সত্যজিৎ রায়

।। সাজ্জাদ বকুল ।।

ভারতবর্ষের চলচ্চিত্রশিল্পের ইতিহাস কমবেশি ১২০ বছরের, আর বিশ্ব চলচ্চিত্রশিল্পের ইতিহাস ১২৫ বছরের। তাই এ কথা বলাই যায় যে, বিশ্ব চলচ্চিত্র আর ভারতবর্ষের চলচ্চিত্র হাত ধরাধরি করে এগিয়ে গিয়েছে। আর ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান তথা এই উপমহাদেশের চলচ্চিত্রযাত্রার দীর্ঘ ইতিহাসে অনেক চলচ্চিত্রকার এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, জীবনঘনিষ্ঠ, চলচ্চিত্রভাষা ও শিল্পমানসমৃদ্ধ চলচ্চিত্র নির্মাণ করে দৃষ্টি কেড়েছেন দেশি-বিদেশি চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের। কিন্তু বেশিরভাগই তাঁদের চলচ্চিত্র দ্বারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনের চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন নি, সমীহ আদায় করা তো দূরের কথা। কিন্তু এঁদের মধ্যে এমন একজন আছেন যিনি তাঁর চলচ্চিত্রকর্ম দিয়ে শুধু বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণই করেন নি, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের ভারতবর্ষের ছবিকে সমীহের চোখে দেখতে বাধ্য করেছেন। তাঁর নাম আর ভারতীয় চলচ্চিত্র সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি সত্যজিৎ রায়। তাঁর চলচ্চিত্র দেশে-বিদেশে প্রচুর পুরস্কার আর সম্মান অর্জন করেছে, তিনিও সম্মানিত হয়েছেন নানাভাবে। চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্বচলচ্চিত্রের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার অস্কারেও ভূষিত হয়েছেন বাঙালি এই চলচ্চিত্রকার। এ ক্ষেত্রে তিনি ছাড়িয়ে গিয়েছেন তাঁর সমসাময়িক অন্য দুই কীর্তিমান বাঙালি চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনকেও। সরাসরি চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে আর কোনো ভারতীয় অস্কার পুরস্কার পান নি।

১৯৯২ সালে ৭১ বছর বয়সে প্রয়াণের পরেও সত্যজিৎ রায়ের সমক্ষক কেউ আসেন নি ভারতীয় চলচ্চিত্রে। তাঁর পরের প্রজন্মের চলচ্চিত্রকার বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, গৌতম ঘোষ, ঋতুপর্ণ ঘোষসহ আরো কেউ কেউ আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেলেও সত্যজিৎকে ছাড়িয়ে যেতে পারেন নি। বহু ভাষাভাষীর দেশ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের নানা ভাষার বেশ কয়েকজন গুণী চলচ্চিত্রকার, যেমন আদুর গোপালাকৃষ্ণাণ, গোবিন্দ নিহালনি, শ্যাম বেনেগাল প্রমুখ আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পেয়েছেন। কিন্তু তাঁরাও সত্যজিতের কাতারে আসতে পারেন নি।

বলা যায়, ভারতীয় চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায় একজন মহীরূহস্বরূপ। একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে আছেন তিনি। উপমহাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পে সত্যজিৎ হিমালয়ের এভারেস্ট চূড়ার মতো গগনস্পর্শী একজন ব্যক্তিত্ব। কিন্তু আজকের প্রজন্মের চলচ্চিত্রদর্শক সত্যজিৎকে কতটুকু জানেন? শুধু দর্শকদের কথাই বা বলি কেন, আজকের প্রজন্মের তরুণ-তরুণী, যারা চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্রতী হতে চান, তাদের কতজনই বা এই মহান চলচ্চিত্রদ্রষ্টা ও তাঁর সৃষ্টি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন? তাঁকে কতটুকু আত্মস্থ করেন? তাদের উদ্দেশেই আজকের এই লেখার অবতারণা করা হলো।

