।। আব্দুল ওদুদ ।।

হিম যন্ত্রাংশ—এই বইটির পাঠ-প্রতিক্রিয়ায় যে দু’চারটি কথার বিস্তার ঘটাবো তা একান্তই আমার ব্যক্তিক ধারণা। সেই ধারণাকে ভেঙে ভেঙে নিজস্ব প্রসাদগুণে হয়তো বিন্যাসিত হবে। এই স্বয়ংসিদ্ধ মত প্রকাশের দায় একান্তই আমার। আবার কেউ যদি একটু ভালোলাগার স্বাদ পেয়ে যান সেটা হয়তো বাড়তি পাওয়া। কবিতা তো ঠিক বুঝে ওঠার বিষয় নয়, কারণ সবটুকু বুঝে গেলে যেন পাঠকতৃষ্ণার মৃত্যু হয়। এটা মূলত সৌন্দর্যের আকাশে আনন্দ-জোছনার এক অদ্ভুত রহস্যগোলক! নতুন স্বাদের তৃষ্ণা অবশেষ রেখেই বারবার রস নিতে হয়। এসবই মতভিন্নতার তত্ত্বকথা। তার চেয়ে, আমরা বরং কবিতার মাঠে বসে আকাশের সৌন্দর্য খুঁজি।

এই কবিতা-পুস্তকের যাত্রাসূচনা হয়েছে ঠিক এইভাবে, ‘আমিই তোমার গ্রন্থ’। পাঠের শুরুতেই যেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এক অসীম গ্রন্থের ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কবি নিজেই যেন এই মহাজগতের প্রতিনিধি হয়ে খুলে দিয়েছেন অপার রহস্যের দুয়ার। যেখানে রয়েছে কিছু সহজাত দৃশ্যসম্ভার, কিছু গুপ্তদৃশ্য, কিছু চিন্তাদৃশ্য। হতে পারে কিছু মূর্ত, কিছু-বা বিমূর্ত। তারপর একটি বিনয়ী আহ্বান—‘পাঠ করো নিবিড় মগ্নতায়, প্রথম পাতা খুলতেই যদি প্রজাপতি উড়ে যায়—তাকে ধরো।’ এই যে প্রজাপতি প্রতীকটির ব্যবহার, এর থেকেই প্রতীয়মান হয় ভেতরে অনেক বর্ণিল বিষয়সম্ভার রয়েছে। বিবিধ সন্ধানে চিন্তার পথ ধরে পাঠককে ছড়িয়ে পড়তে হবে অনেক উপপাদ্যের গহীনে। তারপর ক্রমবর্ণনায় রয়েছে পাঠকের জন্য কৃত্যনির্দেশনা। শেষে এসে বলছেন, ‘পাঠ করো আর নানা ব্যঞ্জনে বাজাও…’ অর্থাৎ শুধু পাঠগ্রহণ নয়, পাঠককে টেনে নিয়ে যায় এমন এক আনন্দলোকে, যেখানে সে স্বতন্ত্র মধুরিমায় ভিন্নতর ব্যঞ্জনে তার সকল অনুলিপ্সাকে মুগ্ধট্রমায় সাজাতেও পারে। সুপ্তকল্পের এইসব রহস্য উদ্ধারের উন্মুক্ত নেশাঘোরে পাঠক হয়তো ঢুকে পড়বে কবিতার সবুজ মাঠ থেকে অন্তহীন আকাশে। যাত্রা তবে শুরু হলো বুঝি।

পরের কবিতায় আসছে মিনা পাগলির কথা—‘শৈশবে লাটিম ঘোরানোর মতো সে ছুড়ে মারতো কথার চাবুক।’ যারা লাটিম খেলেছেন তারাই শুধু বুঝতে পারবেন, লাটিমের গায়ে পাকানো মোটা সুতা কিংবা চিকন দড়ি অপরূপ কৌশলে পেঁচিয়ে নির্দিষ্ট বিভঙ্গে ছুড়ে মারলেই কেবল লাটিম ঘুরতে থাকে। দক্ষতালগ্ন নিক্ষেপণ না হলে ঘুরান্তির পুরো আয়োজন ব্যর্থ হয়। এখানে বর্ণিত হচ্ছে, মিনা পাগলির কথাও ঠিক তেমনি দক্ষতায় মানুষের মনে দাগ কাটতো। এমন এক সম্পৃক্ত বর্ণনা, যেখানে উপমান এবং উপমিত যেন মিলেমিশে একাকার! পরবর্তীতে কবি লিখেছেন—‘পাগলির শরীরে কাপড় নেই। গায়ে নেই পাতার পোশাক। সারা গ্রামে ঘুরেফিরে একদা তাকে লোককাহিনির গুহায় ঢুকে যেতে হলো। ‘পাগলি কামেল ছিল খুব’ লোকমুখে এ কথা শুনে সেইসব স্মৃতি আজ মনে পড়ে গেল…’।

