।। মনিস রফিক ।।

বালক সত্যজিৎ যখন দশে পা দিল, তখন পৌষমেলা দেখার জন্য শান্তিনিকেতন গিয়েছিল। সঙ্গে ছিলেন মা সুপ্রভা রায়। নতুন অটোগ্রাফের খাতা কেনা হয়েছে। ভীষণ শখ জেগেছে প্রথম আটোগ্রাফটা নিবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে। এক সকালে মা’র সঙ্গে সত্যজিৎ গেল উত্তরায়ণে। পারিবারিকভাবে ঠাকুর পরিবার আর রায় পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিনের সুন্দর সম্পর্ক। সত্যজিৎ এর পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজন আর পিতা সুকুমার রায় ছিলেন বিশ্বকবির পরম স্নেহভাজন। সুকুমার রায় সম্পাদিত ‘সন্দেশ’ পত্রিকার তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ পাঠক।

দশ বছরের বালক সত্যজিৎ রায়, যাকে মানিক নামেই রবীন্দ্রনাথ চিনতেন, বিশ্বকবির সামনে কিছুটা ত্রস্ত ভঙ্গিতে অটোগ্রাফের খাতাটা নিয়ে দাঁড়াতেই কবি পরম স্নেহে কাছে টেনে নিলেন। জানতে চাইলেন খাতা নিয়ে সে কেন এসেছে। বালক মানিক খাতাটা এগিয়ে তার ইচ্ছার কথা জানাল। কবি তার দিকে কিছুক্ষণ তাকালেন, তারপর সস্নেহে বললেন, ‘এটা থাক আমার কাছে; কাল সকালে এসে নিয়ে যেও।’ কথামত মানিক পরের দিন গেল। টেবিলের উপর চিঠিপত্র, খাতা-বইয়ের ডাঁই, তার পিছনে বসে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মানিককে দেখতেই তার ছোট্ট বেগুনী খাতাটা খুঁজতে লাগলেন সেই ভিড়ের মধ্যে। মিনিট তিনেক হাতড়ানোর পর বেরোল খাতাটা। তারপর সেটা তাকে দিয়ে মা সুপ্রভা রায়ের দিকে চেয়ে বললেন, ‘এটার মানে ও আরেকটু বড় হলে বুঝবে।’ খাতা খুলে বালক সত্যজিৎ আট লাইনের ভুবনজয় করা কবিতাটা দেখল। বিশ্বকবির ঘর থেকে বের হয়ে উত্তরায়ণের সামনের যে বিশাল আমগাছ তার নিচে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে আবৃত্তি করতে লাগল—

‘এটার মানে ও আরেকটু বড় হলে বুঝবে’, রবিঠাকুর বলেছিলেন সত্যজিতের মাকে

বহু দিন ধরে’ বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা
দেখিতে গিয়েছে সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশির বিন্দু ॥

একটানে আটটি লাইন আবৃত্তি করে কিছুক্ষণ থামলো সে। তারপর দম নিয়ে লাইনগুলোর নিচের শব্দগুলো উচ্চারণ করল—৭ই পৌষ ১৩৩৬ শান্তিনিকেতন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ততক্ষণ মা এসে পিছনে দাঁড়িয়েছেন। জানতে চাইলেন লাইনগুলোর মানে বুঝেছে কিনা। সে তখন অল্প মাথা ঝাঁকিয়ে জানাল, ‘কিছুটা’।

ভারত উপমহাদেশের চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি এবং যাঁকে চলচ্চিত্র জগতের রবীন্দ্রনাথ বলা হয় সেই সত্যজিৎ রায় সম্ভবত বালক বয়সেই বিশ্বকবির এই আটটি লাইন মনের অজান্তেই গভীরভাবে ধারণ করেছিলেন। ফলে ফর্মে আন্তর্জাতিক হলেও বিষয়ে প্রচণ্ডমাত্রায় দেশজ হতে পেরেছেন আর একটানে বাংলা চলচ্চিত্রকে বিশ্বের চলচ্চিত্র কাতারে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। সত্যজিৎ রায়ের জন্ম ১৯২১ সালে ২ মে কোলকাতায়। পূর্বপুরুষের বাসস্থান বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ জেলার মসুয়া গ্রামে। মাত্র আড়াই বছর বয়সে পিতাকে হারানোর ফলে তাকে আর তার মা’কে এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটতে হয়। তবে মামার আশ্রয়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরে পান মা ও ছেলে। মা চাকরি নেন একটি স্কুলে। আট বছর পর্যন্ত সত্যজিৎ মায়ের কাছে বাড়িতেই পড়াশোনা করেন। তারপর ১৯৩০ সালের জানুয়ারি মাসে বালিগঞ্জ সরকারি বিদ্যালয়ে ক্লাস সিক্সে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকেই সত্যজিৎ ১৯৩৬ সালের মার্চ মাসে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র চৌদ্দ বছর দশ মাস। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

নিজের বিদ্যায়তন নিয়ে সত্যজিতের করা স্কেচ

১৯৩৬ সালেই তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেন। এই কলেজে তাঁর পিতামহ ও পিতৃদেবও ছাত্র ছিলেন। কলেজের ছাত্র হবার পর বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পড়ার পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্র ও সংগীতচর্চায় আরো বেশি মন দেন। আগে যেমন চলচ্চিত্র বিষয়ে ভাবতে গিয়ে শুধু অভিনেতাদের নিয়ে ভাবতেন, এবার তাঁর আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় ছবি পরিচালনা ও পরিচালক। ইতোমধ্যে পুদভকিনের চলচ্চিত্রের তাত্ত্বিক দিক সর্ম্পকে দুটি বই পড়ে ফেলেছেন তিনি এবং সেই সময়ে বৃটেনের বিখ্যাত চলচ্চিত্র পত্রিকা ‘সাইট এন্ড সাউন্ড’ এর গ্রাহকও হয়েছেন তিনি। সাইট এন্ড সাউন্ড পত্রিকার চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখাগুলো তাঁকে কীভাবে আলোড়িত করতো তা বলতে গিয়ে পরবর্তী জীবনে তিনি লেখেন, ‘যেন একটা নতুন জগতের দরজা খুলে যাচ্ছে আমার চোখের সামনে।… নজর করে দেখছি যে, ক্যামেরাটাকে কোথায় কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, কোন দৃশ্য কোথায় ‘কাট’ করা হচ্ছে, ছবির গল্পাংশ কীভাবে উন্মোচিত হচ্ছে আর কী কী সেই বৈশিষ্ট্য যা একজন পরিচালকের কাজকে আর একজনের কাজ থেকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়।’ সেই সময় কোন ছবির ডিসটিংটিভ কোয়ালিটি ফিনিশ দেখে সত্যজিৎ আলাদা করতে পারতেন এমজিএম থেকে প্যারামাউন্ট বা ওয়ার্নার থেকে টোয়েন্টিথ সেঞ্চুরি ফক্সের ছবি। সেই সঙ্গে ফোর্ড এবং ওয়াইলার, বা কাপরার সঙ্গে স্টিভেন্স এর মতো পরিচালকের ছবির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধরে ফেলতেন। শেষ জীবনে সেই কিশোর সময়ের কথা স্মরণ করতে গিয়ে তিনি বারবার বলতেন, ‘দিস ওয়াজ প্রেসাইজলি দ্য পয়েন্ট হোয়ার মাই ইনটারেস্ট টুক এ সিরিয়াস টার্ন।’

১৯৩৮ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেবার পর সত্যজিৎ ঠিক করেছিলেন হিউম্যানিটিজের কোনও বিষয় নিয়ে পড়বে। তাঁর ইচ্ছে ছিল সাহিত্য নিয়ে পড়বে। কিন্তু ভারতের প্রখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ পিতৃহীন বন্ধুপুত্রকে সাহায্য করার ইচ্ছায় সুপ্রভা রায়কে পরামর্শ দিয়েছিলেন, সত্যজিৎ যদি অর্থনীতিতে অনার্স নিয়ে বি.এ পরীক্ষা দেয়, তাহলে তাঁর নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান স্ট্যাটেটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের মুখপত্র সংখ্যা পত্রিকায় চাকরির সুবিধা হতে পারে। ‘চাকরি’ এই শব্দ বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তানের কাছে নিশ্চয় বড় লোভনীয় ছিল। ফলে সত্যজিৎ অনেকটা বাধ্য হয়েই অর্থনীতিতে অনার্স নিয়েছিলেন। কিন্তু অর্থনীতি তার ভালো লাগত না। স্রেফ মুখস্থ বিদ্যার জোরে একটা সেকেন্ড ক্লাস নিয়ে সত্যজিৎ রায় অনার্স পাশ করেন।

সত্যজিতের স্কেচে রবিঠাকুর

সত্যজিৎ রায়ের মায়ের একান্ত বাসনা ছিল, সত্যজিৎ শান্তি নিকেতনের শিল্প বিষয় নিয়ে পড়বে। ইতোমধ্যে কলকাতার পাইকপাড়ার সিংহবাড়িতে এক অনুষ্ঠানে সুপ্রভা রায় ও সত্যজিৎ রায় গিয়েছিলেন। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে সুপ্রভা কবিকে প্রণাম করতেই কবি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার ছেলে কী করছে? তাকে আমাদের আশ্রমে পাঠাও না কেন?’ রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে সুপ্রভা রায়ের সুপ্ত ইচ্ছাটা জেগে উঠল এবং এক রকম জোর করেই সত্যজিৎকে শান্তিনিকেতনে জ্ঞানলাভ করতে পাঠালেন। কলকাতার সরগরম পরিবেশ ছেড়ে শান্তিনিকেতনের মত একটি নিরব নিশ্চুপ পরিবেশে যেতে তার একেবারে মন টানছিল না। উপরন্ত শান্তিনিকেতনে নিয়মিত সিনেমা দেখার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া আশ্রমিকদের কিছুটা মেয়েলি ও কৃত্রিম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সত্যজিতের একবারে পছন্দের ছিল না। কিন্তু মায়ের ইচ্ছের কাছে একমাত্র বাধ্য সন্তান ১৯৪০ সালে ১৩ জুলাই শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ভর্তি হলেন। শান্তিনিকেতনের প্রথম দিনে সত্যজিৎ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। কবি তখন উত্তরায়ণ চৌহদ্দির মধ্যে সবে তৈরি ‘উদীচী’ বাড়িতে ছিলেন। সেখানে সত্যজিৎ দেখলেন, কবি সামনের বারান্দায় বসে আছেন আরাম কেদারায় ঠেস দিয়ে, তাঁর চাদরে ঢাকা পা দুটো সামনে একটা টুলের ওপর তোলা। সত্যজিৎকে দেখে খুশি হলেও মুখের ভাবে সে খুশি প্রকাশ করার একটু অসুবিধা ছিল, কারণ একজন নাম করা বাঙালি ভাস্কর তার মূর্তি গড়ছেন মাটি দিয়ে। আর রবীন্দ্রনাথ অনড় হয়ে বসে তাকে সিটিং দিচ্ছেন। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর যে বিশেষ দু’জনের স্নেহ সত্যজিৎ সারাজীবন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতেন তারা হচ্ছেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসু এবং বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। তিনি প্রায় বলতেন। শান্তিনিকেতন তাঁকে দুটি বিষয় শিখিয়েছে—ছবি দেখা এবং প্রকৃতিকে চেনা। ফলে ভীষণ বাস্তববাদী কবিত্বহীন মন নিয়ে তিনি শান্তিনিকেতনেই খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর ভবিষ্যতের যাত্রাপথ। তিনি বলেছেন, ‘দ্য প্লেস হ্যাড ওপেনড উইনডোস ফর মি। ইট হ্যাড ব্রট টু মি অ্যান আওয়ারনেস অফ আওয়ার ট্রাডিশনস হুইচ আই নিউ উড সার্ভ অ্যাজ এ ফাউন্ডেশন ফর এনি ব্রাঞ্চ অফ আর্ট দ্যাট আই উইশড টু পারস্যু।’ এইখানেই ভবিষ্যতের এক শিল্পীর গড়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আড়াই বছর শান্তিনিকেতনে চিত্রকলার শিক্ষগ্রহণ করে অধ্যক্ষ নন্দলাল বসুর অনুমতি নিয়ে কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হওয়ার বাসনায় তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। অথচ সত্যজিতের শান্তিনিকেতনে চার বছর থাকার কথা ছিল।

