সুজিত সরকার

।। সুজিত সরকার ।।

বলতে বাধা নেই, আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের শ্রমিকেরা এখন যা করছেন, তা তাদের বিরুদ্ধেই করছেন বলে প্রতীয়মান হয়।দেখুন শিল্পপতিদের শ্রমিকপ্রেমী হিসেবে প্রচারের জন্য মে দিবসে যে রঙিন আয়োজন মালিকপক্ষ করেন এবং কর্মসূচি শেষে পলিথিনে এক প্যাকেট খিচুড়ি হাতে তুলে দেন আর শ্রমিকেরা একদিনের ছুটি পেয়ে মহাখুশিতে ঘরে ফেরে খিচুড়ি হাতে, তারাই আবার বেতন-বোনাসের জন্যে রাজপথে জোর দাবি তোলেন। সে দাবি মোকাবিলা করতে শ্রমিক নেতারা অর্থের বিনিময়ে গোপনে আপসরফায় যায়, এটা কি নিজেদের বিরুদ্ধে তাদের কর্মসূচি নয়? 

অবশ্য সাধারণ শ্রমিকদের সেখানে কিছু করার নেই। কারণ তাদের ঐক্য নেই। নেই শ্রেণিচেতনা। তারা নানা রাজনীতিক দলের কর্মী বা সমর্থক হয় মিটিং-মিছিলে অর্থের বিনিময়ে অংশ নিয়ে সে দলের সমর্থক প্রদর্শনের জন্যে। সুতরাং তাদের দল যদি শ্রমিকস্বার্থ বিরোধীও হয়, দলের নেতাদের নির্দেশই শেষ কথা। কারণ তারা টাকা নিয়ে তাদের স্বার্থবিরোধী মিছিলে যোগ দিয়েছে।ফলে তাদের বেতন-বোনাস পরিশোধে কিংবা আবাসিক সমস্যা, বীমার সার্পোট দিতে অপারগ অথবা শ্রমিকদের প্রাপ্য বিপুল অঙ্কের অর্থ কয়েকমাস বিনিয়োগ করে ব্যক্তিগত লাভের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চান, সে ক্ষেত্রেও শ্রমিকদের কিছু করার থাকে না। রাস্তায় চিৎকার করে আর বিচ্ছৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে পুলিশের পিটানি খায়। বেতন-বোনাস আদায় হয় না। মাঝখানে খররোদে পুড়ে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফিরে স্বামী/স্ত্রী/সন্তানের সঙ্গে ঝগড়া-মারামারি করেন। সংসারে সৃষ্টি হয় অশান্তি। এ সবের চেয়ে চাকরিটা অক্ষত রেখে খাওয়া-পড়ার ব্যবস্থাকে নিশ্চিত করাই উত্তম। তাদের অতো রাজনীতি বোঝার কিচ্ছু নেই। ও দিয়ে পেট ভরে না। কাজ করো আর ডাল-ভাত খাও। বিধায় শ্রমিক নেতারা যা বলেন এবং করেন সেটা অন্যায় বুঝেও মুখ বন্ধ করে পালন করো। 

তৃতীয় বিশ্বের শ্রমিক নেতারা অনেকেই শিল্পপতির মর্যাদায় অভিষিক্ত। তাদের আছে গাড়ি-বাড়িসহ বিলাসবহুল জীবন ব্যবস্থা। তারাও শ্রমিকদের ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার অর্থ করায়ত্ত করে। শ্রমিকদের বোধ আর ঐক্যহীনতার কারণে তারা শোষণ-বঞ্চনার শিকার। তারপরও তারা বাধ্য হয় মালিকস্বার্থে নিজেদের অধিকার ও পাওনা তুলে দেয় নিঃসঙ্কোচে। অথচ আজকে ওরা যে আট ঘণ্টা কাজ করছে, সে অধিকার কীভাবে কবে থেকে অর্জন করেছে, সে ইতিহাস জানে না। বেকারত্ব-কর্মহীনতা, অভাব তাদের সে তথ্য জানতে উৎসাহিত করে না। জেনে কী হবে! তারা যে শ্রমিক, গতরটাই পুঁজি, তার বেশি অর্জন করা, তাদের সম্ভব হয় না। তাই তারা পদে পদে বঞ্চনা-নির্যাতনের শিকার হয়। তাদের নেই সামাজিক মর্যাদা। পকেটে অর্থ ও বসবাসের ঘর।