ছোট একটি কবিতার দৃশ্যকল্পনায় যেন অনেক কিছু চোখের সামনে ভেসে ওঠে। প্রথাগত সমাজের সকল কানুনকে অগ্রাহ্য করে স্বাধীন এক দুর্বোধ সাহসের নক্ষত্র এই মিনা পাগলি! নিয়মের মাঝে অনিয়মের ধুমকেতুর মতো পাগলির জীবন। সকল সত্যকে বুঝি সে জেনে ফেলেছে, তাই প্রচলিত মানুষের মাঝে প্রকৃত কোনো মানুষ চোখে পড়ে না। ডায়োজেনিসের মতো এই চরাচরে মিনাপাগলি যেন এক কসমোপলিটন বিশ্বমানব! যেন সমস্ত লোভ লালসা মোহ থেকে মুক্ত এক সত্যদ্রষ্টা ঋষি! সে তার দেহের নগ্নতা দিয়ে মানুষের অন্তর্গত কুৎসিত নগ্নতাকে ফুটিয়ে তুলছে! 

এভাবে আমরা সকল কবিতাকে চিন্তাচক্রে ব্যাখ্যা করতে পারি। কিন্তু সেটা সম্ভব হলেও হয়তো প্রযোজ্য নয়। তাই আরও কিছু কবিতার অংশ নিয়ে কথা বলি। ‘চাঁদমুখ থাকে না চাঁদে’ কবিতায়—‘পাগলের ঠোঁট ছুঁয়ে যে হাসি পালিয়ে গেছে দূর কোনো ফসলের মাঠে—কৃষকের কাস্তের কোপে ফালি হওয়া সেই হাসি—বলো তুমি কীভাবে লাগাবে জোড়া! চাঁদমুখ চাঁদে আর থাকে না এখন—বাঁশবাগানের ফাঁক গলে বেরিয়ে গেছে কোনো এক সুদূর নগরে…’ অথবা ‘হনন-মুহূর্ত’ কবিতায়—‘হননমুখে দাঁড়িয়ে সত্য ছাড়া কিছু বলে না পাগল’/‘আত্মহত্যার আগে পাগলটি মাটিতে পুঁতেছিল একটি গোলাপের গাছ…’। এভাবেই বিভিন্ন কবিতায় এসেছে—‘শুধু কাটা হাত ঝুলে রইলো রিকশার হাতলে’/ ‘ইলিশের মৃত চোখ জেগে থাকে হিম কোনো ঘরে’/‘সব ঋতু ফাগুন হলে আগুনে পোড়ে অমুদ্রিত আঙুল’।

শামীম হোসেনের কবিতার বিভিন্ন ছত্রে আমরা দেখি, মূর্ততা যেমন রয়েছে তেমনি কোথাও বিমূর্ত যেন অধিক মূর্ত হয়ে উঠেছে। পাগল যখন গোলাপের গাছ রোপণ করে তখন অনুভবে শিহরণ জাগে। সে তো পাগল নয়, যেন এই স্বপ্নক্লান্ত পৃথিবীতে সুন্দরের এক অপরূপ কারিগর। আমরা দেখি সভ্যতার সঙ্কট, নগরায়নের কাচপোড়া উজ্জ্বল হাহাকার! গ্রামের সেই চিরায়ত শান্ত কোমলতা হারিয়ে গেছে, সেই বাঁশবন নেই, শ্লোক বলা কাজলা দিদি নেই, চাঁদমুখো মায়ের আকাশ হারিয়ে গেছে নগরের কোলাহলে। কাস্তের কোপে ফালি হওয়া হাসি এখন সত্যিই জোড়া লাগানো যায় না আর।

