এ কবিতার মর্ম সত্যজিৎ বুঝবে আরো কিছুদিন পর। বোধ করি ঋষি রবীন্দ্রনাথ তখনি সত্যজিতের কপালে শিল্পির রাজতিলক দেখেছিলেন। সত্যজিত রায়ের বাবা সুকুমার রায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছিল বন্ধুসম্পর্ক। মৃত্যুপথযাত্রী বন্ধুর পাশে বসে রবীন্দ্রনাথ গানও শুনিয়েছিলেন। সত্যজিতের ডাকনাম ছিলো ‘মানিক’; পারিবারিক নাম ‘প্রসাদ’ । ‘প্রসাদ’ নামটি সুকুমার রায়ের পছন্দ ছিল না; রবীন্দ্রনাথের কাছে নাম চাইলেন। তিনি বললেন ‘সরল’। এ নামটিকে প্রেরণাসূত্র করে অবশেষে সত্যজিৎ রায়। শৈশব-কৈশোর ও প্রাকযৌবনে সত্যজিতের রবীন্দ্রসান্নিধ্যসম্পর্কিত উল্লেখপঞ্জি আমাদেও কাছে তেমন দৃশ্যত হয় না। পিতার মৃত্যুর পর সত্যজিতকে শান্তিনিকেতনেই চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু শান্তিনিকেতন সম্পর্কে সত্যজিতের ছিল নেতিধারণা… ম্যাট্রিকুলেশন পর্যন্ত লেখাপড়া করলেন বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে; অর্থনীতিতে অনার্স নিয়ে পড়লেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। অতঃপর শান্তিনিকেতনে কলাভবনে ভর্তি হলেন শিল্পচর্চার প্রত্যয়ে। অর্থাৎ পরিণত বয়সে তিনি এলেন শান্তিনিকেতনে এবং শান্তিনিকেতনের প্রকৃতি ও পরিবেশ তাকে আপ্লুত করে; কোপাই নদীর পাড় তাঁকে পথের পাঁচালীর পথ দেখায়। শান্তিনিকেতন তাঁর চোখ খুলে দেয়। পথের পাঁচালী থেকে আগন্তুকের অভিযাত্রার শুরু হয় রবীন্দ্রভূমি থেকেই; তিনি সৃজনকলায় আশ্রয় নেন রবীন্দ্রসাহিত্যেরও।

সত্যজিৎ রায়ের শতকরা পঁচানব্বই ভাগ চলচ্চিত্র সাহিত্যনির্ভর। ‘প্রয়োজনে সাহিত্যের কাছে হাত বাড়ানোর অধিকার চলচ্চিত্র অর্জন করেছে উত্তরাধিকার সূত্রেই নয় শুধু, ঐতিহাসিক দাবির জোরেও। অবশ্য চলচ্চিত্রের আদি ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা লক্ষ্য করি একইসঙ্গে দুটো প্রবণতাই। সাহিত্য-নির্ভরতা এবং সাহিত্য-নিরপেক্ষতা।’ পরস্পর পরিপূরকরূপে নির্মিত হয়েছে কালজয়ী চলচ্চিত্র। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণে সত্যজিৎ ছিলেন বাছনদার; তাঁর নির্মাণে দৃষ্টির বৈভবে ধরা দেয় বাঙালির মননভূমি; মাটিমায়াপ্রকৃতি ও অরণ্যনগর। বাংলা ভাষার প্রতি তার প্রাণের যোগ; বিশেষ দুর্বলতা। সিনেমাটিক গল্প অন্বেষণে তাঁর মুন্সিয়ানা অনন্য। বাংলা সাহিত্যের বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজশেখর বসু, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শংকর প্রমুখের সাহিত্য থেকে নিয়েছেন মূল রসদ; নির্মাণ করেছেন সৃজনকুশলতায়…যা পেয়েছে অনন্যমাত্রা। ভালো সিনেমা নির্মাণে ভালো গল্পের অভাব তিনি উপলব্ধি করেন এবং আনন্দলোক শারদসংখ্যায় বলেন, ‘আমার মনে হয় চিত্রোপযোগী ভালো গল্প উপন্যাসের অভাব বাংলা ছবির বর্তমান ব্যাপক দৈন্যের একটা বড় কারণ।’ এ বোধে বোধিদীপ্ত সত্যজিৎ সিংহভাগ নির্মাণে উত্তীর্ণসাহিত্যকে প্রশ্রয় দেন; আশ্রয় করেন। তথ্যচিত্রসহ ত্রিশোর্ধ চলচ্চিত্র নির্মাণ করে সত্যজিৎ হয়ে ওঠেন যশস্বী। তাঁর সৃষ্টিতে যে জনসংস্কৃতি তা অবধারিতভাবে বাঙালি জনসংস্কৃতি, মধ্যবিত্ত শ্রেণির টানাপোড়েনের সে জীবন; যে জীবন দোয়েলের…ফড়িংয়ের। প্রকৃতিপ্রেমের সান্নিধ্যে শুরু হওয়া পথে ক্রমে যুক্ত হয় যন্ত্রসভ্যতা; ভগ্ন ও যান্ত্রিক কলকাতার সঙ্গে গ্রামনগর দ্বন্দ্ব। বিস্তৃত বিভাবনায় দর্শকের মনস্তত্ত্বকে প্রাধান্য দিয়ে শিল্পের নির্মোহ-নির্মেদ কৌশলে তাঁর সৃষ্টি দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। অস্কারবিজয়ী বাঙালি পরিচয়ে তিনি হয়ে ওঠেন আমাদের অর্জন; যেমনটি নোবেলবিজয়ী রবীন্দ্রনাথ। তাঁর উল্লেখযোগ্য নির্মাণ হলো পথের পাঁচালী (১৯৫৫), অপরাজিত (১৯৫৬), পরশ পাথর (১৯৫৭), জলসাঘর (১৯৫৮), অপুর সংসার (১৯৫৯), দেবী (১৯৬০), রবীন্দ্রনাথ (১৯৬১), তিনকন্যা (১৯৬১), কাঞ্চনজঙ্ঘা (১৯৬২), অভিযান (১৯৬২), মহানগর (১৯৬৩), চারুলতা (১৯৬৪), কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫), নায়ক (১৯৬৬), চিড়িয়াখানা (১৯৬৭), গুপী গায়েন বাঘা বায়েন (১৯৬৯), অরণ্যেও দিনরাত্রি (১৯৬৯), প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০), সীমাবদ্ধ (১৯৭১), অশনি সংকেত (১৯৭৩), সোনার কেল্লা (১৯৭৪), জন-অরণ্য (১৯৭৬), শতরঞ্জ কে খিলাড়ি (১৯৭৭), জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৮), হীরক রাজার দেশে (১৯৮০), ঘরে বাইরে (১৯৮৫), আগন্তুক (১৯৯১) ।

ছোটবেলায় সত্যজিতের অটোগ্রাফের খাতায় রবিঠাকুর লিখে দিয়েছিলেন এই কবিতাখানি

১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্তিম প্রস্থান তাঁকে নাড়িয়ে যায়; ‘রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকীতে। শুধু তাই নয়, জন্মশতবর্ষেই রবীন্দ্রসাহিত্যের ‘পোস্টমাস্টার, ‘মণিহারা’ ও ‘সমাপ্তি’ গল্প অবলম্বনে নির্মাণ করেন ‘তিন কন্যা’ (১৯৬১)। ১৯৬৪ সালে নির্মাণ করেন ‘নষ্টনীড়’ গল্প অবলম্বনে ‘চারুলতা’ এবং ১৯৮৫ সালে ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস অবলম্বনে ‘ঘরে বাইরে’। ‘চারুলতা’কে তিনি শ্রেষ্ঠ ছবি মনে করেন। নিজেই বলেন, ‘বিকজ ইন দিস ফিল্ম আইন মেড ফিউয়ার মিসটেকস।