মালিকদের শোষণ, নির্যাতন আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে শ্রমিকেরা নানা দাবির মধ্যে শ্রমঘণ্টা কমানোর আন্দোলন শুরু করে। সেকালে একজন শ্রমিককে ১৬ থেকে ২০ ঘণ্টা কাজ করতে হতো। তারা ছিল ক্রীতদাসের অধম। তাদের বিশ্রাম-বিনোদন বলতে কিছু ছিল না। ছিল নিম্নমানের খাদ্য আর অপরিচ্ছন্ন বাসস্থান। অন্ধকার, গলি-ঘুপচিতে বাস করতে হতো। ভুগতো নানা রোগে। চিকিৎসার ব্যবস্থাও ছিল না। কিন্তু তাকে যথানিয়মে অসুস্থ-অভুক্ত থেকেও শ্রম দিতে বাধ্য করা হতো। তার জন্য মালিকদের সহায়তা করতো কিছু আত্মঘাতী শ্রমিকনেতা, দালাল ও ভাড়াটিয়া সশস্ত্র গুণ্ডাবাহিনী। ১৮০৬ সালে ফিলাডেলফিয়ার ধর্মঘটী জুতা শ্রমিকদের ষড়যন্ত্রমূলক মামলা চলার সময় এই শ্রমঘণ্টার বিষয়টি জানা যায়। ১৮৩৪ সালে নিউ ইয়ার্ক রুটি শ্রমিকদের ধর্মঘট চলার সময় ‘ওয়ার্কিং মেনস্ অ্যাডভোকেট’ পত্রিকায় লেখা হয় ‘মিশর দেশের ক্রীতদাস প্রথার চেয়েও দুঃসহ অবস্থায় শ্রমিক শ্রেণি বছরের পর বছর অতিক্রম করে আসেছে। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তাদের ১৬ থেকে ২০ ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য করা হতো। কাজে ত্রুটি হলে কিংবা কোনো কারণে বিরতি দিলে শারীরিক নির্যাতনও করা হতো।’ 

ফলে শ্রমঘণ্টা কমানো জন্য শ্রমিকেরা বিভিন্ন কারখানায় একের পর এক ধর্মঘট শুরু করে। তার জন্য মালিকপক্ষের প্ররোচণায় সরকারি বাহিনী এবং মালিকের পোষা গুণ্ডাবাহিনী শ্রমিকদের ওপর চড়াও হতো। হত্যা অথবা নির্যাতনের শিকার হতো শ্রমিক নেতারা। আমেরিকায় গড়ে ওঠা শ্রমঘণ্টার দাবির আন্দোলন সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

রাশিয়া, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন, হল্যান্ড, জার্মানি, ইতালিসহ ইউরোপের পুঁজিবাদী দেশগুলোয় এই আন্দোলন বেগবান হয়ে ওঠে।ইউরোপজুড়ে সৃষ্টি হয় শ্রমিক অসন্তোষ। সব দেশের পুঁজিপতির চরিত্র ও লোভ অভিন্ন। উৎপাদন হ্রাস এবং মুনাফা কমে যাওয়ার আতঙ্কে তারা কোনো ক্রমেই শ্রমিকদের দাবি মেনে নেয়নি। বরং উৎপীড়নের পথ বেছে নেয়। তাতে শ্রমিকদের মধ্যে আরো দৃঢ় ঐক্য ও সংহতি ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। সংঘবদ্ধ শক্তির কাছে পুঁজিপতিদের সীমিত শক্তি তুচ্ছ। এ কথা অনুধাবন করেছিল শ্রমিক শ্রেণি। ততোদিন দেশে দেশে কার্ল মার্কস্-ফেডারিক অ্যাঙ্গেলস্-এর শ্রমিক অধিকার সম্পর্কিত লেখা বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণির দিকনির্দেশনার কাজ করতে শুরু করে। তারা সে ততোদিনে রপ্ত করেছে, ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ এবং ‘শ্রমিক শ্রেণির শৃঙ্খল ছাড়া হারাবার কিছু নেই, জয় করার আছে সারা বিশ্ব’ স্লোগানে অধিকার আদায়ের গূঢ় অর্থ আর অনুপ্রেরণা। তাই উনিশ শতকে দেশে দেশে শ্রমিক শ্রেণি আর বলহীন-নিজেদের নিঃসঙ্গ ভাবেনি। তারা সমগ্র বিশ্বে তাদের বন্ধুত্বের ঐক্যের ফলে শক্তি ও সাহস সঞ্চয় করে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে।

