।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

রোববার (২৬ এপ্রিল) রাতে হঠাৎ করেই হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন সংগঠনটির আমীর জুনায়েদ বাবুনগরী। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ভোরে নতুন করে একটি আহ্বায়ক কমিটির ঘোষণা দেয়া হয়, যে কমিটির প্রধানও বাবুনগরী।

রাত সাড়ে তিনটার দিকে এক ভিডিয়োবার্তার মাধ্যমে হেফাজতে ইসলামের নেতা নুরুল ইসলাম জিহাদি আহ্বায়ক কমিটির ঘোষণা দেন। ভিডিয়োবার্তায় তিনি বলেন, এই আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমে হেফাজতে ইসলামের যাবতীয় কর্মসূচি পরিচালিত হবে।

আহ্বায়ক কমিটিতে প্রধান উপদেষ্টা করা হয়েছে মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীকে। নুরুল ইসলাম জিহাদি আছেন সদস্য সচিব হিসেবে।

এখানেই শেষ নয়, শফিপন্থি হিসেবে পরিচিত হেফাজতের প্রথম কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মাইনুদ্দিন রুহি এর মধ্যেই এক ভিডিয়োবার্তায় দাবি করেছেন, নতুন করে ঢেলে সাজানো হচ্ছে হেফাজতে ইসলামকে।

হেফাজত নেতাদের এই নৈশতৎপরতার নেপথ্যে তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব কাজ করেছে বলে সংগঠনটির কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন।

ভোরে ৫, সকালে সদস্য সংখ্যা ৩

ভোরের সেই ভিডিয়োবার্তায় নুরুল ইসলাম জিহাদি আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সংখ্যা ৫ জন বলে উল্লেখ করেন। বাকি দুই সদস্য হিসেবে তিনি সালাউদ্দিন নানুপুরি এবং মিজানুর রহমান চৌধুরীর নাম জানান। এদের দুজনকেই অরাজনৈতিক সদস্য হিসেবে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

অথচ সকালে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয় আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সংখ্যা তিনজন। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “চলমান অস্থির ও নাজুক পরিস্থিতি বিবেচনায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ও মহানগর কমিটি বিলুপ্তি ঘোষণা পরবর্তী উপদেষ্টা কমিটির পরামর্শেক্রমে ৩ সদস্য বিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি ঘোষণা করা হলো”।

ঠিক কী কারণে হঠাৎ করেই আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সংখ্যা কমানো হলো, সে ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য এখনও আসেনি হেফাজতে ইসলামের আহ্বায়ক কমিটির তিন নেতার কারো কাছ থেকে।

যে কারণে নৈশতৎপরতা

বিবিসি জানিয়েছে, সম্প্রতি হেফাজতের নেতাদের গ্রেপ্তার অভিযানের মুখে সংগঠনটির পক্ষ থেকে সরকারের সাথে একটি সমঝোতা চালানোর চেষ্টা হচ্ছিল।

সংগঠনটির অনেক নেতাই এই সমঝোতার চেষ্টার কথা গত কয়েকদিন নানাভাবে তুলে ধরেছেন। এর মধ্যেই অনেকটা আকস্মিকভাবেই সংগঠনের আমির কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।

জুনায়েদ বাবুনগরী ভিডিয়োবার্তায় বলেন, “দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় অরাজনৈতিক সংগঠন এবং দ্বীনি সংগঠন হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটিকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের পরামর্শক্রমে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলো।”

তবে তিনি বলেছেন, “আগামীতে আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমে আবার হেফাজতে ইসলামের কার্যক্রম শুরু হবে।”

ঘণ্টা তিনেকের মধ্যেই সেই আহ্বায়ক কমিটির নাম ঘোষণা করা হয়। রাতারাতি এই ঘোষণায় থাকা সদস্য সংখ্যাও আবার কমে যায় সকালে।

রোববার রাত ১১টার দিকে জুনায়েদ বাবুনগরী ভিডিয়োবার্তায় কমিটি বিলুপ্ত করার ঘোষণা দেয়ার একঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে পাল্টা ভিডিয়োবার্তা নিয়ে হাজির হন হেফাজতের প্রথম কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মাইনুদ্দিন রুহি। তিনি ঘোষণা করেন, হেফাজতে ইসলামকে ঢেলে সাজাবেন তারা। রুহি শফিপন্থি হিসেবে পরিচিত।

রুহির এই ঘোষণার পরপরই সক্রিয় হয়ে ওঠেন বাবুনগরীর অনুসারীরা। কালবিলম্ব না করে তারা রাতেই আহ্বায়ক কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেন। তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগের পরই প্রথম পর্যায়ে ভিডিয়োবার্তায় ৫ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির ঘোষণা দেয়া হয়।

বাবুনগরীর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ওই ৫ সদস্যের মধ্যে দুজনের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে না পারার কারণে সকালে তাদেরকে বাদ দিয়ে ৩ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির নাম ঘোষণা করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়।

কী বলছেন রুহি?

রোববার রাত ১২টার দিতে মাইনুদ্দিন রুহি ফেসবুক লাইভে বলেন, “২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর অবৈধ কাউন্সিলের মাধ্যমে হেফাজতের যে কমিটি গঠন করা হয়েছে সেটি সিন্ডিকেট কমিটি। রাজনৈতিক উচ্চাভিলাস ও হেফাজতের মুল লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে বিসর্জন এই কমিটি গঠন করা হয়। সাড়ে মাসের মাথায় বাস্তবতা উপলব্ধি করে হলেও এই কমিটি যে বিলুপ্ত করেছেন আমীর (বাবুনগরী) সাহেব এই সিদ্ধান্তকে আমি স্বাগত জানাই।”

নতুন কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, “দেশবাসীকে আল্লামা আহমদ শফির মুলধারার হেফাজতে ইসলাম এবং সম্পূর্ণ অরাজনৈতিকভাবে দেশের উন্নয়ন, দেশের সমৃদ্ধি, দেশের স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে এবং ইসলামের প্রচার-প্রসার, ইসলামের তাহজীব তামাদ্দুনের সংরক্ষণের জন্য, ইসলামের আকীদা বিশ্বাস সংরক্ষণের জন্য হেফাজতে ইসলাম কাজ করবে। সেই লক্ষ্যে ইনশাআল্লাহ আল্লামা আহমদ শফি সাহেবের নীতি-আদর্শের হেফাজতে ইসলাম আমরা গঠন করবো।”

তিনি বলেন, “আমাদের পূর্বসূরীরা যেভাবে ইসলামকে সংরক্ষণ করেছেন, ইসলামের ভাবধারা ইসলামের ভাবগাম্ভীর্যকে সংরক্ষণ করেছেন সেই পদাংক অনুসরণ করে আমরা হেফাজতে ইসলামের কমিটি গঠন করবো। ইনশাআল্লাহ আপনারা দেশবাসী আমাদের সাথে থাকবেন। ওলামায়েকেরাম আমাদের সাথে থাকবেন। কওমী ওলামায়েকেরাম ঐক্যবদ্ধ থাকবেন। যেকোনো পরিস্থিতিতে যেকোনো বাধা ডিঙিয়ে আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাবো।”