।। ভাষান্তর: হাসিনুল ইসলাম ।।

কলেজের পাঠ শেষ করার নয় মাস পরেই আমার প্রথম গল্প ‘এল এসপেকটাডর’ এর সাপ্তাহিক সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হবে, এমনটা আমি কখনো কল্পনাই করিনি। সেই সময়ে বোগোতা থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত সাহিত্য সাময়িকী ছিল এটি। বিয়াল্লিশ দিন পরেই দ্বিতীয় গল্পটি ছাপলো তারা। আর বিস্ময়কর ঘটনাটি হলো, দ্বিতীয় গল্পের সাথে সাহিত্য সম্পাদক এডুয়ার্ডো জালামে বোরডা একটি ভূমিকা জুড়ে দিলেন। এর কিছু পূর্বেই আমি আসলে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলাম।

সব কিছু এমনভাবে ঘটেছিল যে আমি এসবের স্মৃতিচারণ খুব স্পষ্ট করে করতে পারছি না। ১৯৪৭ সালের কথা। আমি তখন বোগোতা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন শাস্ত্রের ছাত্র। আমার বাবা-মার সাথে বোঝাপড়ার ভিত্তিতে লেখাপড়াটা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। যেসব বিকেলে আমার কাজ থাকতো না, আমি তখন অর্থোপার্জনের জন্য কিছু না করে বরং বই পড়তাম, আমার ঘরে অথবা যেসব ক্যাফেতে বই পড়তে দিত সেখানে। যেসব বই পেতাম সেগুলো বেশিরভাগই ছিল ঘটনাক্রমে পাওয়া কারণ যেসব বন্ধুর বই কেনার টাকা ছিল তারা আমাকে এতটা অল্প সময়ের জন্য তা ধার দিতো যে ঠিক সময়ে ফেরত দেওয়ার জন্য আমাকে রাত জেগে পড়তে হতো। তবে স্কুলে থাকতে যেসব বই পড়তাম সেগুলো ছিল অনেকটা পবিত্র লেখকদের স্মৃতিসৌধের মতো, আর এই বইগুলো টাটকা রুটির মতো যা থেকে নতুনত্বের ঘ্রাণ আসতো। আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে নতুন নতুন লেখালেখি আর অনুবাদের ঢেউ এসেছিল কলম্বিয়ায়। এভাবে আমি হোর্হে লুই বোর্হেস, ডি. এইচ. লরেন্স ও অল্ডাস হাক্সলি, গ্রাহাম গ্রিন ও জি. কে. চেস্টারটন, উইলিয়াম আইরিশ এবং ক্যাথারিন ম্যান্সফিল্ড ও আরো অনেকের লেখার সাথে পরিচিত হই।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বইগুলো বইয়ের দোকানে হাতের নাগালের বাইরে থাকত আমাদের পকেটে অর্থ না থাকার কারণে। তবে কিছু ক্যাফেতে এগুলোর কিছু কপি থাকতো। সেই ক্যাফেগুলো সংস্কৃতির পীঠস্থান ছিল। সেখানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বছরের পর বছর একই টেবিল রিজার্ভ করে রাখতো। সেই ঠিকানাতেই তারা বাড়ি থেকে চিঠি, এমনকি মানি অর্ডার পেত। এইসব ক্যাফের সদয় মালিক আর বিশ্বস্ত কর্মচারী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জীবনে যথেষ্ট প্রভাব রেখেছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর জীবনে প্রায় অদৃশ্য শিক্ষকের চেয়ে ক্যাফেগুলোর অবদান কম ছিল না।

‘এল মোলিনো’ ছিল আমার প্রিয় ক্যাফে। সেখানে অপেক্ষাকৃত বয়স্ক কবিরা প্রায়ই আড্ডা দিতেন। শিক্ষার্থীরা সেখানে আসন রিজার্ভ করতে পারত না। কিন্তু আমরা সেই সব সাহিত্যিক আড্ডার কাছাকাছি বসে কান পেতে তাদের আলোচনা শুনে কতই না উপকৃত হয়েছি। এটা পাঠ্যবইয়ের শিক্ষার চেয়ে বেশি কিছু ছিল। আমি যেহেতু কোনো আসন রিজার্ভ করতে পারতাম না, তাই ওয়েটারদের খাতিরে লিওন ডি গ্রিয়েফ এর পাশের টেবিলে বসার সুযোগ করে নিতাম। তিনি বিখ্যাত সব সাহিত্যিকদের সাথে আড্ডায় মাততেন। যদিও তারা নারী ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র নিয়েই বেশি আলাপ করতেন, তবু আমরা সবসময়ই নতুন কিছু জানতে পারতাম। কোনো কিছু যেন আমাদের কান ছাড়া না হয়, এজন্য আমরা সবাই বোবার মতো বসে থাকতাম।

