।। হাসনাত আবদুল হাই ।।

মাসরুর আরেফিনের উপন্যাসে যা আমাকে আকর্ষণ করে তা হল তার ভাষা। তার উপন্যাসে শব্দচয়নে, বাক্যগঠনে এবং বাকপ্রতিমা নির্মাণে তিনি খুব সচেতনভাবে প্রচলিত রীতি ত্যাগ করে নিজস্ব গদ্য তৈরি করেছেন। এই নির্মাণ নতুনত্ব দিয়ে চমক সৃষ্টির জন্য নয়, ন্যারেটিভের প্রয়োজনে। তার ন্যারেটিভ ধারালো, প্রত্যক্ষ এবং ক্ষমাহীনভাবে কঠোর। মেদ-মাংসহীন এই সবল (sinew) বর্ণনাভঙ্গি লক্ষ্যভেদে একনিষ্ঠ যার জন্য উপন্যাসের বক্তব্য প্রকাশে কোনো অষ্পষ্টতা বা দুর্বলতার অনুপ্রবেশ ঘটে না। তাই বলে তার গদ্যে একঘেয়েমি নেই; ব্যঙ্গ, বিদ্রুপ এবং কৌতুক থাকে কাহিনি বর্ণনায় যখন যা প্র‍য়োজন। আর থাকে প্রচুর রেফারেন্স, intertextuality, যা ন্যারেটিভকে নিয়ে যায় পরিচিত ভূগোলের বাইরে জ্ঞানের বিস্তৃত পরিসরে। এই সবই আয়াস এবং সময়সাধ্য যার জন্য, অনুমান করি, তার লেখার গতি ধীরলয়ে চলে। পাঠকের পাঠও কখনো কখনো খুব সহজ হয় না, যেমন হয়ে থাকে বিনোদনমূলক লেখায়, অন্তত বর্ণনাভঙ্গির ক্ষেত্রে। ক্লিশের মত শোনাবে যদি বলি তার ভাষা পোস্টমডার্ন।

‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ উপন্যাসের অন্যতম মূল বিষয় মানুষের পারষ্পরিক সম্পর্ক, যেখানে মাঝে মাঝে ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ, এমনকি বহুমাত্রিকতা যুক্ত হয় কাহিনিকে পূর্ণাঙ্গ করার প্রয়োজনে। সম্পর্কের এইসব সমীকরণে সামষ্টিক জীবনের জটিলতা ভূমিকা রাখে, যেমন সাম্প্রদায়িকতা, ঈর্ষা, রিরংসা, সবমিলিয়ে স্বার্থপরতা। সম্পর্কগুলো এক অসুস্থ, অস্থির সময়ের কথা বলে যেখানে ব্যক্তির উদ্ধার (redemption) কেবল চরিত্রের নিজের সংকল্পের ওপর নয়, নির্ভর করে বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থার ওপরও। এইখানে চলে আসে রাষ্ট্র, যা কতগুলো নিয়ন্ত্রণমূলক বিধি ও নিয়মের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এতে আপত্তির কিছু থাকে না, যতক্ষণ ক্ষমতার ব্যবহার হয় জেরেমি বেনথামের উপযোগিতাবাদের (utilitarian) ভিত্তিতে। মাসরুর এইখানে পরোক্ষে সামাজিক চুক্তির (social contract) প্রশ্ন নিয়ে আসেন ব্যক্তির স্বাধীনতার প্রসঙ্গে। এই প্রশ্নের প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব ব্যাখ্যা তিনি করেছেন স্তালিনের আমলে কবি মান্দেলশতামের পরিণতির দৃষ্টান্ত দিয়ে। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার বা সামষ্টিক স্বার্থে ব্যবহার না করা তো শুধু বাক-স্বাধীনতার অবস্থান দিয়ে বোঝানো সম্ভব হয় না। বৃহত্তর পরিসরে রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তির সামাজিক চুক্তির মূল্যায়নে যে বহুমাত্রিকতার ফ্রেম বা কাঠামো তা নেই মাসরুরের এই উপন্যাসে। ফলে উদ্দেশ্যের সঙ্গে উপায়ের একটা ফারাক তৈরি হয়েছে— উপন্যাসের দ্বিতীয় থিম বা বিষয়ের, রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে। তাছাড়া আরেকটি অসঙ্গতি চোখে না পড়ে পারে না— মানুষের পারষ্পরিক সম্পর্কের ব্যাখ্যায় তিনি সমকালীন অথবা নিকট অতীতের প্রসঙ্গ এনেছেন, যেমন সাম্প্রদায়িকতা। অথচ রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি চলে গিয়েছেন সুদূর অতীতে, স্তালিনের শাসনকালে। Timeline এর এই বৈষম্য উপন্যাসের দুটি থিম বা বিষয়ের সহাবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ করে।

মাসরুরের লেখা পাঠকের উপলব্ধির প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ তার ব্যতিক্রম নয়, বরং মাত্রায় একটু বেশিই। এই উপন্যাস পাঠ রহস্য রোমাঞ্চের মত পাঠকের জন্য এক অভিযাত্রা।

রহস্য রোমাঞ্চের কথাই যখন উঠল, এই ক্ষেত্রে প্রথমেই whodunnit প্রশ্নের উত্তর দেয়া লেখকের নিজের প্রতিই অবিচার। এই কথা বলতে হল দুই ইনার ফ্ল্যাপে বিষয় ও লেখার উদ্দেশ্য নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য। মাসরুর, হয় পাঠকের উপলব্ধি ক্ষমতা সম্বন্ধে সন্দিহান অথবা প্রথমেই পাঠকের সঙ্গে মজা উপভোগ করে নিতে চান। দুটোর যেটাই সত্যি হোক, ইনার ফ্ল্যাপের লেখা উপন্যাসটি পাঠের আনন্দ অনেকটাই কেড়ে নিয়েছে।

চিন্তার খোরাক আছে, এমন আরো একটি উপন্যাস উপহার দেয়ার জন্য মাসরুর আরেফিনকে ধন্যবাদ।

আন্ডারগ্রাউন্ড: মাসরুর আরেফিন, প্রকাশক: কথাপ্রকাশ, প্রকাশকাল: মার্চ ২০২১, প্রচ্ছদ: আনিসুজ্জামান সোহেল, মূল্য: ৪০০ টাকা

অলংকরণ শিবলী নোমান

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.