মূল: জেফরি আর্চার

রূপান্তর: শিবলী নোমান

শহরটা পাহাড়ের উঁচুতে। ওখান থেকে চাইলে দুদিকে দুটো পর্বত দেখা যায়- পুবে মন্টে টাবুর্নো আর দখিনে ভিসুভিয়াস। ক্যাম্পানিয়ার একেবারে প্রাণকেন্দ্রে মনোরম এই শহরের নাম কর্টোগ্লিয়া। ফোডরস ইতালি নামের নামকরা ট্রাভেল গাইডবুকে একে ‘ভূস্বর্গ’ বলা হয়।

শহরের জনসংখ্যা সাকুল্যে চৌদ্দশ বাহাত্তর এবং শখানেক বছরেও তার তেমন একটা হেরফের নেই। ওয়াইন, জলপাই আর ট্র্যাফল নামের মাশরুমজাতীয় খাবার- এই তিনেই হয় শহরবাসীর কামাই। কর্টোগ্লিয়া হোয়াইট পৃথিবীখ্যাত ওয়াইন। সুগন্ধ আছে, আর যা স্বাদ! এককথায় দারুন আর কী! তা, তার চাহিদার তুলনায় উৎপাদনের ফারাকটা এমন যে, ওয়াইন বোতলে ভরার বহু আগেই বিক্রি হয়ে বসে থাকে। আর ওদের ওখানকার যে জলপাইয়ের তেল, মানে ইংরেজিতে অলিভঅয়েল আর কী, ওটা ছাড়া তারকা হোটেলগুলো তাদের চৌহদ্দিতে আর কোনো ব্র্যান্ড ঘেঁষতে দেয় না। কাজেই সুপারশপের তাকের কপালে সেগুলো খুব একটা জোটে না। 

আর ট্র্যাফলকে বলা যায় ওদের জন্য বোনাস, যার কারণে আশপাশের প্রতিবেশীদের তুলনায় তাদের ঠাটবাট একটু বেশি করার সুযোগ হয়। দুনিয়ার নানা জায়গা থেকে ডাকসাইটে রেস্তোরাঁওয়ালারা কর্টোগ্লিয়া ট্র্যাফল সংগ্রহের জন্য হাজির হয়, যেগুলো তারা সমঝদার খদ্দেরদের দেয়।

কর্টোগ্লিয়া ছেড়ে গিয়ে কিছু লোকের কপাল খুলেছেও বটে। তবে মধ্যযুগীয় কেতায় চলা এই পার্বত্য শহরে পুরুষের গড় আয়ু ৮৬ আর নারীদের ৯১, যা জাতীয় গড় আয়ুর চেয়ে ৮ বছর বেশি। তাই শহর ছেড়ে যাওয়াদের মধ্যে আরও বেশি বুদ্ধিমানরা মোটামুটি দ্রুতই ফিরে আসে।

শহরের মূল স্কোয়ারের মাঝখানে ইতালির জনক জেনারেল গ্যারিবল্ডির একখানা পেল্লাই মূর্তি। আজকাল লোকে তার নাম যুদ্ধের জন্য যতটা না চেনে, তার থেকে বেশি চেনে বিস্কুটের ব্র্যান্ড হিসেবে। শহরে রয়েছে ডজনখানেক দোকান, দুটি রেস্তোঁরা আর গলাভেজানোর জন্য সবেধন নীলমণি একখানা বার। এর বেশি আর শহরের কাউন্সিল অনুমতি দেয় না, পাছে ট্যুরিস্ট আকর্ষণ বেড়ে যায়। ট্রেনের বালাই নেই। সপ্তাঘুরে একখানা বাস উদয় হয়, সেসব বোকাদের জন্য, যারা নেপলসে যেতে চায়। হাতে গোনা কজনের প্রাইভেট কার আছে। কিন্তু হাতের তালুর মতো ছোট শহরে তা লাগে কী কাজে!

শহর চালায় পৌর কাউন্সিল, খাস ইতালিয় ভাষায় যাকে বলা হয় কনসিলিও কমিউনেল। এর সদস্য শহরের ছয় প্রবীণ। সব থেকে কনিষ্ঠ যে সদস্য, তিন পুরুষ আগেও তাদের পরিবারের কারো টিকিও এখানে খুঁজে পাওয়া যেত না। চেয়ারম্যান লরেঞ্জো পলেগ্রিও, অলিভঅয়েল কোম্পানির ম্যানেজার পাওলো কারাফিনি আর ট্র্যাফল মাস্টার পিয়েট্রো ডি রোজা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কাউন্সিলের সদস্য। বাকি তিন পদের জন্য পাঁচ বছর অন্তর ভোট হবার কথা। কিন্তু পনেরো বছর ধরে স্কুলশিক্ষক, ফার্মাসিস্ট আর মুদি কারবারীর বিরুদ্ধে কেউ ভোটেই দাঁড়ায়নি। কাজেই ভোট কী জিনিস, ভোটাররা তা ভুলেই বসে আছেন।

লোকাল পুলিশ বলতে একজন মাত্র অফিসার। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডিপাঠ- সবটাতেই এখানে তিনি একা। রুকা জেন্টাইল নাম তার। বড়কর্তারা বসেন নেপলসে। তা, এই অন্ধের ষষ্ঠী দারোগাবাবু অহেতুক তাদের বিরক্ত করতে চান না। কিন্তু এই গল্পটা এমন এক পরিস্থিতির, যখন লুকার জন্য নেপলসওয়ালাদের শরন নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছিলো।

দুই

ডিনো লম্বার্ডি কোত্থেকে যে হাজির হয়েছিলেন, কেউ বলতে পারে না। কিন্তু রাতারাতি তিনি এই শহরে কালো মেঘের মতো উদয় হয়েছিলেন। শুরু থেকেই একটা বিষয় স্পষ্ট ছিলো, তিনি স্নান করতে নয়, ঝড়-জলে সবাইকে ভেজাতে এসেছেন। ছয় ফুট চার ইঞ্চি তো হবেই তার উচ্চতা। শরীরের গড়নটা পেল্লাই, পাক্কা হেভিওয়েট বক্সারদের মতো। স্বভাবতই তিনি ভাবতেও পারেননি তার লড়াইটা কয়েক রাউন্ডের বেশি স্থায়ী হবে না।

শহরের দুর্বল মানুষজন, দোকানদার, স্থানীয় ব্যবসায়ী আর দুজন রেস্তোরাঁ মালিককে দিয়ে তিনি তার ত্রাসের রাজত্বের সূচনা করেন। তাদের তিনি সুরক্ষা দেবেন মালকড়ির বিনিময়ে, যদিও তারা কেউই বুঝলেন না কাদের কাছ থেকে এই সুরক্ষা! কারণ কর্টোগ্লিয়ার জিন্দেগিতে কোনো বড় অপরাধ তারা দেখেননি।

সত্যি বলতে কী, দারোগাবাবুর বয়স ৬৫ বছর হয়ে যাওয়ায় বছরখানেক আগে অবসর নেন। কিন্তু কাউন্সিল এতোই করিৎকর্মা যে, তার বদলে অন্য কাউকে নিয়োগ দিতে পারেনি পুরো সময়টাতে। কিন্তু আসল মুশকিল হাজির হলো, যখন ১০২ বছর বয়সে মেয়র মারিও পেলেগ্রিনো অন্তিমযাত্রায় চললেন। এখন তো নির্বাচন ছাড়া আর গতি নেই!