চাকরি জীবনে শনিবার বিকেলে ফিল্ম দেখা তাঁর অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেয়েছিল। চলচ্চিত্র সংক্রান্ত পড়াশোনার জন্য মাঝে মধ্যেই যেতেন ইউনাইটেড স্টেটস ইনফরফেশন লাইব্রেরিতে। সেখানেই আলাপ হয়েছিল বংশী চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে। কাশ্মীর থেকে ১৯৪৩ সালে কলকাতায় আসা বংশী ইতোমধ্যে কলকাতা গ্রুপের সদস্য হয়েছেন এবং চলচ্চিত্র নিয়ে তাঁর গভীর ভাবনা থাকায় খুব সহজেই সত্যজিতের সাথে বংশীর বন্ধুত্ব হয়ে যায়। সেই দিনগুলোতে সত্যজিতের হাতে রজার ম্যানভিলেন ফিল্ম বইটি। বইটির শেষ পরিচ্ছেদের শিরোনাম ছিল ‘হোয়াই নট স্টার্ট এ ফিল্ম সোসাইটি’। লেখাটি নিয়ে সত্যজিৎ বংশী দুজনেই নিজেদের মধ্যে আলাপ করলেন। অবশেষে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন কলকাতায় একটি ফিল্ম সোসাইটি সংগঠিত করবেন। সমমনা চলচ্চিত্রে আগ্রহী কিছু যুবক নিয়ে ১৯৪৭ সালের ৫ অক্টোবর যাত্রা শুরু হয় ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির। পঁচিশজন সদস্য নিয়ে সোসাইটিটির পত্তন হয়। সত্যজিৎ ও বংশী চন্দ্রগুপ্ত ছাড়া সোসাইটির উল্লেখযোগ্য সদস্যরা হচ্ছেন, চিদানন্দ দাশগুপ্ত, পূর্ণেন্দু নারায়ণ, মনোজেন্দু মজুমদার। সত্যজিৎ লিখেছেন, ‘সাধারণত আমাদের বাড়ীর বৈঠকখানায় বসে আমরা ১৬ মিলিমিটারের ফিল্ম দেখতাম এবং যেসব ফিল্ম দেখতাম তার নানান দিক নিয়ে আলোচনা করতাম নিজেদের মধ্যে। আমরা প্রথম দেখেছিলাম আইজেনস্টাইনের ক্ল্যাসিক ছবি ব্যাটেলশিপ পোটেমকিন’।

শান্তিনিকেতন থেকে চলে আসার তিনমাস পরে ১৯৪৩ সালের ১ এপ্রিল সত্যজিৎ চাকরি পেলেন বিজ্ঞাপন সংস্থা ডি জে কিমার-এর জুনিয়র ভিসুলাইজার আর্টিস্ট হিসেবে। বাইশ বছরের চলচ্চিত্র রসিক সত্যজিৎ তখনো চলচ্চিত্রকার হয়ে ওঠার কথা ভাবেন নি। ১৯৪৮ সালে নাগাদ সত্যজিৎ ডি জে কিমার আর্ট ডিরেক্টর হয়েছিলেন।

পথের পাঁচালীর কিশোর সংস্করণ আম-আঁটির ভেপুতে সত্যজিৎ এঁকেছিলেন

যে পথের পাঁচালী ছবি করে সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র পরিচালনার জগতে নিজের স্থান করে নেন, সেই পথের পাঁচালী’র কাহিনিটা একটু নাটকীয়ভাবে তাঁর জীবনে আসে। সত্যজিৎ যে কোম্পানিতে চাকরি করতেন, সেই কোম্পানি থেকে বাংলা সাহিত্যের সব সুন্দর বইগুলো একেবারে সাধারণ পাঠক বা কিশোরদের উপযোগী করে নতুন সংস্করণে ছাপা হতো। আর এই সব বইগুলোর প্রচ্ছদ থেকে ছবি আঁকার দায়িত্ব পড়তো সত্যজিৎ রায়ের উপর। একদিন কোম্পানির ডি কে গুপ্ত সত্যজিতকে ডেকে বললেন। পথের পাঁচালীর এক কিশোরপাঠ্য সংস্করণ বের হবে এবং এর ছবিগুলো তাঁকে আঁকতে হবে। সময়টা ছিল ১৯৪৫ সাল। সত্যজিৎ তখনও পথের পাঁচালী পড়েন নি। ব্যাপারটা শুনে ডি কে গুপ্ত তাঁকে স্নেহ-ধমক দিলেন এবং জানিয়ে দিলেন, এই বইয়ের কাহিনি থেকে একটি সুন্দর চলচ্চিত্র হতে পারে। সত্যজিৎ তিনশত পৃষ্ঠার মূল বই পড়ে ফেললেন। পড়ে শুধু তিনি অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘অপূর্ব’! তারপরই কাহিনিটা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল।

এর মধ্যে কয়েক বছর কেটে গেল। পথের পাঁচালী নিয়ে ছবি করার ভাবনা একেবারে উসকে গেল ১৯৪৯ সালে। বিখ্যাত ফরাসী চলচ্চিত্রকার জ্যঁ রেনোয়া সেই সময় কোলকাতায় এসেছেন তাঁর ছবি দি রিভার এর লোকেশন দেখার জন্য। সেই সময়ে রেনোয়ার কোলকাতায় আগমন ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির তরুণদের অদ্ভুতভাবে উদ্দীপ্ত করেছিল। রেনোয়া সত্যিই ছিলেন একজন ‘মেকার’। এই ‘মেকার’ শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণ অর্থেই নয় বরং চলচ্চিত্রের পরিচালক ও কলাকুশলী তৈরির অর্থেও। রেনোয়া আপন করে নিয়েছিলেন বাংলার এই চলচ্চিত্র পাগল যুবকদের। তিনি সোসাইটির খোঁজখবর রাখতেন। সোসাইটির ছেলেদের সঙ্গে বসে চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে খুঁটিনাটি আলাপ করতেন এবং উৎসাহী যুবকদের প্রত্যক্ষভাবে চলচ্চিত্র বিষয়ক জ্ঞান দেওয়ার জন্য নিজের শ্যুটিং ইউনিটে কাজের সুযোগ করে দিতেন। তবে কোলকাতার এই যুবকদের মধ্যে রেনোয়ার সবচেয়ে ভালো লেগেছিল সত্যজিৎ রায়কে। ছয় ফুটের উপরে লম্বা এই বাঙালি ছেলেটির বিশ্ব চলচ্চিত্র এমনকি তাঁর ছবি নিয়ে এত স্বচ্ছ ধারণা তাঁকে বিস্মিত করেছিল। সত্যজিৎ তখন চাকরি করেন। শুধু শনিবার তাঁর ছুটি। রেনোয়া যতদিন কোলকাতায় ছিলেন সেই দিনগুলোতে সত্যজিৎ প্রতি শনিবার রেনোয়ার কাছে আসতেন। তারপর তাঁর গাড়িতে করে বের হয়ে যেতেন নতুন শ্যুটিং লোকেশন-এর সন্ধানে। রেনোয়াও সত্যজিতের জন্য আকুলভাবে অপেক্ষা করে থাকতেন। রেনোয়াকে সত্যজিৎ প্রথম বলেছিলেন পথের পাঁচালী নিয়ে ছবি করার। রেনোয়া শুধু বলেছিলেন, ‘তোমার বাংলায় যে ঐশ্বর্য আছে, সেটাই ব্যবহার কর। নিছক হলিউডের ছবির নকল করার কথা কখনো ভাববে না। তবে পাশ্চাত্য জ্ঞান অবশ্যই গ্রহণ করবে।’ হয়তোবা গুরু রেনোয়ার কথাগুলোকে সত্যজিৎ চিরদিন সম্মান জানিয়ে এসেছেন, ফলে দেখা যায় তিনি ফর্মে আন্তর্জাতিক হলেও বিষয়ে একেবারে দেশজ। আটত্রিশ বছর পর সত্যজিতকে ফ্রান্সের সবচেয়ে সম্মানীয় বেসামরিক পুরস্কার ‘লিজিয়ন অফ দ্য অনার’ দেওয়ার জন্য স্বয়ং ফরাসী রাষ্ট্রপতি ফ্রাঁসোয়া মিতেরা ছুটে এসেছিলেন কোলকাতায়। সেই সময় এক প্রশ্নের উত্তরে সত্যজিৎ জানিয়েছিলেন, ফ্রান্সের জ্যঁ রেনোয়া তাঁর প্রিন্সিপাল মেন্টর।

১৯৪৯ সালের ৩ মার্চ মামাতো বোন বিজয়ার সঙ্গে সত্যজিতের বিয়ে হয়। ১৯৫০ সালের এপ্রিলে কোম্পানির লন্ডন শাখায় তাঁকে কাজ করার জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু সত্যজিতের ঐ মুহূর্তে লন্ডন যাবার কোনো ইচ্ছে ছিল না। কারণ তাঁর মন পড়েছিল রেনোয়ার দি রিভার শ্যুটিং-এর প্রতীক্ষায়। যাহোক অফিসের কর্তাদের প্ররোচনায় আর ইংল্যান্ডের চলচ্চিত্র কাছ থেকে দেখার স্বপ্নে ১৪ এপ্রিল বিজয়া ও সত্যজিৎ সমুদ্র পথে রওনা হলেন। জাহাজে করে কলম্বো থেকে লন্ডনে পৌঁছাতে ষোল দিন লেগেছিল। এই দিনগুলোতে তিনি পথের পাঁচালী’র চিত্রনাট্যের খসড়া করে ফেললেন। উল্লেখ্য, পথের পাঁচালী কিশোর সংস্করণকে আম আঁটির ভেপু নামকরণ করা হয়।

পথের পাঁচালীর পোস্টার ডিজাইনও সত্যজিৎ নিজেই করেন

নিঃসন্দেহে, ১৯৫৫ সালকে বাংলা চলচ্চিত্রের মাহেন্দ্রক্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়। আর এটির কারণ হচ্ছে এই বছরে পথের পাঁচালী’র মুক্তিলাভ। এমন একটি ক্ষণের জন্য যে দীর্ঘ পরিশ্রম ও সাধনার প্রয়োজন—সত্যজিৎ রায় তাঁর জীবন দিয়ে সেটা দেখিয়ে গেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর পথের পাঁচালী নিয়ে তো চিন্তাভাবনা ছিল, তবে ১৯৫১ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত চলচ্চিত্র উৎসব বলতে গেলে তাঁকে ঠেলে দিল পথের পাঁচালী নির্মাণের জন্য। সেই উৎসবে আসা ছবিগুলো মধ্যে অন্যতম ডি সিকার বাইসিক্ল থিফ, মিরাকল ইন মিলান, রোসিলিনির ওপেন সিটি, টাটির জুর দ্য ফেত এবং আকিরা কুরোসাওয়ার রশোমন। সত্যজিতের মতে, তাঁর উপরে রশোমন এর প্রভাব ছিল ‘ইলেকট্রিক’। পরপর তিনদিন তিনি রশোমন দেখেছেন। তিনি বলেছেন ‘কী তীব্র আবেদনে যে এ ছবি আলোড়িত, স্বচক্ষে না দেখলে তা আন্দাজ করা যায় না।’ এই উৎসবের যে ফল সত্যজিতের উপর পড়ল তা হচ্ছে, তাঁর মনে আর কোনো সংশয় রইল না যে তিনি ছবি করবেন। আর পথের পাঁচালীই হবে তাঁর প্রথম ছবি।

