।। কামরুল আহসান ।।

অনেকে বলেন, সত্যজিৎ রায় তার প্রথম চলচ্চিত্র পথের পাঁচালীকে কখনো অতিক্রম করতে পারেননি। অনেকে এও বলেন, রায়ের সব ছবিতেই পথের পাঁচালীর ছাপ ও প্রভাব রয়ে গেছে। সেটা ঠিক কীভাবে রয়ে গেছে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ এখন আমরা দিতে পারব না। তবে আমরা যদি তার সবগুলো ছবি ধারাবাহিকভাবে দেখি তাহলে একটা জিনিস আবিষ্কার করতে পারব—তিনি ক্রমেই নৈঃশব্দ্য থেকে শব্দের জগতে যাত্রা করেছেন। তার প্রথম ছবি পথের পাঁচালীতে যেরকম নৈঃশব্দ্য বিরাজ করে শেষ ছবি আগন্তুকে তা নেই। আগন্তুক অনেক বেশি শব্দসর্বস্ব। কথায় ভরপুর। প্রায় প্রাবন্ধিক। এমনকি, তার শেষ দিকের প্রায় সব ছবিই কাব্যিক দৃশ্যায়নের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রাবন্ধিক চিন্তার প্রতিফলন। অপু ত্রয়ীর সঙ্গে কলকাতা ত্রয়ী বা শেষ তিনটি ছবি গণশত্রু, শাখা-প্রশাখা, আগন্তুক মিলিয়ে দেখলে তা বোঝা যাবে।

একটা চিহ্ন দিয়েও বিষয়টা নির্দেশ করা যায়। চিহ্নটি চারুলতা। চারুলতা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬৪ সালে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নষ্টনীড় গল্প অবম্বলনে নির্মিত এ-ছবিটিকে সত্যৎজিত রায় নিজে তার সবচেয়ে নির্ভুল চলচ্চিত্র হিসেবে দাবি করেছিলেন। এ-ছবিটিও গভীর নৈঃশব্দ্য ধারণ করে আছে। ছবিটির বিগিনিং টাইটেল শুরু হয় চারুলতার রুমালে ফুল তোলার মধ্য দিয়ে। ছবিটি শুরু হওয়ার পর দুবার শুধু চারুলতা বাড়ির চাকরকে একবার ডাকে। তারপর লম্বা কড়িডোর ধরে হেঁটে যায়। দূরবীন নিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখে। তার একাকীত্ব, ক্লান্তিকর সময় পরিচালক শুরুতেই বুঝিয়ে দেন দর্শকদের। ছবিটি শেষ হয় দমবন্ধকরা এক নৈঃশব্দ্যের মধ্য দিয়ে। অমল চলে যাবার পর চারুলতা নিঃসঙ্গতার সাগরে ডুবে যায়। ভূপতি বুঝতে পারে সে আর মিলতে পারছে না চারুলতার সঙ্গে। তার প্রয়োজনই ফুরিয়ে গেছে স্ত্রীর কাছে। তারপরও তারা সমুদ্রে ঘুরতে যায়। কিন্তু যে দূরত্ব একবার সৃষ্টি হয়েছে তা আর ঘুচে না। বাড়ি ফিরে আসার পর দেখে এ-এক নষ্টনীড়। তারপরও স্বামী-স্ত্রী আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে চায়। প্রচণ্ড মানসিক ঝড় সহ্য করার পর ভূপতি বাড়ি ফিরে আসে। চারুলতাও বিস্তর কান্নাকাটি করে নিজেকে সামলে নেয়। স্বামী বাড়ি ফিরে এলে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় চারুলতা, ভূপতিও হাতটা ধরার জন্য হাত বাড়ায়, কিন্তু, দুটি হাত না মিলতেই ছবিটি স্থির হয়ে যায়। দম আটকে বসে থাকা ছাড়া দর্শকের আর কোনো উপায় থাকে না।

