…………………………………………

নব্বইয়ের কালখণ্ডের অগ্রগণ্য কবি মাসুদার রহমানের জন্ম ১৯৭০ সালের পয়লা সেপ্টেম্বর, জয়পুরহাটে। সোনাপাড়া গ্রামে বেড়ে ওঠা এই কবি দু’হাতে লিখে চলেছেন দেশ ও বিদেশের ছোটকাগজ ও ওয়েবজিনগুলোতে। ‘নিভৃতিচারী’ অভিধাটি বহুলপ্রচল হলেও মাসুদার রহমানের ক্ষেত্রে খাটে শতভাগ। লাজুকতা, বিনয়, নিরহঙ্কার ও কাব্যশক্তিমত্তার এমন অপূর্ব ও সুষম মিশ্রণ সচরাচর দেখা যায় না। প্রকাশিত গ্রন্থ সাকূল্যে তেরটি—দশটি কাব্যগ্রন্থ ও তিনটি ছড়া/কিশোরপাঠ্য গ্রন্থ। সম্পাদনা করেছেন ছোটকাগজ ‘অপর’; এছাড়া ‘আশির দশকের কবিতা’ সংখ্যা ও সংকলনে অতিথি সম্পাদক হিসেবে অলোক বিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং বাংলা কবিতার ওয়েবজিন ‘বাক’-এর ‘কবিতা সংখ্যা’র অতিথি সম্পাদকও ছিলেন তিনি। পুরস্কার/সম্মাননার ঝুলিতে সঞ্চয় করেছেন বাংলা একাডেমি তরুণ লেখক পুরস্কার (১৯৯৭), অচেনা যাত্রী সাহিত্য সম্মাননা (১৪২১), বগুড়া লেখকচক্র প্রবর্তিত কবি-সম্পাদক আনওয়ার আহমদ স্মৃতি পদক (২০১৫), শম্ভাবী সাহিত্য সম্মাননা (২০১৬), ইতিকথা সাহিত্য সম্মাননা (১৪২৩), লেখমালা সাহিত্য সম্মাননা (২০২০)। সম্প্রতি এক কাব্যমায়াঘোরাচ্ছন্ন সন্ধ্যায় এই কবির সঙ্গে তাঁর শৈশব, বেড়েওঠা ও লেখাজোখার হরেক পর্ব নিয়ে আলাপচারিতায় মাতেন আরেক কবি ও লেখক তৌহিদ ইমাম

.………………………………………..

তৌহিদ ইমাম: এই কবোষ্ণ সন্ধ্যায় আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি। এখন আমরা যে সময়সন্ধি অতিক্রম করছি, তাতে আমাদের আলাপন কতটা তাৎপর্য বহন করবে, জানি না। এটা কোনো ক্যাজুয়াল ইন্টারভিউ নয়, আড্ডা মাত্র। প্রথমেই আপনার ছেলেবেলাটা সম্পর্কে জানার আগ্রহ হচ্ছে। মানে কোথায় জন্ম আপনার, বাবা কী করতেন, পারিবারিক আবহ, পরিবেশ কেমন ছিলো ইত্যাকার বিষয় আর কি।

মাসুদার রহমান: শুভ সন্ধ্যা! তোমাকেও ভালোবাসা অশেষ। ঠিকই বলেছো, পৃথিবীজুড়ে খারাপ সময় অতিক্রম করছে মানুষ। মানুষের এই অসহায়ত্ব মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেই নিজের ভেতরে টের পাচ্ছি। আমরা আমাদের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অশনিসংকেত শুনে আসছি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম, কিন্তু কান দিইনি। প্রকৃতিবোধ বা প্রকৃতিচেতনা আজো সেভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়নি, কারণ মানুষ আজ মানসিকভাবেই প্রকৃতিবিচ্ছিন্ন। বিপন্নতা ও অস্তিত্ব সংকট সম্পর্কে এখনো ওয়াকিবহাল নয়। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমাদের মিডিয়াও সঠিকভাবে দায়িত্ব বা দায়বদ্ধতা পালনে ব্যর্থ অথবা উৎসুক নয়। অল্পকিছু সংবেদনশীল মানুষ বিপর্যস্ততায় উদ্বিগ্ন। তাঁরা নিশ্চয় সময় থেকে এগিয়ে থাকা মানুষ, তাঁরা মূলত কতিপয় কবি শিল্পী ও দ্রষ্টা। যাঁরা মনে করতে পারেন ‘বৃক্ষরোপণ’ ছেলেমেয়ের বিবাহের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাঁদের দেখে মানুষ প্রশংসায় হাততালি বাজিয়ে যায়, তার বেশি কোনো প্রয়োজন বোধ করে না। আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের থেকেও শিক্ষা নেওয়া উচিত, যাঁরা সন্তান জন্মের পর সন্তানের ভবিষ্যৎ সঞ্চয় হিসেবে বৃক্ষরোপণ করেন। এর চেয়ে ভালো উদ্যোগ আর কী হতে পারে? প্রকৃতিচেতনা এক সময় প্রায় সকল জাতি সম্প্রদায়ের মধ্যেই ছিল। আমাদের চৈতন্যের মধ্যেও তা খুব শক্তপোক্তভাবেই ছিল। প্রাচীন প্রবাদ প্রবচনে তার প্রমাণ মেলে। এই অভিযোগ রেখেই আজকের আড্ডা শুরু করতে হচ্ছে। মনে করি তা খুব অপ্রাসঙ্গিক নয়। অভিযোগের আঙুলটি নিজের দিকেই।