১৯৫২ এর ডিসেম্বর মাসে বিভূতিভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিবারকে জানানো হয়েছিল যে, সত্যজিৎ পথের পাঁচালী নিয়ে ছবি করতে আগ্রহী। সত্যজিৎ রায়ের খুব ইচ্ছে ছিল, বিভুতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর উপন্যাস নিয়ে কথা বলা এবং তাঁর পরিকল্পনার কথা জানানো। কিন্তু ১৯৫০ সালের পহেলা নভেম্বরে বিভূতিভূষণের আকস্মিক মৃত্যু হলে সত্যজিতের আশা পূরণ সম্ভব হয়নি। এই মৃত্যুতে সত্যজিৎ খুবই বেশি ম্রিয়মান হয়ে পড়েছিলেন। সেই সময়ে পথের পাঁচালী’র চিত্রস্বত্ত্বের জন্য অনেকেই বিভূতিভূষণের বিধবা স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং মোটা অংকের টাকা দেওয়ার প্রস্তাবও দেন। কিন্তু রমা দেবী টাকার প্রলোভনে না পড়ে সত্যজিতকেই ছবিটি করার অনুমতি দেন। এর পেছনে অবশ্য কাজ করেছিল, আম আঁটির ভেঁপু বইয়ে করা সত্যজিতের চমৎকার সব ইলাস্ট্রেশন আর সত্যজিতের পরিবার। কারণ রমা দেবী নিজে ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর আর সুকুমার রায়ের অত্যন্ত অনুরাগী। রমা দেবী শুধু সত্যজিৎ রায়কে বলেছিলেন, শুধু শ্যুটিং এর অর্থ জোগাড় করতে, চিত্রস্বত্ত্বের অর্থ নিয়ে না ভাবতে। তবে সেই সময় বেশ কয়েকজন পরিচিত চলচ্চিত্র পরিচালক রমা দেবীর কাছে এমন অনুযোগ করেছিলেন যে, সত্যজিতের মত কম বয়স্ক ও চলচ্চিত্র পরিচালনায় অনভিজ্ঞ একজনের হাতে এত সুন্দর একটা কাহিনি দিয়ে যে ছবিটি তৈরি হবে, সেখানে অবশ্যই উপন্যাসের মৃত্যু ঘটবে।

পথের পাঁচালী’র চিত্রনাট্যের ঝামেলা শেষ হবার পর সত্যজিতকে পড়তে হলো প্রযোজক জোগাড়ের সমস্যায়। নতুন এক পরিচালককে বিশ্বাস করে কেউ অর্থলগ্নি করতে চাইলো না। তার উপর এই ছবিতে কোন নামিদামি অভিনেতা অভিনেত্রী নেই যাদের দেখে দর্শকরা প্রেক্ষাগৃহে ছুটে আসবে। পথের পাঁচালী’র বাজেট ছিল সত্তর হাজার টাকা। এই টাকার জন্য বা প্রযোজক জোগাড় করে দেবার জন্য সত্যজিৎ এবং তাঁর বন্ধুরা প্রথমে গেলেন সেই সময়ের কোলকাতার একমাত্র শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত রঙ্গমঞ্চের মালিক শিশির মল্লিকের কাছে। তিনি চিত্রনাট্যের বিন্যাস শুনে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। তখনই তিনি রানা এন্ড দত্তকে পথের পাঁচালীর জন্য জোর সুপারিশ করেন। রানা বাবু প্রথম কিস্তিতে চল্লিশ হাজার টাকা দিতে রাজি হন। তবে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন, যে ছবিতে স্টার নেই, গান নেই এবং মারপিঠ নেই, সেই ছবিতে এত অর্থ খরচ হবে কি করে? তবে প্রযোজকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানো সত্যজিতের ভালো লাগছিল না। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তিনি আসলেই ছবি তুলতে পারেন কি না, এটা বুঝানোর জন্যই কিছু দৃশ্যের শ্যুটিং করে প্রযোজকদের দেখাবেন। আর এ কাজের জন্য অন্তত দশ হাজার টাকা সংগ্রহের জন্য তিনি তাঁর ইন্সিওরেন্স থেকে প্রায় সাত হাজার টাকা এবং বাকি টাকা বন্ধুদের কাছ থেকে ধার নেন। পথের পাঁচালীতে যে নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের কথা রয়েছে, বিভুতিভূষণের প্রিয় গোপাল নগর গ্রামে গিয়ে সত্যজিতের মনে হয়েছিল, ছবির মূল শ্যুটিংটা ওখানেই করবেন।

মূল শ্যুটিং এর টাকা প্রথম প্রথম রানা বাবু দিতে থাকেন, কিন্তু পরবর্তীতে হঠাৎ করে তিনি অর্থের যোগান বন্ধ করে দেন। মহাঝামেলায় পড়ে শ্যুটিং ইউনিটের পুরো দল। এই ঝামেলা থেকে সাময়িক উদ্ধারের জন্য বিজয়া রায় তাঁর সমস্ত গয়না দিয়েছিলেন, সেগুলো বন্ধক রেখে কয়েকটি দিন শ্যুটিং চলেছিল। পথের পাঁচালী শেষ করার জন্য সত্যজিতকে তাঁর বহুদিনের বহু কষ্টে সংগৃহীত বড় আদরের বিদেশি প্রকাশনের বৃহদাকার বই, অ্যালবাম এবং বিদেশি ধ্রুপদী সংগীতের রেকর্ডগুলো বিক্রি করে দিতে হয়। পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ছবিটি শেষ করার জন্য এগিয়ে আসে। উল্লেখ্য, তখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ডা. বিধানচন্দ্র রায়। ডা. রায়ের সিদ্ধান্তে ছবির পুরো সত্তর হাজার টাকা সত্যজিতকে দেওয়া হয়। যদিও সেই সময়ের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের চলচ্চিত্র বিষয়ক কর্মকর্তা সত্যজিৎ রায়কে এই অর্থ প্রদান সম্পূর্ণই জলে গেল বলে মন্তব্য করেছিলেন। অথচ শুধু ১৯৬১ সালে পথের পাঁচালীর মার্কিন ডিস্ট্রিবিউটর এডওয়ার্ড হ্যারিসন কোম্পানি পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে ৫০,০০০ ডলার রয়্যালটি দিয়েছেন; সরকারের অবশ্য আরো প্রাপ্য বাকি ছিল। চুক্তির শর্তে কোন উল্লেখ না থাকার ফলে সত্যজিৎ পথের পাঁচালী ছবি থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা এই বিশাল অংকের অর্থের কোনো অংশ পাননি। অর্থ পাওয়া সম্পর্কে তাকে প্রশ্ন করায়, তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘নট আ পেনি। দে গেট দ্য মানি বাট আই গট দ্য ফেম।’

১৯৫৫ সালের ১৯ আগস্ট পথের পাঁচালী মুক্তি পায়। ছবিটি শুরু থেকে প্রচুর দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিল। যে পশ্চিমবঙ্গ সরকার পথের পাঁচালীর জন্য সত্তর হাজার টাকা দিতে গিয়ে বলেছিল, টাকাটা পুরোটায় জলে যাচ্ছে, সেই সরকারের কোষাগারে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় এক লক্ষ সত্তর হাজার টাকা জমা হয়। পথের পাঁচালীকে ভারতের সবচেয়ে বেশি ব্যবসা সফল ছবি বললে সম্ভবত ভুল হবে না। কারণ এটাই একমাত্র ছবি যেটা সেই সুদূর ১৯৫৫ সাল থেকে এখনো ব্যবসা করে যাচ্ছে, যার জন্য বিনিয়োগ ছিল মাত্র সত্তর হাজার টাকা।

১৯৫৫ সালেই ভারতীয় ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্ররূপে পথের পাঁচালী নির্বাচিত হয় এবং সেরা পরিচালকের সম্মান পান সত্যজিৎ রায়। কিন্তু পুরস্কারটি ঘোষিত হয় ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। পথের পাঁচালী কোলকাতায় ২৬ আগস্ট মুক্তি পাওয়ার পূর্বে প্রথম প্রদর্শিত হয় নিউইয়র্কে। ১৯৫৫ সালের ৩ মে। বিদেশ থেকেই এর জন্য প্রথম পুরস্কার আসে। ১৯৫৬ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি ‘বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট’ হিসেবে স্পেশাল জুরি পুরস্কার পায়।

পথের পাঁচালী একটা প্রবল ভূমিকম্পের মত ভারতীয় চলচ্চিত্রের গৃহীত কাঠামোকে চূর্ণ করলো। পথের পাঁচালী যে নব বাস্তববোধ দর্শক ও সমালোচকদের হতবাক করেছিল, তার উপাদানে সত্যজিৎ রায়ের ডিটেলের বিশেষ অবদান রয়েছে।

নিশ্চিন্দিপুরের গরিব পুরোহিত হরিহরের পরিবারের কাহিনি যেমন গ্রামবাংলার অসংখ্য মানুষের কাহিনি। হরিহরের স্ত্রী সর্বজায়া, কন্যা দুর্গা, পুত্র অপু এবং দুঃসম্পর্কের ইন্দির ঠাকুরণকে নিয়ে আবর্তিত কাহিনির মাঝেমধ্যে যে ডিটেল সত্যজিৎ রায় ব্যবহার করেছেন তা সত্যিই ভারতীয় ছবিতে পূর্বে কখনো দেখা যায়নি। শাপলা পাতার ওপর ফড়িঙের খেয়ালী নৃত্য, জল-পতঙ্গের ছন্দোবদ্ধ গতি, আকাশ ভাঙা বৃষ্টি কিংবা বর্ষণক্ষান্ত রাত্রির শেষে ভাঙা রান্নাঘরে চিৎ হয়ে থাকা মরা ব্যাঙ—পূর্বে কখনো এত সূক্ষ্মভাবে ভারতীয় দর্শকরা দেখেনি। এ ছবিতে ছোট্ট দুর্গার চুরি করা পেয়ারা নিয়ে ইন্দির ঠাকুরণের সেই খুশি হয়ে ওঠার মধ্যে সারা গ্রাম বাংলার অতীত যেন তার সরলতা, দারিদ্র্য এবং সহজ সুখ নিয়ে ধরা পড়ে। অথবা দুর্গার মৃত্যুর কয়েকদিন পরে বিষণ্ন অপু স্নানের পর ভিজে চুল নিজেই আঁচড়ায়। এ কাজটা দিদির অভাবে সে প্রথম করে। এরপর গায়ে চাদর জড়িয়ে সে বাইরে বেরিয়ে যায়। কিন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিরে আসে এবং ছাতাটা সঙ্গে নিয়ে যায়। মনে হয়েছে, একটি সহায় সম্বলহীন অতি দরিদ্র পরিবারে মাত্র কয়েকদিন পূর্বেকার একটি মৃত্যু তাকে যেন প্রাপ্তবয়স্ক করে তোলে এবং সহসা একটা স্বনির্ভরতা এবং দায়িত্ববোধ ছোট্ট অপুর মধ্যে সচেতন হয়ে ওঠে। এমন অসংখ্য ডিটেলস্ এ পথের পাঁচালী একটি অনন্য সুন্দর চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছে এবং এই নতুন ছবির স্বাদ শুধু ভারতীয় দর্শকরা গ্রহণ করেনি বরং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সৎ-চলচ্চিত্রের সব দর্শক তা গ্রহণ করেছে।

