তামিম শিরাজী

।। তামিম শিরাজী ।।

আজ মহান মে দিবস। বিশ্বে শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রেরণার দিন। এর ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ মোটামুটি সবারই জানা। তাই সেই চর্বিত চর্বন নাহয় থাক। বরং একালে আমাদের শ্রমিকরা কেমন আছেন, তাদের অধিকার কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় আরো কী কী কাজ করার আছে- সেসবই তুলে ধরা যাক।

বৈশ্বিক উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নত হয়েছে বাংলাদেশ। জন্মের পঞ্চাশ বছরের মাথায় তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ তকমা। এর বৃহদাংশ এসছে শ্রমিকের হাত ধরেই। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি এই শ্রমিক, কৃষক এবং মেহনতি শ্রেণির মানুষ। তাদের শ্রমের বিনিময়ে আমরা বড় বড় শিল্প কারখানা পেয়েছি, বিশ্ববাজারে নিজেদের ব্যবসা পেয়েছি, জাতীয় আয়ের বড় একটা অংশ পেয়েছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য, শ্রমিক অথবা মেহনতি শ্রেণির জীবনোন্নয়ন আমরা খুব একটা করতে পারিনি। মালিক শ্রেণির সঙ্গে শ্রমিক শ্রেণির অর্থনৈতিক বৈষম্য আজও স্পষ্ট। নামমাত্র অর্থের বিনিময়ে মালিক পক্ষ শ্রমিকদের যে শ্রম কিনে নিচ্ছেন, বাজারে খাটিয়ে তার হাজার হাজার গুণ বেশি মুনাফা তারা ‘পকেটিকরণ’ করে চলেছেন প্রতিনিয়ত। তার বিনিময়ে সুষ্ঠু শ্রমের পরিবেশ তো দূরের কথা, শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তাটুকুও দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন তারা।

তাদের স্বার্থান্বেষী মনোভাবের কারণে রানা প্লাজা কিংবা তাজরিন গার্মেন্টস এর মতো ঘটনাগুলোতে প্রাণ দিচ্ছেন শ্রমিক। আজকাল বাড়ির পোষা জন্তুকেও মানুষ শেকলে বেঁধে রাখে না। অথচ রানা প্লাজা-তাজরিন গার্মেন্টস এর ঘটনায় আমরা তালাবদ্ধ অবস্থায় শ্রমিকদের মরছে দেখেছি। এসব ঘটনা মধ্যযুগের দাস প্রথার বর্বরতার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। দুর্ঘটনা ছাড়াও শ্রমিক হত্যার ঘটনাও ঘটে হরহামেশা। বেতনভাতা নিয়ে অসন্তোষ, আন্দোলন, কর্মবিরতি ঠেকাতে মালিকপক্ষ প্রায়ই ব্যবহার করে পুলিশ। আর পুলিশ ঘটনা সামলাতে গুলি করে হত্যা করে শ্রমিক। এসব ঘটনা নিত্যদিন ঘটেই চলেছে। এইতো গেল ১৭ এপ্রিল চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বেতনভাতা নিয়ে অসন্তোষের জেরে পুলিশ শ্রমিক সংঘর্ষ হয় যাতে পুলিশের গুলিতে মারা যায় ৫জন শ্রমিক।

এখন প্রশ্ন হলো, এই যে শ্রমিক অসন্তোষ ঠেকানোর আর কি কোনই উপায় ছিল না পুলিশ কিংবা মালিকপক্ষের কাছে? কী এমন উগ্রতা শ্রমিকরা দেখিয়েছিলেন যে গুলি করে মারতে হল তাদের? উত্তর খুব সহজ। পুলিশ এবং মালিকপক্ষ ভালো করেই জানে শ্রমিক মারলে খুব বেশি কিছু হবে না, হবার কোন নজির নেই আমাদের বিচার ব্যবস্থায়। দুদিন মিছিল মিটিং প্রতিবাদ সভা, তদন্ত কমিটি, নিহতদের পরিবারকে টাকা দিয়ে মুখবন্ধ করানো তারপর সবশেষ এইতো চলে আসছে। কোনো শ্রমিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এ পর্যন্ত বিচারের মুখ দেখেনি। এই অবস্থায় শ্রমিকরা যে ভালো নেই তা আশা করি ঘটা করে বলার প্রয়োজন রাখে না।   