মূলত এক কৃষিজীবী পরিবারে জন্ম আমার। কৈশোরে দেখেছি পিতামহ তখনো জীবিত এবং তিনিই পরিবারপ্রধান। তাঁর অভিভাবকত্বের ছায়া নিবিড় ছিল আমার ওপরে। পিতামহী ছিলেন মায়ের অধিক। তাঁর কোলেই প্রতিপালিত হয়েছি। বাবা স্কুলশিক্ষক, পিতামহের একমাত্র পুত্র। কৃষিজীবী পরিবারে যা হয়, জমিজিরেত চাষ-আবাদ গোয়াল-গরু, জমিচাষের কাজে মহিষ, কৃষিকাজের কিষাণ-কামলা, শস্যবপন, মলন-মাড়াই—এসব দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। উঠোনে হাঁস-মুরগির হুল্লোড়, তাদের যৌনক্রিয়া এসব খুব স্বাভাবিক ছিল। উঠোন পেরিয়ে অবারিত সবুজ, দূরে দিগন্ত, গাছপালা, পুকুরদিঘী, মাথার উপরে আকাশ—যে আকাশে একটি হেলিকপ্টার বা বিমান উড়তে দেখলে সমস্ত গ্রাম তখন বেরিয়ে উঁচু সড়কের ওপরে এসে দাঁড়াতো, আকাশযান দেখবার হুল্লোড়! উৎফুল্লতা। যদিও বছরে দু’একবার এই পক্ষীসদৃশ যানটি হঠাৎ দেখা দিয়ে যেতো। তখনো পৃথিবী নির্মল ছিল, বিশেষত আজকের দিনের থেকে। দেখেছি হেমন্তে মাঠ থেকে ফসল উঠিয়ে নেবার পর পুরো মাঠ বিরান পড়ে থাকতো। ধানের নাড়া মাড়িয়ে চলে আসতাম গ্রামের পূর্ব-মাঠে হারাবতি নদীর কাছে। শুকিয়ে যাওয়া নদীর পাড়ে ছোট ছোট ঝর্ণা বইতো। এখন সেসব আর দেখা যায় না। জমিগুলো বহুফসলি হয়ে উঠেছে। পাম্পে ভূগর্ভ থেকে পানি উঠিয়ে সেচকাজ চলে। সে কারণে পানির স্তর নেমে গেছে। এতসব কিছু এই সামান্য জীবনে চোখের সামনেই ঘটে গেল।

আমাদের পরিবারের একজন সদস্য কায়মদ্দিন নানা। সংক্ষেপে ডাকতাম কায়নানা। শিল্পী সুলতানের আঁকা পেশীবহুল মানুষদের একজন। তামাটে বর্ণ, সুঠামদেহী মানুষটি গৃহস্থবাড়ির একজন কাজের মানুষ হয়েও বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে খেতখামার হালবলদ কামিন কামলা সামলাতেন। শুনেছিলাম শৈশবেই বাড়ির একজন হয়ে আসেন তিনি। তাঁর মুখেই শুনতাম ব্রিটিশ-হিন্দুস্থান-পাকিস্তানের গল্প। মুক্তিযুদ্ধের গল্প। তাঁর শৈশবে বাপদাদার অনটনের সংসারে যা হয়েছিল—শীতবস্ত্রহীন মানুষের মাছ ধরা জাল মাদুর খড়বিচালি কিংবা চট ব্যবহারের অভিনব শীতনিবারণ। এই কায়মদ্দিন নানা বাতাসের গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারতেন সেদিন রোদ নাকি বৃষ্টি, মেঘ কিংবা কুয়াশা। পর্যবেক্ষণ ছিল পতঙ্গ-পিঁপড়েদের চলা। পাখির উড়াল। বুঝে ফেলতেন ঝড়ের পূর্বাভাস, খরা বা বৃষ্টির সম্ভাবনা। তাঁর থেকে এর অনেক প্রমাণও পেয়েছিলাম। শৈশব নিয়ে অনেক বলার আছে, এই পরিসরে বলতে যাওয়া কতটা প্রাসঙ্গিক হবে জানি না; তবে তা হয়তো অন্য লেখায় বলবো কখনো।

তৌহিদ ইমাম: মানুষের জীবনে, বিশেষত সৃষ্টিশীল মানুষের জীবনে, শৈশব-কৈশোরকালটা গভীর প্রভাব রাখে। আপনার নিজের সৃষ্টিশীলতায় সে সময়টা কতটা প্রভাব রেখেছে বলে মনে হয়?