কিশোরগঞ্জে উপেন্দ্রকিশোর রায়ের আদিভিটা

এমন এক সময়ে সত্যজিৎকে নিয়ে এই লেখা লিখছি যখন ভারতীয় চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য এক মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত। শুধু ভারতীয় কেন, বাংলাদেশসহ সার্কভুক্ত এই অঞ্চলের চলচ্চিত্রশিল্পের জন্যই এক অবিস্মরণীয় ক্ষণ উপস্থিত। আর সেটা হলো সত্যজিৎ রায়ের জন্মের শতবর্ষ। বাবা-মা’র আদরের মানিক ১৯২১ সালের ২ মে জন্মেছিলেন বাংলার বিখ্যাত রায় পরিবারে। খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন সত্যজিতের পিতামহ। আর তাঁর ছেলে বাংলা সাহিত্যের ছড়াসম্রাট সুকুমার রায় ছিলেন সত্যজিতের বাবা। শুধু সাহিত্যরচনাই নয়, সত্যজিতের বাবা-দাদার ছিল প্রেসের ব্যবসা। মুদ্রণপদ্ধতির উন্নতিকল্পে নানা সফল গবেষণা করেছিলেন উপেন্দ্রকিশোর। ছেলে সুকুমার রায়কেও মুদ্রণ বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য বিলাত পাঠিয়েছিলেন তিনি। দু’জনই ছিলেন ভাল আঁকিয়ে, সম্পাদনা ও প্রকাশ করতেন শিশু-কিশোরদের প্রিয় পত্রিকা সন্দেশ। উপেন্দ্রকিশোরের আদিভিটা বাংলাদেশের বর্তমান কিশোরগঞ্জের মসুয়া গ্রামে। এখনো সেখানে তাঁদের বসতবাড়ির ভগ্নাবশেষ রয়েছে।

এ রকম এক পরিবারে জন্ম নেওয়া ছোট্ট মানিক একদিন বড় হয়ে দাদা-বাবাকেও ছাড়িয়ে গেলেন। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে হয়ে উঠলেন কিংবদন্তি। জন্মের মাত্র আড়াই বছরের মাথায় সত্যজিৎ হারিয়ে ফেলেন বাবা সুকুমার রায়কে। তখনকার দিনের ভয়ঙ্কর কালাজ্বর নামক রোগে ভুগে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করতে হয় অসাধারণ মেধাবী শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায়কে। এরপর মা সুপ্রভা রায় বড় করে তোলেন সত্যজিৎকে। কৈশোরে কিছু সময়ের জন্য সান্নিধ্য পেয়েছেন বাংলা সাহিত্যের দিকপাল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। সুকুমার রায় ছিলেন রবীন্দ্রনাথের তরুণ বন্ধুদের অন্যতম, অত্যন্ত স্নেহভাজন। তাঁর গড়া শান্তিনিকেতনে সুকুমারের সন্তান সত্যজিৎ ছবি আঁকার পাঠ নিয়েছেন নন্দলাল বসুর কাছ থেকে।

সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রাঙ্গনে পা রাখা ১৯৫৫ সালে, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী দিয়ে। তরুণ সত্যজিৎ তখন ব্রিটিশ বিজ্ঞাপনী সংস্থা ডি জে কিমারে আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করছেন। সেখানে কাজের সুবাদে লন্ডনে ছয় মাস থাকতে হয় তাঁকে। সে সময় সেখানে ইতালির নির্মাতা ভিত্তোরিও ডি সিকার ‘বাইসাইকেল থিফ’ ছবিটি দেখে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হন সত্যজিৎ। দেশে ফিরে নির্মাণ শুরু করেন পথের পাঁচালী। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে যে ছবি তিনি নির্মাণ করলেন তা বাঁক ঘুরিয়ে দিল বাংলা চলচ্চিত্রের। প্রথম ছবিই সাড়া ফেলে দিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, ১৯৫৬ সালে ফ্রান্সের বিখ্যাত কান চলচ্চিত্র উৎসবে পথের পাঁচালী জিতে নিল বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট পুরস্কার।