সেকালের সংবাদ দেশে দেশে শ্রমিক অসন্তোষ এবং তার ব্যাপ্তি সম্পর্কে তথ্য পরিবেশন করেছে সংগঠকের মতো। অনেক পত্রিকা অবশ্য শ্রমিকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও তাদের শ্রমিক আন্দোলন সম্পর্কে স্বীকারোক্তি দেশের ও বর্হিজগতের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফ্রান্সের ‘চেম্বার অব ডেপুটিজ’ এবং ইংল্যান্ডের জর্জ বার্নাড শ’, উইলিয়াম মরিস প্রমুখ শ্রমিকদের পক্ষে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেন। চেষ্টা করেন আন্দোলনরত মেহনতি মানুষকে নানাভাবে সহযোগিতার লক্ষ্যে। রাশিয়ায় আলেকডান্ডার পুশকিন, লিও তলস্তয়, দস্তয়োভস্কি, মায়াকোভস্তি, গোর্কি প্রমুখ লেখক শ্রমজীবীদের পক্ষে অবস্থান নেয়ার অভিযোগে সরকারি কালো তালিকাভুক্ত হন। জার দস্তোয়ভস্কিকে মস্কো থেকে দূর সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠায়। শ্রমজীবী মানুষের নেতা জোসেফ স্তালিনকেও সাইবেরিয়া নির্বাসনে পাঠানো হয়। 

বিশ্বে এমন লেখকের অবশ্য অভাব নেই যারা নিঃশর্তে, শুধু অর্থলোভে শোষকশ্রেণির পদলেহন করেছেন। অনেক দার্শনিকও আছেন যারা স্বৈরতন্ত্রকে উৎসাহিত করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হিটলারের দীক্ষাগুরু ফ্রেডারিখ নিৎসে। রাজনীতির সঙ্গে এঁদের জীবন্ত যোগাযোগ ছিল। পরবর্তীকালে স্পেনের স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে কলম-রঙ-তুলি ফেলে অস্ত্র ধারণ করেছিলেন পাবলো পিকাশো, খ্রিস্টফার কডওয়েল, র‌্যালফ ফক্স, কর্নফোর্ড আরো অনেকে। শ্রমজীবীদের রাজ প্রতিষ্ঠার জন্য লড়িয়ে বাঙালি লেখকদের মধ্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সোমেন চন্দ, সুকান্ত ভট্টাচার্য, রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন, সমর সেন, কাজী আবদুল ওদুদ, মনির চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার প্রমুখ অন্যতম। 