মাসুদার রহমান: এ কথা সঠিক, শৈশব-কৈশোর মানুষের জীবনে বড় প্রভাবক। তবে তা বোধ করি অংকের মতো কিছু না, ২+২=৪ এমনতো নয়। আগেই বলেছি, আমার শৈশব-কৈশোর নিবিড় এক গ্রামীণ আবহে বেড়ে উঠেছিল। মাধ্যমিক স্কুলজীবনও বাড়ি থেকে ১৫ কি.মি. দূরের স্কুল আর সেই স্কুলহোস্টেলে। মাইল মাইল অন্তহীন সবুজ ফসলি মাঠের প্রান্তে লাল ইটরঙা এক স্কুলহোস্টেল। থাকতাম সেই স্কুলহোস্টেলে। অনেকটা মেসের মতো, নিজেদের তিনবেলা খাবারের জন্য আনাজপাতি চালডাল আমরা নিজেরাই মাইল মাইল হেঁটে গিয়ে কেনাকাটা করে আনতাম। প্রকাণ্ড বটপাকুরের নিচে বসা সেইসব হাট, হাটের মানুষ, সারি সারি খোলা দোকানপাটের আশ্চর্য বর্ণগন্ধ। সেসবের কিছু কিছু ঘুরেফিরেই এসেছে আমার লেখায়। আমার শৈশব, গ্রামপারিপার্শ্ব লোকজন এসেছে, কিন্তু তার বাইরে আমার দেখা কোনো সিনেমা গ্রন্থপাঠ কল্পনা তাও লেখার অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই নগরায়নে যে প্রজন্ম বড় হয়ে উঠলো বা উঠছে, তাদেরও অনেকেই শিল্পসাহিত্য করতে আসবে। তারা প্রকৃতি এবং জনজীবনের অভিজ্ঞতা তাদের নিজের মতো করেই নেবে। লিখবেও।

তৌহিদ ইমাম: স্কুল-কলেজ কিংবা উচ্চতর শিক্ষাজীবনে এমন কোনো শিক্ষককে কি পেয়েছিলেন, যিনি সযত্নে উসকে দিয়েছিলেন আপনার সৃষ্টিশীলতাকে?

মাসুদার রহমান: শিক্ষকদের মধ্যে সেভাবে কাউকে উল্লেখ করবার মতো নেই। বিস্তর দূরত্ব ছিলো শিক্ষকদের থেকে, সেইটা আমারই অযোগ্যতা। তবে উচ্চমাধ্যমিকের আগে যে প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছি, তাও এক গ্রামীণ পরিবেশেই, যে স্কুলের কথা একটু আগেই বললাম। হোস্টেলে থাকায় প্রাত্যহিক খাবারের সবজি-মাছ-মাংস-মসলাপাতি কেনাকাটার জন্য ওই অঞ্চলের হাটবাজারে যাতায়াত করতাম। ডুগডুগির হাট বলে একটি হাট আমাকে বেশ টানতো। তা নানা কারণেই। তবে প্রশ্নের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক যে কথাটি, তা হলো—ওই হাটে গেলেই একজন কবির দেখা পেতাম। কবি কফিল উদ্দিন। স্বাধীনতার আগে-পরে ‘সওগাত’, ‘মোহাম্মাদী’সহ আরো অনেক পত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন তিনি। খুব উদাসীন হাটের অলিগলি হেঁটে বেড়াতেন। দাঁড়িয়ে থাকতেন। ডুগডুগির হাট থেকে দুই কিলোমিটার দূরেই তাঁর বাড়ি। গ্রামের নাম পালশা। তিনিই আমার প্রথম কবিদর্শন। পাতলা চেহারা, লম্বা কাঁচাপাকা চুল কাঁধ ছুঁয়ে নেমে গেছে। তফাতে দাঁড়িয়ে দেখতাম তাঁকে। কী এক মুগ্ধতা ছিল তাঁর প্রতি! সে সময় তাঁর প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছিলো, নাম ‘অশ্রু বাদল’। কবির বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর প্রথম বই। সে অর্থে বিলম্বিত প্রকাশ বলা যায়। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের কাছে একদিন খবর এলো, কবি কফিল উদ্দিনের কবিতার বই প্রেসে আছে, প্রি-অর্ডারে কারা নিতে আগ্রহী? তালিকা করা হলো। খুব আগ্রহ নিয়ে তালিকায় নাম দিলাম। হাতে বই পেলাম। ভেবেছিলাম বইটি বেরিয়ে গেলো, এবার দেশজুড়ে কবির নাম ছড়াবে। তারপর আরো সময় পেরিয়ে গেলো, জেলা শহরের লেটার প্রেসে ছাপা হয়ে বেরুলো তাঁর আরো কয়েকটি বই। কিন্তু তাঁকে কবি হিসেবে কেউ চিনলো না। মাঝে-মধ্যে নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করি, আমি কি ভুলে গেছি আমার প্রথম কবিদর্শন কফিল উদ্দিনকে?

তৌহিদ ইমাম: আজন্ম সোনাপাড়ায় কাটিয়ে দিলেন। তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়), ছিল আপনার উচ্চতর শিক্ষাক্ষেত্র। শিক্ষাজীবন শেষ করে সেই যে সোনাপাড়ায় ফিরলেন, আপন আলয় থেকে আর বেরুলেন না। কী নীরবে এখনো সৃষ্টিশীলতাকে যাপন করে যাচ্ছেন! এই যাপনের পেছনে বিশেষ কোনো দর্শন কি কাজ করেছে আপনার?