যে-কোনো সবাক ছবিতে সংলাপ কিছু থাকেই। তাহলে আমরা নৈঃশব্দ্যকে চিহ্নিত করছি কী দিয়ে? উদাহরণ দেয়া যাক সত্যজিতেরই একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দিয়ে। ছবিটির নাম—‘টু’। এটি নির্বাক ছবি। কিন্তু, তারপরও শব্দে মুখর । টু-ও নির্মিত হয়েছিল ১৯৬৪ সালে। ছবির কাহিনিটি কেবল দুটি শিশুকে কেন্দ্র করে। একটি ধনী শিশু, আরেকটি গরিব শিশু। ধনী শিশুটি থাকে দোতলা বাড়িতে। তার বাড়ির পাশেই একটি ছোট্ট কুঁড়েঘরে থাকে গরিব শিশুটি। ছবির শুরুতেই দেখা যায় ধনী শিশুটি তাদের বাড়ির দোতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কোক খাচ্ছে। একটি গাড়ি বেরিয়ে যেতে দেখা যায় বাড়ি থেকে। ছেলেটি হাত নেড়ে বিদায় জানায় আর কোক খায়। কোক এখানে পশ্চিমা ধনতন্ত্রের প্রতীক হিসেবেই এসেছে বোঝা যায়। ঘরে গিয়ে ছেলেটি শোফার ওপর চিৎ হয়ে শোয়, হাতের কাছে ফোলানো দুটি বেলুন নিয়ে ম্যাচের কাঠিতে আগুন জ্বেলে সেগুলো একে একে ফোটায়। বেলুন ফোটানোকে বোম ফোটানোর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। তারপরই দেখা যায় ছেলেটি তার খেলনা নিয়ে খেলতে বসেছে। ভালুক গিটার বাজাচ্ছে এমন একটি যান্ত্রিক খেলনা নিয়ে যখন সে মশগুল, তখন শোনে বাইরে থেকে ভেসে আসছে বাঁশির শব্দ। জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে নিচে কুঁড়েঘরের কাছে বাঁশি বাজাতে বাজাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে গরিব শিশুটি। ধনী শিশুটি তখন তার ট্রাম্পপেট নিয়ে এসে প্রচণ্ড শব্দে বাজাতে শুরু করে। গরিব শিশুটির বাঁশের বাঁশির শব্দ তাতে ঢাকা পড়ে গেলে সে দৌড়ে ঘরে গিয়ে নিয়ে আসে তার ছোট্ট খেলনা ঢোলকটি। তা দেখে ধনী শিশুটি বের করে তার যান্ত্রিক এক ড্রাম। হেরে গিয়ে গরিব শিশুটি আবার ঘরে গিয়ে নিয়ে আসে তীর-ধনুক। এবার ধনী শিশুটি একের পর এক তার খেলনা বন্দুক দেখায়। ব্যাটারিচালিত সেই বন্দুকগুলো সত্যিকারের বন্দুকের মতোই ঠা ঠা শব্দ করে। গরিব শিশুটি পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে প্রায় মাথা নিচু করে ঘরে চলে যায়। ধনী শিশুটি তখন আপনমনে ঘরময় পায়চারি করে বেড়ায় আর এটা-সেটা খায়। হঠাৎ দেখে তার জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে একটা ঘুড়ি। জানালার কাছে গিয়ে সে দেখে গরিব শিশুটি এখন নিজের মতো ঘুড়ি উড়াচ্ছে। কিন্তু, ঘরবন্দি ধনীশিশুটির তা সহ্য হবে কেন? তার তো ঘুড়ি নেই, ঘর থেকে বের হওয়ারও উপায় নেই। সে তখন প্রথমে গুলাল দিয়ে গরিব শিশুটির ঘুড়ি নষ্ট করার চেষ্টা করে, তাও যখন পেরে উঠে না তার খেলনা রাইফেলটি নিয়ে আসে। রাবারের বুলেট ছুড়ে সে শেষ পর্যন্ত গরিব শিশুটির ঘুড়িটি নষ্ট করতে সমর্থ হয়। তারপর সে আবার একা, ঘরে বসে তার অজস্র খেলনা নিয়ে খেলতে শুরু করে। তখন শুধু যান্ত্রিক খেলনার শব্দ।