পথের পাঁচালী পর সত্যজিৎ রায় ‘অপরাজিত’ করার সিদ্ধান্ত নেন। পথের পাঁচালীর নিশ্চিন্দিপুর থেকে মা বাবার সঙ্গে অপুর কাশিতে যাওয়া এবং কলেজে যাবার কাহিনি— এই ছবিতে উঠে এসেছে। ইতোমধ্যে চলচ্চিত্রের মধ্যে ভালোভাবে ঢুকে যাবার জন্য সত্যজিৎ রায় ডি কে কিমারের চাকরি ছেড়ে দেন। পথের পাঁচালী তৈরির সময় প্রযোজক নিয়ে যে ভোগান্তি পোহাতে হয় অপরাজিততে সম্পূর্ণ উল্টোটা ঘটে। প্রযোজকরা এক প্রকার লাইন দিয়ে থাকে সত্যজিৎ রায়কে দিয়ে ছবি বানানোর জন্য। শেষ পর্যন্ত চারু প্রকাশ ঘোষ, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় এবং বিএন বন্দ্যোপাধ্যায় তিনজন মিলে এ ছবির প্রযোজনা করেন। পথে পাঁচালী’র পরিবেশক অরোরা ফিল্ম কর্পোরেশনও এবার পরিবেশকের দায়িত্ব নেয়। সেই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডিরেক্টর অজিত বসুর প্রস্তাব অনুযায়ী এক লাখ টাকার মূলধন নিয়ে একটি প্রযোজক সংস্থা করার প্রস্তাব হয়। এর পঞ্চাশ ভাগ মালিকানা থাকবে সত্যজিৎ রায়ের আর পঞ্চাশ ভাগ চারু প্রকাশ ঘোষ প্রমুখের। মূলধনের পঞ্চাশ হাজার টাকা অরোরা সত্যজিৎ রায়কে বার্ষিক এক টাকা সুদে ধার দেয়। অন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা চারু বাবুরা দেয়। সিদ্ধান্ত হয় প্রিন্ট ও পাবলিসিটি বাবদ সব খরচ অরোরা পরিবেশক বহন করবে। সত্যজিৎ রায় নতুন এই সংস্থার নাম দেন এপিক ফিল্মস। মূলত পথের পাঁচালীর অভূতপূর্ব সাফল্যের পর সত্যজিৎ রায়কে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

অপরাজিত ছবির বাজেট ঠিক হয়েছিল এক লক্ষ ছয় হাজার টাকা। সিদ্ধান্ত হয় চিত্রনাট্য রচনা ও চিত্র পরিচালনার জন্য সত্যজিৎ রায় অর্থ পাবেন যেটা তিনি ‘পথের পাঁচালী‘ করার সময় পাননি। কাহিনির চিত্রস্বত্ব কিনে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী রমা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অগ্রিম টাকা দেওয়া হয়। তিনি শুধু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন। ‘আমার স্বামী দেখে যেতে পারলেন না তাঁর উপন্যাস থেকে কী সুন্দর ছবি হতে পারে।’

জওহরলাল নেহেরু সঙ্গে সত্যজিৎ রায় ও রবিশঙ্কর

‘অপরাজিত‘ ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পূর্বে চলচ্চিত্র জগৎ ও দর্শক মহলে হৈ চৈ পড়ে গিয়েছিল। ১৯৫৬ সালের অক্টোবরে অমৃত বাজার পত্রিকার এক সংবাদে প্রকাশ হয়, ‘এ স্পেশাল শোয়িং অফ দ্য ফিল্ম উইল বি হেল্ড অ্যাট রাষ্ট্রপতি ভবন, নিউ দিল্লি, অন দ্য টেন্থ ইনস্টেন্ট। প্রাইম মিনিস্টার নেহেরু এন্ড শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধি আর লাইকলি টু গ্রেস অকেশন বাই দেয়ার প্রেজেন্স।…’ সেই সুবাদে পরের দিন সকালে সত্যজিৎ রায় এবং এপিক ফিল্মসের অমিয় মুখার্জি দিল্লি যান।

সেই বছরই ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘অপরাজিত‘ পাঠান হয়। কুরোসাওয়া, ভিসকান্তি, জিনেমান, নিকোলাস রে আর আঁদ্রে কায়াতের মতো পরিচালকদের ছবির সঙ্গে অপরাজিতও প্রদর্শিত হয়। বিষয়টি সত্যজিৎ রায়ের জন্য খুবই উত্তেজনার একটি বিষয় ছিল। উৎসবের সেরা ছবি বাছাইয়ে তাঁর ছবি প্রতিযোগিতা করবে কুরোসাওয়া বা ভিসকান্তির মতো পরিচালকদের ছবির সঙ্গে। ভেনিস উৎসবে উপস্থিত দর্শক সমালোচক এবং জুরীর সদস্যরা সত্যজিৎ রায়ের ছবিটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। ‘অপরাজিত‘ ছবিটি এই ফেস্টিভ্যাল হিস্ট্রিতে প্রথম বারের মতো একই ছবি গ্র্যান্ড প্রাইজ আর ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ড পায়।

বলা যেতে পারে, সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালী‘ এবং দ্বিতীয় ছবি ‘অপরাজিত‘ তাঁর জীবনের দুই বড় মাইলস্টোন। এই ছবি দুটি নির্মাণ করতে গিয়ে সত্যজিৎ একই সঙ্গে সংগ্রাম, ব্যর্থতা, ধৈর্য-হতাশা, নিষ্ঠা, সাফল্য জনপ্রিয়তা ও আক্রমণের স্বাদ পেয়েছেন।

‘অপরাজিত’র শ্যুটিং এর সময় কাশীর ঘাটে দুর্ঘটনার জন্য তিন মাসের জন্য সত্যজিৎ রায়কে শয্যাশায়ী থাকতে হয়েছিল। তখনই তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জলসাঘর‘ গল্পটির সঙ্গে তাঁর নতুন করে পরিচয় হয়। সত্যজিৎ বরাবর উনিশ শতকের বাংলার সামাজিক ইতিহাসে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। ‘জলসাঘর‘ হচ্ছে তাঁর প্রথম ছবি সেখানে সেই উনিশ শতকের সংস্কৃতি আর স্বভাবের সমন্বয় দেখা যায়—যার শেষ পর্ব রয়েছে রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ণে। ‘জলসাঘর‘ সত্যজিতের নিজস্ব স্বভাবধর্ম প্রতিচিত্রণের আদি চলচ্চিত্র।

মুর্শিদাবাদের নিমতিতার জমিদার রায় চৌধুরীদের ভগ্ন প্রায় প্রাসাদোপম অট্টালিকাতে হয় লোকেশন শ্যুটিং। পরে সত্যজিৎ রায় জানতে পারেন এই বংশের উপেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী হলেন গল্পের বিশ্বম্ভর রায়ের চরিত্র চিত্রণের প্রেরণা।

ছবি বিশ্বাস ও ওস্তাদ বিলায়েত খাঁ

জমিদার বিশ্বম্ভর রায়ের ভূমিকায় নির্বাচিত হয়েছিলেন ছবি বিশ্বাস। সত্যজিতের কথায় ‘ছবি বাবুর মত অভিনেতা না থাকলে ‘জলসাঘর‘ এর মতো কাহিনীর চিত্ররূপ দেওয়া সম্ভব হত কিনা জানি না।’ ছবির শ্যুটিং চলাকালীন ছবি বিশ্বাস অভিনীত তপন সিনহার ছবি ‘কাবুলিওয়ালা‘ বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে মনোনয়ন পায়। ফলে ছবি বিশ্বাস বার্লিন যাওয়ায় তাঁর অনুপস্থিতে ছবি শ্যুটিং কিছুদিনের জন্য বন্ধ থাকে। সেই মুহূর্তে সত্যজিৎ একেবারে হাত পা গুঁটিয়ে বসে থাকতে চাইছিলেন না, ফলে তিনি রাজশেখর বসুর কমেডি, ফ্যান্টাসি, স্যাটায়ার, ফার্স আর প্যাথসের এক ধরনের সমন্বয়ে তৈরি গল্প ‘পরশ পাথর‘ নিয়ে নতুন ছবিতে হাত দিলেন। গল্পের সময়টা ছিল ১৯৪৮ সালের কোলকাতা। একটি পরশ পাথর একজন কেরানীর ব্যক্তি জীবন ও সমাজ জীবনে কী প্রভাব ফেলে এরই চমৎকার কৌতুকধর্মী উপস্থাপনা আছে এই ছবিটিতে। মূল চরিত্রে তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয় অনন্য। ‘জলসাঘর‘ এর আগেই ‘পরশ পাথর‘ মুক্তি পায়। প্রথমটি ১৯৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে, পরেরটি অক্টোবরে। ‘জলসাঘর’ চলচ্চত্রিরে সংগীত পরিচালক বিশ্বখ্যাত সেতার বাদক ওস্তাদ বিলায়তে খাঁ। এরই মধ্যে ১৯৫৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের সাধারণতন্ত্র দিবসে সত্যজিৎ রায়কে ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে সম্মানিত করা হয়। ভাবতেই অবাক লাগে যে সত্যজিতকে তিন চার বছর আগে তাঁর প্রথম ছবি বানানোর জন্য কী বিশাল সব বাধা পেরুতে হয়েছে, সেই সত্যজিৎ একেবারে রাষ্ট্রের সম্মানিত সম্মানে ভূষিত হলেন।

‘অপরাজিত‘র দ্বিতীয় পর্ব ছবি করার সময় সত্যজিৎ তার নাম দিলেন ‘অপুর সংসার‘। আগের দুটো ছবি, ‘পরশ পাথর’ এবং ‘জলসাঘর’-এ সত্যজিৎ পরিচিত আর পেশাদার অভিনেতাদের দিয়ে অভিনয় করিয়েছিলেন। সেখানে প্রথম কাহিনি নির্বাচনের প্রধানতম উদ্দেশ্য ছিল তুলসী চক্রবর্তীকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করা। সত্যজিৎ এ ব্যাপারে বলেছিলেন, ‘আই ওয়ান্টেড টু মেক এ ফিল্ম উইথ তুলসী চক্রবর্তী, ভীষণভাবে নেগলেক্টেড ছিলেন‘। দ্বিতীয় ছবি প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘ন্যাচারলি এক ধরনের থিয়াট্রিক্যাল প্রফেশনাল অভিনয়ে ছবি বিশ্বাস খুব পাকা ও দক্ষ ছিলেন। আমার মনে হয়েছিল, ‘জলসাঘর’-এ বিশ্বম্ভর রায়ের যে চরিত্র, তাতে হয়ত খাইয়ে যাবে।’

অপুর সংসারে সৌমিত্র

‘অপুর সংসার’ করার সময় সত্যজিৎ ঠিক করেছিলেন প্রধানত নতুন মুখ নিবেন। তাঁর ফিল্ম ইউনিটের এক কর্মী নিয়ে এসেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে। সৌমিত্র তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ ক্লাসের ছাত্র। মঞ্চে কাজ করেন আর আকাশ বাণীর কলকাতায় ঘোষকের কাজ করছেন। অপর্ণার ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য অভিনেত্রীর খোঁজে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। অনেক আবেদন আসার পরও কাউকে সত্যজিতের চরিত্রটার সঙ্গে যোগ্য মনে হয়নি। তবে খোঁজ পাওয়া গেল চিলড্রেনস লিটল থিয়েটারে এক বালিকাকে নৃত্যাভিনয়ে দেখা গেছে; তার সঙ্গে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির সম্পর্ক আছে। তাঁর ছোট বোন ঐন্দ্রিলা বা টিংকু ঠাকুর তপন সিংহ-র ‘কাবুলিওয়ালা’ ছবিতে অভিনয় করেছেন। মেয়েটির বাবা গীতীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মা ইরা ঠাকুর সত্যজিতের পরিচিত। সত্যজিতের লেক অ্যাভিনিউর বাড়িতে ঠাকুর দম্পতি তাঁদের কন্যা শর্মিলাকে নিয়ে এসেছিলেন। সেদিন তাঁর পরনে ছিল হলুদ রঙের ফ্রক আর মাথায় বব-ছাঁট চুল। বিজয়া রায় মেয়েটাকে শাড়ি পরিয়ে গ্রামীণ অপর্ণার সাজে সাজাতেই শর্মিলা হয়ে গেল আদ্যন্ত অপর্ণা। ‘অপুর সংসার‘-এর শ্যুটিং শুরু হলো ১৯৫৮ সালের ৯ আগস্ট।