কলকাতার গড়পাড় লেনে দাদাবাড়ি স্কেচটি সত্যজিতের নিজের করা

পথের পাঁচালী নির্মাণের বছরেই ভারতের রাষ্ট্রপতির স্বর্ণ ও রৌপ্যপদকসহ অনেকগুলো পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কিছু হলো রোমের ভ্যাটিকান পুরস্কার (১৯৫৬), সানফ্রান্সিকোতে শ্রেষ্ঠ ছবি ও শ্রেষ্ঠ পরিচালক (১৯৫৭), বার্লিনে সেলজনিক গোল্ডেন লরেল পুরস্কার (১৯৫৭), কানাডার ভ্যানকুবার ও স্ট্রাটফোর্ডে শ্রেষ্ঠ ছবি (১৯৫৮), নিউইয়র্ক (১৯৫৯), লন্ডন (১৯৬০), জাপান ও ডেনমার্ক (১৯৬৬) চলচ্চিত্র উৎসবের পুরস্কার। ইতালির নিও রিয়ালিজম বা নব্য বাস্তবতাবাদ ধারায় নির্মিত এই ছবি সারা পৃথিবীর সর্বকালের সেরা ছবিগুলোর তালিকায় ঠাঁই করে নিয়েছে। এই ছবির কেন্দ্রীয় দুটি চরিত্র অপু-দুর্গা হয়ে উঠেছে নিম্নমধ্যবিত্ত বা প্রায় বিত্তহীন পরিবারের টানাপড়েনের মধ্যে বেড়ে ওঠা কিশোর-কিশোরীদের চিরায়ত প্রতিনিধি। অপুকে নিয়ে এরপর সত্যজিৎ নির্মাণ করেছেন আরো দুটি চলচ্চিত্র অপরাজিত (১৯৫৬) ও অপুর সংসার (১৯৫৯)। এই ছবি দুটিও ভেনিস, সানফ্রান্সিসকো, বার্লিন, ডেনমার্ক, লন্ডন, এডিনবার্গ, আমেরিকার ন্যাশনাল বোর্ড অব মোশন পিকচার্স এর পুরস্কার জিতেছে। পথের পাঁচালীর পর অপুর সংসারও জিতেছে ভারতের রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক। এই তিনটি ছবিকে অপুত্রয়ী (অপু ট্রিলজি) হিসেবে অভিহিত করা হয়।

সত্যজিৎ রায় তাঁর ৩৬ বছরের চলচ্চিত্রজীবনে নির্মাণ করেছেন মোট ২৮টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র। অপুত্রয়ী বাদে তাঁর অন্য ২৫টি পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি হলো: পরশপাথর (১৯৫৮), জলসাঘর (১৯৫৮), দেবী (১৯৬০), তিনকন্যা (১৯৬১), কাঞ্চনজঙ্ঘা (১৯৬২), অভিযান (১৯৬২), মহানগর (১৯৬৩), চারুলতা (১৯৬৪), কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫), নায়ক (১৯৬৬), চিড়িয়াখানা (১৯৬৭), গুপী গাইন বাঘা বাইন (১৯৬৮), অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৬৯), প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০), সীমাবদ্ধ (১৯৭১), অশনি সংকেত (১৯৭৩), সোনার কেল্লা (১৯৭৪), জনঅরণ্য (১৯৭৫), শতরঞ্জ কে খিলাড়ি (১৯৭৭), জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৯), হীরক রাজার দেশে (১৯৮০), ঘরে বাইরে (১৯৮৪), গণশত্রু (১৯৮৯), শাখা প্রশাখা (১৯৯০), আগন্তুক (১৯৯১)। এসব ছবিও বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছে।

