আজকের বিশ্বে তিন শ্রেণির মানুষ জন্মাচ্ছে। প্রথম শ্রেণির মানুষেরা হয় নির্গুণ, দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষেরা শঙ্কর এবং তৃতীয় ধাপের মানুষেরা হয় স্বগুণ। জানি তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ। এখানে প্রথম দুই শ্রেণিকে আমার মনে হয় বিদিশাগ্রস্ত। বরং ভীষণ আগ্রহ আমর তৃতীয় ধাপের মানুষদের নিয়ে। যারা মারাত্মক গুরুত্বপূর্ণ, তারা সতত দিশাগ্রস্ত। তেমনই কিছু মানুষ যারা সাহিত্যের ক্যারাভানে চড়ে যেতে চান বহুদূর। তাদেরই একজন অতি অন্যতম হুমায়ুন আজাদ। বলি কোন তকমায়, কোন তালিকায় নাম লিখব তার! যিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ভাষাবিজ্ঞানী, সমালোচক, রাজনীতিক ভাষ্যকার, গবেষক। আমি থামলাম এখানেই। জানি তিনি ছিলেন আরও অনেক গুণের গুণিতক। সাতটি কাব্যগ্রন্থ, বারোটি উপন্যাস, বাইশটি সমালোচনাগ্রন্থ ও অন্যান্য প্রবন্ধসংকলন মিলিয়ে ষাটটিরও অধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয় তার জীবদ্দশায়। ছাপার অক্ষরে যেন কাঁচুলি খুলে তারা কাছে ডাকছে পাঠকদের। ভাবি সেইসব গ্রন্থের সৌন্দর্য প্রথার আদিমগন্ধে ম ম করছে দিগন্ত।

হুমায়ুন আজাদের কবিতা আমাদের সাংস্কৃতিক দুস্থতা থেকে চিরকালই থেকেছে কয়েক কিলোমিটার দূরে। যেখানে রাগ, অভিমান প্রেমের সঙ্গে ঢলে পড়েছে প্রকৃতি। যা কখনো হাসি কখনো বা রাগের সাদা ফেনায় ফুঁসে উঠেছে। যেখানে প্রদর্শিত হয়েছে স্থাপত্যের নতুন আইডিয়া। কঙ্কালে লেগেছে কলঙ্কের মাংস। হুমায়ুন আজাদ—যিনি এমন নগ্নতা যা সুসজ্জিত। এমন উপাখ্যান যা শব্দহীন। এমন শান্তি যা খুঁজে বেড়ায় অপরাধ। যিনি লিখতে চেয়েছেন আত্মজীবনী নয় তবে আত্মার বিবরণী। অবক্ষয়ের দিকে গড়ে ওঠা আপাতত দেখতে ধূসর যে দেয়ালখানি সেখানে আঘাতের অস্ত্র চালিয়েছেন বিপদকে বদ্ধমূল ধারণায় বন্দি রেখে। আঘাত করার এই প্রস্তুতি জীবন-চর্চার প্রতি, উৎকুলিত মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাবান। ভাবতে ভালো লাগে, সন্দেহ নেই আজাদের কবিতায় সাফল্যের একটি নিরাপদ বন্দর রয়েছে। শুধু কবিতা নয়, তার অন্য রচনাতেও চোখ বোলালে দেখা যায়, প্রচল মণ্ডপের সীমাবদ্ধতা থেকে বের হয়ে তিনি নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে পড়তে উন্মুখ।