১৯৫৯ এর ১ মে ‘অপুর সংসার’ মুক্তি পেল। ১৯৫৯ সালের শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে এটি রাষ্ট্রপতি স্বর্ণপদক পেল। তাছাড়া বছরের সবচেয়ে মৌলিক চলচ্চিত্র হিসেবে ছবিটি ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ‘সাদারল্যান্ড’ ট্রফি পায়। ছবিটি বক্স অফিসের বিরাট সাফল্য পেয়েছিল।

১৯৫৯-এ প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্প ‘দেবী‘ অবলম্বনে চলচ্চিত্র করার সিদ্ধান্ত নেন সত্যজিৎ রায়। হিন্দু সমাজে প্রচলিত কিছু কুসংস্কারকে কুঠারাঘাত করেছেন তিনি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। সম্ভবত তিনি যেহেতু কুসংস্কারে একেবারে বিশ্বাসী ছিলেন না সে জন্য হিন্দু সমাজে প্রচলিত কিছু কুসংস্কার সর্ম্পকে মানুষের চেতনা খুলে দেওয়ার জন্যই তিনি এই ছবিটি তৈরি করতে চেয়েছিলেন। জীবন বিমুখ ভক্তিতত্ত্বের দ্বারা আচ্ছন্ন মন যে কী নিদারুণ ট্র্যাজেডির কারণ হতে পারে সেই কথাটাই মূলত এই কাহিনিতে বলার চেষ্টা করা হয়েছে। ‘দেবী’র লেখক প্রভাত কুমার তাঁর কাহিনির পটভূমিরূপে গ্রহণ করেছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের বাংলাদেশ। সে বাংলাদেশে একদিকে যেমন ছিল প্রাচীন ধর্মীয় গোঁড়ামির অজ্ঞতা, তেমনি অন্যদিকে ছিল ইংরেজি শিক্ষার প্রভাবে নবোন্নীলিত, সংস্কারমুক্ত নব্য যুব সম্প্রদায়। ‘দেবী’ সেই যুগেরই একটি জমিদার গৃহের কাহিনি। যেখানে এই দুই বিপরীতমুখী ধারার সংঘাতে ট্র্যাজেডির উদ্ভব হয়। ১৯৬০ সালে ‘দেবী’ শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক পায়।

রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবর্ষ পালনের জন্য ভারত সরকারের উদ্যোগে এক কমিটি তৈরি হলো ১৯৫৮ সালে। সেই কমিটি থেকে সত্যজিতকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের ভার দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল রবীন্দ্র শতবর্ষ পালনের মূল অনুষ্ঠানে ছবিটি দেখানো হবে। তবে কমিটির বেশ কয়েকজন সদস্য সত্যজিতকে দিয়ে রবীন্দ্রনাথের জীবনের ওপর তথ্যচিত্রের বিরোধিতা করেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, সত্যজিৎ রায় একজন মূলত চলচ্চিত্রকার, তিনি ইতিহাসবিদ নয়। ফলে তাঁর দ্বারা এমন একটা কাজ যথার্থভাবে করা সম্ভব নয়। শতবার্ষিক কমিটির সভায় চেয়ারম্যান ছিলেন তদানিন্তন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের ঐতিহাসিকের দরকার নেই, আমাদের দরকার একজন শিল্পীর।’ নেহেরু আরো বলেছিলেন, ‘সত্যজিৎ রায় সেই মানুষ, কোন ইতিহাসবেত্তার তাঁর কাজে হস্তক্ষেপ করার দরকার হবে না।’ বড় বেশি ভালোবাসতেন জওহরলাল নেহেরু সত্যজিৎ রায়কে।

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর যে শোকযাত্রা বেরিয়েছিল তা দিয়েই তথ্য চিত্রের শুরু। তারপর ধীরে ধীরে কবির বংশ, পরিবার, বাল্যকাল, যৌবন, বার্ধক্যে তাঁর বিচিত্র প্রতিভার তথ্যাদি উপস্থাপিত হয়। রবীন্দ্রনাথ তথ্যচিত্রে সংগীত, দৃশ্য, ভাষা ছাড়াও তার আকর্ষণীয় দিক হল, রবীন্দ্রনাথের চিত্রাংকন; পাণ্ডুলিপির কাটাকুটি থেকে শিল্পী হিসেবে উত্তরণ এবং শেষ দৃশ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে সভ্যতার সংকট ভাষণটির স্থাপনা।

৫৪ মিনিটের এই তথ্যচিত্রের দৈর্ঘ্য নিয়ে ভারত সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সমস্যায় পড়েছিল। ঠিক হয়, এই রাজ্যে সত্যজিতের কণ্ঠে ভাষ্যসহ পূর্ণাঙ্গ ছবিটি দেখানো হবে; অন্যত্র ২০ মিনিটের সম্পাদিত তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হবে। ১৯৬১ সালে ৫ মে দিল্লিতে ছবির মুক্তির সময়ে সত্যজিৎ বলেছিলেন, ‘আই ডিড অ্যাজ সাচ ওয়ার্ক অন ইট অ্যাজ অন থ্রি ফিচার ফিল্মস। মাই অ্যাপ্রোচ টু দ্য বায়োগ্রাফি ওয়াজ টু স্ট্রেস টেগোর অ্যাজ এ হিউম্যান বিইং এন্ড পেট্রিয়ট।’ রবীন্দ্রনাথ তথ্যচিত্রটি এ দেশে এবং বিদেশে যথেষ্ট সমাদর পেয়েছিল। মুক্তির পর ছবিটি দিল্লিতে সরকার এবং বিদেশি মিশনের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গের জন্য প্রদর্শিত হয়। সেই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নেহেরু সত্যজিতকে একটি রৌপ্য ফলক উপহার দেন। ছয় রিল এবং ৪৮৪৪ ফুটের তথ্যচিত্র এমনই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, ছবিটি শেষ হবার পরও নেহেরু এবং ড. রাধাকৃষ্ণন বেশ কিছুক্ষণ নীরবে বসেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ তথ্যচিত্রের শুরুর এক বছর আগে সত্যজিৎ ১৯৬০-এর আগস্টে ‘তিনকন্যা’র শ্যুটিং শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তিনটি ছোটগল্প; মনিহারা, পোস্টমাস্টার এবং সমাপ্তি নিয়ে এই ছবিটি তৈরি হয়।

পোস্টমাস্টার গল্পটির শ্যুটিং আগে শেষ হয়। এখানে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন অনিল চট্টোপাধ্যায় এবং রতনের চরিত্রে চন্দনা বন্দ্যোপাধ্যায়, এক নৃত্য শিক্ষার স্কুল থেকে তাকে নির্বাচন করা হয়েছিল। তার অভিনয় এত বেশি সুন্দর ও প্রাণবন্ত ছিল যে, অনিল চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিজ্ঞ অভিনেতার অভিনয়ও ম্লান হয়ে গিয়েছিল। ‘তিনকন্যা‘ ছবির স্মরণযোগ্য প্রসঙ্গ হলো যে, এই ছবিতে সত্যজিৎ রায় প্রথম সংগীত পরিচালনা করেন।

‘তিনকন্যা’ ছবির ‘পোস্টমাস্টার’ এর পর ‘সমাপ্তি’-র শ্যুটিং হয়। এখানে মূল ভূমিকায় ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং অপর্ণা দাশগুপ্ত। অপর্ণাকে নির্বাচনে সাহায্য করেছিলেন বিজয়া রায়। অপর্ণা ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটির অন্যতম প্রধান সংগঠক চিদানন্দ দাশগুপ্তের কন্যা। এই ছবিতে অপর্ণার অভিনয় সম্বন্ধে সত্যজিৎ একটু অস্বস্তির মধ্যে ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘দ্য ওনলি ট্রাবল ওয়াজ হার অ্যাকসেন্ট ইন বেঙ্গলি হুইচ ওয়াজ রাদার সোফিসটিকেটেড।’ তুবও অপর্ণার চেহারা ও অভিনয় ‘সমাপ্তি’র মৃন্ময়ীকে জনপ্রিয় করেছিল।

‘মনিহারা’য় অভিনয় করেছেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কণিকা মজুমদার। ‘মনিহারা’-র উল্লেখযোগ্য অংশ হলো এর সংগীতের ব্যবহার। সত্যজিৎ তাঁর চল্লিশ বছর বয়সের জন্মদিনের পর দিন ‘তিনকন্যা’ ইন্ডিয়া ফিল্ম ল্যাবরেটরিতে দেখালেন। ‘তিনকন্যা’ ছবিটিও প্রচুর দর্শকপ্রিয়তা পেল কিন্তু বিদেশে ছবিটি দৈর্ঘ্যের কারণে পুরো দেখানো সম্ভব হয়নি। ‘মনিহারা’-কে বাদ দিয়ে ছবিটির নাম টু ডটারস্ করে ছবিটি প্রদর্শিত হয়।

১৯৬২ সালে সত্যজিৎ রায় ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবিটি বানালেন। অনেক দিক দিয়ে ছবিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রথম সত্যজিৎ নিজের কাহিনি নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি তৈরি করলেন এবং এই প্রথম তিনি ছবিতে রঙ নিয়ে এলেন। আর এই প্রথম কাহিনির সঙ্গে সময় এবং স্থানের সাযুজ্য আনলেন। এখানে রঙের এক বিশাল ভূমিকা আছে। দুই বোন, অনিমা আর মনীষার শাড়ি, অলংকার, ঠোঁটের রঙ আর কপালের টিপ একই সঙ্গে তাদের সামাজিক অবস্থান, তাদের চরিত্র এবং জায়গা বা পরিবেশের কথাও বলে দেয়। উজ্জ্বল রঙ শুধু সেই অশ্বারোহী শিশুটির গায়ে যাকে কোনো সমস্যা বা ভাবনা আক্রমণ করেনি। শুধু তাই নয়, প্রতিটি ছোটো বা বড় চরিত্রের পোশাকেও তাদের সামাজিক পরিবেশ আর মূল্যবোধ ধরা পড়ে; সেই সঙ্গে ঘণ্টা দুয়েকের সীমানায় দার্জিলিং পাহাড়ের দৃশ্যের ঘন ঘন বদল কখনো রোদ, কখনো কুয়াশা, পাইনের সারি, উঁচু নিচু পথ, ম্যাল প্রতিটিই এই রঙিন ছবিতে কাহিনির চরিত্র হয়ে গিয়েছে। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ সম্বন্ধে আরো একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হলো, এই ছবিটা সম্পূর্ণই আউটডোরে শ্যুটিং হয়েছে। দশ রিলের ছবিটির জন্য সত্যজিৎ সময় নিয়েছেন মাত্র ছাব্বিশ দিন।