একদিন আমাদের বন্ধু জর্জ আলভারো এসপিনোজা, যে আমাকে বাইবেল পড়া শেখানোর পরে আমি বাইবেলের সব চরিত্রের নাম মুখস্থ করে ফেলেছিলাম, একটা বই টেবিলের ওপর চাপড়ে ফেলে বিশপের মতো কর্তৃত্ব নিয়ে বলল: এটা আরেক বাইবেল। এটা ছিল জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’ যা আমি বারবার পড়তে পড়তে ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত পড়ে গিয়েছি। কয়েক বছর পরে পুরোপুরি পূর্ণবয়স্ক মানুষ হিসেবে আমি বইটা আবার পড়ি, গভীরভাবে। আর তখন আমি ভাষাকে মুক্ত করার কৌশল খুঁজে পাই এবং আমার নিজের বইয়ের গঠন ও কাহিনিতে সময়ের ব্যবহার আয়ত্ব করার উপায় আবিষ্কার করি। আমার রুমমেটদের মধ্যে একজনের নাম ডমিংগো মানুয়েল ভেগা। সে চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। সে প্রায়শই ঘুম আনানোর জন্য আমাকে বই পড়তে দিত। একদিন তার দেওয়া বই উল্টো ঘটনা ঘটালো। আমি কোনোভাবেই ঘুমাতে পারলাম না। এটা ছিল কাফকার ‘দি মেটামরফসিস’, অবশ্যই অনুবাদে। 

……………………………………………………………………….

আমি রহস্যময় বইগুলোর ভয়ংকর চূড়ায় উঠতাম। সেগুলো তখন পর্যন্ত জানা সবকিছুর চেয়ে ভিন্ন ছিল। ওরা আমাকে বুঝিয়েছিল যে কেবল তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে গল্প লেখা হয় না। লেখকের জন্য নিজের সত্যটি লিখে ফেলাই যথেষ্ট। এর জন্য লেখকের লেখার ক্ষমতা, আর বলার ভঙ্গিই যথেষ্ট। কাফকা পড়ার পরে, আমি আবার আরব্য উপন্যাসের শেহরেজাদির জগতে যেতে পারলাম, সেখানে সবকিছুই সম্ভব।

……………………………………………………………………….

আমি রহস্যময় বইগুলোর ভয়ংকর চূড়ায় উঠতাম। সেগুলো তখন পর্যন্ত জানা সবকিছুর চেয়ে ভিন্ন ছিল। ওরা আমাকে বুঝিয়েছিল যে কেবল তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে গল্প লেখা হয় না। লেখকের জন্য নিজের সত্যটি লিখে ফেলাই যথেষ্ট। এর জন্য লেখকের লেখার ক্ষমতা, আর বলার ভঙ্গিই যথেষ্ট। কাফকা পড়ার পরে, আমি আবার আরব্য উপন্যাসের শেহরেজাদির জগতে যেতে পারলাম, সেখানে সবকিছুই সম্ভব। মেটামরফসিস পড়া শেষে আমি সেই অচেনা স্বর্গে বাস করতে চাইলাম। বন্ধু ভেগার ধার দেওয়া টাইপরাইটারে পরদিন বসলাম। পরের কয়েকদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম না কারণ আমার ভয় হচ্ছিল যে বাইরের বাস্তবতা আমাকে কাফকার জগতের ঘোর থেকে বের করে আনবে। আমি কাফকার মতো কিছু লেখার চেষ্টায় টাইপরাইটারে পড়ে থাকলাম। কয়েক দিন পরেই এডুয়ার্ডো জালামে বোরডার একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হলো। সেখানে তিনি আক্ষেপ করছিলেন যে কলম্বিয়ায় আর কোনো শক্তিশালী লেখক আসছে না। কেন জানি আমি একে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করলাম। আমার লেখা গল্পটি নিয়ে আবার বসলাম। আমি কাউকে আমার ভেতরের অস্বস্তি বলে বোঝানোর সাহস পাচ্ছিলাম না। এল মোলিনো ক্যাফের টেবিলেও না। গল্পটাতে বারবার শান দিতে থাকলাম। একসময় আমি নিঃশেষ হলাম। তখন আমি এডুয়ার্ডো জালামে বরাবর কিছু কথা লিখলাম, যার একটি শব্দও এখন আর স্মৃতিতে নেই। পরের দিন সেই লেখা আর গল্পটি নিয়ে নিজে এল এসপেকটাডর পত্রিকার অফিসে গেলাম। দারোয়ান আমাকে দোতলায় জালামের কাছে যাওয়ার অনুমতি দিল কিন্তু নিজে তার সামনে গিয়ে কী বলব, একথা ভাবতেই আমার হাতপা ঠাণ্ডা হয়ে এলো। আমি অভ্যর্থনা ডেস্কে খামটি রেখে পালিয়ে এলাম।