ছবিটর বক্তব্য সহজ। শুধু ধনী-গরিব নয়, প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের একটা বিভাজনও ছবিটিতে ফুটে উঠেছে। আর তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলছিল, ধারণা করা হয় এটি ভিয়েতনাম যুদ্ধেরই একটি প্রতিবাদ। গরিব শিশুটি এখানে ভিয়েতনাম আর ধনী শিশুটি আমেরিকার প্রতীক।

ছবিটি নির্বাক হলেও এটি যে একটি বক্তব্যপ্রদানধর্মী চলচ্চিত্র বলার অপেক্ষা রাখে না। এই বক্তব্যপ্রদানকেই আমরা শব্দের জগত হিসেবে চিহ্নিত করছি। যে-কোনো শিল্পে, চলচ্চিত্রে বক্তব্য কিছু থাকেই। কিন্তু, তা যখন সরাসরি কেবল বক্তব্যপ্রদানের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে যায় তখন শিল্পের চেয়ে প্রতিবেদন বিষয়টা প্রধান হয়ে ওঠে। বিশেষ করে চলচ্চিত্রশিল্প তো কেবল কথা বলার জন্যই নয়, সেখানে দৃশ্যের খেলা থাকবে; দর্শক যা বোঝার ছবি দিয়েই বুঝবে। তা না-হলে আর ছবি কেন! তার জন্য তো গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-সংবাদপত্রই আছে। কিন্তু আমরা দেখব সত্যজিৎ রায় এক সময় দৃশ্যের জগত ছেড়ে, অর্থাৎ নৈঃশব্দ্যের জগত ছেড়ে শুধু কথা বা শব্দের জগতেই পা রাখছেন।

১৯৬৫ সালে তিনি দুটি ছবি বানিয়েছেন। একটি প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্প অবলম্বনে ‘কাপুরুষ’, আরেকটি পরশুরামের গল্প অবলম্বনে ‘মহাপুরুষ’। কাপুরুষ একটি ব্যর্থপ্রেমের গল্প। অমিতাভ রায় ভালোবাসতো করুণাকে। নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে অমিতাভ একটি বিশেষ মুহূর্তে করুণাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। করুণার সঙ্গে অমিতাভের দেখা হয় তিন বছর পর। দার্জিলিং যাওয়ার পথে অমিতাভের গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে এক চা বাগানের ম্যানেজারের বাংলোতে রাত কাটাতে বাধ্য হয় অমিতাভ। করুণা এখন সেই ম্যানেজারের স্ত্রী। বাংলোতে গিয়ে করুণাকে দেখে অমিতাভ হতবাক। নানা সুযোগে অমিতাভ করুণার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে। করুণা সুখী হয়েছে কিনা জানতে চায়। করুণা অমিতাভের প্রতি এক প্রকার নিস্পৃহ ভাব দেখায়। করুণার কাছ থেকে ঘুমের বড়ি চেয়ে নেয় অমিতাভ। নিজের গাড়ি রেখে অমিতাভ পরদিন ট্রেনে করে চলে যাবার মনস্থির করে। তাকে এগিয়ে দিতে যায় করুণা ও করুণার স্বামী। দিনটা তারা চা-বাগানে ঘুরেফিরে কাটায়। দিনেও করুণার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ খোঁজে অমিতাভ। করুণাকে অমিতাভ এমনও