১৯৬২ সালেই সত্যজিৎকে অপ্রত্যাশিতভাবে তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে ‘অভিযান’ ছবির কাজ করতে হয়। মূলত সত্যজিতের বন্ধু বিজয় চট্টোপাধ্যায় ছবিটি তৈরির কথা ভেবেছিলেন এবং সত্যজিতকে দিয়ে তিনি ছবিটির চিত্রনাট্যও তৈরি করিয়ে নিয়েছিলেন। শ্যুটিং লোকেশন দেখার জন্য বিজয় চট্টোপাধ্যায় এবং বংশী চন্দ্রগুপ্ত সত্যজিতকে বাংলা-বিহার সীমান্তে অবস্থিত বীরভূমের দুবরাজপুরে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানকার, দৃশ্যপট বিশেষ করে মস্ত মস্ত পাথর ছড়ানো পাহাড় দেখে সত্যজিৎ অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি ঐসব দৃশ্যগুলোকে কাজে লাগাবার জন্য চিত্রনাট্যের সংশোধন করেন। ‘অভিযান’ ছবির প্রথমদিনের শ্যুটিং এ সত্যজিৎ হাজির ছিলেন। বন্ধুকে কিছু পরামর্শও দিলেন। শেষ পর্যন্ত বন্ধুদের অনুরোধে সত্যজিতকেই এই ছবির নির্দেশনার দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল। একশ পঞ্চাশ মিনিটের এই ছবিটি সত্যজিতের দীর্ঘতম সৃষ্টি। বিজয় চট্টোপাধ্যায়ের পরিকল্পনা মতোই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নরসিং চরিত্রের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। আর গুলাবি চরিত্রের জন্য সত্যজিৎ রায়ের ওয়াহিদা রহমানকে পছন্দ হয়েছিল। সেই সময় ওয়াহিদা রহমান বোম্বের নামকরা নায়িকা। একটি ছবির জন্য তিনি যে পরিমাণ পারিশ্রমিক নিতেন তাতে গোটা অভিযান ছবির কাজ হয়ে যাবে। তারপরও সত্যজিৎ রায় ওয়াহিদা রহমানকে অভিযানে অভিনয় করার জন্য পাঠালেন। ওয়াহিদা রহমানের কাছে সত্যজিতের বার্তা নিয়ে গেল বন্ধু বিজয় চট্ট্যোপাধ্যায় এবং অনিল চৌধুরী। সত্যজিতের ছবিতে অভিনয় করার জন্য ওয়াহিদা রহমান সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ‘অভিযান’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য যে পারিশ্রমিক নিয়েছিলেন তা ছিল সেই সময়কার বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ওয়াহিদার একদিনের উপার্জন। ‘অভিযান’ ছবিটি সকলকেই মুগ্ধ করেছিল এবং খুব ভালো চলেছিল।

১৯৬৪ সালের ১৮ মার্চ ঢাকায় এক চলচ্চিত্র উৎসবের শেষের দিনে ‘মহানগর’ এর প্রদর্শনী হয়। প্রবল উৎসাহে সেদিন বেশ কয়েক হাজার দর্শক টিকিটের জন্য লাইন দিয়েছিলেন; প্রচুর জনসমাগমে সেদিন এক ধরনের হাঙ্গামা শুরু হয়ে যায় এবং পুলিশকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য লাঠিচার্জ করতে হয়। ফলাফল স্বরূপ প্রায় ১৫০ জন আহত হয়। অতিরিক্ত প্রদর্শনীয় দাবিতে কর্তৃপক্ষ সেদিন সকাল দশটা থেকে পরের দিন সকাল ৪.৩০ টা পর্যন্ত এক নাগাড়ে ছবিটির ১০ বার প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়

১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়াতিতে ঢাকার পল্টন ময়দানে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আপ্লুত সত্যজিৎ বলেছিলেন, ‘কয়েক বছর আগে যখন এখানে ‘মহানগর’ ছবিটি দেখানো হয়েছিল, তাতে এখানকার জনসাধারণ কি ধরনের আগ্রহ, কৌতুহল প্রকাশ করেছিল এবং তার ফলে কী ঘটনার উদ্ভব হয়েছিল, সে খবর আমার কানে যখন পৌঁছায়। আমি সে কথা বিশ্বাস করিনি, কিন্তু তারপর এখান থেকে বহু বন্ধু আমাকে চিঠি লিখে, খবরের কাগজের খবর কেটে পাঠিয়েছিলেন।… বিস্ময়ে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি ভাবতে পারিনি যে এটা হতে পারে। একজন শিল্পীর এর চেয়ে বড় সম্মান, এর থেকে গর্বের বিষয় আর কিছুই হতে পারে না।’ ১৯৬৩-র ভারতের রাষ্ট্রীয় মানপত্র পেয়েছিল ছবিটি।

নরেন মিত্রের লেখা অবতরণিকা ও আকিঞ্চন গল্প নিয়ে ১৯৬২ সালে সত্যজিৎ শুরু করলেন ‘মহানগর’ ছবির কাজ। মাধবী মুখোপাধ্যায়কে আরতি চরিত্রের জন্য নেয়া হয়। ইতোপূর্বে মাধবী মৃণাল সেনের ‘বাইশে শ্রাবণ’ এবং ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্ণ রেখা’য় অভিনয় করেছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে উৎখাত হয়ে স্বপরিবারে মাধবী কোলকাতায় এসেছিলেন।

চারুলতার দৃশ্য

সত্যজিৎ রায় যখন ‘রবীন্দ্রনাথ’ তথ্যচিত্র নির্মাণের জন্য রবীন্দ্রনাথকে সুক্ষ্মভাবে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। তখনই তিনি ‘নষ্টনীড়’ গল্পের পাণ্ডুলিপিটা দেখেন। সেখানে পাণ্ডুলিপির মার্জিনে কবির হাতে লেখা ‘হেকেটি’ শব্দের উল্লেখ ছিল। যারা রবীন্দ্রনাথের জীবনটা একটু ভালোভাবে পড়েছেন, তারা নিশ্চয় জানেন, রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথের বন্ধুদের কাছে তাঁর স্ত্রী কাদম্বরী দেবী গ্রিক দেবী ‘হেকেটি’ নামে পরিচিত ছিল। সেই হিসেবে সত্যজিতের কাছে ‘নষ্টনীড়’ গল্পটি রবীন্দ্রনাথের আত্মজীবনীর একাংশ বলে মনে হয়েছিল। বাংলা ১৩০৮ সালে ভারতী পত্রিকা ‘নষ্টনীড়’ তিন সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৬৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ‘নষ্টনীড়’ ছবির শ্যুটিং শুরু হয়। সত্যজিৎ রায় ছবিটির নাম প্রধান চরিত্রের নামের সঙ্গে মিল রেখে রাখলেন ‘চারুলতা’।

নষ্টনীড়ের পাণ্ডুলিপি দেখে সত্যজিতের মনে হয়েছিল এই কাহিনিতে রবীন্দ্রনাথের এক গহন আত্মকথার অনুভূতি কিছুটা চিত্রিত হয়েছে। পাণ্ডুলিপিতে এক নারীর মুখের ছবি দেখে সত্যজিতের সেই ধারণা আরো বিশ্বস্ত হয়। তাঁর গভীর বিশ্বাস ছিল চারু আর কেউ নয়। তিনি হচ্ছেন কাদম্বরী দেবী নিজে আর অমল রবীন্দ্রনাথের যৌবনের প্রতিচ্ছবি। হয়তো বাংলার সমাজে চিরকালই এমন প্রচ্ছন্ন প্রণয় বহমান।

কিশোর কুমার আর সত্যজিৎ রায়

কিশোর কুমারের গলা সত্যজিৎ খুব পছন্দ করতেন। ‘চারুলতা’ ছবির রবীন্দ্র সংগীত, ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’ কিশোর কুমারকে দিয়ে গাওয়াবেন বলে ঠিক করলেন। সত্যজিৎ রায় কিশোর কুমারকে কলকাতায় আসার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। তখন তিনি এত ব্যস্ত ছিলেন যে, বশে কিছু মাস তাঁর একটি দিনও ফাঁকা ছিল না। বিব্রত কিশোর কুমার সত্যজিৎ রায়কে বিশেষভাবে অনুরোধ করলেন বোম্বেতে যাওয়ার জন্য। সত্যজিৎ রায় বোম্বেতে গিয়ে কিশোর কুমারের কণ্ঠে গানটি রেকর্ডিং করলেন। এই গানে পিয়ানো বাজিয়েছিলেন সত্যজিৎ নিজেই। দেশি-বিদেশি সুরের মিশ্রণের কথায় তিনি বলেছিলেন, ‘দ্য পসিবিলিটিজ অফ ফিউজিং ইন্ডিয়ান এন্ড ওয়েস্টার্ন মিউজিক বিগ্যান টু ইন্টারেস্ট মি ফ্রম চারুলতা অন। আই বিগ্যান টু রিয়ালাইজ দ্যাট, অ্যাট সাম পয়েন্ট, মিউজিক ইজ ওয়ান।’

১৯৬৫ সালে সত্যজিৎ রায় ‘নায়ক’ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য তৈরি করলেন। স্বভাবত উত্তম কুমার তখনই নির্বাচিত হলেন। এই ছবির জন্য উত্তম কুমারকে নির্বাচন করার খবর যখন বেরোল, তখন চারিদিকে এক শোরগোল পড়ে গিয়েছিল যে, সত্যজিৎ স্টার নিয়ে ছবি করার কথা বলে কম্প্রোমাইজ করছেন, অনেকে এমনও মন্তব্য করলেন যে, ‘সত্যজিৎ বাবু এবার পথে এসেছেন, এবার উত্তম কুমারকে নিয়ে ছবি করছেন। সত্যজিৎ রায় অবশ্য নিজেই মনে করেন, …বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে উত্তম কুমার ছাড়া আর কেউ পারেনি, পুরুষদের মধ্যে তাঁকে একমাত্র স্টার বলা যায়। উত্তম কুমারকে সত্যজিতের ভালো লাগতো তাঁর চরিত্রের সাবলীলতা, ব্যক্তিত্ব আর অভিনয়ের জন্য।

মূলত উত্তম কুমারের কথা ভেবেই সত্যজিৎ ‘নায়ক’ ছবির চিত্রনাট্য তৈরি করেছিলেন। কারণ ছবিতে এমন এক অভিনেতার কথা বলা হয়েছে যে স্টার হিসেবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে গেছেন। উত্তম কুমারের কাজে সত্যজিৎ রায় খুবই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। পরিচালক যা চেয়েছিলেন উত্তম কুমার হুবহু সেটাই করতেন এবং অধিকাংশ শট একবারে ‘ওকে’ হয়ে যেতো। শ্যুটিং এর সময় উত্তম কুমার লোকেশনে চুপচাপ বসে থাকতেন। তেমন কারো সঙ্গে কথা বলতেন না। মনে হতো ধ্যানস্থ হয়ে ভাবছেন কীভাবে সত্যজিৎ রায় যা চাইছেন একেবারে সেটাই দেওয়া যায়। সত্যজিৎ রায় বার বার বলতেন, ‘অনেকের সঙ্গে আমি কাজ করেছি, কাজ করে আনন্দও পেয়েছি। কিন্তু উত্তমের মতো কেউ নেই, উত্তমের মতো কেউ হবেও না।’ ‘নায়ক’ ছবিতে বাংলা চলচ্চিত্রের মহাপরিচালকের সঙ্গে মহানায়কের এক অদ্ভুত সমন্বয় ঘটেছিল।

নায়ক সিনেমায় উত্তম কুমার ও শর্মিলা ঠাকুর

নায়ক সম্পূর্ণরূপে উত্তম কুমার কেন্দ্রীক ছবি, তার উৎস, পরিণতি ও সাফল্যে তাঁর অবদান সত্যজিৎ রায় সব সময় কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করেছেন। উত্তম কুমার সত্যজিৎ রায়ের পরের ছবি ‘চিড়িয়াখানা’তেও অভিনয় করলেন। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিড়িয়াখানা কাহিনি অবলম্বনে এই ছবিতে উত্তম ডিটেকটিভ ব্যোমবেশ বক্সীর চরিত্রে অভিনয় করলেন। ছবিটির জন্য সত্যজিৎ রায় ১৯৬৮ সালে শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে ভারত সরকারের পুরস্কার পান।