মাসুদার রহমান: হ্যাঁ, ফিরেছি ইচ্ছে করেই। অস্বীকার করবো না, নগরজীবন থেকে অনেক কিছু শিখেছিলাম। গ্রামে ফিরে সাহিত্য করবার সাহসও পেয়েছিলাম সে জীবন অভিজ্ঞতা থেকেই। দুটো জীবনধারার মিলমিশেই বোধ করি একটি আধুনিকতা দাঁড়িয়ে যায়। প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিকতাকেও যেমন এড়িয়ে যাওয়া যায় না, আবার প্রকৃতিকে ভুলে গিয়ে শিকড়কে বাদ দিয়ে আধুনিকতা সম্পূর্ণ হবার নয়। শিল্পের জন্য, কবিতার জন্য যাপন অনিবার্য। মনে করি, ‘কবিতা লিখে এখন আর কেউ সেলিব্রেটি হবে না’—এই বিশ্বাস ধারণের পরও যদি কাউকে কবিতা তাড়িত করে, কবিতা তাকে বেঁচে থাকার অক্সিজেন যোগায়, তাহলেই কবিতা তার জন্য অনিবার্য। 

তৌহিদ ইমাম: কেমন ছিলো আপনার তারুণ্যের কবিতাযাপন?

মাসুদার রহমান: যে সময় সাগর নদীর প্রত্যাশা, সেই তারুণ্যে আমাদের সামনে ডোবানালাও ছিল না। আর খুব বেশি বইপত্র তো হাতের কাছে ছিলই না। স্কুললাইব্রেরি থেকে প্রতি সপ্তাহে বই নিতাম। বেশিরভাগই নভেল। দু’তিনদিনেই পড়ে শেষ করে ফেলতাম। সপ্তাহের বাকি চার-পাঁচদিন বৃহস্পতিবার কবে আসবে তার অপেক্ষা করতাম। নেশা হলো। খোঁজ করে নিজ বাড়িতেও বই পেয়ে গিয়েছিলাম। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বাংলা প্রকাশনার বইপত্রিকাও কিছু পেয়েছিলাম। অসামান্য ছাপা কাগজ আর সরল গদ্যভাষা টেনে নিতো। স্কুলজীবনে দু’একটি পত্রিকায় লিখেছিলাম। বলাবাহুল্য, নিতান্ত কাঁচা হাতে অপরিণত লেখা। সে সময়েই কবিতা লিখতে আসা। সমসাময়িক একঝাঁক তরুণের সঙ্গে চিঠিপত্রে যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। তাদের চিন্তা ও সামর্থ্য মতো ছোট ছোট কাগজ প্রকাশও করতো তারা। যেমন, কবি মুজিব ইরম তখন মুজিবুর রহমান মুজিব নামে পরিচিত ছিল, ও সম্পাদনা করতো ‘কল্পতরু’ নামে একটি পত্রিকা। কবি শোয়াইব জিবরান পরিচিত ছিল শোয়াইব আহমেদ শোয়েব নামে, ও সম্পাদনা করতো ‘ঊর্মি’ নামে একটি পত্রিকা। মির্জা তাহের জামিল সম্পাদনা করতো ‘নুন’ নামে একটি কাগজ। এসব কথা যখন বলছি, তখন একটি মজার ঘটনা মনে পড়ে গেল। আমি তখন বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে ইন্টারমিডিয়েট পড়তে গেছি। মাস পরে বাড়ি ফিরে গেলে দেখতাম, বাড়ির ঠিকানায় তরুণদের প্রকাশিত কিছু কাগজ/পত্রিকা ডাকে এসেছে। আমি ফিরলে আব্বা তাঁর ড্রয়ারে সংরক্ষিত সেই পত্রিকা চিঠিপত্র আমাকে দিতেন। একবার কোনো ছুটির পর বাড়ি ফিরে গিয়ে ৫/৭টি পত্রিকা ও চিঠি পেলাম। একটি ছোট্ট চিঠি খোলা খামে। আব্বা এবং মা দু’জনেই দেখিয়ে বললেন, ওটা ঝিনাইদহ থেকে এসেছে। বুঝলাম, খামের মুখ খোলা পেয়ে উনারা চিঠিটি হয়তো পড়ে নিয়েছেন। চিঠির প্রেরক জনৈক অশ্রু মিত্র, কলেজ রোড, ঝিনাইদহ। তেমন কিছুই নয়, দু’তিনটি লাইন। একদম উদ্দেশ্যহীন একটি চিরকুট। কিন্তু অশ্রু মিত্র নামটি বোঝায় প্রেরক একজন নারী। সব পত্রপত্রিকা টেবিলে থাকলেও চিরকুটটি সেদিনই উধাও হয়ে যায়। পরে বুঝেছি, আমার অভিভাবকদের কেউ তা সরিয়ে নিয়েছিলেন। হয়তো ভেবেছিলেন, একজন মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগের পরিণতি অন্য কিছুতে না গড়ায়। আসলে সেই ‘অশ্রু মিত্র’ ছিলো আজকের কবি টোকন ঠাকুর। ও পর পর অনেকগুলো নামে লিখেছে, যেমন- আকতারুজ্জামান টোকন, সাগর সৈকত, আরো দু’একটি; তো পরে এসে টোকন ঠাকুরে স্থির হয়েছে।  

তৌহিদ ইমাম: বাংলা একাডেমিতে একসময় ‘তরুণ লেখক প্রকল্প’ চালু ছিল। আমরা জানি, আপনি নিজেও সেই প্রকল্পের কোনো এক ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। কারা ছিল আপনার সতীর্থ? সে সময়ের অভিজ্ঞতা কেমন? কারা ক্লাস নিতেন? একটু স্মৃতিচারণা কি করবেন?