এটা ছিল এক মঙ্গলবারের ঘটনা। গল্পটার ভাগ্যে কী ঘটল, তা নিয়ে আমি আর কিছু ভাবছিলাম না। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে ওটা ছাপা হলেও, সহসা হবে না। এর পরের দুই সপ্তাহ আমি এক ক্যাফে থেকে আরেক ক্যাফেতে ঘুরে বেড়ালাম। এরপর সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখে এল মোলিনোতে যেতেই এল এসপেকটাডর পত্রিকার পুরো পৃষ্ঠা জুড়ে গল্পটা দেখতে পেলাম: ‘দ্য থার্ড রেজিগনেশান’।

আমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল—পত্রিকাটা কেনার জন্য পাঁচ সেন্টাভো (এক পেসোর একশত ভাগের এক ভাগ) তো আমার কাছে নেই। দারিদ্র্যের আর কি নিদর্শন হতে পারে? নিত্যদিনের আরো অনেক কাজেই পাঁচ সেন্টাভো লাগে: পাবলিক টেলিফোন, এক কাপ কফি, জুতো পালিশ ইত্যাদি। কে আমাকে পাঁচ সেন্টাভো দেবে? বাড়িওয়ালি? তার কাছে তো দুমাস থেকে সাতশ কুড়ি বারের মতো পাঁচ সেন্টাভোর ঋণ আছে। রাস্তায় সে সময় স্বর্গ থেকে এক লোকের উদয় হলো— একটা ট্যাক্সি থেকে নামছিল, হাতে এল এসপেকটাডর। আমি সোজাসাপ্টা বললাম, আমাকে ওটা দেবেন কি না। গল্পটায় হোরনান মেরিনোর করা অলংকরণ ছিল। এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলে পত্রিকাটা আমার রুমে লুকিয়ে রাখলাম, তখনও বুক ধুকপুক করছে। আমি সেদিন মুদ্রণের অপার শক্তি অনুভব করলাম—আমার সমস্ত আবেগ, প্রেম দিয়ে আমি কাফকার মতো সর্বজনীন প্রতিভাকে অনুকরণ করে নিজেকে উজাড় করে যা লিখেছি, তা দু-তিন বাক্য পড়েই মনে হচ্ছে কত দুর্বল আর খেলো। দ্বিতীয়বার গল্পটি পড়ার জন্য সাহস সঞ্চয় করতে আমার কুড়ি বছর সময় লেগেছে। তবে সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় ছিলো আমার রুমে বন্ধুদের উপচে পড়া ভিড়। প্রত্যেকের হাতে সেই পত্রিকা। কেউ পড়ে বুঝেছে, কেউ বিভ্রান্ত বোধ করেছে। কেউ প্রথম চার লাইনের পর আর এগোয়নি। সাহিত্যবোদ্ধা বন্ধু গঞ্জালো মালারিনো গল্পটির প্রশংসা করলো।