সবাই একরকম ধরেই নিয়েছিলেন যে, মেয়রপুত্র লরেঞ্জো তার বাবার আসনে বসবেন। পাওলো কারাফিনি তখন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হতেন। সবাই একটা করে পদ আগে বাড়তেন। স্থানীয় কসাই আমবার্টো ক্যাটেনিও ফাঁকা জায়গাটা পূরণ করতেন। এগুলো সব ঠিক ছিলো লম্বার্ডি টাউনহলে ঢোকার আগ অবধি। কারণ তিনি সোজা মেয়র পদপ্রত্যাশীর তালিকায় নিজের নামটি ঢুকিয়ে দেন। অবশ্যই লরেঞ্জো পেলেগ্রিনো যে নিরঙ্কুশ জয় পেতে যাচ্ছেন, সে নিয়ে তখনও কারো সন্দেহ ছিলো না। কাজেই ব্যাপারটা বজ্রাঘাতের মতো হলো, যখন টাউনক্লার্ক টাউন হলের সিঁড়ি থেকে ফল ঘোষণা করলেন। ঘোষণা অনুযায়ী, লম্বার্ডি ৫৫১ আর পলেগ্রিনো ৪৮৬ ভোট পেয়েছেন। ফলাফল শুনে অবিশ্বাসের ধাক্কা খেলো শহরবাসী। কারণ তাদের কেউই নিজের পরিচিত একজনকেও জানতেন না যিনি লম্বার্ডিকে ভোট দিয়েছিলেন। শুধু ফলাফল ঘোষণাকারী টাউনক্লার্কের বাম পা ছিলো প্লাস্টারে ঢাকা, দাঁড়িয়েছিলেন ক্র্যাচে ভর করে।     

লম্বার্ডি মুহূর্তের মধ্যেই টাউন হল দখল করে নিলেন। জেঁকে বসলেন মেয়রের বাসভবনে। আর কাউন্সিলকে বরখাস্ত করলেন। তিনি তার পদে অল্প কিছুদিনই ছিলেন। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যেই শহরের মূল তিন কোম্পানির ওপর বিক্রয় শুল্ক বসিয়ে দেন। এরপর সেই শুল্ক দোকানদার থেকে রেস্তোরাঁ অবধি বিস্তৃত হলো। এখানেই শেষ নয়, লম্বার্ডি বিক্রেতাদের মতোই ক্রেতাদের ওপরও শুল্ক বসিয়ে ছাড়লেন। নিদেনপক্ষে কমিশন তো বটেই।

‘ভূস্বর্গ’ বছরখানেকের মধ্যেই ‘ভূনরক’ হয়ে উঠলো। আর মেয়র মহোদয় এতে শয়তানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পেরে বেশ খুশিই ছিলেন। কাজেই, বাস্তবিক অর্থে, লম্বার্ডি খুন হবার পর কেউই তেমন একটা ধাক্কা খাননি।

লুকা জেনটাইল কাউন্সিলের চেয়ারম্যানকে সাফ বলে দিলেন যে, এইসব খুন-টুন তার আয়ত্বের বাইরের ব্যাপার। কাজেই তাকে নেপলসে তার বড়কর্তাদের জানাতে হবে। এরপরই দারোগাবাবু ওপরে একখানা প্রতিবেদন লিখে পাঠালেন, যেখানে অসহায় স্বীকারোক্তিও জুড়ে দিলেন যে, শহরের ১,৪৭২ অধিবাসীর সবাইকেই তার সন্দেহভাজন মনে হচ্ছে এবং খুনটা যে কে করেছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো ধারণাই করতে পারছেন না!

এই অপরাধ তদন্ত করে খুনিকে ধরে বিচারের জন্য নিয়ে যাবেন, এমন একজন মেধাবী তরুণ গোয়েন্দাকে পাঠানো হলো নেপলস থেকে। আন্তোনিও রসেটি তার নাম। বয়স ৩৪। সবে তিনি লেফটেন্যান্ট হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। এটা নিয়ে শুরুর দিকে একটু দোলাচলে ছিলেন তিনি। তবে তা খুব বেশিদিন নয়। তিনি পুলিশপ্রধানকে আশ্বস্ত করলেন যে, যত দ্রুত সম্ভব তিনি মামলা গুটিয়ে নিয়ে নেপলস ফিরবেন, যাতে সেখানে ফিরে কিছু খাস অপরাধীকে টাইট দিতে পারেন।

লেফটেন্যান্ট রসেটি কার্টোগ্লিয়ায় পা রাখার আগেই লুকা জেন্টাইল হার্টঅ্যাটাকে মারা গেলেন। কেউ কেউ বললেন যে, খুনের ব্যাপারটা তাকে খুব চাপে রেখেছিলো। কারণ এই শহরের শেষ খুনটা হয়েছিলো ১৮৯২ সালে, যখন পুলিশের দায়িত্বে ছিলেন লুকার দাদার বাবা। কাজেই এখন মেয়র খুনের ব্যাপারে হয়তো একজনের কাছ থেকেই কিছু কাজের তথ্য মিলতে পারে। তিনি হলেন স্থানীয় চিকিৎসক, যিনি থাকেন পাশের গ্রামে।

কর্টোগ্লিয়ার পথে রসেটি ডা. ব্যারনের সঙ্গে দেখা করলেন। লম্বার্ডির মরদেহ যে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিলো, তা জেনে তিনি মোটেও সন্তুষ্ট হলেন না। তার ওপর স্থানীয়দের ঘৃণা প্রকাশের দৃষ্টান্ত হিসেবে সেই পোড়া ছাইও পাহাড়ের নিচে ছড়িয়ে ফেলা হয়েছিলো। ডা. ব্যারন শুধু এটুকুই নিশ্চিত করতে পারলেন যে, প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরার আগে তিনি আর লুকা জেন্টাইল কেবলমাত্র মরদেহটা দেখতে পান।

“কাজেই, এখন এই খুনের ব্যাপারে যা তথ্য সেগুলো এখন এই দুনিয়ায় আপনি আর আমিই শুধু জানি,” রসেটির হাতে ময়নাতদন্তের ফলাফল তুলে দেয়ার সময় ডা. ব্যারন বললেন।  

তিন

লেফটেন্যান্ট অ্যান্তোনিও রসেটি সেদিন সন্ধ্যায় কর্টোগ্লিয়ায় পৌঁছান। তাকে জানানো হলো যে, খুনি ধরা না পরা পর্যন্ত কাউন্সিল তাকে মেয়রের বাসায় থাকার কথা বলেছে।

কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বলেছিলেন, “সর্বোপরি ব্যাপারটা দ্রুত শেষ হয়ে যাক, যাতে ছেলেটা দ্রুত নেপলসে ফিরে যেতে পারে।”

পরদিন, অ্যান্তোনিও স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে তার অফিস বসালেন। অফিস বলতে দুটো ছোট ঘর, একটা অনাবৃত সেল আর একখানা ল্যাভেটরি। ডা. ব্যারনের রিপোর্ট আরো একবার পড়ার পর তিনি তার অফিস ছেড়ে শহরে ঘোরাফেরা করার সিদ্ধান্ত নেন, এই আশায়, যদি কেউ তাকে তথ্য দিতে পারে। তিনি ধীর গতিতে হাঁটলেন এবং এর ওর দিকে চেয়ে হাসলেন, কিন্তু তারপরেও লোকগুলো তার সঙ্গে কথা বলার চেয়ে রাস্তা পেরিয়ে চলে যাওয়াটাই বেশি পছন্দ করলেন। বোঝা গেলো, তাকে খুব জুতের মানুষ হিসেবে কেউ নিচ্ছেন না।  

নিরাশ সকাল শেষে অ্যান্তোনিও তার অফিসে ফিরলেন। একটা তালিকা করলেন, যেখানে সেইসব মানুষদের নাম তুললেন, লম্বার্ডির মৃত্যুতে যারা সব থেকে লাভবান হয়েছেন। তিনি মোটামুটিভাবে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, শুরুটা টাউন কাউন্সিলের সদস্যদের দিয়েই করতে হবে। তার নোটবুকে লিখলেন- ওয়াইন, অলিভঅয়েল আর ট্র্যাফল। তিনি শেষেরটা দিয়ে শুরু করার কথা ভাবলেন। তাই সিনর ডি রোজার অফিসে ফোন করে সেই দুপুরে দেখা করার জন্য অ্যাপয়েনমেন্ট চাইলেন।

চার

“একগ্লাস ওয়াইন চলবে নাকি?” ডি রোজা বললেন। অ্যান্তোনিও এমনকি তখনও বসেননি।

“না, থ্যাংক ইউ, স্যার। ডিউটির সময় আমি খাই না।”

“ঠিকই আছে,” ডি রোজা বললেন বটে। তবে নিজের জন্য স্থানীয় হোয়াইট ওয়াইন ঠিকই গ্লাসে ঢাললেন।

“শুরু করা যাক,” অ্যান্তোনিও নোটপ্যাডটা খুলে আগে থেকে তৈরি করা প্রশ্নের দিকে চোখ বুলিয়ে বললেন, “আপনার পরিবার তো কর্টোগ্লিয়ায় দুশ বছরের বেশি সময় ধরে থাকছে…”

“উঁহু, দুশ নয়,” ট্র্যাফল মাস্টার ভুল ধরালেন, “তিনশ বছর।”

“সেক্ষেত্রে লম্বার্ডিকে কে খুন করতে পারে সে ব্যাপারে আপনার একটা মতামত পেতেই পারি, নাকি?”