‘চিড়িয়াখানা’র শ্যুটিং চলাকালীন সময়ে পুত্র সন্দ্বীপ পিতার কাছে আবদার করলেন ছোটদের জন্য একটি ছবি তৈরি করার জন্য। সেই সময় উত্তম কুমারের অসুস্থতার জন্য বেশ কয়েকদিন শ্যুটিং বন্ধ ছিল। সেই অবসরে সত্যজিৎ রায় পুত্রের আবদার রক্ষার্থে ছোটদের ছবির চিত্রনাট্য নিয়ে ভাবতে লাগলেন। পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়ের কাহিনি থেকেই তিনি ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ নামে একটি ছোটদের ছবির এক ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন। সেই সময় ছবির বাজেট ছিল চার লক্ষ টাকা যা রীতিমতো সবাইকে অবাক করে দিয়েছিল। রাজস্থানের দুটি বিখ্যাত কেল্লা দুই রাজার প্রাসাদ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। ইনডোরে এ ছবির জন্য বিশাল সেট দর্শকদের আশ্চর্য করে দিয়েছিল। আউটডোরের শ্যুটিংগুলো হয়েছে বীরভূম, যোধপুর, জয়সলমির, বুন্দি ও কুফরি অঞ্চলে। যদিও শিশুদের জন্য ছবিটি তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু এর মধ্যে যে অন্তর্নিহিত অর্থ রাখলেন তিনি যা আমাদের প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতি কটাক্ষ করে। অদ্ভুত আনন্দ দেওয়ার সঙ্গে চিন্তিত দর্শকদের একটু গভীরতর বাণীও দিলেন সত্যজিৎ রায়। ছবিটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ‘গোপী গাইন বাঘা বাইন’ ছবির উপস্থাপনায় মনে হয় এটির আবেদন কখনো শেষ হবার নয়।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৬৯ সালে সত্যজিৎ রায় ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র কাজ শুরু করেন। সত্যজিৎ রায়ের আধুনিক চলচ্চিত্র এটি। যার সময়কাল খুব সমসাময়িক। চার বন্ধু হঠাৎ কয়েকটি দিন একটু অন্যরকমভাবে কাটানোর জন্য শহর জীবনের নিজেদের ব্যস্ততা এড়িয়ে ছুটে যায় শান্ত প্রকৃতির কোলে। এই প্রকৃতির কোল সাধারণ সরল মানুষদের বাস। টাইটলস্-এ মাদলের ধ্বনি আর কয়্যার-এর মতো আদিবাসীদের উচ্চস্বর সংগীতে যে তীব্র আনন্দের উন্মাদনা বা পত্রবহুল শাল অরণ্যের যে প্রাণচঞ্চল প্রতিশ্রুতি তার সঙ্গে বস্তুত এই চারটি চরিত্রের কোনো যোগাযোগ ঘটে না। ফরেস্ট বাংলোতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ল্যান্ডস্কেপ পরিবর্তিত হয়। পাতাঝরা শীর্ণ বৃক্ষরাজি আর শুকনো নদীর ধু ধু বালির চড়ায় রিক্ততা প্রকাশ হয়ে পড়ে। চার বন্ধুর জীবনের উন্মাদনা, হৈ চৈ, আনন্দ এবং অপর্ণার মতো এক মেয়েকে বনের এমন নীরব পরিবেশের পাওয়ার আনন্দ দর্শকদের হয়তো ক্ষণিকের জন্য শহরের ছাঁচে ফেলা আনন্দের কাছে নিয়ে যায়, এই আনন্দের সঙ্গে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী নাচ-গানের আনন্দ আরো অপরূপ ঘন অরণ্য পরিবেশের কথা মনে করিয়ে দেয় আমাদের। কিন্তু যখন হাটে বা চায়ের দোকানে বুভুক্ষু মলিন মুখ দেখা যায় তখন বুঝতে বাকি থাকে না এরা শুধু প্রাকৃতিক ঐ সম্পদের পাহারাদার। এগুলো ভোগ করার অধিকার তাদের নেই। বাংলোর চৌকিদার পরিবারের দুর্দশা অথবা অর্থ বিনিময়ে আদিবাসী মেয়ে দুলির ওপর হরিনাথের দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন এবং দুলিকে সুন্দর নগর জীবনের মিছে স্বপ্ন দেখিয়ে নিজের পাশবিকতাকে চরিতার্থ করার মধ্য দিয়ে পরিচালক আমাদের সামনে তুলে ধরেন শহরের এই ক্লেদাক্ত মানসিকতার কাছে কীভাবে অরণ্যের সরলতা লাঞ্ছিত হয়েছে। বলা হয়, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ থেকে সত্যজিৎ চলচ্চিত্রে এক নতুন অধ্যায়ের শুরু। এমন হতে পারে এ চলচ্চিত্র তাঁর পরবর্তী চলচ্চিত্রের কথামুখ, কিংবা সমসাময়িক কাল ও মানুষ সম্পর্কে কোন ট্রিলজির প্রথম পর্ব। ছবিটি পাশ্চাত্যে যথেষ্ট প্রশংসিত হয়েছে। সত্যজিৎ নিজেই বলেছেন, ‘আমি মনে করি, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ এক যথার্থ বাংলা ছবি। আমি ভাবতেই পারিনি পশ্চিমের দর্শক এত সহজে এই ছবির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাবে। এটা একদম বাংলা ফিল্ম।’

একই বছর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আরেকটি উপন্যাসের কাহিনি নিয়ে সত্যজিৎ রায় তৈরি করলেন ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ছবিটি। তাঁর নায়ক শিক্ষিত ও বেকার সিদ্ধার্থ চৌধুরী। সত্যজিৎ রায় এমন একটি চরিত্রের প্রতি প্রবল আকর্ষণ অনুভব করলেন। ষাটের দশকের শেষে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক আন্দোলন তুঙ্গে উঠেছিল। ‘শ্রেণী শত্রু খতম’ রবে গজিয়ে উঠছে নকশাল আন্দোলন আর অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের মধ্যে কোন্দল। এমন অবস্থায় সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রবল অস্থিরতায় যুবসমাজ দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য। কোলকাতা নগরী অশান্ত। এমন বিক্ষুব্ধ এক শহরের পটভূমিতে বর্তমান কালের এক নাগরিক যুবককে নিয়ে ঘুরতে থাকে এই ছবির গল্প। পূর্বের ছবিতে সত্যজিৎ রায় উপন্যাসের গল্প থেকে অনেকটা সরে এসেছেন, সেজন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছবিটা দেখে খুশি হতে পারেননি। কিন্তু ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ছবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে সত্যিকারের সন্তুষ্ট করতে পেরেছিল।

সেটে ববিতার সঙ্গে সত্যজিৎ

১৯৭২ সালের জুলাইয়ে ‘অশনি সংকেত’ ছবির শ্যুটিং শুরু হলো শান্তিনিকেতনের কাছেই ভাঙাপাড়া গ্রামে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে অবিভক্ত বাংলায় মনন্তর যে দুর্ভিক্ষের রূপ নিয়ে দেখা গিয়েছিল, সেই চিত্র। এ ছবিতে বাংলাদেশের চিত্রনায়িকা ববিতা অভিনয় করেন। দেশ ও কালের এক সুতীব্র সংকটের মুহূর্তে অশনি সংকেত তৈরি হলো। ছিয়াত্তরের দেশজোড়া আকাল, অগ্নিমূল্য ও কালোবাজারিদের সীমাহীন খেয়াল খুশির আধিপত্য যখন সাধারণ মানুষ এক অসাধারণ ধৈর্যের পরীক্ষায় রত, তখন সত্যজিৎ রায় তাঁর চলচ্চিত্রে ততোল্লশিরে দুর্ভিক্ষের পদধ্বনির কথা শোনালেন। যে দুর্ভিক্ষের পেছনে কোনো অনাবৃষ্টি, বন্যা কিংবা কোনো অজন্মার ভূমিকা ছিল না। তবুও সেই দুর্ভিক্ষের বলি হয়েছিল এই দেশেরই পঞ্চাশ লক্ষ নরনারী। ‘অশনি সংকেত’ ছবিটি ১৯৭৩ সালের ৩ জুলাই বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়।

১৯৭৪ সালের শুরুতে সত্যজিৎ রায় সোনার কেল্লার শ্যুটিং শুরু করলেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ছবিটি প্রযোজনার জন্য এগিয়ে আসে। শিশুদের বিষয়টি মাথায় রেখে তিনি ছবিটি করেন। জাতিস্মরী বালক মুকুলকে ঘিরে গল্পটি আবর্তিত হয়েছে। এই আবর্তনের অন্যদের মতো সত্যজিতের ডিটেকটিভ হিরো প্রদোষচন্দ্র মিত্রও ঘুরে। কোলকাতা, রাজস্থান, দিল্লির লালকেল্লা, যোধপুর ও জয়সলমিরে ছবিটির শ্যুটিং হয়।

প্রেমচাঁদের অমর কাহিনি ‘শতরঞ্জ কে খেলাড়ী’ অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় তাঁর প্রথম হিন্দি ছবি তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। এই কাহিনির যে সর্ব ভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক আবেদন তাতে বাংলার চেয়ে হিন্দীতে করলে ছবিটি আরো বেশি ফলপ্রসূ হওয়ার চিন্তা থেকেই তিনি ছবিটি হিন্দিতে করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর পূর্বে শান্তিনিকেতনে থাকার সময় সত্যজিৎ প্রথম উপন্যাসটি পড়েন এবং কাহিনিটি তাঁকে এত বেশি আলোড়িত করে যে, তিনি সব সময়ই ভাবতেন সময় সুযোগ আসলেই এই ছবিতে তিনি হাত দেবেন। ১৮৫৬ সালের লখনৌর ইতিহাস ও নবাবকে নিয়ে এই কাহিনি গড়ে উঠেছে। লখনৌর নবাব শাহ ওয়াজেদ আলীর কাহিনি, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ আর ব্রিটিশদের ভারত দখল উঠে এসেছে এই চলচ্চিত্রে। ব্রিটিশদের দ্বারা অযোধ্যা দখল নিয়ে সাধারণ জনগণের অস্পষ্ট ধারণা রয়েছে। সত্যজিৎ সেই বিষয়টির দিকেই দৃষ্টি দিতে চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে, এটি তথ্যচিত্রের চরিত্রও হতে পারে। ১৯৭৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইলাস্ট্রেটেড উইকলি-র এক সমালোচনার জবাবে এই চিত্রনাট্য লেখার পূর্বে তিনি যে যে উৎস গবেষণা হিসেবে নিয়েছিলেন তার এক বিশাল তালিকা পেশ করেছিলেন। সেখানে তিনি উল্লখে করেন, ব্ল বুক অন অওধ, মিল এবং বেভারিজ এর ভারত ইতিহাস, ডালহৌসির পত্রাবলী, উটরামের দুটি জীবনীগ্রন্থ, হাওয়ার্ড রাসেলের দ্য ইন্ডিয়ান মিউটনি, তরুণ ওয়াজিদের ডায়েরি, উমরাও জান আদা, সমসাময়িক ইংরেজি ও বাংলা পত্র-পত্রিকা ইত্যাদি।

এ ছবিতে অভিনয় করলেন বোম্বের সঞ্জীব কুমার, সৈয়দ জাফরি, আমজাদ হোসেন, বিরজু মহারাজ, শাবানা আজমি প্রমুখ। সেইসঙ্গে একটি দৃশ্যের জন্য অভিনয় করেছিলেন প্রায় ত্রিশজন ব্রিটিশ, ক্যানাডিয়ান ও অস্ট্রেলিয়ান সরকারের দিল্লিস্থ দূতাবাসকর্মী। ৬১তম ক্যাভালরির সেনাবাহিনী এবং আশিটি শিক্ষিত ঘোড়া, উট আর হাতি নিয়ে ঐতিহাসিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যদল তৈরি হয়েছিল। এ ছবিতে জেনারেল উটরামের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বিখ্যাত গান্ধী চলচ্চিত্রের পরিচালক রিচার্ড এ্যাটেনবরো। এই ছবিতে সেই সময়েই খরচ হয়েছিল চল্লিশ লক্ষ টাকা।