আমি একমাত্র জর্জ আলভারো এসপিনোজার মতামতকে মান্য করতাম। তার তীক্ষ্ন মন্তব্য আমার পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের চেয়ে অনেক বেশি তীব্র ছিল। আমার মনের মধ্যে তখন দ্বিমুখী দোলা: তার সাথে দেখা করে তার মতামত জানবো, আবার সেকথা ভাবলেই ভয়ে বুকে মোচড় লাগছিল। মঙ্গলবার সে এল মোলিনো ক্যাফেতে হাজির। সে আমার গল্পের কথা না বলে আমার ঔদ্ধত্যের কথা পাড়ল। তার কথা: আমার মনে হচ্ছে তুমি নিজেকে বেশ ঝামেলায় ফেলে দিলে। তুমি এখন প্রতিষ্ঠিত লেখকদের নজরে। তোমাকে এখন নিজের লেখনির প্রমাণ দিতে হবে। নিজেকে যোগ্য করতে হবে। তার মতামতকে আমি খুব গুরুত্ব দিতাম, তাই অনেকটা ভয়ে নিজে গুটিয়ে গেলাম। আমি জানালাম যে গল্পটা কিছুই হয়নি। তার উত্তর ছিল: ওটা ভালো কি মন্দ, তাতে কিছু যায় আসে না এখন। তবে আমার সামনে যে নতুন ভবিষ্যত উঁকি দিচ্ছে তা আমি কিভাবে মোকাবেলা করব সেটিই মুখ্য বিষয়। তার শেষ মন্তব্য ছিল এমন: গল্পটা যেমনই হোক, ওটা এখন অতীত। পরের গল্পটা কেমন হবে, সেটাই মুখ্য।

দ্বিতীয় গল্পের জন্য আমি বাস্তব জীবন থেকে কিছু খুঁজছিলাম। আমার স্মৃতিতে হঠাৎ এক নারীর দেখা পেলাম। আমার ছোটবেলায় তিনি একদিন বলেছিলেন যে, তিনি তার পোষা বেড়ালের মাঝে প্রবেশ করতে চান। কেন? তিনি বললেন, কারণ বেড়ালটি তো আমার চেয়েও সুন্দর। গল্পের নামকরণ হলো: ‘ইভা ইজ ইনসাইড হার ক্যাট’। তারপর গল্প নিজ গতিতে এগিয়ে চলল। আসলে গল্পের ভেতরেই এর বীজ সুপ্ত থাকে যা নিজেকে বিলীন করে পূর্ণতার জন্ম দেয়। ১৯৪৭ এর ২৫ অক্টোবরে এটা ছাপা হলো সেই এল এসপেকাটডরে। তবে কয়েকদিন পরে এডুয়ার্ডো জালামে তার প্রাত্যহিক কলামে এক বেফাঁস মন্তব্য করলেন। তিনি লিখলেন, পাঠকেরা নিশ্চয় এক সাহসী নতুন লেখকের আবির্ভাব দেখতে পেয়েছে। সে হলো গার্সিয়া মার্কেস। আমি তখন আনন্দে আত্মহারা।

……………………………………………………………………….

একদিন এক নারী আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিল যে আমি তার বারো পেসো চুরি করে পালাচ্ছি। তখনই দুজন ষণ্ড এসে আমাকে আটকে পুরো দেহ তন্নতন্ন করে খুঁজে দুই পেসো পেল। ততক্ষণে সেই নারী মনে করতে পেরেছিল সে আগের দিন নতুন স্থানে তার পেসো লুকিয়ে রেখেছিল, আর সে তখন তা খুঁজেও পেল। আমি সেবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচলাম।

……………………………………………………………………….