ডি রোজা তার গ্লাসটা আবার ভরলেন, এরপর বড় একটা চুমুক দিলেন। তারপর বললেন, “আলবাৎ পারেন, লেফটেন্যান্ট রসেটি। কারণ আমিই লম্বার্ডিকে মেরেছি।”

অ্যান্তোনিওকে হতচকিত দেখালো। দ্বিতীয় দিনে এক্কেবারে সোজা স্বীকারোক্তি! তিনি ভাবতেও শুরু করেছিলেন যে নেপলসে ফিরে কীভাবে দুর্ধর্ষ সব অপরাধীদের পেছনে লাগবেন।

“আপনি কি সেক্ষেত্রে একটা জবানবন্দিতে সই করবেন?”

“বিলকুল। কেন নয়?”

“আপনি তো এটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, সিনর ডি রোজা, যে, এর ফলে আপনাকে বিচারের জন্য আমার সঙ্গে নেপলসে যেতে হবে? আপনার বাকি জীবন হয়তো সেখানে জেলে কাটাতে হবে।”

“বেজন্মাটাকে যেদিন মারলাম, সেদিন থেকেই আমি এসব ভেবেছি। ব্যাপার না। খুব ভালো একটা জীবন কাটিয়েছি আমি।”

“কেন মারলেন আপনি ওকে?” অ্যান্তোনিও জানতে চাইলেন, যিনি কি না মনে করেন যে সব অপরাধের পেছনে সব সময় কোনো না কোনো মোটিভ থাকে।

ডি রোজা তার গ্লাসটা তৃতীয়বারের মতো ভরে নিলেন। “লেফটেন্যান্ট, ও মানুষ নয়, একটা শয়তান ছিলো। যেই তার সংস্পর্শে এসেছে, তার জীবনই সে দুর্বিষহ করে দিয়েছে।” একটু থামলেন। এরপর ওয়াইনে চুমুক দিয়ে ডি রোজা বললেন, “ও সবার জীবন নরক করে ছেড়েছে, আমারটাও।”

“কীভাবে?” অ্যান্তোনিও সবিস্তারে জানতে চান।

“ব্যাটা খালি আমার ট্র্যাফলের ওপর ট্যাক্স লাগিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, সে আমার পুরনো সব খদ্দেরদের কাছ থেকে ঘুষ নিতে শুরু করেছিলো। যদি বেশিদিন এভাবে চলতো, তাহলে আমার ব্যবসার বারোটা বেজে যেত।”

অ্যান্তোনিও লিখে চলেছেন।

“আমার বাবার মৃত্যুর পর আমি দায়িত্ব নিই। এরপর থেকে আমাদের কোম্পানি গেলো বছর প্রথমবারের মতো লোকসান গুনেছে,” ডি রোজা বলে চলেছেন, “সত্যিটা হলো, ওর যা প্রাপ্য সেটাই ও পেয়েছে।”  

“আরেকটা প্রশ্ন আছে,” গোয়েন্দাপ্রবর জানতে চাইলেন, “ওকে কীভাবে মেরেছেন আপনি?”

“আমার ট্র্যাফল কাটার ছুড়ি দিয়ে,“ কোনো দ্বিধা ছাড়াই ডি রোজা জানিয়ে দিলেন, “ওই অস্ত্রটাই আমার কাছে যথাযথ মনে হয়েছে।”

“আর কতবার আপনি ওকে স্ট্যাব করেছিলেন?”

“ছয় কি সাত,” সামনে থাকা চাকু তুলে নিয়ে দেখাতে দেখাতে বললেন তিনি।

“সিনর ডি রোজা, আমি নিশ্চিত যে, আপনি জানেন পুলিশের সময় নষ্ট করা গুরুতর অপরাধ।”

“অবশ্যই আমি জানি,” ডি রোজা নির্বিকার, “কিন্তু আমি তো এখন দায় স্বীকার করে নিলাম। আপনি আমাকে গ্রেফতার করে গরাদে পুরতে পারেন।”

“সেটা করতে পারলে কেতার্থ হতাম,” অ্যন্তোনিও বললেন, “যদি শুধু ছুরিকাঘাতে লম্বার্ডি মরতেন।”

ট্যাফল মাস্টার তার কাঁধ ঝাকালেন, “এর মানে কী? শুধু বলুন যে, লম্বার্ডিকে কীভাবে মেরেছি বলে আমাকে স্বীকারোক্তি দিতে হবে।”

প্রথমবারের মতো অ্যান্তোনিও কাউকে হত্যার দায় নিতে দেখলেন, যে সেই অপরাধটি আসলে করেইনি।

“আপনি নতুন করে আরও কোনো ঝামেলায় পড়ার আগেই আমি চললাম, সিনর ডি রোজা।”

ট্র্যাফল মাস্টারকে হতাশ মনে হলো।

অ্যান্তোনিও তার নোটপ্যাড বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালেন। এরপর আর একটি শব্দও ব্যয় না করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। যখন তিনি তার দেখা সব থেকে বেশি সংখ্যক শুকরের খামারের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের কাণ্ডকারখানা দেখে হাসি চাপার চেষ্টা করলেন। যেন ওরা ধরেই নিয়েছে যে ওদের জীবনে জবাই করা হবে না।

পাঁচ

পুলিশ স্টেশনে ফেরার পথে স্কোয়ারের উল্টোপাশে একটা ফার্মেসি দেখতে পেলেন অ্যান্তোনিও। তার মনে পড়লো, সাবান আর টুথপেস্ট লাগবে তার। ভেতরে ঢুকতেই দরজার ওপরে ঝোলানো ছোট ঘণ্টাটা বেজে উঠলো। কাউন্টারের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়াতে হলো। “সুপ্রভাত, সিনর রসেটি,” ডিসপেনসারি থেকে এগিয়ে এসে তরুণী বললো, “কী করতে পারি, বলুন।”

আপনি যখন শহরের একমাত্র মানুষ, যিনি কাউকে চেনেন না, অথচ সবাই আপনাকে চেনে!