সত্যজিৎ নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রগুলো হলো টু (১৯৬৪), পিকু (১৯৮০), সদগতি (১৯৮১)। সত্যজিৎ রায় কয়েকটি প্রামাণ্য চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছেন। এগুলো হলো: রবীন্দ্রনাথ (১৯৬১), সিকিম (১৯৭১), দ্য ইনার আই (১৯৭২), বালা (১৯৭৬), সুকুমার রায় (১৯৮৭)। এসব ছবির জন্যও সত্যজিৎ পুরস্কৃত হয়েছেন।

সত্যজিৎ রায় ভারতীয় চলচ্চিত্রে এমন একজন ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন যে তাঁকে পুরস্কৃত ও সম্মানিত করতে পেরে কর্তৃপক্ষই যেন সম্মানিত বোধ করতেন। তাঁর বহু পুরস্কার ও সম্মাননার মধ্যে এখানে সামান্য কিছু তুলে ধরা হলো। ১৯৫৮ সালেই ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মশ্রী, ১৯৬৫ সালে পদ্মভূষণ, ১৯৭৬ সালে পদ্মবিভূষণ এবং ১৯৯২ সালে ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ভারতরত্ন খেতাবে ভূষিত হন সত্যজিৎ। ১৯৮২ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসব কমিটি তাঁকে বিশ্ব চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদান রাখার জন্য হেডলেস অ্যাঞ্জেল ট্রফি প্রদান করে। ১৯৯২ সালে—জীবনের শেষ বছরে এসে সত্যজিৎ নিউইয়র্কের অ্যাকাডেমি অব মোশন পিকচার্স-এর পক্ষ থেকে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট-এর জন্য বিশেষ অস্কার পুরস্কার লাভ করেন। এ বছর তিনি জাপানের আকিরা কুরোসাওয়া পুরস্কারও লাভ করেন। ভারতের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পান ১৯৮৫ সালে। আসামের সরকার কর্তৃক শঙ্করদেব বঁটা পুরস্কার পান ১৯৮৯ সালে। ফরাসি সরকার কর্তৃক ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান লিজিয়ন অব অনার (১৯৮৭) পান সত্যজিৎ। ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরঁ কলকাতায় এসে নিজ হাতে সত্যজিতের হাতে এই পুরস্কার তুলে দেন।

অর্থনীতি নিয়ে পড়া সত্যজিৎ রায় বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছেন। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব লেটারস (১৯৭৩), লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব আর্টস কর্তৃক ডক্টরেট (১৯৭৪), বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডি লিট ডিগ্রি (১৯৭৮), একই বছর শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী কর্তৃক দেশিকোত্তম সম্মাননা, পশ্চিমবঙ্গের যাবদপুর ও বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি লিট ডিগ্রি (১৯৮০), বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডক্টরেট (১৯৮১), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি লিট ডিগ্রি (১৯৮৫), রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি লিট (১৯৮৭) ডিগ্রি পান আপাদমস্তক সৃজনশীল এই মানুষটি।

শিশুসাহিত্যিক হিসেবেও সত্যজিতের ঝুলিতে অনেক পুরস্কার জমা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কিছু হলো ১৯৬৮ সালে প্রোফেসর শঙ্কু বছরের শ্রেষ্ঠ শিশুসাহিত্য গ্রন্থ হিসেবে আকাদেমি পুরস্কার লাভ করে। এ বছর তিনি ম্যানিলার সম্মানজনক ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পান। সাহিত্যে কলকাতার সম্মানজনক আনন্দ পুরস্কার পান ১৯৭১ সালে। এ ছাড়া তিনি সাহিত্যে আরো যেসব পুরস্কার পেয়েছেন সেগুলো হলো পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদত্ত বিদ্যাসাগর পুরস্কার (১৯৮২), টিনটোরেটোর যিশু গ্রন্থের জন্য ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশনাল রিসার্চ ট্রেনিং কর্তৃক শিশুসাহিত্যের পুরস্কার (১৯৮৭), ফ্রান্সের সেরা বিদেশি গ্রন্থের জন্য বিশেষ পুরস্কার (১৯৮৯) প্রভৃতি। ১৯৩৬ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে ডয়েটল্যান্ডার ক্যামেরায় ছবি তুলে ইংল্যান্ডের বয়েজ ওন পেপার পত্রিকায় প্রথম পুরস্কার পাওয়ার মধ্য দিয়ে সত্যজিতের যে যাত্রা শুরু, বাকি জীবনে চলচ্চিত্র, সংগীত, সাহিত্যে কত পুরস্কার, সম্মাননা যে তিনি পেয়েছেন তার বর্ণনা করতে গেলে এই লেখার পরিসর বেড়ে যাবে অনেক। তাই এখানেই ক্ষান্ত দিলাম।