মাসুদার রহমান: সবেমাত্র পড়াশোনা শেষ করে কাঠ-বেকারজীবনে অল্প সময়ের জন্য হলেও এক আর্থিক সাপোর্ট ছিল সেই প্রজেক্ট। বাংলা একাডেমির ওই প্রজেক্টে আমরা এক এক ব্যাচে প্রায় ৪০ জন করে ছিলাম। আমাদের চতুর্থ ব্যাচ। তার আগে মুজিব ইরম, শোয়াইব জিবরান, শাহনাজ মুন্নি, রাখাল রাহা, বায়তুল্লাহ কাদরী, বদরুজ্জামান আলমগীর, চঞ্চল আশরাফ, রবিউল করিম, সাইমন জাকারিয়া, মির্জা তাহের জামিলসহ অজস্র কবি/লেখক কাজ করেছেন। আমাদের সময় টোকন ঠাকুর, আলফ্রেড খোকনের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। আমি গ্রাম থেকে আসা তরুণ, বাংলা একাডেমির ওই সময় অনেক সমৃদ্ধ সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। শওকত ওসমান, সরদার ফজলুল করিম, শামসুর রাহমান, অন্নদাশঙ্কর রায়, সেলিম আলদীন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ শামসুল হক, রফিক আজাদ, সেলিনা হোসেন, হায়াৎ মামুদ, রশীদ হায়দার, মমতাজ উদদীন আহমদ, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, মুস্তফা নূর-উল ইসলাম, শওকত আলী, আব্দুল কুদ্দুস বয়াতী, ফরহাদ খান, বিশ্বজিৎ ঘোষ, আবদুল্লাহ্ আল মুতী প্রমুখ চিন্তক-কবি-সাহিত্যিকদের জীবনদর্শন কাব্যবোধ সাহিত্যচিন্তা সরাসরি তাঁদের থেকে জানতে পেরে ঋদ্ধ হয়েছিলাম। অনেকেই বলতে পারেন, এভাবে সাহিত্য হয় নাকি? হয়তো হয় না। তবে পড়া-জানার বিকল্প তো আর নেই। অস্বীকার কেন করবো, সে ক্ষেত্রে সুবিধা হয়েছিল আমার।

তৌহিদ ইমাম: আপনার কী মনে হয়, সময়ই মূলত একজন লেখককে তৈরি করে, নাকি তার ভেতরের সংগুপ্ত সৃষ্টিশীলতার প্রেরণা?

মাসুদার রহমান: দুটোই। ধরলাম সময় একজনকে সুকান্ত ভট্টাচার্য বানিয়ে দিলো, কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে আরো কোটি মানুষ জীবনকে বয়ে নিয়েছে, তারাতো সবাই কবি/লেখক হয়ে উঠতে পারেনি। তাই মনে করি, ‘সময় এবং ভেতর থেকে পাওয়া সৃষ্টিশীলতার প্রেরণা’ দুটো মিলেই লেখক তৈরি হয়। 

তৌহিদ ইমাম: আপনার কাছে কবিতা কী? ব্যাখ্যা শুনতে চাইছি না, উপলব্ধিটুকু শুনতে চাই।

মাসুদার রহমান: কবিতা কী, কেন, কীভাবে—এই প্রশ্নমালার কোনো নির্দিষ্ট উত্তর কবির হাতে নেই। তাই বোধ করি, প্রশ্ন করা আর উত্তর খোঁজা এক কবিজীবন। এক একটি দিন এক এক রকমভাবে আসে প্রশ্নগুলো। কোনো দিন সমুদ্রের শান্ত সেই অঞ্চলের মতো কেবল অতলতা আলস্য বিছিয়ে রাখে, আবার কোনো দিন উত্তাল এক সমুদ্র, আছড়ে পড়ে প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন। কিন্তু উত্তর? উত্তর সে যাই হোক, প্রশ্ন করতে পারাটাই মুখ্য; উত্তর হয়তো গৌণ। নতুন লিখতে আসা তরুণের কাছে এটি খুব স্বাভাবিক, তার যথেষ্ট অগ্রজ সামান্য অগ্রজ কিংবা সমসাময়িকরা পর্যন্ত তাকে শেখাতে থাকেন—কী লিখতে হবে কী লেখা উচিত। এমনকি কী পড়তে হবে কী পড়া উচিত তা নিয়েও বলতে থাকেন। ধারণা তৈরি করে দিতে থাকেন কবিতা কী। অনেক ক্ষেত্রে চাপিয়ে দেবার মতো। তারপরও একজন কবির কবিতা নির্মাণ কিংবা কবিতাকেন্দ্রিক চিন্তা-ভাবনা অন্যজন থেকে সামান্য হলেও আলাদা হবেই। বিস্তরও হতে পারে।