নেপলেসর ডাকসাইটে বড় বড় অপরাধীরাও অ্যান্তোনিও রসেটিকে চুপ করাতে পারেনি। অথচ কর্টোগ্লিয়ার এক কেমিস্ট এক বাক্যে তা করে ফেললো। মেয়েটা অ্যান্তোনিওকে কথা বলতে সময় দিলো।

“আমি…আসলে…সাবান চাইছি,” অ্যান্তোনিও দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। 

“আপনার পেছনে নিচের তৃতীয় তাক থেকে বেছে নিতে পারেন।”

অ্যান্তোনিও একটা সাবান নিলেন। তবে টুথপেস্টের ধারেকাছেও ঘেঁষলেন না। কারণ যত দ্রুত সম্ভব আরেকবার এখানে ঢুঁ মারার একটা সুযোগ তিনি রেখে দিতে চাইলেন। তিনি সাবানটা কাউন্টারে রেখে দাঁড়িয়ে থাকলেন এবং চেষ্টা করলেন মেয়েটার দিকে না তাকাতে।

“নেপলসে পুলিশরা কি সব ফ্রিতে পায় নাকি?” মুখচাপা হাসি দিয়ে মেয়েটা জানতে চাইলো।

“আই অ্যাম সো স্যরি,” সম্বিৎ ফিরে পেয়ে দ্রুত পকেট থেকে টাকা বের করে কাউন্টারে রাখলেন অ্যান্তোনিও।

“আর কিছু লাগলে চলে আসবেন এখানে,” মেয়েটা ছোট একটা ব্যাগে সাবান ভরে দেয়ার সময় বললো।

দোকান থেকে তিনি প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে এলেন। দ্রুত পায়ে ফিরলেন পুলিশ স্টেশনে। টেবিলে বসে ডি রোজার সঙ্গে হওয়া বৈঠকের রিপোর্ট লিখতে বসলেন। কিন্তু মনোযোগ দিতে পারছিলেন না। এরপর তিনি ফিরে গেলেন তার সন্দেহভাজনদের তালিকায়। সেখান থেকে ট্রাফল কেটে দিলেন।

অ্যান্তোনিও এরপর অলিভঅয়েল কোম্পানির মালিক পাওলো ক্যারাফিনির সঙ্গে বসার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু এবার তিনি আর ফোন করে তাকে আগাম জানালেন না। দুপুরের খাবার খেয়েই তিনি শহরের বাইরের অংশে অলিভঅয়েল কারখানার দিকে চললেন। পথে ফার্মেসিটা আবার দেখলেন। একটু থেমে দোকানের দিকে এগিয়ে জানালা দিয়ে উঁকি দিলেন। মেয়েটা কাউন্টারে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বলছে। চলে যাবার সময় মেয়েটার চোখ পড়লো তার ওপর। সে হাসলো। আর তাতেই অ্যান্তোনিওর চলার গতি দ্রুত হয়ে গেলো।

তিনি ক্যারাফিনির অলিভঅয়েল কারখানায় পৌঁছে রিসিপসনিস্ট বললেন, তিনি সিনর ক্যারাফিনির সঙ্গে দেখা করতে চান।

“আপনার কি কোনো অ্যাপয়েনমেন্ট ছিলো?”

“না”, তিনি পকেট থেকে একটা ওয়ারেন্ট কার্ড বের করে দেখালেন।

“আমি জানি আপনি কে,” রিসিপশনিস্ট মেয়েটা এটুকু বলেই ফোনের রিসিভার কানে লাগিয়ে ওপারে কথা বললো, “সেই পুলিশ আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।”

করিডোরের অন্যপাশের দরজা খুলে এক বয়স্ক ভদ্রলোক বেরিয়ে আসতেই অ্যান্তোনিও হাসলেন। “আসুন, সিনর রসেটি,” ভদ্রলোকের অকপট অভ্যর্থনা।

“আমি দুঃখিত যে, অ্যাপয়েনমেন্ট ছাড়াই চলে এসেছি, স্যার,” সিনর ক্যারাফিনির পিছন পিছন তার অফিসে ঢুকে অ্যান্তোনিও বললেন।

“আমি বুঝেছি ব্যাপারটা,” ক্যারাফিনি বললেন, “মোটের ওপর আপনি আমাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলেন। যদিও আমি কিন্তু মোটেও তা হইনি।”

“কেন?” মুখোমুখি বসে জানতে চাইলেন অ্যান্তোনিও।

“সবাই জানে যে আপনি লম্বার্ডির হত্যা তদন্ত করতে এসেছেন। আর এব্যাপারে কথা বলার জন্য আমি যে আপনার তালিকার শুরুর দিকে থাকবো, তা তো প্রত্যাশিতই।” 

“কী কারণে?”

“কারণ, আমি যে ওই লোকটাকে ঘৃণা করি, তা লুকানোর কিছু নেই। আর সে কারণে হয়তো আপনি আমাকে গ্রেফতার করে চান। তাই আমাকে সতর্ক করে আসতে চাননি।”

অ্যান্তোনিও তার কলম নামিয়ে রাখলেন। “আর আমি কেন তেমনটা করবো, সিনর ক্যারাফিনি?”

“কারণ, আমি মেয়রকে মেরেছি।”

“কী কারণে আপনি তাকে খুন করলেন?”

“ও আমার ব্যবসা বরবাদ করে দিচ্ছিলো। ওই লোকটা যদি আরেক বছর বাঁচতো তাহলে আমার বাচ্চা কাচ্চাদের জন্য হয়তো কিছুই রেখে যেতে পারতাম না। তাও ভালো এখন আমার ছেলেটা আমার এই ব্যবসার দায়িত্ব নিতে সক্ষম।” ক্যারাফিনি উঠে দাঁড়িয়ে ডেস্কের ওপর দিয়ে নিচের দুটো হাত বাড়িয়ে দিলেন, যেন হ্যান্ডকাফ পরানো যায়।

“আপনাকে গ্রেফতারের আগে,” পুলিশম্যান বললেন, “লম্বার্ডিকে আপনি কীভাবে খুন করেছেন, তা একটু জানতে চাই, সিনর ক্যারাফিনি।”

ক্যারাফিনি ইতস্তত করলেন না মোটেই। “আমি ওকে গলা টিপে মেরেছি,” বসে পড়ার আগে তিনি বললেন।

“কী দিয়ে?”

এবার খানিকটা ইতস্তত করলেন। তারপর বললেন, “সেটা বলার কি কোনো দরকার আছে?”

“তা নেই,” অ্যান্তোনিও বললেন, “কিন্তু আমার মনে হয় না যে লম্বার্ডিকে গলা টিপে মারা হয়েছে।”

“কিন্তু ওর অন্তেষ্টিক্রিয়াও হয়ে গেছে। আপনি কীভাবে এতোটা নিশ্চিত হচ্ছেন?”

“কারণ তার একটা ময়নাতন্ত হয়েছে এবং সেই রিপোর্টটা আমি পড়েছি। সিনর, ক্যারাফিনি, আমি আপনাকে আশ্বস্ত করছি যে, তাকে গলাটিপে মারা হয়নি।”

“আমাকে বলুন যে কীভাবে তাকে মারা হয়েছিলো। আমি নিশ্চিত যে খুনি সে ব্যাপারে দ্রুতই নিজেকে তুলে ধরবে। আর সেটা আপনার-আমার দুজনেরই সমস্যা দূর করে দেবে।”

“এমনটা হবে না,” অ্যান্তোনিও বললেন, “কাজেই, সিনর ক্যারাফিনি, আপনি আপনার বন্ধুদের নিশ্চিত করে বলে দেন যে, লম্বার্ডির খুনি যেই হোক আমি তাকে ধরবো এবং গরাদে পুরবো।” তিনি তার নোটবুকটা বন্ধ করলেন।

উঠে দাঁড়াতেই অ্যান্তোনির চোখ পড়লো ক্যারাফিনির ডেস্কে রাখা ছবির দিকে। অলিভঅয়েল কারখানার মালিক হাসলেন। “আমার মেয়ের বিয়ের ছবি,” তিনি বললেন, “ও আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সিনর ডি রোজার ছেলেকে বিয়ে করেছে। তেল আর জল হয়তো মেশে না, লেফটেন্যান্ট। কিন্তু অলিভঅয়েল আর ট্রাফল সহজেই মেশে।” নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলেন ক্যারাফিনি। অ্যান্তোনিও ধারণা করলো, এর আগে বহুবার ভদ্রলোক এই রসিকতা করেছেন।

“আর এই নিতকনেটা কে?” অ্যান্তোনিও নববধূর পেছনে দাঁড়ানোর তরুণীকে দেখিয়ে জানতে চাইলেন।

“ফ্রান্সেসকা ফারিনেলি, সিনর পেলেগ্রিনোর ভাইঝি। ওকে আমি আমার ছেলে মারিওর সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু হয়নি।”

“কেন হলো না?” অ্যান্তোনিও বললেন, “জুড়িটা তো ভালোই হতো।”