শামীমের কিছু কিছু বীক্ষণ মনে দোলা দেয়। যেমন—‘জন্ম সত্য জেনে যাপনে রাখি ক্ষরণের পাহাড়’। এই যে জীবনের এক মহান উপলব্ধিকে একটি বাক্যে বিশদ বলে দেওয়া, এ তো শুধু কবিতা নয় যেন সত্যদ্রষ্ট দর্শন। কোলরিজের একটি কথা মনে পড়ে গেল—No man was ever yet a  great poet without being at the same time a profound philosopher। সত্যিই তাই, প্রকৃত কবিমাত্রই ভালো দার্শনিক।

শিরোনাম কবিতা হিম যন্ত্রাংশে দেখি, ‘বাতাসের বদলে ফুটবলে রক্ত ঢুকালাম। চলো খেলি। ফাঁকা মাঠ। কার কাছে বন্দক দেবো হৃদিঘাট?’ অথবা ‘আত্মপক্ষ’ কবিতায়—‘জোনাকির আলো সরিয়ে ভিজিয়ে রাখি মৃত্যুর ছায়া। উড়বার আগে কেটে রাখি সমূহ ডানা।’ কিংবা ‘দুরবিনের ক্যানভাস’ কবিতায়—‘আলাভোলা মেঘের ক্যানভাসে কী চিত্র আঁকে/দুরবিনের উল্টো দিকে জেগে থাকা চোখ।’ সময়ের বাস্তবতার এই যে রক্তলেখ চিত্রায়ণ, ফাঁকা মাঠে ফুটবল খেলার মতো অদ্ভুত এক মেটাফরিক বর্ণনা আমাদের মগজের অনেক যন্ত্রাংশকেই হিম করে তোলে। সমূহ ডানা কেটে উড়বার যে চিত্রায়ণ, আমাদেরকে নির্ভরশীল সাহায্য ছাড়াই স্বয়ং-উড়ালকে উদ্বুদ্ধ করে।

তারপর এক অপার রহস্যের মায়াঘোরে ঢুকে পড়তে হয় আমাকে, দুরবিনের পেছনে জেগে থাকা চোখ আকাশের ক্যানভাসে কী চিত্র আঁকে! আহা, এ ভাবনা বড্ড নেশারূপ জাগানিয়া। পাঠক ভাবতে থাকুন, ভাবতে ভাবতে অমোঘ আনন্দের কোনো এক অলকানন্দে ঢুকে পড়তে পারেন। বইটির শেষ কবিতায় কবি একটি সুন্দর ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন এইভাবে—‘আসুন একটা ঘোরের ভেতর ঢুকে পড়ি।’/‘সপ্তাহে একদিন ঘরে নয়, ঘোরে ঢুকে পড়ুন।’

একদম একদম, কবিতা এমনই এক মায়াবী ঘোর, যে অনিন্দ্য রসঘোরে একবার যদি ঢোকা যায়, যেন শুদ্ধস্নান হয়ে যাবে। ধুলোবালি কালিমা আর কলুষ ধুয়ে মুছে নবীন কচিপাতার মতো নবজন্ম পেয়ে যেতে পারেন। কবিতা-ঘোরের পথ ধরে সেই পুণ্যস্নানের পথে সকল পাঠকের মধুযাত্রা হোক। ‘কবিতা কমল-কলা পাকা যেন মধু, ইচ্ছা হয় যত পাই পেট ভরে খাই।’ গ্যেটে রচিত ‘ফাউস্ট’-এর একটি কথা মনে পড়ে গেল। ‘মানুষের মহিমাকে দেবত্বের স্তরে,/নিয়ে যেতে একমাত্র কবিকৃতি পারে।’ শামীম হোসেনের ‘হিম যন্ত্রাংশ’ কবিতাবইটির বহুলপাঠ হোক। পাঠক, আপনিও পড়ে দেখুন, কবি তার কবিকৃতিকে কোথায় নিয়ে যেতে পেরেছেন।

গ্রন্থতথ্য হিম যন্ত্রাংশ: শামীম হোসেন, প্রকাশক: চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন, প্রকাশকাল: ফেব্রয়ারি ২০২১, প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত, মূল্য: ২০০ টাকা।

অলংকরণ শিবলী নোমান