প্রস্তাব দেয় তার সঙ্গে চলে যাবার। কিন্তু, করুণা নিশ্চুপ। অমিতাভকে ট্রেনে ইস্টিশানে নামিয়ে দিয়ে বিকেলে করুণা ও তার স্বামী চলে যায়। বিধস্ত অমিতাভ ট্রেন ইস্টিশানে বসে থাকতে থাকতেই সন্ধ্যা নামে। হঠাৎ ট্রেনের হুইসেল শুনে যখন তার সংবিত ফেরে তখন চেয়ে দেখে করুণা এসে দাঁড়িয়েছে তার কাছে। তাহলে কি করুণা অমিতাভের সঙ্গে চলে যাবার জন্যই এসেছে? না, করুণা এসেছে তার ঘুমের বড়িগুলো চেয়ে নেবার জন্য। এখানে এ-বড়ি পাওয়া যায় না। একরাত একদিনের গল্পটি এখানেই শেষ। না, এ-ছবিতেও নৈঃশব্দ্য তেমন গভীর নয়, বরং অতিকথনে সয়লাব। করুণার নীরবতাও করুণার স্বামী ও অমিতাভের অতিকথনে ভেঙে খান খান হয়ে যায়। দ্রুত গল্প শেষ করার তাড়নাতেই বোধহয় ৭৪ মিনিটের ছবিটি দর্শকের ভেতরে তেমন কোনো দাগ না কেটেই ফুরিয়ে যায়।

মহাপুরুষ গল্পটি এক ভণ্ডবাবার মুখোশ উন্মোচন করে দেয়ার গল্প। এ-ছবির সময়সীমা মাত্র ৬৫ মিনিট। গল্পের পেছনে দ্রুত গতিতে দৌড়াতে গিয়ে অনিবার্যভাবেই সত্যজিৎ রায় কোনো ‘ইমেজ’ নিয়ে খেলার সুযোগ পাননি।

১৯৬৬ সালে সত্যজিৎ রায় নির্মাণ করেন ‘নায়ক’। নায়কও শব্দে শব্দে, অর্থাৎ কেবল সংলাপে সংলাপে কাহিনি বিস্তার। এমন বলছি না যে সংলাপের মধ্য দিয়ে কাহিনি বিস্তার দূষণীয়। সংলাপও কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার একটা মাধ্যম। কিন্তু, চলচ্চিত্র যেহেতু দৃশ্যেরও ব্যাপার, আর প্রথম দিকে সত্যজিৎ রায় যেহেতু অপরূপ কিছু কাব্যময় দৃশ্যায়নের মাধ্যমে আমাদের দৃষ্টিকে প্রসারিত করেছিলেন শেষ দিকে সেগুলো ক্রমশ বিলীন হয়ে যেতে থাকায় আমাদের চোখে ও মনে একঘেয়েমী ক্লান্তি এনে দেয়।

অতিরিক্ত সংলাপ আসার একটা কারণ কিছু বলার তাড়না। আমরা দেখব সত্যজিৎ রায় ধীরে ধীরে কেমন অস্থির হয়ে উঠছেন, কিছু বলার জন্য ছটফট করছেন। কোনো ধৈর্যহীন দর্শক যদি সত্যজিৎ রায়ের একটি ছবিও দেখে থাকেন তাহলে নিশ্চিতভাবেই ‘হীরক রাজার দেশ’ দেখেছেন। কথা ছাড়া হীরক রাজার দেশ আর কী! ছবি ছাড়া এ-গল্প যদি আমরা কোনো বইয়ে পড়তাম তাহলে একইরকম ভালো লাগত। তাহলে একটি বইয়ের গল্প সিনেমার পর্দায় উঠে আসার কারণ কী? সেগুলো কিছু বাড়তি ‘ইমেজ’ দাবি করে। মুখের কথাকে যে-ছবি স্তব্ধ না করে দেয় সে ছবি কোনো ছবিই না। কিন্তু অস্থিরতাই আমাদের অধিক কথা বলতে বাধ্য করে। সত্যজিৎ রায়ের অস্থিরতার সবচেয়ে বড় নজির কলকাতা ত্রয়ী। কলকাতা ত্রয়ীর প্রথম ছবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’। এই ছবির মধ্য দিয়ে সত্যজিৎ রায় সরাসরি তৎকালীন কলকাতার সামাজিক-রাজনৈতিক জগতে প্রবেশ করেন। কিন্তু তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিটি কী?