স্পেনের আন্দালুসিয়ার লোপেরা গ্রামে শহীদ হন র‌্যালফ ফক্স, জামরা নদীর তীরে জলপাই বনে আত্মহুতি দ্যান খ্রিস্টফার কডওয়েল; ঢাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে প্রাণ বিসর্জন দেন সোমেন চন্দ (৮ মার্চ ১৯৪২)। এঁদের লেখার মধ্যে দিয়ে সমাজের নিচু তলার মানুষের জীবনচিত্র উঠে এসেছে। সমাজ পরিবর্তনের আহ্বান আরো জোরদার হয়েছে। শ্রমিকদের দুঃসহ জীবন নিয়ে বিশ্বময় আন্দোলনও গড়ে ওঠে এঁদেরই কল্যাণে। সাংবাদিক জন রিড ‘দুনিয়া কাঁপানো দশদিন’ লিখে শ্রমিক-কৃষকদের অনুপ্রাণিত করেন। বিচার হেনরিয়েটা স্টো ‘আঙ্কেল টমাস কেবিন’ উপন্যাসও ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার পক্ষে কাজ করেছে। পত্র-পত্রিকাও সেই ভূমিকায় রেখেছে। অনেক সাংবাদিকও সেই অভিযোগে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছেন সরকার। আমেরিকার হে মার্কেটের নির্মম ঘটনার তথ্যচিত্র সংবাদপত্র এবং সাহিত্যিকদের লেখায় উঠে আসে। জে গোল্ড, জন সুইনটন প্রমুখের লেখায় পুঁজিপতিদের ভাড়াটিয়া বাহিনীর নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে নানা তথ্য দিয়েছেন।১৮৮৫ সালে ‘নিউ ইয়র্ক ট্রিবিউন’ পত্রিকা লিখেন, ‘এইসব পাশবিক জীবগুলো শক্তি ছাড়া আর কোনো যুক্তিই বোঝে না এবং তা যথেষ্ট পরিমাণে প্রয়োগ করাই প্রয়োজন যাতে কয়েক পুরুষ ধরে তা থাকে।’ আমেরিকারন পুঁজিপতি সমর্থিত সরকারের এই মানসিকতার এক নির্মম প্রয়োগ দেখা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে জাপানের হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিরাপরাধ ও নিরস্ত্র মানুষ ও প্রকৃতিকে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপের মধ্যে। এই অপশক্তিই জগতের নষ্টের মূল।শান্তি ও মানবতা বিরোধিতার মহাগুরু। ধর্মান্ধতা-সাম্প্রদায়িকতারও শিরোমণি সাম্রাজ্যবাদ। একাত্তরে ধর্মান্ধদের হত্যা-ধর্ষণের পক্ষে আমেরিকার পুঁজিপতিদের সরকারের অবস্থান সে বিষয়ে উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাই দেশে দেশে তাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেয়া প্রতিটি কর্মজীবী ও শ্রমজীবী-কৃষিজীবী মানুষের নৈতিক দায়িত্ব।

১৮৮৮ সালে শিকাগো শহরে হে মার্কেটে শ্রমিকদের গুলি করে হত্যা করা হয়, এ তথ্য শ্রমজীবী মানুষের রক্তাক্ত ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে। হত্যা পর পুঁজিপতিদের প্রত্যক্ষ চাপে আমেরিকার সরকার শ্রমিক নেতাদের গ্রেফতার করে এবং একটি প্রহসনের বিচার করে। সে বিচারে শ্রমিক নেতা আগস্ট স্পাইস, ফিশার, অ্যাঞ্জেল ও পার্সনের ফাঁসি হয় ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর।

কী ছিল তাঁদের অপরাধ? বেঁচে থাকার অধিকার দাবি করা। সুস্থভাবে শ্রম বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে সংযুক্ত হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের ইচ্ছে প্রকাশ। হাজার হাজার কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ, কারখানায় উৎপাদন করে উৎপাদিত পণ্য দেশে দেশে বিক্রি করে পুঁজিপতিরা কোটি কোটি টাকা আয় করে, শ্রমিকদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে। শ্রমিক যে জুতো বানায় সে জুতো কি তারা পড়তে পারে না প্রিয়জনকে দিতে পারে? পারে না। সে ইচ্ছে প্রকাশ করলেই মালিকপক্ষ বাধার প্রাচীর তোলে। করে নানামুখী হয়রানি। 