প্রকাশ্য কবিত্ব কবিতার বড় শত্রু। সেটি এক অদেখলাপনা ও মূর্খতা ছাড়া আর কী হতে পারে? শব্দ বাক্য ধরে কবিতার অর্থ খোঁজা লোকজনের প্রসঙ্গে আদিবাসীদের বন্যপশু শিকারের একটি দৃশ্য মনে পড়ে। ধান কাটা-মাড়াইয়ের পর শীতকালে যখন হাতে তেমন কাজ থাকে না, দল বেঁধে প্রতিবেশী বিধুয়া টপ্পদা তীরধনুক বল্লম সুড়কি হাতে বেরিয়ে পড়েন শিকারে।

সেবার গ্রামের পাশে শুকনো খালের পাড়ে ওঁদের এক অদ্ভুত শিকারকৌশল দেখেছিলাম। পাড়ের উপর থেকে নিঃশব্দে খালের তলদেশ পর্যবেক্ষণ করে সরে এসে পজিশন নিলেন বিধুয়া টপ্প। আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সতর্ক পজিশনে বিধুয়ার শিকারি দলবল। বিধুয়া ধনুকে তীর লাগিয়ে টার্গেট করলেন আকাশের দিকে। সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে আমরা যারা এই শিকারপর্ব উপভোগ করতে এসেছিলাম, তারা বুঝতে চেষ্টা করলাম উড়তে থাকা কোন পাখি নিশানা করছে বিধুয়া টপ্প। তীর ছুড়লেন বিধুয়া। দেখছি তীর উঠে যাচ্ছে আকাশের দিকে; কিন্তু কোথায় (?) তীর কোনো কিছুকেই বিদ্ধ না করে ফিরে আসছে। তীরটি গিয়ে পড়লো খালের তলদেশে। এবার খালের নিচে একটা গোঙানির শব্দ। একটা ছটফটানি। সেদিকে দৌড় লাগালো বিধুয়া টপ্পর শিকার সহযোগীরা। দেখি হইচই আনন্দ করে টেনে আনছে তীরবিদ্ধ একটি ধাড়ি শেয়াল।

তাহলে কি শেয়াল পাখা মেলেছিলো আকাশে? আকাশে তীর ছুড়ে একটি শেয়ালে বিদ্ধ করা কীভাবে? কীভাবে? কবিতার পাঠকমাত্র জানেন, কবি তো ওই বিধুয়া টপ্প!

তৌহিদ ইমাম: পোয়েট্রি ইজ দ্য সুপ্রিম ফর্ম অব আর্ট—দাবিটি মূলত কবিরাই করেন। আপনার কী মনে হয়, এ কি নিছকই অহংবোধ, নাকি এর বাস্তবসম্মত ভিত্তি আছে?

মাসুদার রহমান: ‘এমন দাবি একজন কবিই করেন’—তোমার এই কথার মধ্যেই এর উত্তর অনেকটা রয়ে গেছে। কবিতার দুর্বোধ্যতা নিয়ে অভিযোগ প্রায় চিরদিনের। সেখানে একজন সাধারণ মানুষ, যে কোনোভাবেই কবিতার পাঠক নয়, তার নিকট থেকে কবিতা নিয়ে এমন অভিমত প্রত্যাশা করার কোনো অর্থই হয় না, উচিতও নয়। কবি বা কবিতাবোদ্ধা ‘পোয়েট্রি ইজ দ্য সুপ্রিম ফর্ম অব আর্ট’ বললে অবাক হবার কিছু নেই। তাঁর উপলব্ধি থেকেই হয়তো তিনি বলছেন। পাহাড়ের উপরের থেকে কোনো দৃশ্য বা বস্তুকে পাহাড়ের মালভূমি কিংবা দূরের সমতলে দাঁড়িয়ে অবলোকন করা সম্ভব? কবিতাকে উপলব্ধি করতে হলে একজন পাঠককে তার জন্য একটা প্রস্তুতিপর্ব পেরিয়ে আসতে হয়। পাহাড়ে উঠে পাহাড়ের উপরের দৃশ্য দেখার মতোই। কবিতা কম মানুষই পড়েন, সেও বোধ করি খারাপ কিছু না। সবাই কবিতা পড়বেন, এমনটি চাওয়া মোটেও ঠিক না। সর্বজনীন যা কিছু তা সহজ হবার কথা। তারপরও ‘সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা’ তাকেও শতভাগ সর্বজনীন করা গেল কি?