সত্যজিৎ রায়ের বিরুদ্ধে একটা সমালোচনা তিনি একটু কম বামঘেষা। অন্তত তার সমসাময়িক অন্য দুই মহৎ চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন ও ঋত্বিক ঘটকের তুলনায় তো বটেই। মৃণাল সেন ও ঋত্বিক ঘটক বামপন্থি এটা স্পষ্টতই প্রকাশিত। অন্য দিকে সত্যজিৎ রায় যে বামরাজনীতি পছন্দ করেন না এটা এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টই বলেছেন। তাহলে তিনি কোনপন্থী? বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী? কিন্তু, তার স্বরূপ তো তিনি দেশভাগের পর থেকে দেখেছেন। সমাজজুড়ে প্রচণ্ড অরাজকতা। কলকাতায় তখন নকশাল আন্দোলন তুঙ্গে। প্রতিদ্বন্দ্বীর নায়ক সিদ্ধার্থকে কখনো মনে হয় প্রতিবাদী কখনো আপসকামী। মূলত সে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে। তার ছোটভাই টুলু বরং অনেক বেশি আস্থাশীল, তার দৃঢ় বিশ্বাস বিপ্লব ছাড়া যে সমাজ পরিবর্তন আসবে না। অন্যদিকে তার ছোটবোন সুতপা নিজের রূপসৌন্দর্যের বিনিময়ে ভালো একটি চাকরি বাগিয়ে নেয়। এরকম কাছাকাছি বিষয়ের কিছু ঘটনা আমরা দেখব ১৯৭৫ সালে নির্মিত কলকাতা ত্রয়ীর তৃতীয় ছবি ‘জন-অরণ্য’-এ। জন-অরণ্য-এর নায়ক সোমনাথ, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ছোটবোন কনা নিজের রূপ বিক্রি করে সংসারের ভোরপোষণ চালায়। অনার্স পাস করার পরও সোমনাথ ও তার বন্ধুর কোনো চাকরি হয় না। কারণ তারা কোনো গ্রেড পায়নি। চাকরি না পেয়ে সোমনাথ শুরু করে দালালীর ব্যবসা, মধ্যম মাধ্যম; অর্থাৎ একজনের পণ্য আরেকজনের কাছে অর্ডার নিয়ে পৌঁছে দেয়। এর মধ্যে অতি লোভে কিংবা টিকে থাকার প্রয়োজনে শেষ পর্যন্ত এক ক্লায়েন্টের কাছে তাকে নিয়ে যেতে হয় বন্ধুর বোনকে। এই তার নৈতিক অধঃপতন। অন্য দিকে তার অবসরপ্রাপ্ত পিতা নৈতিকতার এক শিরোমণি হয়ে ঘরে বসে থাকেন। কাজে সাফল্য পেলেও নৈতিক অধঃপতনের কারণে সোমনাথ আর পিতার মুখোমুখি হতে পারে না। ঠিক এইরকম দৃশ্যই আমরা দেখব সত্যজিৎ রায়ের শেষ দিকের ছবি ‘শাখা-প্রশাখা’য়। সেখানেও পিতা এমনই নীতিবান পুরুষ- সুস্থসফল ছেলেদের দুই নম্বরী দেখে নিজের মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলেটিকেই আকড়ে ধরেন।

শেষ দিকে যাওয়ার আগে জন-অরণ্য ছবিটি নিয়েই আর দুচারটি কথা বলা যাক। শংকরের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এ-চলচ্চিত্রটি নিয়ে কিছু বিতর্ক করার অবকাশ আছে। সোমনাথের পরিবার মোটামুটি স্বচ্ছল। শিক্ষিত বাবা, এখন অবসরপ্রাপ্ত। মা মারা গেছেন। তারা দুভাই। বড়ভাই ভালো চাকরি করে। বাড়িতে আর আছে ভাবী। ভাবী সোমনাথের প্রতি খুবই বন্ধুসুলভ। বোঝা যায় শিক্ষিত, রুচিশীল মেয়ে। পুরো পরিবারটাই অত্যন্ত ভদ্র, শিক্ষিত, সুরুচিসম্পন্ন। আদর্শ মধ্যবিত্ত বলতে যা বোঝায়। এখানে প্রথমেই একটা কথা বলে নেয়া ভালো, যে, তেমন কোনো