আজাদ ছিলেন প্রথাগত ধ্যানধারণা অতি সচেতনভাবে পরিহার করা এক মানুষ। যার সাহিত্যের উপাদান হয়ে এসেছে প্রগতিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সামরিক শাসন, রাজনীতি তথা রাষ্ট্রনীতি। এসেছে নদনদী, নর-নারীর প্রেম, প্রকৃতি আর লোকজ স্পর্শের বিস্তীর্ণ হরিৎ দৃশ্যবলয়ে পটধৃত মানুষ, যাদেরকে অনুসঙ্গ করে তিনি অনুধাবন করবেন। তার টেক্সটে তিনি কোথায় দাঁড়াবেন প্রশ্ন সেটা নয়, প্রশ্ন হল কখন এবং কীভাবে তিনি দাঁড়াবেন? মূলত চল্লিশ ও পঞ্চাশের সীমান্তজুড়ে থাকা এ দেশের কবিতার রঙ ছিল স্থির, ম্যাড়মেড়ে, কড়িৎকর্মাহীন নাবালক, রোগা আর লিকলিকে। সেখানে ষাট—তার দশকের তুর্কী মহাজনরা শতেক রঙের ঢেউয়ের ছলক দেখিয়ে দিয়েছিল। গতানুগতিকতার অনুশাসন ভাঙার ষাটের সেই তরঙ্গভঙ্গ পুরানো দিনের কথার মত শোনালেও বিস্মৃত হওয়া যায় না কিছুতেই। ষাটের আদ্যপান্ত হতাশা, ঘৃণা, দ্রোহ, প্রেম বিবমিষা, টানাপোড়েন এসবই মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল আজাদের ‘অলৌকিক ইস্টিমার’-এ। যুগের স্বভাব বুঝি এমনই। গতানুগতিকতার বন্ধ দরজায় আঘাত হানতে আজাদ লিখলেন, ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’। একজন পাঠক হিসেবে প্রাথমিক প্রাণঢালা শুভেচ্ছা বিনিময়ের পরে মন যদি উতলা হয়, কুমন্ত্রণায় ছলনা এসে প্রতিস্থাপিত করে মূল্যবিচারকে? আমরা কি খণ্ডিত হয়ে যাব? হয়তো হ্যাঁ, হয়তো বা না।

কবিতার ঝিলিক এখানেই যখনই তা লেখা হয় সেটা আজকের নয়, গতকালের। গত মানেই স্মৃতি। তবে কি স্মৃতির এসব গহন হাতছানি নিয়তির মত ভবিষ্যলুব্ধ? আজাদ তার কবিতায় শুধু সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শুধু অস্তিত্বের পুনর্নবায়ন করেননি। সময়কে টপকে গিয়ে তিনি সৃজন করতে চেয়েছেন। যে সৃষ্টি, যে তত্ত্ব আরেকজনকে মুগ্ধ করে, আক্রান্ত করে এবং চিন্তিত করে। আজাদ সে কাজটিই করেছেন সফলভাবে। অন্যের নিউরনে মেলে ধরেছেন বিস্ময়োজ্জল অথচ সতর্ক অন্বেষার চোখ। ভীষণ পরিহাসপ্রিয়, তুখোড় আড্ডাবাজ, মেজাজি এবং বিপুল প্রাণ-ঐশ্বর্যের অধিকারী হুমায়ুন আজাদ তার রচনায় বৈচিত্র্য প্রয়াসী। কোথাও বর্ষা হলে ভিজে যায় বন, ভাসে নদী। সংকট চিরকালই কবির জন্য অপেক্ষা করে থাকে। নিকট ও সুদুরের ফারাক বুঝতে লেগে যায় অনেকটা সময়। লেখক হুমায়ুন আজাদের বাকি তকমাগুলো জানি পূর্ণ করতে পেরেছে তার কবি পরিচিতির প্রলেপ দিয়ে। গদ্য তার এতটাই টানটান, প্রঞ্জল, সুখপাঠ্য তার কারণ তিনি মূলত কবি। কেননা কবির কাজই হল ভাষার অস্থিতি ঘোষণা। ভাষার জমাট ও সাকার আয়তনটিকে নিয়ন্ত্রণাতীতভাবে অস্থৈর্যে ঠেলে দেওয়া।