তৌহিদ ইমাম: আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হাটের কবিতা’, বেরিয়েছিল ২০১০ সালে, ঢাকার পাঠসূত্র প্রকাশনী থেকে। সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘চাঁদের বই’ বেরিয়েছে ২০২০ সালে, কলকাতার ঐহিক প্রকাশনী থেকে। মাঝখানে প্রায় আটটি কাব্যগ্রন্থ বেরিয়ে গেছে। কিন্তু প্রথম বই প্রকাশের পূর্বেও প্রায় দেড় দশক আপনি একটানা লেখালেখি করে গেছেন। সব মিলিয়ে এই যে আড়াই দশকের পোয়েটিক জার্নি, আপনি কি মনে করেন, একটা স্বতন্ত্র কাব্যস্বর আপনি অর্জন করেছেন?

মাসুদার রহমান: আমার সবকিছু একটু দেরিতেই হয়, বইয়ের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল বিষয়টি। তিন দশকের কবিতা জার্নির ভেতর দিয়ে নিজস্ব কাব্যস্বর অর্জন করতে পেরেছি কিনা তা পাঠক জানেন। তুমি নিজেও বলতে পারো। কিংবা কখনো সখনো যাঁরা আমার কাব্যভাষা স্বতন্ত্র বলেছেন/বলছেন, তাঁদের জিজ্ঞেস করে দেখো, কেন তাঁরা এমনটি বলছেন? 

তৌহিদ ইমাম: শিশুসাহিত্যেও আপনি বেশ স্বচ্ছন্দ। কাব্যগ্রন্থের পাশাপাশি তিনটি ছড়াগ্রন্থও বেরিয়েছে আপনার। কবিতার মতোই আপনার ছড়াগুলোও বেশ ম্যাচিউরড। সেগুলো আমার ঠিক শিশু উপযোগী মনে হয় না। কিশোরসাহিত্য বলতেই আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবো। আপনার কী মনে হয়?

মাসুদার রহমান: ঠিকই বলেছো, তিনটি বই হয়েছে এ পর্যন্ত। মনে করি, সকল কবি সাহিত্যিকের উচিত শিশুকিশোরদের জন্য কিছু কাজ করা। আজ শিশুকিশোর পাঠ-উপযোগী সাহিত্যকর্ম যা হচ্ছে তা নগণ্য, মানহীন। তরুণের বিকাশে সাহিত্যের এই শাখাকে অস্বীকার করা যায় না। বিগত প্রজন্মের প্রায় সকল খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিক ছোটদের সাহিত্যে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করেছেন। তরুণ সমাজ উচ্ছন্নে গেছে বলে গলা ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছি; কিন্তু ওদের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য কী কী করছি আমরা? আবার সাহিত্যে ঢের ঢের পাঠক প্রত্যাশা করছি, তার জন্য তো শিশুকিশোর থেকে শিল্পসাহিত্যের আনন্দের পৃথিবীতে টানতে হবে। ছোটদের জন্য লেখা সত্যি কঠিন। হয়তো ঠিকই বলেছো, আমার এই কাজগুলো কিশোরপাঠ্য উপযোগীই।

তৌহিদ ইমাম: মাসুদার ভাই, আপনার বেশ কিছু গদ্য আমি পড়েছি, বিচ্ছিন্নভাবে। কবির গদ্য বলতে ঠিক যা বোঝায়, আপনার গদ্যগুলো তাই। গদ্যগুলো পড়ে আমি বেশ মুগ্ধই হয়েছি। আমার মনে হয়, আপনার আরো বেশি গদ্য লেখা উচিত। আপনার কী মনে হয়?

মাসুদার রহমান: কখনো-সখনো কিছু গদ্য লিখেছি। লিখি। অনেক ক্ষেত্রে সে গদ্য কবিতার প্রভাবমুক্ত হয় না। কেউ কেউ পাঠের পর বলেন, এ যেন কবিতা! সম্প্রতি আমার গদ্যচর্চার একটি সুযোগ করে দিয়েছে ‘চিহ্ন’ পত্রিকা। ধারাবাহিকভাবে ‘ব্যক্তিগত গদ্য’ লেখা শুরু করেছি ‘চিহ্ন’তে।

তৌহিদ ইমাম: ‘অপর’ নামে একটি ছোটকাগজ সম্পাদনা করেছেন আপনি, একসময়। আমার জানা মতে, দুটো সংখ্যা বেরিয়েছিলো ‘অপর’-এর। এরপর আর বেরোলো না, কেন? কাগজটি নিয়ে ভবিষ্যৎ কোনো পরিকল্পনা কি আছে আপনার?

মাসুদার রহমান: ‘অপর’ ঘিরে স্বপ্ন ছিল। কুমার প্রণব, হেলাল আনোয়ার, মাহফুজ মিঠুকে নিয়ে সে স্বপ্নযাত্রা শুরু করার পর তৃতীয় ইস্যুতে আটকে গেল। আমার শরীর-স্বাস্থ্যের জন্য খানিকটা এবং বিস্তর দূর-বিচ্ছিন্ন (জেলা সদর থেকে ২৭ কি.মি., উপজেলা সদর থেকে ১৫ কি.মি.) আমার অবস্থান। টাকা পয়সাও বিষয়, আবার মাটি-কাটার মতো শ্রম, আমি পারিনি।

তৌহিদ ইমাম: আপনার নিজের শহর জয়পুরহাটের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে যদি আমাদের ধারণা দিতেন…

