।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’-এর কথা মনে আছে? ২০১৯ সালে মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রটি নানা কারণে আলোচিত হয়। কিন্তু ছবি হওয়ার আগেই ২০১৪ সালে এর মূল বইটি প্রকাশিত হয়। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মহমোহন সিংয়ের প্রাক্তন মিডিয়া অ্যাডভাইজার সঞ্জয় বারুর লেখা বইটি প্রথম থেকেই সেদেশের রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হয়।

বইয়ে এই সাংবাদিক মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে তার কাজের অভিজ্ঞতার বরাত দিয়ে যা লিখেছেন, তার সারমর্ম হলো, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন গান্ধী পরিবারের পুতুল। বইটি সেইসময় নরেন্দ্র মোদীর জয়রথে হাওয়া দিয়েছিলো বলেও ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনা আছে। এবার সেই সঞ্জয় বারু লিখেছেন নতুন বই, যেখানে তিনি দাবি করেছেন, ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজের সুবিধার জন্য দেশটির ‘মিডিয়া এলিট’দের ব্যবহার করছেন।

গত ১৬ এপ্রিল ‘ইন্ডিয়াস পাওয়ার এলিট: কাস্ট, ক্লাস অ্যান্ড কালচারাল রেভ্যুলুশন’ নামের এই বইটিও প্রকাশ করেছে পেঙ্গুইন। বইটিতে সঞ্জয় বারু ভারতের জনপ্রিয় সাংবাদিক অর্নব গোস্বামী কীভাবে নরেন্দ্র মোদীর হয়ে কাজ করছেন তা তুলে ধরেছেন। বলেছেন, মোদী-পন্থি রিপাবলিক টেলিভিশন শুরুর একদশকের কম সময়ের মধ্যে অর্নব গোস্বামীর সম্পদের উল্লেখযোগ্য স্ফীতি হয়েছে। আইআইএফএল শীর্ষ ধনীর তালিকায় তার নাম এসেছে। তার সম্পদের পরিমাণ ১৩০০ কোটি রুপি। বইটির চুম্বক অংশ প্রকাশ্যে এনেছে স্ক্রল ডট ইন।

সঞ্জয় নতুন বইয়ের জানাচ্ছেন, শুধু এক্ষেত্রেই নয়, ভারতে সাম্প্রতিককালে সংবাদমাধ্যম পেশাদারদের ক্ষেত্রে এক পরিবর্তন হাজির হয়েছে। বড় বিনিয়োগের নতুন সংবাদমাধ্যম এসেছে। এনডিটিভির প্রণয় রায়ের মতোই অনেক টেলিভিশন অ্যাংকর এখন মিডিয়া হাউসের মালিক বনে গিয়েছেন। অর্নব গোস্বামীর পাশাপাশি রজত শর্মার নামও এই বইয়ে এসেছে। মুদ্রিত সংবাদমাধ্যমেও এই অবস্থা চলছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। লিখেছেন, অনেক সাংবাদিক ক্ষমতার কেন্দ্রে এসেছেন, মন্ত্রী হয়েছেন। আবার অনেকে সফল ব্যবসায়ী ও মিডিয়া উদ্যোক্তা হয়ে বসেছেন।

বইয়ের সঞ্জয় বারু সাংবাদিকদের বর্তমান পরিস্থিতি বোঝাতে লিখেছেন- “টিভি অ্যাঙ্করের ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেকে দাঁড় করানো সংবাদকর্মীদের মালিকানাও নিশ্চিত হবার পর তাদের অনেকেই দক্ষিণ দিল্লিতে আলিশান বাড়ি, দক্ষিণ মুম্বাইয়ে মূল্যবান ফ্ল্যাট, হিমালয়ের পাদদেশ বা গোয়ায় ফার্মহাউস বা অবসর যাপন কেন্দ্রের মালিক হয়েছেন। ছুটি কাটাতে যাচ্ছেন ইতালির টাস্কানিতে। জরুরি অবস্থা-পূর্বকালের সাংবাদিকরা এমন জীবনযাত্রার স্বপ্নও দেখতে পারেননি।”