“সে ঠিকই বলেছেন। কিন্তু কী করার। আসলে এই আধুনিক ইতালীয় মেয়েদের মেজাজমর্জি বোঝা দায়। ওরা সব সময় নিজের মতো করে ভাবে। আমি তো দোষ দিই ওর বাবাকে। মেয়েটাকে ভার্সিটিতে পাঠানোই উচিত হয়নি।” অ্যান্তোনিও কোনোমতে হাসি চাপলেন, পাছে ভদ্রলোক কিছু মনে করেন।

“স্যরি, লেফটেন্যান্ট। আমি আপনার কোনো কাজে এলাম না।”

“আমিও, সিনর ক্যারাফিনি।” অ্যান্তোনিও বললেন।

পুলিশ স্টেশনে গিয়ে রিপোর্ট লিখতে বসার আগে পথে ফার্মেসি হয়ে যাবার কথা ভাবলেন অ্যান্তোনিও। কিন্তু কাউন্টারে মাঝবয়সী একটা লোককে এক ক্রেতার সঙ্গে কথা বলতে দেখে তিনি হতাশ হলেন।

“কী লাগবে আপনার, সিনর রসেটি?” দোকানে ঢুকতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন।

“টুথপেস্ট লাগবে আমার।”

“আপনার ডানের ওপরের তাকে। প্লিজ হেলপ ইওরসেলফ।”

তিনি দাম দিচ্ছিলেন, এমন সময় ফ্রান্সেসকা হাতে একটা প্রেসক্রিপশন নিয়ে হাজির হলো।

“এটার কাজ করার কথা, সিনোরা, তারপরেও যদি না হয়, আমাকে জানাবেন”, আগে থেকে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রেতার উদ্দেশে বললো মেয়েটি।

“থ্যাংক ইউ, ডিয়ার,” বেরিয়ে যাবার আগে ক্রেতা বললেন।

এবার ফ্রান্সেসকা অ্যান্তোনিওর দিকে মনোযোগ দিলো।

“আপনি আমার বাবাকে ধরতে এসেছেন নাকি?”

“একদম না। আসলে আমি এখন এমন একজনকে খুঁজছি, যে বলবে সে লম্বার্ডিকে খুন করেনি।”

“ওয়েল, স্যরি টু সে, আমি করিনি,” সিনর ফেরিনেলি বললেন, “করতে পারলে খুশি হতাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি সেদিন রোমে একটা ফার্মাসিউটিক্যালস কনফারেন্সে ছিলাম।”

 “কিন্তু আমি যাইনি। আমি ছিলাম,” ফ্রান্সেসকা একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বললো।

“এমন একটা শহরে আটকা পড়াটা মোটেই সুখকর নয়, যেখানে আপনি কাউকে চেনেন না,” ফেরিনেলি বললেন।

“ব্যাপারটা জঘন্য,” অ্যান্তোনিও বললেন, “স্থানীয়রা সবে বন্ধু হতে শুরু করেছে। আর আমার ভালো জায়গাও নেই।”

“আপনি কোনোদিন যদি আমাদের সঙ্গে ডিনার করেন, ভালো হবে।”

“আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।”

“বৃহস্পতিবার আটটার দিকে হতে পারে?”

“আমি অপেক্ষায় থাকছি,” যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো অ্যান্তোনিও।

“আপনার টুথপেস্টটা নিয়ে যেতে ভুলেন না, সিনর রসেটি,” ফ্রান্সেসকা বললো।

ছয়

পরের সকালে যখন অ্যান্তোনিও পুলিশ স্টেশনে এলেন, তখন সেখানে একজন বিশালাকায়, হোঁৎকা শরীরের মানুষকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। তার পরনে একটা লম্বা নীল-শাদা স্ট্রাইপের অ্যাপ্রন।

“সুপ্রভাত, ইন্সপেক্টর।”

“লেফটেন্যান্ট।” অ্যান্তোনিও শুধরে দিলেন।

“আমি আমবার্টো ক্যাটেনিও”

“ও আচ্ছা, কসাইখানাটা আপনার,” অ্যান্তোনিও বললেন, “আপনার দোকানটা টাউন স্কোয়ারে না?”

তিনি মাথা উপরনিচ করলেন। গলাটা নামিয়ে নিয়ে এসে বললেন, “আমার মনে হয় আমি তদন্তে আপনাকে সাহায্য করতে পারবো।” অবশেষে, একজন ইনফরমার! ভেবেই অ্যান্তোনিওর মনটা চনমনে হয়ে উঠলো। দরজা লক করে তিনি ক্যাটেনিওকে অফিসে নিলেন। “আগে আমাকে একটু নিশ্চিত হতে হবে,” ক্যাটেনিও বললেন, “লম্বর্ডিকে কে মেরেছে, তা যদি আমি বলে দিই, তাহলে আমার নাম আসবে না তো?”

“আমি আপনাকে কথা দিলাম,” অ্যান্তোনিও ততোক্ষণে নোটবুক কেরে ফেলেছে, “এমনকি, বিচারের সময়ও প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আপনার নাম আসবে না।”

“আপনার কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর দরকারই হবে না,” ক্যাটেনিও বললেন, “কারণ আমি জানি খুনি তার পিস্তল কোথায় লুকিয়েছে।”

অ্যান্তোনিও চট করে নোটপ্যাডটা বন্ধ করলেন। এরপর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন। তার গতিক দেখে ক্যাটেনিও বললেন, “আরে আরে, আমি তো এখনও আপনাকে বলিই নি যে খুনি কে!” 

“আপনাকে আর সেই কষ্ট করতে হবে না, সিনর ক্যাটেনিও। কারণ লম্বার্ডি গুলি খেয়ে মরে নি।”

“কিন্তু জিয়ান লুসিও আমাকে বলেছে যে, সে ওকে গুলি করে মেরেছে,” ক্যাটেনিও প্রতিবাদ করলেন।

“আপনাকে কয়েকদিনের জন্য গরাদে ঢোকানোর আগে আমাকে বলা যাবে যে, এই জিয়ান লুসিওর পেছনে কেন লাগা হলো?”

“জিয়ান লুসিও আলটানা তো আমার সব থেকে পুরনো আর ঘনিষ্ঠ বন্ধু।”

“তাহলে তাকে লালদালানের ভাতটা খাওয়াতে চাইছেন কেন?”

“মোটেই না,” ক্যাটেনিও বললেন, “আমরা টস করেছি আর আমি হেরে গেছি।”

“ব্যাপারটা কী? কীসের টস?”

“যে জিতবে তাকে বলতে হবে যে, অন্যজন খুন করেছে।”

“কী?”, বিস্ময়ের ধাক্কাটা অতি কষ্টে সামলালেন নেপলসের গোয়েন্দাপ্রবর, “তা, আপনি টসে জিতলে কীভাবে লম্বার্ডিকে মারার কথা বলতেন?”

“আমিও তাকে… ঢিঁসচিঁয়াও”, আঙুল তাক করে গুলির ভঙ্গি দেখাতে দেখাতে বললেন, “গুলি করেই মারতাম। আর যেহেতু আমাদের দুই বন্ধুর মধ্যে একটাই পিস্তল আছে, তাই আগেই আমরা ঠিক করে রেখেছিলাম। সে অনুযায়ী আমি ওর বাড়িতে পিস্তল রেখেও এসেছি।”

“মানে…কৌতূহল আর কী,” অ্যান্তোনিওখানিক শীতল কণ্ঠে জানতে চাইলেন, “একটু কি বলবেন যে আপনার দোস্ত সিনর আলটানা লম্বার্ডিকে মারার স্বীকারোক্তি দেয়ার কৃপা কেন করলেন?”

“লম্বার্ডি যখন মেয়র ছিলো, তখন সে লুসিও রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন তিনবেলা খেতো।”

“এটুকুই একটা মানুষকে মেরে ফেলার জন্য কোনো কারণ হতে পারে!”

“তার চেয়ে বড় কথা মেয়র তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে তিনবেলা ওটা দখল করে রাখার কারণে সব নিয়মিত খদ্দেররা ভাগল ভা হয়ে যায়। ব্যবসায় লালবাত জ্বলার দশা হয়। সে আর কী করবে!” অ্যান্তোনিও মাথা দোলালেন। “আচ্ছা, ভালো কথা,” ক্যাটেনিও বললেন, “সে তো ছুরিকাঘাতে মরে নি, নাকি?”