১৮৮৬ সালের ২০ আগস্ট ৬০টি ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধি একত্রে বসে বাল্টিমোরে জমায়েতে গঠন করেন ‘ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়ন’ প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিষ্ঠা সভাতেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়: ‘এই দেশের শ্রমিকদের পুঁজিবাদী দাসত্বের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য, বর্তমানের প্রথম ও খুবই প্রয়োজনীয় এমন একটা আইন পাশ করা, যার ফলে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সব রাজ্যে দিনে আট ঘণ্টাই যেন স্বাভাবিক কাজের সময় বলে গণ্য করা হয়। যতোদিন এই গৌরবময় ফল অর্জন করতে না পারি, ততোদিন আমরা আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগের সংকল্প করছি।’ অবশিষ্ট ষোলো ঘণ্টার আট ঘণ্টা বিনোদন এবং অবশিষ্ট আট ঘণ্টা বিশ্রাম। এই দাবি মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন বলে আজকে মনে হলেও সেকালে পুজিপতিরা এই মানবিক অধিকারের দাবি মানতে স্বীকৃত ছিল না।অথচ নিজেরা শ্রমিকের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে তার মুনাফা দিয়ে বিলাসবহুল স্বাধীন জীবন যাপন করতো। তারা শ্রমিকদের মানুষই ভাবেনি। আফ্রিকা-এশিয়া থেকে সুখি-সমৃদ্ধ জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে এবং অপহরণ করে হাজার হাজার মানুষকে জাহাজে তুলে নিয়ে আসতো। সেই মানুষগুলোর স্বপ্ন তখনই উবে যেতো যখন তাদের হাট-বাজারে গরু-ছাগলের মতো বিক্রি করে দিতো সাদা চামড়ার মালিকেরা। তাদের না ছিল পারিবারিক জীবন, না ছিল কোনো স্বাধীনতা এবং অধিকার। স্পাটাকাস এই শৃঙ্খল ভাঙার প্রত্যয়ে বিদোহ করেছিলেন। তিনি সফল না হলেও অন্যায়-অমানবিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের সংগ্রামের দিকনির্দেশনার ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। 

আমেরিকায় পাঁচ লক্ষাধিক শ্রমিকের এই সমাবেশের এক দশক আগে ১৮৭৫ সালে ফাঁসি দেয়া হয় দশজন খনি শ্রমিককে। এই হত্যার প্রতিবাদে রেল ও ইস্পাত শ্রমিকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা একটানা ১৮৭৭ সাল পর্যন্ত প্রতিবাদী কর্মসূচি পালন করে। ১৮৮৪ সালের ৭ অক্টোবর ‘ফেডারেশন অব অর্গানাইজড ট্রেডস্ অ্যান্ড লেবার ইউনিয়নস্ অব দি ইউনাইটেড স্টেট অব কানাডা’ প্রস্তাব নেয় ১৮৮৬ সালের ১ মে থেকে সারাদেশে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করবে। যতোদিন এই দাবি বাস্তবায়ন না হয়, ততোদিন তারা সংগ্রাম করবেই। এই সংবাদে পুঁজিপতিরা ভীষণ প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে। ভীতও হয়। তারা তাদের পোষা সশস্ত্র গুণ্ডা ও পুলিশ বাহিনী দিয়ে একের পর যত্রতত্র শ্রমিক নেতাদের গুপ্ত হত্যা, জখম-নির্যাতন শুরু করে। সভা-সমাবেশ ভঙ্গ করতে বোমাবাজি ও লাঠিবাজি করে। শ্রমিকেরাও গুণ্ডা-পুলিশের বন্দুক-বোমাকে উপেক্ষা করে প্রতিরোধের ভূমিকা গ্রহণ করে ঐক্যবদ্ধভাবে। তারা জানে, তাদের ‘হারাবার কিছু নেই, শৃঙ্খল আর জীবন ছাড়া।’ 