আমার নিয়মিত গরহাজির থাকা এবং বিচারিক চর্চায় অবহেলার পরেও আমি প্রথম বর্ষ পার হয়ে গেলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ষোল সপ্তাহ বিস্ময়করভাবে পার হলে আমি কেবল কিছু ভালো বন্ধু জোগাড় করতে পেরেছিলাম। জালামের ঘোষণার পর আইন শাস্ত্রের প্রতি আমার আকর্ষণ একেবারে কমে এলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে কেউ কেউ আমাকে লেখক গুরু হিসেবে আখ্যা দিতে থাকল। আমি তখন শিখতে চাইলাম, কীভাবে একটি গল্প একই সাথে বিশ্বাসযোগ্য এবং কল্পনাবিলাসী হতে পারে। আমি তখন সফোক্লিসের ‘ইডিপাস রেক্স’, জ্যাকবের ‘দ্য মাংকিজ প’ এবং মপাসার ‘বুল ডে সুইফ’ থেকে শিখছিলাম।

এক রোববার রাতের কথা। সারাদিন, সারা সন্ধ্যা আড্ডায় কাটিয়ে রুমে ফেরার তাগিদে বাসে করে ফিরছিলাম। চাপিনেরো স্ট্যান্ডে ছাগলের শিং ও লেজওয়ালা গ্রাম্য দেবতার বেশে একজন বাসে উঠল। আমি ভাবলাম, সারা সন্ধ্যা হয়তো বাচ্চাদেরকে আনন্দ দিয়ে লোকটা তার সাজপোশাক পরেই বাসায় ফিরছে। বাসের কেউ তার দিকে ঘুরেও তাকাচ্ছে না যেন সে অন্য সবার মতোই একজন। আমার পাশ দিয়ে যখন সে গেল, তখন আমি ঠিকই বোঁটকা গন্ধটা পেলাম। ক্যালে ২৬ এর আগে যেখানে একটা পার্ক আছে সেখানে নেমে সে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি মাঝরাত পার করেও বিছানায় এপাশ ওপাশ করছিলাম। আমার রুমমেট ভেগা জানতে চাইল আমার কোনো সমস্যা হয়েছে কি না। আমি তাকে বিষয়টা বললাম। সে বলল, তুমি বোধহয় দুঃস্বপ্ন দেখলে, তোমার বদহজম হয়েছে। আর যদি সত্যিই তা দেখে থাকো, তবে গল্পের জন্য তা বেশ কল্পনাবিলাসী বিষয় হবে। পরের দিন এক বসাতেই গল্পটা লিখে ফেললাম। কয়েকদিন ধরে রাতে ঘুমাবার আগে ও সকালে ঘুম থেকে উঠে বারবার ওটা পড়লাম। এবার আর এল এসপেকটাডরে পাঠালাম না। আমার নতুন কারো মতামত দরকার। এক বন্ধুকে দিয়ে এল টিয়েম্পোর সাহিত্য পত্রিকার জন্য পাঠালাম। সাথে সাহিত্য সম্পাদক বরাবর একটি চিঠি। গল্পটা ছাপা হয় নি এবং কোনো উত্তরও পাইনি।

এল এসপেকটাডরে গল্প ছাপা হওয়ার পরে আমি নতুন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলাম। যারা আমার কাছে টাকা পেতো তারা টাকা ফেরত চাওয়া শুরু করল। তারা ভাবছিল যে আমি বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকায় লেখা ছাপাই, বেশ কিছু পেসো তো নিশ্চয় পাই। খুব কম লোকজনই সত্যটা বিশ্বাস করতো। পত্রিকায় লেখা ছাপা হওয়ার জন্য কখনো এক পয়সাও পাইনি, আর প্রত্যাশাও করিনি, কারণ দেশের প্রকাশনা শিল্পের রীতিটাই এমন। আমার বাবারও মনোভঙ্গ ঘটছিল কারণ তার এগারো সন্তানের তিনজন তখন স্কুলে। পরিবার থেকে মাসে ত্রিশ পেসো আসত। আমার রুম ভাড়া ছিল আঠারো পেসো, নাস্তা ছাড়াই। আমি জানি না, কখন যে আমি পত্রিকার কোণায়, রুমালের উপর বা ক্যাফের মার্বেল টেবিলে স্কেচ আঁকা শুরু করেছিলাম। এল মোলিনোতে এক লোক আসত যার মন্ত্রণালয়ে বেশ প্রভাব ছিল। সে প্রস্তাব দিল, সে মন্ত্রণালয়ে ড্রাফট্সম্যানের চাকরি নিবে, আর কাজটা আমাকে করে দিতে হবে। বেতনটা ভাগাভাগি হবে। জীবনে আমি আর কখনো দুর্নীতির এত কাছে পৌঁছিনি, তবে অনুশোচনা হওয়ার মতো কাজের কাছাকাছি যে হইনি তাও নয়।