“সিনর ক্যাটেনিও,” ঠাণ্ডা গলায় বললেন পুলিশকর্তা, “আপনি আর আপনার বন্ধু দুজনকেই চৌদ্দশিকে ঢোকানোর আগে মানে মানে কেটে পড়েন।”

পুরো সকালটা নষ্ট হয়নি। অ্যান্তোনিও ভাবলেন। কারণ এখন তিনি নিশ্চিত যে, শুধু তিনি, ডা. ব্যারন আর খুনি ছাড়া আর কারো ধারণাই নেই যে, লম্বার্ডি কীভাবে মরেছে।

সাত

বৃহস্পতিবার এসে গেলো। আটটা বাজার কয়েক মিনিট পর ফ্রান্সেসকাদের বাড়ির সামনের দরজায় অ্যান্তোনিও বেল বাজালেন। চমৎকার উষ্ণ একটা হাসি দিয়ে মধ্যবয়সী এক নারী দরজা খুলে তাকে স্বাগত জানালেন।

“আমি এলিনা ফেরিনেলি, ফ্রান্সেসকার মা। আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, সিনর রসেটি। ভেতরে আসুন, প্লিজ।” তিনি মেহমানকে ড্রইংরুমে নিয়ে বসালেন। তার পতিপ্রবর তখন সেখানে ওয়াইনের বোতল খুলছিলেন। ফ্রান্সেসকার কোনো পাত্তা নেই। “ও অল্পকিছুক্ষণের মধ্যেই নামবে,” এলিনা এমনভাবে বললেন, যেন তিনি অ্যান্তোনিওর ভাবনা ধরে ফেলেছেন।

ম্যারিও ফেরিনেলি ওয়াইনভরা একটা গ্লাস অ্যান্তোনিওর দিকে এগিয়ে দিলেন। জানতে চাইলেন, “তা আজ কটাকে গরাদে পুরেছেন?”

“আরে, আজ তো একটু হতাশই,” অ্যান্তোনিও জবাব দিলেন, “আজ কেউ লম্বার্ডিকে খুনের দায় নিতে এলোই না!”

এমন সময় ফ্রান্সেসকা ঘরে ঢুকলো।

অ্যান্তোনিও সহসা উপলব্ধি করলেন, এই প্রথমবারের মতো মেয়েটাকে তিনি লম্বা সাদা কোট ছাড়া দেখছেন। সে লাল সিল্কের ব্লাউজ, কালো স্কার্ট পরা। পায়ে একজোড়া উঁচু হিলের জুতো। নিশ্চিতভাবেই সেগুলো কর্টোগ্লিয়াতে কিনতে পাওয়া যায় না। সে মেয়েটার দিকে না তাকানোর প্রাণপণ চেষ্টা চালালো। আগের চেয়ে কোনো পরিবর্তন আছে কি? অবশ্যই। মেয়েটা চুল খুলে রেখেছে। অ্যান্তোনিও ধারণাই করতে পারে নি ফ্রান্সেসকা এতোটা আকর্ষণীয়।

“আপনি যেহেতু দক্ষ প্রশিক্ষিত ডিটেকটিভ,” মেয়েটা মুখ খুললো, “আমি ধরে নিচ্ছি যে আপনি এর মধ্যেই জেনে গেছেন যে আমার নাম ফ্রান্সেসকা। কিন্তু আপনাকে কী বলে ডাকবো, সেটা এখনও জানি না। অ্যান্তোনিও, নাকি টনি?”

“মা ডাকেন অ্যান্তোনিও বলে, বন্ধুরা সব টনি।”

“জানি যে, আপনি নেপলসে থাকেন,” এলিনা ফেরিনেলি বললেন, “কিন্তু আপনার পরিবারও কি সেখানকারই?”

“হ্যাঁ”, অ্যান্তোনিও জানালেন, “বাবা-মা দুজনই স্কুলটিচার। আমার আরও দুটো ভাই আছে। ওদের একজন ছবি আঁকে, আরেকজন ওকালতি করে।”

“আপনি কি সব সময়ই পুলিশ হতে চেয়েছিলেন?” ফ্রান্সিসকা জানতে চাইলো। ওর বাবা ওর হাতে ওয়াইনের গ্লাসটা দিলেন।

“একদম। কিন্তু আসলে নেপলসে হয় আপনাকে আইনের এদিক থাকতে হবে, নাহলে ওদিকে।”

সবাই নিয়মের হাসি হেসে উঠলেন। সেই হাসি মনে করালো, কীভাবে পরস্পরকে না চিনেও চেনার চেষ্টা করার জন্য কথা বলে যেতে হয়।

ফ্রান্সেসকার মা ট্রাডিশনাল ইতালিয়ান গৃহিনী, যার রান্না এতোটাই অসাধারণ যে সহজেই নিজের একটা রেস্তোরাঁ খুলে ফেলতে পারেন। ডিনারের সময়, ফ্রান্সিসকার বাবা ফার্মেসিতে শোনা নানা গল্প বলে সবাইকে মাতিয়ে রাখলেন। শহরের সব থেকে বড় গসিপশপ হলো তারটা, স্বীকারও করে নিলেন। আর অবশ্যই প্রত্যেকের একটা করে মতামত আছে যে, কে লম্বার্ডিকে খুন করেছে।

“আমার মনে হয়, যখন আমি নেপলসে ফিরে যাবো, তখন আমিই একমাত্র লোক হবো, যে মেয়রকে খুন করেছি বলে দাবি না করেই এই শহর ছাড়বো।”

ফেরিনেলি পরিবারের আতিথেয়তা অ্যান্তোনিওকে সহজ করে দিলো। নিজ বাড়ি বাড়ি একটা অনুভব পেলেন তিনি। সেই সন্ধ্যায় কয় বোতল ওয়াইন খোলা হয়েছিলো তিনি তা মনেও করতে পারলেন না। কিন্তু তিনি বেশ ঝরঝরে বোধ করছিলেন, যখন মেয়রের বাড়িতে যাবার সময় হলো। যদিও তিনি নিজেই নিজেকে অ্যারেস্ট করতেন, যদি এ অবস্থায় গাড়ি চালাতেন।

“কাল দেখা হবে,” বাইরের দরজা অবধি এগিয়ে দিতে এসে ফ্রান্সিসকা হেসে বললো। অ্যান্তোনিওকে একটু দ্বিধান্বিত দেখাচ্ছিলো। তা দেখেই মেয়েটা বললো, “সে পর্যন্ত, আপনার আরেকটা সাবানের দরকার হবে বলেই আমার মনে হয়। ভালো কথা, আমাদের বেশিরভাগ খদ্দের তিনটে বা ছয়টা সাবানের বাক্স কেনেন।”

“তোমাকে ডিনারে নিতে পারি?” বলে বসলেন অ্যান্তোনিও।

“এটা ভালো হবে।”

আট

দিনটা অ্যান্তোনিওর জন্য বিশ্রিভাবে শুরু হলো, যখন ডাকপিয়নবাবুর শখ জাগলো যে, এবার মেয়রকে খুন করার দায় স্বীকার করার পালা তার।

“তা, কীভাবে আপনি তাকে মেরেছেন, সিনর?” নিজের কলমটাও না তুলে জানতে চাইলেন অ্যান্তোনিও।

“ব্যাটাকে চুবিয়ে মেরেছি; একদম ডুবিয়ে দিয়েছি,” ডাকপিয়নের জবাব।

“কোথায়? সাগরে?” ভ্রু তুলে জানতে চাইলেন পুলিশকর্তা।

“না না, ওর বাথটাবে। আমি তাকে ভরকে দিয়েছিলাম।”

“আপনি করতেই পারেন,” অ্যান্তোনিও বললেন, “তবে আপনার ঘটনাটা লেখার আগে, আমাকে একটু বলেন তো, আপনি কতোখানি লম্বা?”