আমাদের অধিকাংশ গদ্যই যখন এক অনতিক্রান্ত সীমাবদ্ধতার ভেতর ডোবা জলে সাঁতরে বেড়াচ্ছে, অধিকাংশ গদ্যই যখন গতানুগতিক এক পানসে জীবনবোধের পাঁকের ভেতর তার পিচ্ছিল দেহটা নিয়ে স্বাদের ঘোলা জল আরও ঘোলা করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে আজাদের ‘ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল’ এবং তার পর পরই ‘সব কিছু ভেঙে পড়ে’। মনস্ক পাঠককে জানান দিয়ে যায়, সৎ এবং প্রকৃত কাহিনি এখনও নির্মাণ করা যায়। যে কাহিনির ব্যুৎপত্তি শিল্পের মত, গভীর এক বোধ নিয়ে স্বঅস্তিত্বের অভ্যূদয় ঘটায়। আজাদের আলোচ্য উপন্যাস দুটিতে রহিত আছে এমনই এক মেজাজ যা ধ্রুপদী চলচ্চিত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়। মন্থর। রুক্ষ। পাথুরে পথের মত দুধারে যার কেবলই চড়াই-উতরাই। কিংবা দুর্ভেদ্য অরণ্যের মত বিশাল আর গভীর। যাকে আত্মস্থ করতে হলে নিজের মনোযোগকে দাঁড় করাতে হবে তীক্ষ্ন ছুরির মত। গোপন অন্ধকারকে ভেদ করতে পারলে অরণ্যের গভীরে বন-বাদাড়ের যে সৌন্দর্য, চিরহরিৎ যে দৃশ্যের সন্ধান পাওয়া যাবে—তাতে নিজের রক্তাক্ত অভিযানকে সার্থক করে তোলার পক্ষে যথেষ্ট। আজাদ লিখেছেন সেই অকৃত্রিম মনোযোগের গল্প। সেই অভিনিবেশের গল্প। মনে করি এটা সম্ভব হয়েছে তার কাব্যপ্রতিভার ভারে। কারণ কবিতার অবয়ব তার বিস্তৃত-পরিসরী, বিবৃত এবং সমতায়নিক। মনের অভ্যন্তরে বোধ জাগরণে তিনি কখনো আরোহী কখনো বা অবরোহী। তাতে মনের উপলব্ধি ও অনুভূতিকে তিনি বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে সঞ্চারিত করে কারুকৃতি দান করেন, আবার সেই তিনিই উল্টো বিশ্বপ্রকৃতির ভার পরিমণ্ডলকে আত্মস্থ করে নিজেই রসসিক্ত হন।