হীরক রাজার দেশে সিনেমার পোস্টার

জন্মশতবর্ষে এসে এটা বলতে পারি, সত্যজিৎ ছিলেন একজন নিপাট বাঙালি চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক। তাঁর চলচ্চিত্রের গল্প, চরিত্রায়ণ, ভাষা ছিল বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতির পাটাতনে স্থিত। যদিও পরের দিকে তিনি নিজে যখন তাঁর চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেছেন তখন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন চমৎকার মুনশিয়ানার সঙ্গে। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, সত্যজিৎ রায় ছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাণের কারিগরি সকল দিকের একজন বিশেষজ্ঞ। ছবির গল্প ও চিত্রনাট্য লেখা, ছবিতে গানের প্রয়োজন হলে তার কথা রচনা করা, সংলাপ রচনা, হীরক রাজার দেশে-এর মতো ছবিতে সংলাপগুলো ছড়ায় ছড়ায় রচনা করা, ছবির সংগীত পরিচালনা করা এসব তিনি নিজে হাতে করেছেন। আবার যেসব কাজে তিনি সাহায্য নিয়েছেন দক্ষ শিল্পীদের সেসব কাজেও তাঁর নিজস্বতার ছাপ রেখেছেন। যেমন, সত্যজিতের ছবির চিত্রগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রথম দিকে সুব্রত্র মিত্র ও পরের দিকে সৌমেন্দু রায় কাজ করেছেন। তাঁরা দুজনই খুব গুণী চিত্রগ্রাহক তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। কিন্তু ছবির প্রতিটি শট কেমন হবে, তার ফ্রেমিং কেমন হবে, কম্পোজিশন কেমন হবে, ছবিতে আলো-ছায়ার ব্যবহার কেমন হবে এসব ক্ষেত্রে সত্যজিৎ তাঁর নিজের চিন্তাভাবনা প্রয়োগ করতেন। একইভাবে ছবির শিল্প নির্দেশনা, কস্টিউম ডিজাইন এসবেও মাথা ঘামাতেন সত্যজিৎ। ছবির সম্পাদনার ক্ষেত্রেও সত্যজিতের নিজস্ব মেধার প্রয়োগ ছিল অবধারিত।

এভাবে সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্রের সকল কারিগরি দিকে তাঁর মেধাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন যেখানে পৌঁছুনো যেকোনো চলচ্চিত্রকারের জন্য এক কথায় বলা যায় অসম্ভব। তিনি যে চিত্রনাট্য তৈরি করতেন সেখানে দৃশ্যবর্ণনার পাশে শটগুলোর ছবি এঁকে রাখতেন যাতে চিত্রগ্রাহকের বুঝতে সুবিধা হয় তিনি ঠিক কীভাবে শটটি নিতে চাইছেন। এটি তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল কারণ তিনি ছিলেন একজন গুণী চিত্রশিল্পীও, ছেলেবেলাতেই যার পরিচয় মিলেছিল। স্কুলে পড়ার সময় একদিন পেছনের বেঞ্চিতে বসে তিনি কী যেন আঁকিবুঁকি করছিলেন। সেটা দেখে শিক্ষক তাঁকে সামনে ডেকে দেখতে চান খাতায় তিনি কী করছেন। খাতায় দেখা যায় ওই শিক্ষকের স্কেচ আঁকা। আঁকার মুনশিয়ানা দেখে ওই শিক্ষক শাস্তি দেবার বদলে কিশোর সত্যজিৎকে বলেছিলেন, ‘তুই নামেও সত্যজিৎ, কাজেও সইত্যজিত’। সত্যজিতের এই আঁকাআঁকির প্রতিভা নিঃসন্দেহে চলচ্চিত্রের শট কম্পোজিশনে তাঁকে অনেক সাহায্য করেছিল।