১৮৮৬ সালে আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিম রেলপথের কুখ্যাত মালিক অত্যন্ত দম্ভের সঙ্গে বলেছিল, ‘শ্রমিক শ্রেণির অর্ধেক অংশকে আমি ভাড়া করতে পারি, অবশিষ্ট অর্ধেককে খুন করার জন্য।’ তার এই দম্ভোক্তির জবাব সে বছরই শ্রমিক শ্রেণি দিয়েছিল। ১ মে থেকে শুরু হয় ধর্মঘট। সারা আমেরিকায় কোনো কারখানার চাকা ঘোরেনি। একমুঠো লোহা কিংবা কয়লা খনি থেকে উত্তোলিত হয়নি। ৩ মে নেমে এলো নির্মম নির্যাতন। ‘ম্যাককর্মিক হার্ভেস্টার’ কারখানায় ধর্মঘটকারী শ্রমিকদের ওপর। পুলিশ গুলি বর্ষণ করে। ফলে ঘটনাস্থলে ছয়জন শ্রমিক নিহত হন। আহত হন শত শত। তারই প্রতিবাদে ৪ মে হে মার্কেট স্কোয়ারে ডাকা হয় শ্রমিকদের এক বিক্ষোভ সভা। সেই সভার শুরুতেই শুরু হয় পুঁজিপতিদের ভাড়াটিয়া গুণ্ডা-সন্ত্রাসী ও সরকারি পুলিশের বর্বরোচিত আক্রমণ। ভিড়ের মধ্যে গুণ্ডাদের নিক্ষিপ্ত একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। মারা যায় একজন পুলিশ সার্জেন্ট। তখন পুলিশের সব সন্দেহ গিয়ে পড়ে বিক্ষোভরত শ্রমিকদের ওপর। তখনই পুলিশ রাইফেল উঁচিয়ে শুরু করে এলোপাথারি গুলি। শুরু হয় তখন খণ্ডযুদ্ধ। একদিকে হাজার হাজার নিরস্ত্র শ্রমিক, অপরদিকে গুটিকয়েক পুলিশ আর ভাড়াটিয়া গুণ্ডা। সেই হাতাহাতি খণ্ডযুদ্ধে নিহত হন সাতজন পুলিশ ও চারজন শ্রমিক। কিন্তু প্রতিবাদের আওয়াজ তখনো শ্রমিকেরা পরিত্যাগ করেনি। তারা কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। শ্রমিকদের এই সংগ্রামকে স্মরণীয় করে রাখতে তারা বদ্ধ পরিকর হয়। তাই তারা দিবস পালনে নানামুখী সিদ্ধান্ত নেন। বিশ্বময় সে সিদ্ধান্ত শ্রমজীবী নেতাদের অবহিতও করা হয়। সে সময় ভারতে ইংরেজ শাসন। আমেরিকা-ইউরোপের এই আন্দোলনের সংবাদ যেন ভারতীয় শ্রমিক সংগঠনগুলো না জানতে পারে, তার জন্য ভীষণ কড়াকড়ি শুরু করে ব্রিটিশ সরকার। বই-পুস্তক এলেও তা অ্যাকাডেমিক কিংবা ধর্মীয়। ভীষণ সেন্সর শুরু করে বাণিজ্য বন্দরে। তার ভেতর দিয়ে তথ্য এসে পৌঁছোয় ভারতে।

১৮৮৮ সালের ডিসেম্বরে সেন্ট লুইতে আমেরিকার ফেডারেশন অব লেবার অভিবেশনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অধিবেশনে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, ১৮৯০ সালের ১ মে থেকে এই দিবসটি প্রতিবছর পালিত হবে আমেরিকায়। এই সিদ্ধান্তের কয়েকমাস পরই ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অর্থাৎ প্যারিস কংগ্রেসে মহামতি ফ্রেডারিক অ্যাঙ্গেলস-এর উপস্থিতিতে (মার্কস তখন জীবিত নেই) সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, এই দিবসটি কেবল আমেরিকায় নয়, সারাবিশ্বের শ্রমিক তথা শ্রমজীবী মানুষ বিক্ষোভ ও সমাবেশের মাধ্যমে পালন করবে। তাই ১৮৯০ সালের ১ মে থেকে সারাবিশ্বে এই প্রতিবাদী রক্তাক্ত দিনটি পালিত হয়ে আসছে।

এই দিবসটি কেন সারা দুনিয়ার শ্রমজীবী মানুষের কাছে এতো জীবন্ত ও প্রিয়? কী তার তাৎপর্য?