এই সময়েই সংগীতের প্রতি আমার আকর্ষণ তৈরি হয়। ‘দ্য কোস্টাল আওয়ার’ নামে একটি জনপ্রিয় রেডিও অনুষ্ঠান হতো। এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে আমরা ক্যারিবীয় শিক্ষার্থীরা রোববারে রেডিও অফিসে গিয়ে বিকেল পর্যন্ত নাচতাম। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংগীতের চর্চা বৃদ্ধি করতে এই অনুষ্ঠানটি বেশ ভূমিকা রেখেছিল। এর মাধ্যমে উপকূল অঞ্চল থেকে অনেক শিক্ষার্থী বোগোতায় এসে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির সুযোগ করে নিতে পারছিল। ক্যারিবীয় শিক্ষার্থীদের একটাই সমস্যা ছিল—জোরপূর্বক বিয়ে। আমি জানি না এই দুষ্ট সংস্কার কবে কীভাবে জন্ম হয়েছিল যে, বোগোতার মেয়েরা উপকূল অঞ্চলের ছেলেদের সাথে মিশে তাদেরকে বিছানায় নিয়ে গিয়ে বিয়ে পর্যন্ত নিয়ে যাবে। তারা প্রেমের জন্য এমন করতো না, এই আশায় যে জানালা খুললে সমুদ্র দেখতে পাবে। অন্যদিকে, বোগোতার জঘন্যতম অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেখানকার পতিতালয়ে। আমরা কখনো মাতাল হয়ে সেখানে যেতাম। একদিন এক নারী আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিল যে আমি তার বারো পেসো চুরি করে পালাচ্ছি। তখনই দুজন ষণ্ড এসে আমাকে আটকে পুরো দেহ তন্নতন্ন করে খুঁজে দুই পেসো পেল। ততক্ষণে সেই নারী মনে করতে পেরেছিল সে আগের দিন নতুন স্থানে তার পেসো লুকিয়ে রেখেছিল, আর সে তখন তা খুঁজেও পেল। আমি সেবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচলাম।

এরপর খুব বেশি সময় পার হওয়ার পূর্বেই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে আইন শাস্ত্র নিয়ে এগোনো আর ঠিক হবে না। কিন্তু বাবা-মাকে একথা বলার সাহস পাচ্ছিলাম না। তারা আমার প্রথম বর্ষের ফলাফলে এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে আমার ভাইয়ের হাতে সেই ১৯৪৮ সালের সবচেয়ে হালকা ও আধুনিক টাইপরাইটার পাঠিয়েছিলেন। এটাই আমার প্রথম টাইপরাইটার, কিন্তু সেই সাথে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনকও বটে। আমার ভাই ও তার সাথে আসা বন্ধুদের উদ্দেশ্যে একটা পার্টি দেওয়ার জন্য বারো পেসোর বিনিময়ে সেই দিনই টাইপরাইটারটি বন্ধক রাখলাম। পরদিন মাথাব্যথা নিয়ে সেই দোকানে গেলাম যে যন্ত্রটি সেরকমভাবেই সিলগালা করা আছে কি না। স্বর্গ থেকে কিছু পেসো পাবো, আর ওটা ছাড়িয়ে আনবো, এই আশায় থাকলাম। আমি বা আমার ভাই যখনই ওই দোকানের সামনে দিয়ে যেতাম, খেয়াল করতাম যে ওটা ওরকমই আছে কি না। এক মাস পরেও স্বর্গ থেকে কিছু এলো না। তবে তিন মাস পর পর কিস্তি দেওয়ার শর্তে টাইপরাইটারটা ওরকমই থাকবে বলে নিশ্চয়তা পেলাম।

[গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের মূল লেখাটি ছিল স্প্যনিশ ভাষায়। ২০০৩ সালে দ্য নিউ ইয়র্কার পত্রিকায় এডিথ গ্রসমানের অনুবাদে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। এই নিবন্ধটি সেটিরই সংক্ষেপিত অনুবাদ।]

অলংকরণ শিবলী নোমান