“পাঁচ ফুট সাড়ে তিন ইঞ্চি।”

“ওজন?”

“মোটামুটি ১৪০ থেকে ১৫০ পাউন্ড।”

“বটে! আর আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে বলছেন যে, আপনি এই শরীর নিয়ে ৬ ফুট ৪ ইঞ্চির একটা মুশকো জোয়ান, যার ওজন কোনোমতেই তিনশ পাউন্ডের কম নয়, তাকে চুবিয়ে মেরেছেন। তাও আবার যখন তিনি বাথটাবে স্নান করতেনই না। তা, সিনর, এবার আমাকে বলেন তো, সে সময় কি তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন?”

“না,” ডকপিয়ন জবাব দিলেন, “কিন্তু ও মাতাল ছিলো।”

“আহা! এটা একটা ব্যাখ্যা হতে পারতো। কিন্তু, সত্যি কথা হলো, আপনি যদি তাকে চুবানোর আগেই সে মরে যেতো, তাহলে নাহয় একটা ব্যাপার হতো।” ডাকপিয়নকে আহত মনে হলো। অ্যান্তোনিও বলে চললেন, “এনিওয়ে, আপনি সম্ভবত একটা ব্যাপার মাথায় রাখেন নি।”   

“কী সেটা?”

“লম্বার্ডি ডুবে মরে নি। কিন্তু চেষ্টাটা ভালো ছিলো আপনার। আর তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমার জন্য কোনো চিঠি আছে কি?”

“হ্যাঁ। একটা আপনার মায়ের। একটা পুলিশ চিফের। আরেকটা আপনার ভাইয়ের কাছ থেকে।”

“চিত্রশিল্পী নাকি উকিল?” অ্যান্তোনিও প্রশ্ন করতেই ডাকপিয়ন চিঠি তিনটে তার ডেস্কের ওপর রাখলো।

“উকিলবাবু।”

“শহরে কি গোপন বলে আর কিছু আছে?”

 “মাত্র একটা ব্যাপার,” ডাকপিয়ন বললো।

নয়

ফ্রান্সিসকার সঙ্গে তার পছন্দের রেস্তোরাঁয় ডিনার করার মানে প্রদর্শনীর মতোই প্রকাশ্যে বলে মনে হলো। যদি তিনি তার হাতটাও ধরতেন, তাহলেও সেই ছবি খবরসমেত পরদিন কর্টোগ্লিয়া গেজেটে ছাপা হয়ে যেতে পারতো।

“এই ছোট শহরে কখনও তুমি বোর হও না?” ওয়েটার প্লেট দিয়ে যাবার পর জানতে চাইলেন অ্যান্তোনিও।

“না,” মেয়েটা জবাব দিলো, “আপনি যে বই পড়েন, যে খবরের কাগজ পড়েন, তার সবই আমি পড়তে পারি। একই টিভি প্রোগ্রাম দেখতে পারি, একই খাবার খেতে পারি, এমনকি সেই একই ওয়াইনও। আর যদি নতুন কাপড় কেনা, আর্ট গ্যালারিতে যাওয়া কিংবা অপেরা দেখার দরকার হয়, আমি অনায়াসেই নেপলসে একটা দিন কাটিয়ে আসতে পারি।”

“কিন্তু সেই কোলাহল, সেই এক্সাইটমেন্ট, সেই…”

“সেই গাড়িরে সারি, সেই দূষণ, আর সেই গ্রাফিতি, আপনার নেপোলিটানদের আদব কেতার কথা নাহয় আর নাই বা বললাম।”

“আমি তোমার হাতটা ধরতে চাই,” অ্যান্তোনিও বললো। ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন বিটলসের গান বাজছিলো।

“ফ্রান্সিসকা চারিদিকে চেয়ে হাসলো, “তাহলে আমাদের মনে হয় ডেজার্টটা না খেয়ে হাঁটতে যাওয়া উচিত।”

“বিলটা মিটিয়ে চলো যাই,” ওয়ালেটটা পকেট থেকে বের করছিলেন অ্যান্তোনিও।

“বিলের কারবার চলবে না এখানে,” ফ্রান্সেসকা বললো, “জিয়ান লুসিও সবাইকে বলছেন যে, মেয়রকে খুন করেছেন বলে তিনি স্বীকার করলেও আপনি তাকে অ্যারেস্ট করতে রাজি হননি।”

“কারণ, তিনি অপরাধী নন,” অ্যান্তোনিও প্রতিবাদ করলেন। তারা ওঠার আগেই জিয়ান লুসিও সেখানে হাজির হলেন এবং বলতে থাকলেন যে, খুব শিগগির তাদের ‍দুজনকে আবার এখানে দেখতে পাবেন বলে আশা করেন।

দেয়ালে ঘেরা রাস্তার গোলকধাঁধায় যখন তারা হাঁটছিলেন তখন ফ্রান্সেসকা এমনভাবে কথা বলছিলো, যেন তারা কতদিনের চেনা। অ্যান্তোনিওর জন্য একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা এটা। হাঁটতে হাঁটতে যখন তারা ফ্রান্সেসকার বাড়ির সামনে এলো তখন প্রথমবারের মতো একে অপরকে চুমু খেলো।

“কাল দেখা হবে,” ফ্রান্সেসকা দরজায় চাবি ঢোকাতে ঢোকাতে বললো, “তা, এবার কী খুঁজতে আসবে রেজর নাকি সেভিং ক্রিম?”

অ্যান্তোনিও জবাব দেয়ার আগেই মেয়েটা দরজা বন্ধ করে দিলো।

দশ

নেপলসের পুলিশ চিফ মাসের শেষে অ্যান্তোনিওকে ডেকে পাঠালেন। জানতে চাইলেন, কোনো অগ্রগতি আছে কি না।

“আমার মনে হয় না, আমাকে দিয়ে হবে, চিফ,” অ্যান্তোনিও সাফ জানালেন। একটা মোটা ফাইল খুলে বললেন, “এ অবধি ৩৩ জন লোক লম্বার্ডিকে খুন করার স্বীকারোক্তি দিয়েছে, যাদের কেউই করেনি কাজটা। আর তার থেকেও খারাপ ব্যাপার হচ্ছে, আমার গাটস ফিলিং বলছে যে, এদের সবাই জানে যে কাজটা কে করেছে।”

“কেউ না কেউ ভাঙবেই,” চিফ বললেন, “সব সময় এমনই তো হয়।”

“এটা নেপলস নয়, বস,” স্বগতোক্তির মতো শোনালো অ্যান্তোনিওর নিজের কাছেই।

“তা, তোমার স্বীকারোক্তির তালিকায় নতুন কে?”

“কে নয়, কারা। এগারো জন। স্থানীয় ফুটবল টিম দাবি করছে যে তারা লম্বার্ডিকে খাঁড়ার ওপর ফেলে মেরেছে।”

“তো, ওরা কাজটা করে নি, সে ব্যাপারে তুমি এতো নিশ্চিত হচ্ছো কীভাবে?”