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে সত্যজিৎ রায়ের নির্মিত তথ্যচিত্র ‘রবীন্দ্রনাথ’। তথ্যচিত্রটি একটি নতুন ধারণায় নির্মিত; মনে হবে যেন কাহিনিচিত্র। সরলভাষ্যে কঠিনকথার প্রতিঢেউ; জীবন্ত হয়ে ওঠে রবির অন্তিমযাত্রা। অভিনয়, তথ্য ও বোধের সম্মিলনে যেন রবিজীবনের জলছবি। তথ্যচিত্রটিতে স্বকণ্ঠে ধারাভাষ্য দিয়েছেন সত্যজিৎ। তথ্যচিত্রটির শুরুর দৃশ্য বিস্ময়জাগানিয়া। হাজারো মানুষের ভিড়ে একটি মৃতদেহের শ্মশানযাত্রা; জনতার অরণ্যে পরিণত চারদিক। প্রথমত জনতার ভিড়ে খুঁজে পাওয়া যায় না মৃতদেহ। ধীরে ধীরে একসময় ভেসে রবির পদ্মমুখ। উপচে পড়া ভক্তদের চাপে জোড়াসাঁকোবাড়ির গেট ভেঙে পড়ার উপক্রম; চিতা অভিমুখে চলে মরদেহ। রাতে যখন দাহ করার সময় ধারাভাষ্যে ধ্বনিত হয় ‘রাতের মধ্যে মানুষটির মরদেহ আগুনে ভস্মিভূত হয়ে গেল…কিন্তু তাঁর কবিতা, গান, সাহিত্য, ছবি ও মানবতাবোধ হয়ে রইল অমর।’ অতঃপর ছবির টাইটেল ভেসে ওঠে। তারপর ঠাকুরবাড়ি, কলকাতা, পরিবেশ, বালক রবীন্দ্রনাথ, শিলাইদহ, গান্ধীজী, দেশবন্ধু, শরৎচন্দ্র, ছিন্নপত্র, জালিয়ানওয়ালাবাগ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, সভ্যতার সংকট, রাজনীতি… কী নেই তাতে? শেষাংশে ব্যঞ্জনাবহ হয়ে আসে ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে ধরার ধুলোয় ঘাসে ঘাসে’ গানটি। পঞ্চান্ন মিনিটে একজীবনের পুরোজীবন যেন দেখা হয়ে যায়। ডিটেইল, ইমেজ ও মন্তাজে তথ্যচিত্রটি অনন্যমাত্রায় উত্তীর্ণ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষে তাঁর জীবনীভিত্তিক তথ্যচিত্র উপহার একজন মহৎ শিল্পির দ্বারাই সম্ভব। সত্যজিৎ সে ধারারই একজন শিল্পী। বাঙলা ও বাঙালির জীবনে এ রবীন্দ্রনাথ ও সত্যজিৎ উভয়েই প্রণম্য। অথচ ‘ইতিহাসের পরিহাস হলো, দুজনের প্রতিভাই আবিষ্কৃত এবং প্রাথমিকভাবে আদৃত হয়েছে পশ্চিমে, জন্মভূমিতে নয়।’ আমাদের সান্ত্ব¦না এই যে, শেষাবধি আমরা দুজনের জন্মশতবর্ষ নিয়ে গরবিত হই। দীর্ঘজীবী হও কিংবা বেঁচে থাকো একশো বছর…এমন আশীর্বাণী হরহামেশাই আমরা করে থাকি। কিন্তু ক’জন বাঁচে? শতবর্ষী সে জন্মসূত্রে কালের মাত্রা টপকানো দুজন মানুষ সত্যজিৎ ও রবীন্দ্রনাথ। সত্যজিতের জন্মশতবর্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষ স্মরণপ্রসঙ্গ সত্যজিৎ নিজেই নির্মাণ করেছেন। একের ভেতর দিয়ে দুজনকে দেখা। রবীন্দ্রজন্মকে একশো বছর পরে নির্মাণ করেছেন সত্যজিৎ আর সত্যজিৎজন্মকে একশোবছর বছর পরে নির্মাণ করছে আজকের সময়। সত্যজিতের প্রাপ্তিটা এখানেই।

লেখায় ব্যবহৃত ছবিটি সুধীর চন্দ্রকরের ‘জনগণের রবীন্দ্রনাথ’ বইয়ের প্রচ্ছদ থেকে নেয়া। সত্যজিৎ রায় প্রচ্ছদটি এঁকেছিলেন।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.