এই করোনা মহামারির আপৎকালীন পরিস্থিতিতে শ্রমিকশ্রেণি কেমন আছে সেটাও দেখা দরকার। কার্ল মার্ক্স তাঁর “দ্যা কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো” বইতে সমাজের যে শ্রেণিবিন্যাস এবং শ্রেণিবৈষম্য দেখিয়েছেন তা আজকের সমাজেও একইভাবে উপস্থিত। মার্ক্স দুটি শ্রেণির কথা বলেছেন- বুর্জোয়া আর প্রলেতারিয়েত। “দ্যা কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো”-এর ১৯৮৮ সালের ইংরেজি সংস্করণে এঙ্গেলসের পাদটীকা থেকে দেখে নেওয়া যাক-“বুর্জোয়া বলতে আধুনিক পুঁজিবাদী শ্রেণি বোঝায়, যারা সামাজিক উৎপাদনের উপায়গুলির মালিক এবং মজুরি-শ্রমের নিয়োগকর্তা। প্রলেতারিয়েত হলো আজকালকার মজুরি-শ্রমিকেরা, উৎপাদনের উপায় নিজের হাতে না থাকার দরুন যারা বেঁচে থাকার জন্য স্বীয় শ্রমশক্তি বেচতে বাধ্য হয়।” সহজ ভাষায় বলতে গেলে যে নিজের জীবিকা নির্বাহের জন্য শ্রমশক্তি বিনিময় করছে অর্থাৎ শ্রমের বিনিময়ে উপার্জন করছে তাকেই শ্রমিকশ্রেণি বলা যায়। এই শ্রেণিতে রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে গার্মেন্টস শ্রমিক সবাই পড়ছে।

করোনার আপৎকালীন পরিস্থিতিতে আমরা দেখলাম পুঁজিবাদীদের দৌরাত্ম্য আর শ্রমিকশ্রেণির হাহাকার। লকডাউনে যখন সবকিছু বন্ধ তখন জমানো পুঁজির পাহাড়সম বিশালতায় বসে জীবন কাটাচ্ছে পুঁজিপতিরা আর কাজের অভাবে ডুকরে মরছে শ্রমিকরা। কারণ শ্রমিকদের কাজ নাই তো টাকাও নাই। শ্রমিক বলতে আমি সমস্ত খেটেখাওয়া দিনমজুর শ্রেণিকে বোঝাচ্ছি। করোনায় পরিবহণ বন্ধ, গার্মেন্টস বন্ধ, ইমারত নির্মাণ বন্ধ, বাসা বাড়িতে কাজের লোক বন্ধ, বাসার কেয়ারটেকার বন্ধ, দুধওয়ালা বন্ধ। তাদের না আছে ইনকাম না আছে পুঁজি, সবার কাছে রাষ্ট্রীয় অনুদান পৌঁছানোরও নেই কোনো ব্যবস্থা। রাষ্ট্রীয়ভাবে যে অনুদানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল তা অনেক জায়গায় সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা ঠিকমত পৌঁছাননি, সেখানেও নয়ছয় হয়েছে- এমন অভিযোগও এসেছে। পরিবারের খাবার জোগাড় করতে যখন কেউ রিকশা নিয়ে বেরুচ্ছে তখন রিকশা আটক, টায়ার পাঙ্‌কচার করে দেওয়া, কোথাও কোথাও অর্থ জরিমানা করা হচ্ছে। অথচ বড়বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান শপিংমল ঠিকই খোলা। এ যেন শ্রমিকশ্রেণির উপর পুঁজিবাদের স্টিমরোলার। করোনার প্রথম বছর লকডাউনে ব্যক্তিগত এবং সংগঠনভিত্তিক অর্থ ও খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করা গেলেও এবছর তা প্রায় শূন্যের কোটায়। এঅবস্থায় শ্রমিকশ্রেণি এবং দিন এনে দিন খাওয়া শ্রেণির মানুষের জীবনযাপন দিন কে দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠেছে।