আঁকাআঁকির কথাই যখন এলো তখন এই সুযোগে সত্যজিতের আরেকটি গুণের কথা বলে নেই। বংশানুক্রমেই তিনি পেয়েছিলেন সাহিত্যচর্চার মেধা। উপেন্দ্রকিশোরের নাতি আর সুকুমারের ছেলে শিশুসাহিত্যিক হবেন না তো কে হবেন? সত্যজিতের যদি চলচ্চিত্রকার পরিচয়টা বাদও দেওয়া হয়, তাহলে তিনি শুধু শিশুসাহিত্যিক হিসেবেও বাংলা সাহিত্যের চিরস্থায়ী আসনে আসীন থাকবেন। কারণ তুখোড় চলচ্চিত্রকার সত্যজিতের হাতেই তৈরি হয়েছে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্রগুলোর অন্যতম ফেলুদা। প্রদোষচন্দ্র মিত্র ওরফে ফেলুদা আর তার খুঁড়তুতো ভাই তপেশরঞ্জন বোস ওরফে তোপসের সঙ্গী হয়ে নানা রহস্য অনুসন্ধানে নামেন নি, গোয়েন্দাগল্পের এমন বাঙালি পাঠক একজনও পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। ফেলুদা, তোপসকে নিয়ে লেখা অনেকগুলো গল্প-উপন্যাসের মাধ্যমে সত্যজিৎ আমার মতো কত লাখো শিশু-কিশোর-তরুণের জীবন যে রাঙিয়ে দিয়েছেন! সোনার কেল্লা থেকে ফেলুদা-তোপসের রহস্য অনুসন্ধানের সঙ্গী হওয়া লালমোহন গাঙ্গুলী ওরফে জটায়ুকে ভুলতে পারে এমন বাঙালি পাঠক কি পাওয়া সম্ভব?

ওদিকে প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর সঙ্গে নানা অভিযানে সঙ্গী হয় নি এমন বাঙালি পাঠকই বা আছেন কয়জন? শঙ্কুকে নিয়ে লেখা সত্যজিতের সায়েন্স ফ্যান্টাসিধর্মী গল্পগুলো তো আমার মতে বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। এ রকম অমর কিছু চরিত্র সৃষ্টির পাশাপাশি সত্যজিতের সৃষ্ট তারিণীখুড়ো, সিধু জ্যাঠার কথাও কি কারো পক্ষে ভোলা সম্ভব? এসবের বাইরেও সত্যজিৎ লিখেছেন নানা স্বাদের শতাধিক ছোটগল্প। এই গল্পগুলোও বাংলা সাহিত্যে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। লিখেছেন চলচ্চিত্র, সংগীত প্রভৃতি বিষয়ে প্রবন্ধ। আর আঁকিয়ে সত্যজিৎ তাঁর নিজের বইগুলোর প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণের কাজটা নিজেই করেছেন দারুণ মুনশিয়ানার সঙ্গে। সত্যজিৎ তাঁর নিজের চলচ্চিত্রগুলোর পোস্টার ডিজাইনও করেছেন নিজেই। সেসবও চোখে লেগে থাকার মতো।

আজ জন্মশতবর্ষে এই মহান চলচ্চিত্রকার, সংগীতকার, চিত্রশিল্পী, সাহিত্যিক সর্বোপরি একজন আইকনিক বাঙালির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। এমন মানুষ ও তাঁর কাজকে আমাদের পাঠ করতে হবে গভীর মনোযোগের সঙ্গে। আর তা করতে হবে আমাদের নিজেদের শেকড় খুঁজে পেতে, এগিয়ে যেতে তাঁর হাত ধরে আরো বহুদূর।

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.