অভাব-অনটন না থাকা সত্ত্বেও সোমনাথের হঠাৎ একেবারে দালাল বনে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত নিজের বন্ধুর বোনকে খদ্দেরের কাছে দিয়ে আসা খুবই বাড়াবাড়ি মনে হয়েছে। তৎকালীন বাস্তবতায় এটা সত্য মনে হলেও এই পরিবারটির জন্য বেখাপ্পা মনে হয়েছে। আর অধঃপতন মানেই কি শুধু মধ্যবিত্তের অধঃপতন! সত্যজিৎ রায় নিজে মধ্যবিত্ত মানসিকতার এবং মধ্যবিত্ত দর্শকদেরই মন তুষ্ট করতে কিংবা নাড়া দিতে চেয়েছেন। যাই হোক, এ নিয়ে অনেক কথা বলা যায়, আমাদের পরিসর ছোট বলে জন-অরণ্য ছবির শুরুর দিকেই একটা প্রসঙ্গ উত্থাপন করা যাক। পুত্রদ্বয়ের সঙ্গে কথা বলছেন সোমনাথের পিতা। অল্প কয়েকটি প্রার্থীর জন্য এক লাখ আবেদনপত্র জমা পড়েছে শুনে তিনি চোখ কপালে তুলে ফেলেন। হতবিহ্বল হয়ে মন্তব্য করেন, সাধে কি ছেলেরা বিপ্লব করতে চায়! বড়ছেলে তখন নিত্যনৈমিত্তিক কথার সুরে বলে, বিপ্লব আর বেশিদিন নাই, বাবা। সবাইকে মেরে শেষ করে ফেলছে। শুনে পিতা বুকে হাত বুলান, দেশের জন্য মৃত্যু তো সহজ কাজ নয়। বড়ছেলে তখন বলে, এদের ভয়ডর নেই, বাবা। এরা মরতেও ভয় পায় না, মারতেও ভয় পায় না। পিতা তখন এদের আদর্শ জানার জন্য ছোটপুত্রের কাছে কিছু বইপত্র চান। খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে এসব আলাপ-আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত আসলে কারো কোনো রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায় না। এ-গলদ কলকাতা ত্রয়ীর আরেক ছবি ‘সীমাবদ্ধ’-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সীমাবদ্ধ-এর নায়ক শ্যামলেন্দু প্রতিদ্বন্দ্বীর নায়ক সিদ্ধার্থের বিপরীত চরিত্র। তার লড়াই শুধু উপরে ওঠার। ছবিটি শুরুই হয় তার ধারাবর্ণনা দিয়ে। বেকারত্বের রাজত্বে সে যে সফল একজন ব্যক্তি হয়ে উঠছে তা নিয়ে তার প্রবল আত্মতুষ্টি। কাজ করে বিদেশি একটি কোম্পানিতে। বিশাল অংকের বেতনের সঙ্গে পেয়েছে অত্যাধুনিক সুরম্য ফ্ল্যাট। সেই ফ্ল্যাটে থাকে সুন্দরী স্ত্রী। সারাক্ষণ স্বামীর মন যোগাতেই যে ব্যস্ত। বাড়িতে বেড়াতে আসে সুন্দরী শ্যালিকা। তার সঙ্গেও শ্যামলেন্দুর মিষ্টি সম্পর্ক। সব মিলিয়ে বেশ সুখী একজন মানুষ সে। একমাত্র পুত্র পড়ে দার্জিলিংয়ের সেন্ট পল স্কুলে। বুড়ো বাবা-মা থাকে এই কলকাতা শহরেই অন্য একটি ছোট ভাড়াবাসায়। এ-বাড়িতে থাকতে পারেন না কারণ শ্যামলেন্দুর বন্ধুরা আসে এবং তারা নিষিদ্ধ পানি পান করে। সেই পানভোজনের এক রাতে শ্যামলেন্দু ও তার বন্ধুরা অসংখ্য অনর্থক কথার সাথে হঠাৎ টেনে আনে কলকাতা শহরের রাজনীতি। শ্যামলেন্দুর এক বন্ধু যখন এক সাধুবাবার বুজুর্গির কথা বলছিল তখন শ্যামলের স্ত্রীই টেনে আনে কথাটা, এতোই যদি পারেন তো আমাদের শহরের গণ্ডগোলটা মিটিয়ে দেন না, বাবা। গণ্ডগোল বলতে শহরে হঠাৎ হঠাৎ বোম ফোটার কথা বলা