“আমি ওদের সবাইকে আলাদাভাবে জেরা করেছি। তারা একমতই হতে পারেনি যে, খাঁড়ার কোন অংশে তারা ওকে ফেলেছিলো। অথবা কীভাবে সেখান থেকে তারা ওকে বাড়ি পর্যন্ত বয়ে নিয়ে বিছানায় লাশটা রেখেছিলো। দুটো ক্ষেত্রে আমি আপনাকে নিশ্চিত করছি যে, ওরা খুনি নয়।”

“কী জানি বাপু! ওকে মারার লোকের তো অভাব নেই দেখছি,” চিফ বললেন, “শোনো, আমি অর্গানাইজ ক্রাইম ডিপার্টমেন্টের হেডের কাছ থেকে একটা চিঠি পেয়েছি। ওরা ওকে বরখাস্ত করেছে কারণ তাদের ধারণা সে অনেক বেশি হিংস্র। কাজেই এই কেসে যদি তোমার আর কিছু করার না থাকে তাহলে পরের মাসের শেষ নাগাদ ফিরে এসো। কারণ নেপলসে সত্যিকারের সব খুনিরা রাস্তায় ঘুরছে।”

এগারো

দিনটা সবাই ছুটি নিলো। অ্যান্তোনিওসহ। লরেঞ্জো পেলেগ্রিনো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মেয়র হলেন সেই উদযাপনে। কেউ ব্যাপারটাতে অবাক হয়নি। পুরনো কাউন্সিল স্বপদেই থেকে গেলো। টাউন স্কোয়ারে নাচ-গান চললো অনেক রাত অবধি। অ্যান্তোনিওর বেডরুমের জানালার পাশেই সেসব চললেও সেটাই তার ‍ঘুমুতে না পারার একমাত্র কারণ ছিলো না।

পরের সকালে তিনি তার মাকে ফোন করে জানালেন যে, তিনি বিয়ে করতে চান, এখানে এসে যে মেয়েটাকে পছন্দ করেছেন। আর মেয়েটা শুধু তার শারীরিক সৌন্দর্য্য দিয়েই তাকে মুগ্ধ করে নি।

“আমি ওকে না দেখে থাকতে পারছি না,” অ্যান্তোনিওর মা বললেন, “তুই ওকে এই উইকএন্ডে নেপলসে নিয়ে আয় না!”

“তুমি আর বাবা কর্টোগ্লিায়ায় আসো না, প্লিজ।”

পরের মাসের মধ্যে লম্বার্ডিকে খুন করার স্বীকারোক্তি দেনেওয়ালার সংখ্যা ৩৩ থেকে বেড়ে ৪১ জনের দাঁড়ালো। এবং যখন চিফ ফের তাকে নেপলসে ডেকে পাঠালেন, তখন অ্যান্তোনিওকে স্বীকার করতেই হলো যে, ছোট সেই শহরের লোকেরা ওকে হারিয়ে দিয়েছে। তিনি মেনেও নিলেন যে, সম্ভবত কেসটা ক্লোজ করার সময় চলে এসেছে।

নতুন মেয়র যদি ফোন করে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলতে নাও চাইতেন তাও হয়তো অ্যান্তোনিও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যেতেন। স্কোয়ার থেকে টাউন হলের পথে যেতে যেতে তরুণ ডিটেকটিভ ভাবলে যে স্বীকারোক্তিওয়ালার সংখ্যা সম্ভবত বেড়ে ৪২ হতে চলেছে। কারণ নয়া মেয়রই একমাত্র লোক, যিনি এখনো দাবি করেননি যে, তিনি লম্বার্ডিকে খুন করেছেন।

কিন্তু যখন সেই টাউন ক্লার্ক তাকে এবার ক্রাচ ছাড়াই তাকে কাউন্সিল ঘরে নিয়ে গেলো, তখন তিনি দেখলেন যে, মেয়র তার ৬ জন কাউন্সিলরসহ তার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন।

অ্যান্তোনিও টেবিলের অন্যপ্রান্তে বসলেন। কাউন্সিলের প্রতিটি সদস্যই একা বা যৌথভাবে লম্বার্ডিকে খুনের দাবি করে ফেলেছেন এরই মধ্যে। কাজেই তিনি বুঝতে পারলেন না, তাকে ডেকে আনার হেতু।

“সিনর রসেটি,” মেয়র শুরু করলেন, “আমরা এইমাত্র কাউন্সিলের মিটিং শেষ করেছি। আমরা সবাই একমত হয়েছি যে আপনাকে আমরা আমাদের পুলিশ চিফ করতে চাই।”

“কিন্তু আপনারা তো এর আগে একজন মাত্র পুলিশ রেখেছিলেন,” অ্যান্তোনিও মনে করিয়ে দিলেন।

“আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি যে, নেপলসের পুলিশ চিফ কেমন বেতনভাতা আর সুযোগ সুবিধা পান। আমরা সেসব আপনাকে দিতে একমত হয়েছি। আর আমরা মনে করছি যে, এতো খুনি চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে যে, আপনার একজন ডেপুটির দরকার হবে।”

“সে ঠিক আছে। কিন্তু…”

“আমরা আরও ঠিক করেছি যে, শহরের প্রয়োজনে আমাদের একটা নতুন পুলিশ স্টেশন তৈরি করা দরকার।”

“ঠিক আছে। আমি না হয় একমত হলাম, কিন্তু…”

“আর আমি খুশি হবো আপনি যদি মেয়রের বাসভবনটাকেই নিজের থাকার জন্য বেছে নেন,” পেলেগ্রিনো বললেন, “কারণ আমার আসলে দুটো বাড়ির দরকার নেই।”

অ্যান্তোনিওর তৃতীয় ‘কিন্তু…’ ততোটা জোরালো শোনালো না।

“এবং,” মেয়র বলে চললেন, “এর জন্য ভোটের দরকার নেই। তবে আপনি যদি আমাদের এখানকার কোনো মেয়েকে বিয়ে করেন, তাহলে বেশ ভালোই হবে ব্যাপারটা।”

বারো

বিয়ের দিন সকালে নেপলস থেকে অনেক অতিথি এসে পৌঁছালেন। অ্যান্তোনিও মেয়রকে আশ্বস্ত করলেন যে, পরদিনই তারা সবাই ফিরে যাবেন।

অ্যান্তোনিও রসেটি আর ফ্রান্সেসকা ফেরিনেলির অমর প্রেমের পরিণতি দেখতে পুরো শহর ভেঙে পড়লো, নিমন্ত্রণপ্রাপ্তদের বাইরে যারা ছিলেন তারাও। বিয়ের পর তারাভেনিসে হানিমুনে যাত্রা করলেন। অ্যান্তোনিওর মনে হলো, ওরা ফিরে এসেও শহরের সবাইকে উৎসব করতে দেখবেন।

নব দম্পতি তাদের হানিমুনের সময়টা প্রচুর স্পাগেটি খেলো, সঙ্গে অনেক ওয়াইন। যদিও খুব একটা মোটা হলো না।

হানিমুনের শেষ দিন তারা একসঙ্গে উপভোগ করলো।

সেই রাতে অ্যান্তোনিও বিছানায় বসে তার স্ত্রীকে নিরাভরণ হতে দেখছিলেন। ফ্রান্সিসকা বিছানায় উঠতেই তিনি তাকে জড়িয়ে ধরলেন।

“চমৎকার সময়গুলোর জন্য ধন্যবাদ,” ফ্রান্সিসকা বললেন, “তবে সব চেয়ে বেশি ধন্যবাদ একবারের জন্যও লম্বার্ডির নামটা মুখে না আনার জন্য।”

অ্যান্তোনিও হাসলেন। বললেন, “তুমি হয়তো একমাত্র ব্যক্তি যাকে আমি জিজ্ঞেস করিনি যে, কে ওকে খুন করলো।”

“আমি করেছি,” ফ্রান্সেসকা আরও ঘনিষ্ঠ হলো।

অ্যান্তোনিও হেসে ফেললেন। “তো, কীভাবে তুমি তাকে খুন করেছিলে, ডার্লিং?”

“বিষ। বিষ দিয়ে। ও ঘুমুতে যাবার আগে দুফোঁটা সায়েনাইড ওর কফিতে মিশিয়ে দিয়েছিলাম,” বিছানার পাশের লাইটটা বন্ধ করে দিয়ে ফ্রান্সিসকা বললো। অ্যান্তোনিও নড়াচড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন, ডা. ব্যারনের সেই ময়নাতদন্ত রিপোর্ট।

জেফরি আর্চার: এই ব্রিটিশ লেখক রাজনীতিতে নিজের জীবন শুরু করেছিলেন। ব্রিটেনের সংসদ সদস্য ছিলেন। দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে শেষ হয় তার রাজনৈতিক জীবন। তবে সেটা তাকে বিশ্বের সেরা রহস্য-রোমাঞ্চ লেখক হতে বাধা দিতে পারেনি। অনেকগুলো বেস্টসেলারের লেখক জেফরি আর্চারকে সমসাময়িককালের অন্যতম সেরা থ্রিলার লেখক ধরা হয়ে থাকে।