মিডিয়ার স্ফীতির সঙ্গে তার মালিক-সম্পাদকদের সম্পদের স্ফীতি এই খাতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও বেশি পাকাপোক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে বলে সঞ্জয় উল্লেখ করেছেন। বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এই প্রাক্তন প্রধান সম্পাদক লিখেছেন, “সিকি শতক আগে সমীর জৈন (টাইমস অব ইন্ডিয়ার মূল সংস্থার মালিক) দাবি করেছিলেন যে, তিনি নিজেই ‘প্রতিষ্ঠান’। সম্ভবত তখন অরুণ পুরি, রামোজি রাও, এন.রাম, অভীক সরকারসহ ভারতের বিভিন্ন ভাষার প্রভাবশালী সংবাদপত্রের মালিক-সম্পাদকরাও এমন ধারণাই পোষণ করতেন। অথচ সামাজিক মাধ্যমের বাড় বাড়ন্ত আর রাষ্ট্রে স্বৈরাচারী সরকারের অবস্থানের কারণে আজ কোনো সংবাদমাধ্যমের মালিক-সম্পাদকই সমীর জৈনের মতো এমন দাবি করতে পারবেন না।“

বিজেপি ঘরানায় খুব পরিচিত একটি প্রপঞ্চ ‘লুটিয়ান মিডিয়া’। লুটিয়ান মূলত দিল্লির অভিজাত একটি এলাকা। আবদুল কালাম সড়কের এই অংশটির কাছাকাছিই গুরুত্বপূর্ণ সব দূতাবাস। সন্ধ্যা হলেই এখানকার জিমখানা ক্লাব, হ্যাবিটাট সেন্টার বা ইন্ডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে চলে বড় সব মানুষের আনাগোনা। আমলা-কর্তাদের সঙ্গে এখানে মিডিয়া-এলিটরাও আসেন। তো, দিল্লিতে এই ধারার সাংবাদিকদের মোদী বলেন ‘লুটিয়ান মিডিয়া’। সঞ্জয় বারু তার বইয়ের একটি অংশে লিখেছেন “মোদী ও ‘লুটিয়ান’ মিডিয়া” নিয়ে। তিনি লিখেছেন, গুজরাট দাঙ্গার কারণে নরেন্দ্র মোদী জাতীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচিত হন। মোদী ব্যক্তিগতভাবে শেখর গুপ্তা, রাজদীপ সারদেশাই ও করন থাপরের মতো দিল্লি কয়েকজন সাংবাদিকের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। তারা সবাই কোনো না কোনোভাবেই অ-বিজেপি নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। ২০১৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় মোদী এদের সমালোচনাও করেছেন ব্যাপকভাবে। সে সময় তার প্রচারণা পরিকল্পনাকারীরা এসব মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে উপেক্ষা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে পুরোপুরি কাজে লাগান। এমনকি প্রধানমন্ত্রী হবার পরেও তিনি সামাজিক মাধ্যমকেই যোগাযোগের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন।

সঞ্জয় আরও লিখেছেন, “আমি দিল্লির মিডিয়াগুলিকে চার ভাগে ভাগ করি- (ক) খাঁটি পেশাদার (খ) সরকার সমর্থক (গ) বিরোধী পক্ষের এবং (ঘ) দুর্নীতিবাজদের। গ মানে বিরোধীপক্ষের রাজনৈতিক বা আদর্শিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সাংবাদিকদের বাদ দিয়ে অন্য তিনটির সব কটি থেকেই প্রধানমন্ত্রীর অনুকূলে প্রচারণা চালানো সম্ভব। এ কারণেই মোদী ও তার পরিকল্পনাকারীরা ক, খ ও ঘ শ্রেণির সাংবাদিকদের কাছে সাহায্য চাননি। বরং তারা যত বেশি সংখ্যক সম্ভব সাংবাদিকদের খ শ্রেণিতে আনতে সচেষ্ট হয়েছেন। প্রধানত তারা হিন্দি মিডিয়াগুলোকে টার্গেট করেছেন। এর কারণ সম্ভবত তারা রিপাবলিক টিভি, টাইমস নাও ও ইন্ডিয়া টিভির মতো দল-সমর্থক মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে সন্তুষ্ট।”

সঞ্জয় বারুর মতে, সামাজিক মাধ্যমের পাশাপাশি মূলধারার এসব মিডিয়াকেও বাগে নিয়ে আসার মাধ্যমে মোদী তার নিজের লক্ষ্যগুলো পূরণ করছেন। বারু লিখেছেন, “পেশাদার সাংবাদিকরা তাদের বাইলাইনের মধ্যে বেঁচে থাকে এবং মারা যায়। সামাজিক মিডিয়ায় পক্ষপাতমূলকভাবে সেগুলোকে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে এই শক্তিকে নিঃশেষ করা হয়। ভুয়া সংবাদ, পেইড নিউজ আর, প্রকাশ্য পক্ষপাতমূলক খবরের এই জামানায় পেশাদার গণমাধ্যমের শক্তি ভীষণ হুমকির মুখে।”