হচ্ছে। এই বোম ফোটার কথা আগেও একবার এসেছে শ্যামলেন্দুর শ্যালিকা টুটুল যখন এসেছিল তখন তার বড়বোন ফ্ল্যাটটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতে দেখাতে এক সময় জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। জানালা দিয়ে শহরটি দেখে টুটুল যখন মুগ্ধ হয় তখন তার বড়বোন বলে, এমনিতে ভালোই, শুধু মাঝে মাঝে বোমটোম ফুটে। এরকম আবছা আবছা কথায় বোঝা যায় নকশাল আন্দোলনকারীদের কথাই বলা হচ্ছে। শ্যামলেন্দুর স্ত্রীর কথা শুনে এক বন্ধু বলে, ‘ওদের ধরে ধরে চাকরি দিয়ে দাও’, তার উত্তরে আরেকজন বলে, ‘চাকরি দিয়েই বা লাভ কি, সেখানেও একটা ইউনিয়ন করে বসবে।’ স্বয়ং শ্যামলেন্দু তখন বলে, ‘ওদের বক্তব্য হল পুরো ব্যবস্থাটাই পচে গেছে, ওরা চাকরি চায় না’। শ্যামলেন্দুর মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে আরেকজন তখন বলে, ‘ওরা বিপ্লব চায়’। আরেকজন বলে, ‘এখন দরকার ডিক্টেটর’। শ্যামলেন্দু বলে, ‘তরুণদের মধ্যে এই যে একটা অনাস্থা, এটা তো একটা ইউনিভার্সেল ব্যাপার, সৌমেন দা’। সৌমেন বিরক্ত হয়ে বলে, ‘ইউনিভার্সেল মাই ফুট! বিদেশে করছে তারই অনুকরণে এখানে কিছু চলছে। ওরাও করছে, আমরাও করছি।’ শ্যামলেন্দুর সুন্দরী শ্যালিকা টুটুল তখন চোখ গরম করে তাকায়। মানে কথাগুলো তার খুব লাগছে। কিন্তু সে কোনো রা-শব্দ করে না। সে যে ছেলেটিকে ভালোবাসে সে নকশাল করলেও করতে পারে এমন একটি ইঙ্গিত ছবির মাঝামাঝি পরিচালক আমাদের দিলেও সারা ছবিতে সেই ছেলে সম্পর্কে আর একটি কথাও উচ্চারিত হয় না। এমনকি টুটুল যে দুলাভাইয়ের উচ্চাবিলাসে নানা অস্পষ্ট প্রতিক্রিয়া দেখায় সেও যে আসলে কোন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে তাও ঠিক বোঝা যায় না। ছবির শেষে সে যখন ধারণা করতে শ্যামলেন্দু অফিসের একটি হঠাৎ আবির্ভূত জটিলতা কোনো একটা অন্যায়ের মাধ্যমে সামলে নিয়েছে তখন সে শুধু শ্যামলেন্দুর উপহার দেয়াটা ঘড়িটা ফেরত দিয়ে দেয়। তাতেই শ্যামলেন্দু একেবারে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে। খুব ভাব-গাম্ভীর্যের সঙ্গে সীমাবদ্ধ ছবিটি উপস্থাপিত হলেও তার অনেকগুলো সীমাবদ্ধতা আছে। অযথা কথা ছাড়া পুরো ছবিটিতে হৃদয়গ্রাহী তেমন কিছু নেই। পুরো ছবিটিতে শ্যামলেন্দুর বিলাসী জীবন-যাপনের অনুষঙ্গই বর্তমান। এ দিয়ে পরিচালক কী-ধরনের দার্শনিক-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতে চেয়েছেন তা স্পষ্ট নয়। তিনি কি বুঝাতে চেয়েছেন ক্রমশ আকাঙ্ক্ষার জীবন হঠকারিতার এবং শেষ পর্যন্ত সেটা ব্যর্থ? শ্যামলেন্দুর ওই মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকাটা কি তার অনুতাপের, উপলব্দির? তার ওই অনুতাপে কোন ধরনের দর্শকের কী ধরনের অনুভূতি হতে পারে! বুর্জোয়ারা বিপ্লবী হবে, নাকি বিপ্লবী হবে পরিমার্জিত বুর্জোয়া?

রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি পোক্ত না হলে চুপ থাকাই উত্তম। কিন্তু জ্ঞান-তাত্ত্বিকতার বাজারে চুপ থাকা কঠিন। আবার কথা বলতে গিয়ে তখন অনেক কাঁচাকথা বেরিয়ে যায়। সত্যজিৎ রায় কতোটা বাগ্মী হয়ে উঠেছিলেন সেটা বোঝা যায় ক্যামেরার কাজ বাদ দিয়ে চরিত্রদের মধ্য দিয়ে খালি কথা বলানোর মধ্য দিয়ে। তাঁর শেষ তিনটি ছবি গণশত্রু (১৯৯০), শাখা-প্রশাখা (১৯৯০) এবং আগন্তুক (১৯৯১) একেবারেই কথাসর্বস্ব। গণশত্রু করেছেন ইবসেনের একটি নাটক অবলম্বনে। মঞ্চনাটকের মতোই ছবিটির দৃশ্যধারণ করেছেন। ক্যামেরা নিয়ে ঘর থেকে বেরোননি বললেই চলে। এমনকি যে-নদীর জল দূষিত হয়ে যাচ্ছে বলে এতো কথা সেই নদীটিও তিনি একবার দেখাননি। কারিগরি দিক দিয়ে ছবিটির নির্মাণ যতোই কৌশলতার পরিচয় দিক অতিকথনের ফলে বেশ ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। শেষ দিকের ছবিগুলোতে তিনি খুব নৈতিকতা প্রচার করতে নেমেছিলেন, এবং সেগুলো বেশ স্পষ্ট কলরবে। নৈঃশব্দ্য থেকে শব্দের দিকে যাত্রা—এটা সত্যজিতের একার যাত্রা না, এটা কালেরই একটা দাবি। বলছিলাম অস্থিরতাই অধিক কথা বলতে বাধ্য করে। ষাট দশকের পর কলকাতায়, বাংলায়, সমগ্র ভূ-ভারতে, এমনকি সারাবিশ্বেই একটা অস্থির কাল নিয়ে আসে। এ-সময় কোনো সংবেদনশীল মানুষের পক্ষে চুপ থাকা অসম্ভব। আবার স্পষ্ট করে কেউ কিছু বলবে সেইরকম দার্শনিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতিও তো নেই। সে সময়ের সাহিত্য-দর্শন-রাজনৈতিক ইতিহাস পড়লেই আমরা দেখব চারদিকে ভয়ানক অস্থিরতা, সবাই কথা বলছে, কিন্তু, কেউ শুনছে না। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যা, সেইসব কথার কোনো অর্থও দাঁড়াচ্ছে না। কথায় কোনো ফল হচ্ছে না। প্রচুর শব্দ উৎপাদিত হচ্ছে, কানকে বধির করে দেয়া ছাড়া আর কোনো কাজ হচ্ছে না। শব্দের ঝংকার সাময়িকভাবে আমাদের মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করলেও হৃদয়ে কোনো আলোড়ন সৃষ্টি করছে না। তাই অপু ত্রয়ী, কাঞ্চনজঙ্ঘা, এমনকি চারুলতার নৈঃশব্দ্য আমাদের যেমন দীর্ঘবছর ধরে আচ্ছন্ন করে রাখে সত্যজিতের শব্দসর্বস্ব অন্যসব চলচ্চিত্র তেমন ঘোরের মধ্যে নিয়ে ফেলে না।

সত্যজিতের চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে বাংলার, ভারতের, বিশ্বের গত শতাব্দীর শেষ দশকগুলো বোঝা যাবে। বোঝা যাবে নৈঃশব্দ্যের কাল শেষ, আসছে কেবল শব্দের ঝংকার। কথা কথা আর কথা…