সামনে ঈদ আসছে। পুঁজিবাদীরা নিজেদের মুনাফা গুছাতে ব্যস্ত। এই লকডাউনেও বিভিন্ন শিল্পকারখানায় তারা শ্রমিকদের কাজ করাচ্ছে। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তো আছেই, সেই সাথে এই আপৎকালীন পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দেয়ার বেলায় তালবাহানা যে করবে না মালিকপক্ষ তার নিশ্চয়তা কী? স্বাভাবিক সময়েই নানা রকম অজুহাত দিয়ে শ্রমিকদের বেতনভাতা দিতে চায় না মালিকপক্ষ সেখানে এবারতো আপৎকাল। পুঁজিবাদীদের কাছে শুধু শ্রমিক নয়, অনেকে বলেন, সরকার পর্যন্ত নাকি অসহায়। নিজেদের ফায়দা হাসিলে লকডাউনে কীভাবে বিপণীবিতান খুলতে সরকারকে বাধ্য করলো তা তো সবারই জানা। সাধারণ জনগণকে এই পুঁজিবাদীরা যে হিপনোটিক সাজেশন দিচ্ছে জনগণ সেভাবেই চলছে। আপৎকালীন পরিস্থিতিতে ঈদের কাপড় কেনার ধুম মানসিক বিকারগ্রস্থতা ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে এই কাল্ট তৈরি করেছে পুঁজিবাদ। আপনি কী পরবেন, কী খাবেন, কীভাবে জীবনযাপন করবেন সব কিছুই নির্ধারণ করে দিচ্ছে পুঁজিবাদী সমাজ। কার্ল মার্ক্স তাঁর কাল্পনিক চাহিদা তত্ত্বে বলেছেন-“পুঁজিবাদ এমন সব জিনিস তৈরি করবে, যা মানুষের দরকার নেই কিন্তু তারপরেও সে বস্তুর চাহিদা তৈরি হবে।”

কার্ল মার্ক্স আজো প্রাসঙ্গিক এইখানেই, তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের সংস্কৃতি হয়ে ওঠা ঈদ বাজার, স্মার্ট ফোন, রেস্টুরেন্ট কালচার, বিভিন্ন ফ্যাশান সামগ্রী আমাদের অপরিহার্য বস্তু না হলেও চাহিদার প্রধানতম অংশ ঘিরে অবস্থান করছে। এই যখন অবস্থা শ্রমিকরা তখন কী করবে?

বাংলাদেশের মোট শ্রমিকের প্রায় ৮০ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরে কাজ করে। তাদের নামমাত্র মজুরিতে কাজ করানো হয়। ছুটির কার্যকর বিধান, নিয়ম অনুযায়ী ওভারটাইম, নিয়োগপত্র কিছুই দেয়া হয় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এবং এসব নিয়ে কোন কার্যকর শ্রমিক আন্দোলন নেই। কারণ শ্রমিকদের একটি বড় অংশ আজও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এবং আইএলও কনভেনশন ’৮৭ ও ৯৮ এর ভিত্তি অনুযায়ী শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার থাকলেও তার প্রতিষ্ঠিত রূপ আমরা দেখি না। শ্রমিক অধিকার রক্ষায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল “শ্রম আইন”। এই আইন শ্রমিকস্বার্থ রক্ষার আইনি প্রক্রিয়া হলেও দুঃখের বিষয় আমাদের সমাজে তা মালিকস্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মোট শ্রমিকের বড় অংশ ট্রেড ইউনিয়নের আওতাধীন না হওয়ার কারণে মালিকপক্ষ ছলে বলে কৌশলে নির্যাতন, শোষণ, পীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। শ্রমিক অধিকার আদায়, শ্রমিকস্বার্থ রক্ষা, শ্রমিক-মালিক সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক এবং শ্রমিকশ্রেণির জীবনযাপন মান উন্নয়নে তথা শ্রমিকশ্রেণির কল্যাণে ট্রেড ইউনিয়নের কোন বিকল্প নেই। শ্রমিকস্বার্থে ট্রেড ইউনিয়ন শুধু প্রয়োজনীয়ই নয়, আইন স্বীকৃতও বটে। শ্রমিকস্বার্থ রক্ষা, নায্য পাওনা আদায়, পাওনা ক্ষতিপূরণ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, উন্নত জীবনমান, কোম্পানি মুনাফায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণসহ শ্রমিকদের প্রতিটি নায্য দাবি তখনই বাস্তবায়ন হবে, যখন ট্রেড ইউনিয়ন বাস্তবায়িত হবে।

কাজেই শ্রম আইন এবং ট্রেড ইউনিয়ন পূর্ণ বাস্তবায়ন হোক এবারের মে দিবসের অঙ্গীকার। শ্রমিকনেতাদের প্রতি আহ্বান, আসুন শ্রম আইন ও ট্রেড ইউনিয়ন বাস্তবায়নের লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হই এবং শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করি। সরকারের কাছে বিশেষ অনুরোধ, করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় শ্রমিকদের জন্য আপৎকালীন সহায়তা ভাতা চালু করুন। কারণ শ্রমিক বাঁচলেই বাঁচবে দেশ।

তামিম শিরাজী রাজশাহীতে বসবাসরত একজন প্রগতিশীল ছাত্রনেতা

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.