প্রথমত, মে দিবসই প্রথম এবং এখনো একমাত্র আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। দ্বিতীয়ত, সমস্ত অসংগঠিত শ্রমিককে সংগঠিত করার আহ্বানই মে দিবসের ডাক। তৃতীয়ত, মালিক শ্রেণির শোষণের বিরুদ্ধে সমগ্র শ্রমিক শ্রেণিকে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে একমাত্র মে দিবস। চতুর্থত, আর্থনীতিক সংগ্রামকে রাজনীতিক সংগ্রামে রূপান্তরের ডাক দিয়েছে মে দিবস।

বিশ্বের নানা দেশে আজো শোষণ-বঞ্চনা অব্যাহত রয়েছে। তাদের মুক্তির আলোর দিশা দ্যায় প্রথম রাশিয়ায় সোভিয়েত প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে। সে ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে গত শতকের নব্বইয়ের দশকে। অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশও সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লাভবান হতে পারেনি, আমলাতান্ত্রিক মনোভাব এবং নেতৃত্ব পর্যায়ে ভোগবাদী বিলাসিতার কারণে। সাম্রাজ্যবাদীরা সমাজতান্ত্রিক দেশে তাদের বিরোধিতার প্রকল্প বাস্তবায়নে গার্বাচেভ-পুতিনের মতো সমাজতন্ত্র বিরোধী নেতাদের উত্থানের। চীন এবং উত্তর কোরিয়া আজকে একজনই আমৃত্যু পার্টি ও সরকার প্রধান হয়ে থাকবেন। একে কে বলবে গণতান্ত্রিক আচরণ? 

সোভিয়েতে নেতা পরিবর্তনের ফলে সমাজতন্ত্র ভেঙে পড়েছে দেখে আতঙ্কে উত্তর কোরিয়া ও চীন নেতার পরিবর্তনকে আইন করে রুখে দিয়ে ভাবছে দেশি-বিদেশি বিরুদ্ধ পক্ষ নিশ্চুপ আছে। সেটা অমূলক। প্রতিপক্ষ সময়ের অপেক্ষা করছে। বরং জনগণের মৌলিক অধিকার ও চাহিদাকে গুরুত্ব দেয়া প্রত্যাশিত। আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে এমনটা কতোটা শোভন ও গ্রহণযোগ্য যে নেতা যা করবেন তা থাকবে বিতর্কের উর্ধ্বে। তবে এ ক্ষেত্রে আমেরিকার প্রতিবেশী দেশ কিউবা আজো অবিচল।সাম্রাজ্যবাদীদের ত্রাস হয়ে অবস্থান করছে। পুঁজিবাদীদের শত অপপ্রচারের পরও সেখানে শ্রমিক-কৃষকের স্বার্থ এক বিন্দুও ক্ষুণ্ণ হয়নি। এখন সেই ছোট্ট দ্বীপদেশ শিক্ষা-চিকিৎসা ও শিল্পে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী। কিউবা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আতঙ্কই শুধু নয়, মহাশত্রুও।  

মানুষের চেহারার মতো তার পছন্দ-অপছন্দের বিষয়টিও স্বতন্ত্র। নাগরিক রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছে কি না। উন্নয়নে তার শ্রম ও মেধা ক্রিয়াশীল কি না। সে সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী ভূমিকায় রয়েছে কি না। তার ভাবনার জগৎ হওয়া উচিত বিজ্ঞান ও মানবতার পক্ষে। সেটা না হলে সে বিচারাধীন হতে বাধ্য। মে দিবস সেই সাম্যের পথ নির্দেশক। অনেক শ্রমিকের রক্ত এবং জীবন-সম্মানের বিনিময়ে বিশ্বব্যাপী একটি শ্রমনীতি প্রণীত হয়েছে। বাংলাদেশ তার কতোটা অনুশীলক সেটাও বিবেচনায় রেখে যাবতীয় আন্দোলনের কর্মসূচি প্রণীত হওয়া প্রত্যাশিত। স্বার্থপর-শ্রমিক শোষক শ্রমিক নেতা আর মালিকদের অনুকূলে মে দিবসের কর্মসূটি পালন তাই শ্রমিকের নিজের পতনের জন্যে গর্ত খনন। রানা প্লাজার গণহত্যার বিচারের বিলম্ব কি সে দৃষ্টান্ত বহন করছে না? বাংলাদেশের শ্রমজীবীরা সচেতন ও নিজের শুভার্থী না। তারা যা করে অধিকাংশ সময় নিজের বিরুদ্ধে করে। এটাই আজকের বাস্তবতা। কর্পোরেট পুঁজি তাদের সেদিকেই নিয়ে যাচ্ছে।

সুজিত সরকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক ও সংস্কৃতিকর্মী