১৯৭৮ সালের প্রথম দিকে নিজের রচিত ফেলুদা কাহিনি নিয়ে সত্যজিৎ রায় তৈরি করলেন ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’। সম্ভবত মগনলাল মেঘরাজের চরিত্র তাঁকে খুব আকর্ষণ করতো। মগনলাল মেঘরাজের ভূমিকায় উৎপল দত্তের অভিনয় ছিল অসাধারণ। ছবির শ্যুটিং হয়েছিল বেনারসে।

‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ এর দ্বিতীয় পর্বে তিনি হাত দিলেন ‘হীরক রাজার দেশে’ নামে। এ ছবিতে দু রকম সংলাপ রাখা হয়েছে। সত্যজিৎ প্রথমবারের মতো তাঁর চলচ্চিত্রে রাজা এবং তাঁর সভাসদদের কথোপকথন অন্তমিলযুক্ত পদ্যবন্ধে রেখেছেন। ‘হীরক রাজার দেশে’ রূপকের মাধ্যমে জরুরি অবস্থা এবং একনায়কতন্ত্রের প্রতিবাদ করা হয়েছে। সত্তরের মধ্যভাগে দিল্লির তুর্কমান গেটে যেমন বসতি ভাঙার ঘটনা ছিল এখানেও সেই ধরনের দৃশ্য আছে। আরো আছে শ্রমিক-কৃষক-শিক্ষক-ছাত্র সকলের মগজ ধোলাইয়ের জারিজুরির পরিকল্পনা।

জীবনের প্রথম সত্যজিৎ রায় যে ছবির চিত্রনাট্য তৈরি করেছিলেন সেটি হচ্ছে ‘ঘরে বাইরে’। ১৯৪৭ সালে। কিন্তু ছবিটি করা হয়নি। সেই ছবিটি তৈরির জন্য ১৯৮১ সালে তিনি আবার চিত্রনাট্য তৈরি করলেন। এ ছবিতে সত্যজিৎ রায় উত্তম কুমারকে দিয়ে সন্দ্বীপ এর চরিত্রে অভিনয় করাতে চেয়েছিলেন কিন্তু তিনি জানিয়েছিলেন ভিলেন বা খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করতে তিনি ইচ্ছুক নন। পরে সেই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এই ছবি চলাকালীন সময়ে সত্যজিতের হার্ট অ্যাটাক হলো। বেশ কিছুদিন তিনি কোনো কাজ করতে পারলেন না ফলে ছবিটি শেষ করতে করতে ১৯৮৪ এর মাঝামাঝি লেগে গেল।

‘ঘরে বাইরে’ ছবির পর সত্যজিৎ ১৯৮৯ সালে তৈরি করলেন হেনরিক ইবসেনের কাহিনি অবলম্বনে ‘গণশত্রু’ এবং ১৯৯০ সালে নিজের কাহিনি অবলম্বনে ‘শাখা-প্রশাখা’। পূর্ণদৈর্ঘ্যের কাহিনিচিত্র ছাড়াও সত্যজিৎ পাঁচটি তথ্যচিত্র তৈরি করেন। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপরে ‘রবীন্দ্রনাথ’ নামক তথ্যচিত্র। এটির চিত্রনাট্য, পরিচালনা ও ধারাভাষ্যে সত্যজিৎ রায় নিজেই ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে ‘সিকিম’, ১৯৭২ সালে ‘ইনার আই’, ১৯৭৬ সালে ‘বালা’ এবং ১৯৮৭ সালে ‘সুকুমার রায়’। ‘ইনার আই’ তথ্যচিত্রটি তাঁর শান্তিনিকেতনের চিত্রকলার শিক্ষক বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের শিল্পী জীবন নিয়ে। শান্তিনিকেতনের যে দুজন শিক্ষকের কথা সত্যজিৎ আমৃত্যু পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন তাদের একজন হচ্ছেন শিল্পী নন্দলাল বসু আরেকজন বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। এছাড়া তিনি দূরদর্শনের জন্য ১৯৬৪ সালে ‘টু’ কাহিনিচিত্র, ১৯৮২ সালে ‘পিকু’ এবং ‘সদগতি’ তৈরি করেন।

আগন্তুকের দৃশ্য

ইতোমধ্যে সত্যজিতের শরীরটা খারাপ হতে শুরু করেছে। তাঁর অতিথি গল্পটাকে একটু বড় করে ‘আগন্তুক’ নামে একটি ছবি করার সাধ তাঁর বহুদিনের। ১৯৯০ সালে তিনি এই ছবির শ্যুটিং শুরু করলেন। দীর্ঘদিন পর কোলকাতায় ফিরে আসে এক ব্যক্তি। তাঁর ভাগ্নির বাসায় কয়েকটি দিন কাটাতে চান। ভবঘুরে এই মামার জীবন কেটেছে পৃথিবীর সব বৈচিত্র্যময় পরিবেশে। এক সময় কোলকাতায় ছাত্র থাকা অবস্থায় বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় প্রথম হওয়া মামা কিসের এক টানে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান। তিনিই ফিরে এসেছেন। কিন্তু তাঁকে নিয়ে গড়ে উঠে সন্দেহের ঘেরাটোপ। তাঁর কথা বিশ্বাস করতে সবাই সন্দেহ পোষণ করে। তর্ক হয় ভাগ্নি জামাইয়ের বন্ধুর সঙ্গে। নগর জীবনের অবিশ্বাসে মামা কষ্ট পান। আবার ভালোভাবেই উপলব্ধি করেন দীর্ঘদিন আদিবাসীদের সরলতায় জীবন কাটিয়ে দেওয়ায় আছে পরম সুখ। তাইতো কোলকাতা ছেড়ে তিনি ক্ষণিকের জন্য আশ্রয় নেন এক আদিবাসী পল্লিতে। পরে সন্দেহ প্রবণ ভাগ্নি-জামাই এবং ভাগ্নির মামার আসলত্ব নিয়ে সন্দেহ দূর হয়, যখন মামা কোলকাতা ছেড়ে চলে যান এবং যাবার আগে ভাগ্নির নামে দিয়ে যান উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত তাঁর বিশাল অংকের অর্থ। ‘আগন্তুক’ চলচ্চিত্রে মামার চরিত্রে উৎপল দত্তের অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রের এক অনবদ্য সৃষ্টি। ছবির শ্যুটিং চলার সময় সত্যজিৎ শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। নিয়মিত চিকিৎসা চলছিল। মনে হচ্ছিল তাঁর অনেক তাড়া আছে, অনেক কাজ বাকি। অবশেষে ‘আগন্তুক’ ছবির শেষ শটটির সময় এলো। অনেকক্ষণ সত্যজিৎ ক্যামেরায় লুক থ্রু করলেন, সবকিছু ঠিকঠাক দেখে নিলেন। তারপর ‘পথের পাঁচালী’র প্রথম শট নেওয়ার সময় যেমন একটা খোশ মেজাজ ছিল তেমনই এক মেজাজে তিনি জলদ কণ্ঠে বলে উঠলেন; ‘লাইটস, ক্যামেরা, এ্যাকশন’। শটটা ওকে হবার পর বেশ হাসির মেজাজে একটা তালি মেরে বলে উঠলেন, ‘যাঃ, আমার যা কিছু ছিল সব ফুরিয়ে গেল। আর কিছু বলার নেই।’

১৯৯২ সালের ৪ মার্চ সত্যজিতকে আবার ইনটেনসিভ কেয়ারে ভর্তি করা হলো। এবার ওঁর হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের জন্য ডাক্তার ওঁকে তৈরি করছেন। তাঁর অবস্থা খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে। ডিসেম্বর মাসে হলিউড থেকে টেলিগ্রামে জানানো হয়েছে তাঁর জীবনব্যাপী কীর্তির স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি এবারে অস্কার পুরস্কারে ভূষিত হবেন। ৩০ মার্চ ১৯৯২ এ আমেরিকায় বিশ্ব চলচ্চিত্রে মহারথিদের উপস্থিতিতে তাঁকে অস্কার পুরস্কার প্রদান করা হবে। প্রাণচাঞ্চল্যে জেগে উঠলেন চলচ্চিত্রের এই নোবেল পুরস্কারটা পাওয়ার জন্য। এর মধ্যে তাঁকে বিভিন্ন মহল থেকে পুরস্কার দেওয়ার হিড়িক পড়ে গেছে। কিছুদিন পূর্বে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট স্বয়ং ফ্রাঁসোয়া মিতেরা কোলকাতায় এসে সত্যজিৎ রায়কে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘লিজিয়ন অব দ্য অনার’ এ ভূষিত করে গেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী পিভি নরসীমা রাও জরুরি ভিত্তিতে মন্ত্রীসভার মিটিং ডেকেছেন এবং সেই দিনই রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে ঘোষণা করা হয় সত্যজিৎ রায়কে ‘ভারতরত্ন’ উপাধি দেওয়া হচ্ছে। সবাই এত তাড়াহুড়ো করছে কেন? তাঁর কি যাবার সময় হয়ে গেছে!

সত্যজিৎ রায়ের অস্কার নেওয়ার জন্য আর আমেরিকায় যাওয়া হলো না। এমনকি ৩০ মার্চ পর্যন্ত অস্কার কমিটি অপেক্ষাও করল না। তারপূর্বে অস্কার পুরস্কার নিয়ে এক মার্কিন প্রতিনিধি দল কোলকাতায় এসে হাজির হলো। পনের দিন আগে নার্সিং হোমেই অসুস্থ সত্যজিতের হাতে অস্কার তুলে দেওয়া হলো। ১৯৯২-র ৬৪তম বার্ষিক একাডেমি পুরস্কারের পত্রে আট লাইনে লেখা ছিল—

ছোট শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন

‘অ্যান একাডেমি অনারারি অ্যাওয়ার্ড
ইজ প্রেজেন্টেড টু সত্যজিৎ রায়
ইন রেকগনিশন অফ হিজ রেয়ার মাস্টারি
অফ দ্য আর্ট অফ মোশান পিকচার্স,
এন্ড অব হিজ প্রোফাউন্ড হিউম্যানিট্যারিয়ান আউটলুক,
হুইচ হ্যাজ অ্যান ইনডেলিবল ইনফ্লুয়েন্স
অন ফিল্মমেকারস
এন্ড অভিয়েন্সেজ থ্র আউট দ্য ওয়ার্ল্ড।’

তাঁর উদ্দেশ্যে লেখা এই কথাগুলো পড়ে হঠাৎ তাঁর মনে পড়ে গেল দশ বছর বয়সের সেই দৃশ্যটি। যেবার মা সুপ্রভা রায়ের সঙ্গে বালক মানিক তাঁর বেগুনী অটোগ্রাফের খাতা নিয়ে গিয়েছিল শান্তিনিকেতনের উত্তরায়ণে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুররে অটোগ্রাফ নেবার আশায়। একদিন পর অদ্ভুত জড়ানো হাতের আট লাইনে লেখা কবিতাটা বালক মানিকের হাতে দেবার সময় কবিগুরু তার মাকে বলেছিলেন, ‘এটার মানে ও আরেকটু বড় হলে বুঝবে।’ অস্কার ট্রফিটা হাতে নিয়ে সব ভুলে তাঁর মন কেন যেন ছুটে যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের দিকে। তাঁর খুব যেন বলতে ইচ্ছ করছে, ‘গুরুদেব, আমি তোমার সেই আট লাইনের মানে এখন পুরোপুরিই বুঝি, গুরুদেব!’ তারপর মনের অজান্তেই আশেপাশের কারো দিকে লক্ষ্য না রেখে ডুকরিয়ে ছোট শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন।

কোলকাতার বেলভিউ নার্সিং হোমে ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল সত্যজিৎ রায় সত্তর বছর এগার মাস একুশ দিন বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.