মাসুদার রহমান: এ মুহূর্তে এখানে লেখায় আছে একঝাঁক নতুন লিখিয়ে। দু’একজনকে বেশ সম্ভাবনাময় মনে করি। যতন কুমার দেবনাথ সম্পাদিত ‘শিঞ্জন’ এবং মাহফুজুর রহমান ও মুস্তফা আনছারী সম্পাদিত ‘জট’ নামে দু’টি সাহিত্য পত্রিকা উল্লেখযোগ্য। জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে বসবাস সত্তর দশকের বিশিষ্ট কবি সুজন হাজারীর; এখনো সচল আছেন লেখালেখিতে।

তৌহিদ ইমাম: আপনি নব্বইয়ের কালখণ্ডের কবি। এই কালখণ্ডে অন্য কবিদের সম্পর্কে আপনার অভিমত কী? কবি হিসেবে তাঁদের সাথে আপনার মৌলিক পার্থক্য কী বলে মনে করেন?

মাসুদার রহমান: নব্বই দশকেই স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা কবিতার উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছে। কবিতার ন্যারেটিভটি এড়িয়ে এই দশকে কবিতাকে আরো শিল্পমণ্ডিত সংহতরূপে পেয়েছি। কাজটি আশির দশকের কয়েকজন কবির হাত ধরে শুরু হলেও নব্বইয়ের কবিদের হাতে তা পরিণত হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এ সময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কবি বাংলা কবিতায় নিজ রক্তঘাম সমর্পণ করেছেন। ‘প্রধানতম কবি’, ‘শ্রেষ্ঠতম কবি’ কবি-কবিতায় এমন তকমা উঠিয়ে অনেকের কাজ মান্যতা পেলো। বাংলা কবিতার জন্য এ নিশ্চয় স্বাস্থ্যকর।

তৌহিদ ইমাম: কবিতার ঘোর এমনই এক ঐন্দ্রজালিক ঘোর যে, জাগতিক সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তাতে ঘর-সংসারের প্রতি যে দায়দায়িত্ব, তাতে মাঝে মাঝে ব্যত্যয় ঘটে। আপনার ক্ষেত্রেও কি তাই ঘটেছে? স্ত্রী কিংবা ছেলের কোনো অভিযোগ আছে আপনার প্রতি?

মাসুদার রহমান: সবকিছু মসৃণ হবে, এমন ভাবনার কোনো কারণ নেই। তাও আবার শিল্পসাহিত্যের মতো ক্ষেত্রে। ম্যানেজ করে নিতে পারলেই হয়। কবিতা সংসারের কী কাজে লাগে? তারপরও যে মেনে নেয়, সেতো ভালোবেসেই মেনে নেয়, হয়তো কবিকে কিংবা কবিতাকে। আমি সেদিক থেকে সৌভাগ্যবান।

তৌহিদ ইমাম: ছোটকাগজের একটি মৌলিক উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করা এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধিতাকে প্রশ্রয় দেওয়া। বাংলাদেশে আসলেই কি প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে? পশ্চিমবঙ্গে যেমন আনন্দবাজার। যদি না হয়ে থাকে, তবে এখানে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার স্বরূপ কী?

মাসুদার রহমান: প্রাতিষ্ঠানিকতা তো বিবিধ প্রকারের। মনে করো, কেউ বা কারা জারি করে দিলো, ‘কবিতা এমন, এর বাইরে কিছু নেই’, এই মনোভাবটিকে তুমি কী বলবে? নতুনরা কবিতা লিখতে আসবে নতুন স্বপ্ন নিয়ে, নতুন ভাষাভঙ্গি নিয়ে। সে ক্ষেত্রে দেখা গেল, একটি চলমান পত্রিকা কিছুতেই তাকে মেনে নিতে চাইছে না। বরাবর সে যা ছেপে আসছে, তার অবস্থান থেকে কোনো নড়চড় নেই এবং সেই সনাতন ধারাটিকেই জারি রাখার সংকল্পবদ্ধ। এ ক্ষেত্রে চলমান ওই কাগজটিকে কী বলবে? নতুন লিখতে আসা নতুন লিখতে চাওয়াদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম খুব প্রয়োজন। যদি অন্য কোনো কাগজ ওইসব নতুনকে প্রশ্রয় দেয়, তো সে চলমান পত্রিকাটির প্রাতিষ্ঠানিক মনোভাবের বিরুদ্ধেই প্রশ্রয় দিলো। কিংবা আরো একটি নতুন ছোটকাগজ জন্ম নিলো। তাই বলা যায়, প্রাতিষ্ঠানিকতা নানা ক্ষেত্রে নানাভাবে বিদ্যমান। আনন্দবাজার নিঃসন্দেহে একটি যথার্থ প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টান্ত।

তৌহিদ ইমাম: আমাদের আলাচারিতা এখানেই ইতি টানতে হচ্ছে। এতক্ষণ সময় দেবার জন্য কৃতজ্ঞ। আপনার সৃষ্টিশীল সুস্থ জীবন কামনা করছি।

মাসুদার রহমান: আবারও আন্তরিক ভালোবাসা ও শুভকামনা জানাই তোমাকে।

প্রচ্ছদ শিবলী নোমান