আজ পর্যন্ত মানব সমাজ যত প্রকার ইজম বা মতবাদের যোগান দিয়েছে আসলে তা সব-ই মানুষ ও তার সমাজের দৈহিক ও মানসিক রোগের প্রতিফলন। মানব সৃষ্টির দুইটি ধারার একটির দিকে নজর দিলে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই সেই জ্ঞানবৃক্ষ থেকে ফলভক্ষণে প্ররোচিত করার অপরাধে সাব্যস্ত করা হল নারীকে, ঘোষণা করা হল—নারী নরকের দ্বার, নারীই জগতের সকল অহিতের মূল। আর সেই থেকে সমাজের সমস্ত অভিশাপ, ঘৃণা অবধারিতভাবেই বর্ষিত হয় নারীর উপর। তাকে গিয়ে দাঁড়াতে হয় গৃহপালিত পশুর চেয়েও নিচের ধাপে। পুরুষ তার একক আধিপত্যে ভোগ করছে প্রকৃতিকে। বিনিময়ে প্রকৃতিও ভুক্ত হচ্ছে পুরুষের দ্বারা। এর ফলে ক্লেদাক্ত হয়ে উঠছে সমাজ। প্রচল ভাঙার সত্যিকারের সাহস নিয়ে এগিয়ে আসেনি কেউ। ফলে যা হবার যুগের পরে যুগ চলে যায় নিখিলপুরুষ নিখিলনারীকে ভোগ করে চলেছে অবিরাম। সংস্কারবিরোধিতা, যৌনতা, নারীবাদ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য মূলত আশির দশক থেকে আলোচিত হুমায়ুন আজাদ নারীবাদী গবেষণাগ্রন্থ ‘নারী’ প্রকাশের পর বিতর্কিত হয়ে ওঠেন। এ সমাজ কতটা লজ্জাবতী বিষয়টা প্রকট হয়ে ওঠে। বস্তুত হুমায়ুন আজাদের এই গ্রন্থের আদ্যপান্ত হল অকিঞ্চিৎকর অবহেলিত সেই নারী। খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুগে যুগে জাতিতে-জাতিতে, দেশে-দেশে, গোষ্ঠীতে-গোষ্ঠীতে, মানুষে-মানুষে প্রথমেই চাই মর্যাদার সাম্য প্রতিষ্ঠা। যেখানে অন্তর্ভুক্ত থাকবে নর এবং নারী। এর পরে আসে আর্থিক সাম্য এবং তার পরিণামের কথা। দুঃখের এবং ভাবনার বিষয় আমাদের এ সমাজে আজও যা অধরাই রয়ে গেল। ফলে যা হবার ঘটে চলেছে ঘটনাগুলো আপন মনে এমনই উল্টো পথে। পরিস্থিতির জাঁতাকলে পড়ে সমাজ এভাবেই নারীকে দিনকে দিন পাঠিয়ে দিচ্ছে পেছনের সারিতে। যদিও নারী আজ অতি সচেতন প্রকৃত সত্তা। যে চায় পুরুষকে বাঁচিয়ে রেখেই নিজ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে।

আধুনিক সভ্যতা হচ্ছে বিকট বিস্ফোরণে তাড়া-খাওয়া একঝাঁক উদ্ভ্রান্ত পাখি যারা এক অনিশ্চিত এলোমেলো গন্তব্যের পথে উড়তে উড়তে ক্লান্ত, বিতৃষ্ণ যাদের কোনো গন্তব্য নেই। আছে কেবল ভীতি ও অবিশ্বাসের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আসন গাড়া। রক্তপাত, শঠতা, নৃশংসতা, লুণ্ঠন, দুর্নীতি, লালসা—বলতে গেলে সমগ্র মানবিক বোধে এমনই এক ক্ষতের সৃষ্টি করেছে যা সমগ্র মানবিক বোধকেই করেছে বিষক্রিয়। এতে জীবন হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত, দৃষ্টি ও দর্শন হয়েছে বিভ্রান্ত এবং অনুসন্ধান ও নিবিষ্টতা হয়েছে লক্ষ্যচ্যুত। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে হুমায়ুন আজাদ লিখলেন ‘প্রবচনগুচ্ছ’। যা বিগত আজ এবং আগামীর জন্য শতভাগ প্রযোজ্য। অবগুণ্ঠন বা পশ্চাৎপদতায় না গিয়ে প্রকাশ্যে উজাড় করে দিয়েছেন। বলেছেন তার মনের, প্রাণের কথা। অতীব সত্যি আর সাহস দিয়ে গড়া এই প্রবচনগুলোর বাঁকে বাঁকে যে দৃশ্য ধরা পড়ে তা আমাদের চোখে ধাক্কা মারে। সত্যের জিত হলে কেউ জ্বলে ওঠে, কেঁপে ওঠে, মারা পড়ে সামাজিক লজ্জায়। হুমায়ুন আজাদ—সাহিত্যের এমনই এক মহাজন যিনি তার মোকামে বসে উঁচু-নিচু সমস্ত আসনকে সমতল করে দিয়ে বলতে পারেন—জেনো তুমি, হেরে গেছো তার কাছে।

প্রচ্ছদ শিবলী নোমান